০১:২১ এম
প্রায় ৬০ বছর বয়সী জাহানারা বেগমের সংসারে রয়েছে এক ছেলে এবং পাঁচটি মেয়ে। তার একমাত্র ছেলে কামাল উদ্দিন বাবুল ছিল তার সকল স্বপ্ন, নির্ভরতা এবং বেঁচে থাকার উৎস। যদিও তার ছেলে বিদেশে থাকতেন, প্রতিদিনই ফোন করে মায়ের খোঁজ নিতেন এবং দেশে ফিরে মায়ের পাশে থাকার কথা দিতেন। কিন্তু ইতালির রাজধানী রোমে ঘটে যাওয়া এক নৃশংস হত্যাকাণ্ডে বাবুল নিহত হন, তার স্ত্রী এবং পাঁচ বছরের মেয়ে আরিশাও হত্যার শিকার হন। বিষয়টি এখনও নোয়াখালীর প্রত্যন্ত গ্রামের সেই মায়ের কাছে পুরোপুরি পৌঁছায়নি। তিনি এখনো এই বিশ্বাস রাখেন যে, তার ছেলে বেঁচে আছে এবং সুস্থ হয়ে একদিন ফিরে আসবে।
শনিবার (২৭ জুন) বিকেলে নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার চরকাঁকড়া ইউনিয়নের বিজয়নগর এলাকায় কামাল উদ্দিন বাবুলের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, পুরো পরিবার শোকে স্তব্ধ হয়ে রয়েছে। শোকে কাতর মায়ের বিলাপ উঠছে ঘর থেকে। চোখের পানি মুছতে মুছতে তিনি বারবার বলছেন, “আমার বাবুল আবার আইবো, আমার বাবুল কিছু হইব না।”
এখনো ছেলের মৃত্যুর বিষয়টি স্পষ্ট করে মাকে জানানো হয়নি, শুধুমাত্র বলা হয়েছে, বাবুল গুরুতর অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি আছেন। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, ২০১০ সালে এক আত্মীয়ের সাহায্যে ইতালিতে পাড়ি জমান বাবুল। বিদেশ যাওয়ার আগে তিনি একাধিক বিয়ের মাধ্যমে মমতাজ বেগম আরজুকে জীবনসঙ্গী হিসেবে গ্রহণ করেন। তাদের সংসারে জন্ম নেয় একজন ছেলে অয়ন ও একজন মেয়ে আরিশা। বাবুল দীর্ঘদিন ধরে বিদেশে থাকাকালীন তার স্ত্রী ও সন্তানদের নিয়ে সুখী জীবনযাপন করেছেন। পরিবারের সদস্যদের আশা ছিল, কিছু পরিমাণ পরে বাবুল দেশে ফিরে স্থায়ীভাবে বসবাস করবেন। তবে শুক্রবার রাতে ঘটে যাওয়া হত্যাকাণ্ডে সেই স্বপ্ন মুহূর্তেই চুরমার হয়ে যায়।
আরও পড়ুন: পাবনার জয়কালী বাড়ি মন্দিরে দুর্গাপূজা উপলক্ষে শাড়ি বিতরণ
ইতালির স্থানীয় সময় শুক্রবার রাত ৮টার দিকে রোমের পার্শ্ববর্তী ক্যাসালোত্তির ভিয়া মন্তিলিও এলাকায় এই ভয়াবহ ঘটনা ঘটে। নিহত কামাল উদ্দিন বাবুল, তার স্ত্রী আরজু বেগম এবং তাদের কন্যা আরিশা ইসলাম নিহত হন। গুরুতর আহত হন তাদের ছেলে অয়ন, যিনি বর্তমানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় হাসপাতালে আছেন।
স্থানীয় সূত্র ও স্বজনদের দাবি, শাহাদাত হোসেনের সঙ্গে বাবুলের স্ত্রীর সম্পর্ককে কেন্দ্র করে বিরোধের কারণে এ হত্যাকাণ্ড ঘটানো হয়েছে। যদিও বাবুল স্ত্রী-সন্তানদের নিয়ে ইতালিতে চলে আসেন, এরপরও এই বিরোধ ছিল। ঘটনার দিন, কামাল উদ্দিন, তার স্ত্রী এবং সন্তানদের উপস্থিতিতে শাহাদাতের সঙ্গে এক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকের সময় শেষ হলে তর্ক-বিতর্ক শুরু হয় এবং শাহাদাত ধারালো অস্ত্র নিয়ে হামলা চালান। বাবুল এবং তার পরিবার তখন ঘটনাস্থলেই নিহত হন।
ঘটনার পরে সন্দেহভাজন শাহাদাত হোসেন তার ফেসবুক অ্যাকাউন্টে একটি স্ট্যাটাস দেন, যেখানে তিনি লেখেন, "একজন মানুষ শুধু নিজে একা মরে না, নিজেও মরে অন্যকেও মরার মতো করে রেখে যায়। তাই মরার সময় প্রিয়জনদেরও সঙ্গে নিয়ে মরা উচিত। তাতে কারও জন্য কাউকে কষ্ট পেতে হয় না।"
শনিবার, ইতালির আইনশৃঙ্খলা বাহিনী শাহাদাতের ছবি প্রকাশ করে এবং তাকে ট্রিপল মার্ডার মামলার প্রধান সন্দেহভাজন হিসেবে চিহ্নিত করে। এরপর তার অবস্থান সম্পর্কে জনসাধারণের কাছে তথ্য চাওয়া হয়। শাহাদাতের বড় ভাই, সৌদি প্রবাসী ইসমাইল হোসেন হারুন বলেন, "চার বছর আগে শাহাদাত তার সব সম্পত্তি বিক্রি করে যুক্তরাজ্যে চলে যায়। এরপর থেকে পরিবারের সঙ্গে তার যোগাযোগ ছিল না।"
আরও পড়ুন: সন্দ্বীপে রোকেয়া মুজিবুল স্মৃতি বৃত্তি পরীক্ষা ও পুরস্কার বিতরণ
ইতালীয় সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, ঘটনাস্থলে স্থানীয়রা পুলিশে খবর দিলে পরে পুলিশ তিনজনের মরদেহ উদ্ধার করে। তদন্ত কর্মকর্তাদের প্রাথমিক ধারণা, ধারালো অস্ত্রের আঘাতে তাদের হত্যা করা হয়েছে।
চরকাঁকড়ার ওই বাড়িতে এখন শুধু কান্না এবং অপেক্ষা বিরাজমান। একদিকে, প্রিয় সন্তানকে হারানোর বেদনা, অন্যদিকে পুত্রবধূ এবং নাতনির মৃত্যু—সব মিলিয়ে পুরো পরিবার শোকে ভেঙে পড়েছে। তবে সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি হচ্ছে, জাহানারা বেগম এখনও এই বিষয়ে জানতে পারেনি। তিনি এখনো অপেক্ষা করছেন তার বাবুল একদিন ফিরে আসবে। তবে সেই অপেক্ষার আর কোনো শেষ নেই।
কোম্পানীগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. নুরুল হাকিম বলেন, "ভুক্তভোগী পরিবার মৌখিকভাবে বিষয়টি পুলিশকে জানিয়েছিল। এরপর পুলিশ নিয়মিত টহল দিয়ে তাদের নিরাপত্তার বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করেছিল।"
আরও পড়ুন: ঝালকাঠিতে ইয়ুথ ভলান্টিয়ার অ্যাওয়ার্ড ও অনুদান প্রদান
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন