০৫:২৩ পি.এম
গাজীপুরের শিল্পনগরী খ্যাত কালিয়াকৈর উপজেলা বর্তমানে একটি চোর, ছিনতাইকারী ও রাহাজানিকারী গোষ্ঠীর অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে এখানে চুরি ও ছিনতাইয়ের ঘটনার সংখ্যা উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে। মসজিদ-মাদ্রাসা, বাড়ি, দোকানপাট সহ জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ হাইটেক সিটি রেলস্টেশন থেকেও যেন চোরেরা নিরাপদ নয়, কোনো স্থানই রক্ষা পাচ্ছে না। গত ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলোর কারণে পুরো উপজেলায় ব্যাপক আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। রবিবার (৩১ মে) দিবাগত রাত আড়াইটার সময় কালিয়াকৈর হাইটেক সিটি রেলওয়ে স্টেশনে একটি নাটকীয় ঘটনা ঘটে। সেখানে ট্রেনের লাইনের মেরামতের জন্য ব্যবহৃত একটি বিশেষ ওয়ার্কস ট্রেন বা মেরামত গাড়ি দাঁড়িয়ে ছিল। সেই গাড়ির ব্রেক সিস্টেম, কাপলিং ও সিগন্যালিংয়ের গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশ খুলে নিয়ে যাওয়ার সময় রেলওয়ের নৈশ প্রহরীর দৃষ্টিতে ধরা পড়ে চোরের একটি দল। এ সময় মোশাররফ হোসেন (২৮) নামক একজন চোরকে হাতেনাতে আটক করা হয়। তার বাড়ি উপজেলার টান কালিয়াকৈর গ্রামে, এবং তার পিতার নাম মোজাম্মেল হক। তার কাছ থেকে উদ্ধার করা হয়েছে রেলের তিনটি কাপলিং পিন ও একটি ব্রেক হোজ। তবে তার সহযোগী ৪-৫ জন চোর পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়। স্থানীয়রা ক্ষোভের সঙ্গে জানান, হাইটেক স্টেশন দেশের আধুনিক স্টেশন থাকা সত্ত্বেও রাতে সেখানে একজনও আরএনবি পুলিশ থাকে না। চোরেরা জানে যে সেখানে নিরাপত্তার অভাব রয়েছে, তাই কোটি টাকার যন্ত্রাংশ খুলে নিয়ে যাচ্ছে, যা স্ক্র্যাপ দোকানে মাত্র দুই-তিন হাজার টাকায় বিক্রি করা হচ্ছে। গত ছয় মাসে স্টেশন এলাকা থেকে রেলের ক্ল্যাম্প, নাট-বল্টু এবং সিগন্যাল তার চুরির ঘটনা বৃদ্ধি পেলেও রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের নজরদারি নেই। এদিকে গত শুক্রবার (২৯ মে) জুম্মার নামাজের সময় চুরির ঘটনার পর শনিবার (৩০ মে) দিবাগত রাতে জামিয়া আরাবিয়া রহিম নেওয়াজ খান মাদ্রাসায় চোরের দল দেয়াল টপকে ঢুকে পড়ে এবং সিসি ক্যামেরা及জেনারেটরের বৈদ্যুতিক তার খুলে নিয়ে যায়। উল্লেখ্য যে, ওই মাদ্রাসায় ২৫০ জন শিক্ষার্থী আবাসিক থাকে এবং ঈদ সামনে আসায় এখন বন্ধ থাকায় চোরেরা এই সুযোগ নিচ্ছে বলেও জানা গেছে। মাদ্রাসার পরিচালক মিয়ার মনি কান্নাজড়িত কণ্ঠে জানান, দান-সদকার টাকার মাধ্যমে জেনারেটরের তার কেনা হয়েছিল শিশুদের নিরাপত্তার উদ্দেশ্যে, কিন্তু চোরেরা এতিমখানাকে ও ছাড় দেননি। এ ছাড়া কিছুদিন আগে চায়না কোম্পানির বিদ্যুতের তার চুরি করার চেষ্টা করতে বাধা দেওয়ায় কর্মচারীদের মারধর করারও অভিযোগ রয়েছে। অথচ আহনাফের বাড়ির উঠান থেকে দুটি নারকেল চারাও চুরি হয়েছে। কালিয়াকৈর পৌরসভার শ্রীফলতলী, চন্দ্রা, সফিপুর, আটাবহ এবং মৌচাক এলাকায় প্রতিদিন ৫-৭টি বাসা-বাড়িতে চুরির ঘটনা ঘটছে। চুরির তালিকায় রয়েছে গ্যাসের সিলিন্ডার, সাবমারসিবল পাম্পের কপার ক্যাবল, সোলার প্যানেল, মোটর, ইনভার্টার ব্যাটারি, এমনকি রান্নার হাঁড়ি-পাতিল এবং থালা-বাসনও। ভুক্তভোগী গৃহবধূ রাহেলা বেগম জানিয়েছেন, টিনের ঘরের তালা ভেঙে চোরেরা তার রান্নার সমস্ত বাসনপত্র ও বৈদ্যুতিক তার চুরি করে নিয়ে গেছে। কালিয়াকৈর থানার ওসি সহিদুল ইসলাম জানান, চুরি ও ছিনতাই রোধের উদ্দেশ্যে টহল বাড়ানো হয়েছে। হাইটেক স্টেশনের ঘটনার পর একজন আটক হয়েছে এবং বাকিদের ধরতে জিআরপি ও থানা পুলিশ যৌথ অভিযানে নেমেছে। স্ক্র্যাপ দোকানে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করে চোরাই মাল উদ্ধারের চেষ্টা চলছে। তবে ভুক্তভোগীদের অভিযোগ যে, রাত ১২টা থেকে ভোর ৫টা পর্যন্ত প্রধান সড়কগুলোতে টহল পুলিশ চোখে পড়ে না এবং চোরেরা পুলিশের টহলের সময়সূচি জেনে যাওয়ায় টহল শেষ হলেই তাদের কাজে লেগে পড়ে। কালিয়াকৈর শিল্পাঞ্চল হওয়ায় এখানে ভাসমান জনসংখ্যা অনেক এবং বেকারত্ব, মাদকের বিস্তার ও স্ক্র্যাপ ব্যবসার জন্য অবৈধ চাহিদার কারণে এ ধরনের চুরি বাড়ছে বলে জানাচ্ছেন সচেতন মহল। প্রশাসন যদি এখনই কঠোর পদক্ষেপ নেয় না, তাহলে এলাকাবাসীর জানমালের নিরাপত্তা আরও বিপদের সম্মুখীন হতে পারে।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন