১১:১০ পি.এম
পটুয়াখালীর রাঙ্গাবালীতে বনের খাল ও চরে মাছ ধরার অনুমতি দেওয়ার কথা বলে জেলেদের কাছ থেকে লাখ লাখ টাকা নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে বিট কর্মকর্তা সোয়েব খানের বিরুদ্ধে।
ভুক্তভোগীদের দাবি, ৫০ থেকে ৬০ জনের কাছ থেকে প্রায় ৩০ থেকে ৩৫ লাখ টাকা নেওয়া হলেও অনেককেই দেওয়া হয়নি কাঙ্ক্ষিত অনুমতি। পরে টাকা ফেরতের আশ্বাস দিয়ে গত ২২ জুলাই বদলির পর রাতের আঁধারে কর্মস্থল ত্যাগ করেন ওই কর্মকর্তা।
এ ঘটনায় মঙ্গলবার মৌডুবী বাজারে শতাধিক ভুক্তভোগী মানববন্ধন করে টাকা ফেরত ও অভিযুক্ত কর্মকর্তার বিচার দাবি করেন।
আরও পড়ুন: গাজীপুরের পোশাক কারখানার গুদামে আগুন, নিয়ন্ত্রণে ফায়ার সার্ভিসের চার ইউনিট
মানববন্ধনে অংশ নেওয়া স্থানীয় ইউপি সদস্য মহাসীন ভুঁইয়া অভিযোগ করেন, তিনি ও তার ছোট ভাই মিজানুর রহমান ভুইয়ার কাছ থেকে দুই দফায় মোট ৩ লাখ ৫০ হাজার টাকা নিয়েছেন সোয়েব খান। এরপর তাদের নির্দিষ্ট চরে মাছ ধরার অনুমতি না দিয়ে বেশি টাকার বিনিময়ে অন্য ব্যক্তিকে অনুমতি দেওয়া হয়। পরে চুক্তি অনুযায়ী অতিরিক্ত টাকা ফেরত চাইলে সোয়েব খান নিয়মিত কর্মস্থলে যাওয়া বন্ধ করে দেন। বদলির খবর জানার পর তারা টাকা ফেরত চাইলে তিনি ফেরত দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে রাতের আঁধারে এলাকা ত্যাগ করেন। পরবর্তীতে তার মুঠোফোনে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি এবং অন্য ভুক্তভোগীদের ফোন ধরছেন না।
স্থানীয় জেলে মনির হোসেন তালুকদার (৪৬) বলেন, চরতুফানিয়া এলাকায় গরু-মহিষের খাদ্যের জন্য ধানসি সংগ্রহের বেলচি (অনুমতি) দেওয়ার কথা বলে বিট কর্মকর্তা সোয়েব খান তার কাছে ৪ লাখ টাকা দাবি করেন। এর মধ্যে তিনি অগ্রিম ১ লাখ ৩২ হাজার টাকা দেন। বাকি টাকা অনুমতিপত্র হাতে পাওয়ার পর পরিশোধ করার কথা ছিল। কিন্তু টাকা দেওয়ার আট মাস পার হলেও তিনি কোনো অনুমতি পাননি। পরে টাকা ফেরত চাইলে সোয়েব খান টালবাহানা শুরু করেন এবং সময় চান।
তিনি আরও বলেন, গত ২২ জুলাই সোয়েব খানের বদলির খবর ছড়িয়ে পড়লে তিনি রাঙ্গাবালী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও)-এর কাছে লিখিত অভিযোগ করেন। এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা খায়রুল হাসান বলেন, লিখিত অভিযোগটি অভিযুক্ত কর্মকর্তার নিজ কার্যালয় জেলা বন বিভাগে পাঠানো হবে।
শামীম হাওলাদার (৪৮) বলেন, চলতি বছরের জানুয়ারিতে চর তালুকদার এলাকায় মাছ ধরার অনুমতি দেওয়ার নামে তাঁর কাছ থেকে ১ লাখ টাকা নেওয়া হয়। পরে তাঁকে অনুমতি না দিয়ে বেশি টাকার বিনিময়ে অন্য একজনকে অনুমতি দেওয়া হয়। তিনি টাকা ফেরত চাইলে ওই ব্যক্তির অনুমতি বাতিল করে তাঁকে দেওয়ার আশ্বাস দেওয়া হয়। পরে অভিযুক্ত কর্মকর্তার বদলির খবর শুনে তিনিসহ একাধিক ভুক্তভোগী তাঁকে আটক করে ঘুষের টাকা ফেরত চান। এ সময় তিনি সবার টাকা ফেরত দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে গোপনে কর্মস্থল ত্যাগ করেন।
আরও পড়ুন: নেছারাবাদে বিএনপি নেতা মিঠুর গণসংযোগ, ইউপি নির্বাচনে মনোনয়ন প্রত্যাশা
বাদল হাওলাদার বলেন, চর তালুকদার এলাকায় মাছ ধরার অনুমতি দেওয়ার নামে গত মার্চ মাসে তাঁর কাছ থেকে ১ লাখ টাকা ঘুষ নেওয়া হয়। পরে তাঁকে গ্যাফ চর বরাদ্দ দেওয়া হলে তিনি আপত্তি জানিয়ে টাকা ফেরত চান। পরে রাঙ্গাবালীতে সদ্য যোগদান করা রেঞ্জ কর্মকর্তা আমীর হোসেন ও মৌডুবী ইউনিয়নের বিট কর্মকর্তা জহির ইদ্দনের উপস্থিতিতে বিষয়টি সমাধানের আশ্বাস দেওয়া হলেও সোয়েব খান গোপনে কর্মস্থল ত্যাগ করেন।
মো. নুহু মিয়া (৪৫) বলেন, বেলচি দেওয়ার কথা বলে তার কাছ থেকে ৬০ হাজার টাকা নেওয়া হলেও তাঁকে কোনো বেলচি দেওয়া হয়নি, টাকাও ফেরত দেওয়া হয়নি। পরে নতুন রেঞ্জ কর্মকর্তা এলাকায় গেলে তিনি ও অন্যান্য ভুক্তভোগী মৌখিকভাবে অভিযোগ করেন। তখন রেঞ্জ কর্মকর্তা লিখিত অভিযোগ দিতে বলেন। অভিযোগ দেওয়ার বিষয়টি জানতে পেরে সোয়েব খান টাকা ফেরত দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে অভিযোগ না করার অনুরোধ করেন। কিন্তু বদলির পর থেকে তিনি আর ফোন ধরছেন না।
মৌডুবী ইউনিয়ন সেচ্ছাসেবক দলের সভাপতি তানবীন বিশ্বাস বলেন, নির্দিষ্ট এলাকায় মাছ ধরার বেলচি (অনুমতি) দেওয়ার কথা বলে তার কাছ থেকে ১ লাখ ৮৬ হাজার টাকা নেওয়া হয়। পরে তাকে অনুমতি না দিয়ে অন্য ব্যক্তিকে দেওয়া হলে তিনি টাকা ফেরত চান। এরপর সোয়েব খান টালবাহানা শুরু করেন। একপর্যায়ে মৌডুবী বাজারে তাঁকে আটক করে তার কাছ থেকে ভিডিও স্বীকারোক্তিও নেওয়া হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি। পরে রাঙ্গাবালী উপজেলা যুবদলের সদস্যসচিব নিয়াজ আকনের মাধ্যমে তাঁকে ৪০ হাজার টাকা ফেরত দেওয়া হয়।
মিজানুর রহমান (৪৫) বলেন, তার কাছ থেকে ১ লাখ ৫০ হাজার টাকা নেওয়া হলেও তাঁকে মাছ ধরার অনুমতি দেওয়া হয়নি। পরে নতুন রেঞ্জ কর্মকর্তা এলাকায় তদন্তে গেলে তিনি মৌখিকভাবে অভিযোগ করেন। রেঞ্জ কর্মকর্তা তাঁকে লিখিত অভিযোগ করার পরামর্শ দেন। কিন্তু সোয়েব খান টাকা ফেরত দেওয়ার প্রতিশ্রুতি নিয়ে অভিযোগ না করতে এবং বিষয়টি চেপে যেতে অনুরোধ করেন। এরপর তিনি বদলি হয়ে গোপনে চলে যান।
আরও পড়ুন: বরিশালে যুবদলকর্মী কাওসার হাওলাদারকে সন্ত্রাসীদের হাতে হত্যা
মানববন্ধনে অংশ নেওয়া ভুক্তভোগীরা অভিযোগ করেন, বঙ্গোপসাগর-সংলগ্ন নদী এলাকায় মাছ ধরা এবং গরু-মহিষের খাদ্যের জন্য ধানসি কাটার বেলচি (অনুমতি) দেওয়ার কথা বলে মৌডুবী এলাকার ৫০ থেকে ৬০ জন জেলে ও কৃষকের কাছ থেকে প্রায় ৩০ থেকে ৩৫ লাখ টাকা ঘুষ নেওয়া হয়েছে। কিন্তু তাঁদের বেলচি না দিয়ে অভিযুক্ত কর্মকর্তা রাতের আঁধারে কর্মস্থল ত্যাগ করেছেন।
এ বিষয়ে বিট কর্মকর্তা সোয়েব খান মুঠোফোনে ঘুষ নেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছেন, ‘বদলি হওয়ার কারণে অহেতুক কিছু অভিযোগ করা হয়েছে। তবে অধিকাংশ বিষয় সমাধান করেছি। বাকি কথা ফোনে নয়, রাতে হোয়াটসঅ্যাপে বলব।’ এরপর ফোনের লাইনটি কেটে দেন তিনি।
রাঙ্গাবালীর রেঞ্জ কর্মকর্তা আমীর হোসেন বলেন, তিনি চলতি বছরের ২২ জুলাই সেখানে যোগদান করেন। পরে মৌডুবী এলাকায় বন পরিদর্শনে গেলে স্থানীয় কয়েকজন সদ্য বদলি হওয়া বিট কর্মকর্তা সোয়েব খানের বিরুদ্ধে বেলচি প্রদানে ঘুষ নেওয়ার অভিযোগ করেন। তবে এখন পর্যন্ত অফিসিয়ালভাবে কেউ লিখিত অভিযোগ করেননি।
সোয়েব খানের স্থলাভিষিক্ত বিট কর্মকর্তা জহির উদ্দিন বলেন, তিনি ২৮ জুলাই মৌডুবী এলাকায় যোগদান করেন। যোগদানের সময় স্থানীয় কয়েকজন তার সামনেও সোয়েব খানের বিরুদ্ধে ঘুষ লেনদেনের অভিযোগ করেন। তবে পরিস্থিতি জটিল হওয়ায় তিনি তাৎক্ষণিকভাবে অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করতে পারেননি। পরবর্তীতে আগের কর্মকর্তা সোয়েব খান যথাযথভাবে দায়িত্ব হস্তান্তর না করেই গোপনে চলে গেছেন। বর্তমানে ভুক্তভোগীরা টাকা ফেরতের দাবিতে প্রায় প্রতিদিন তাঁর কাছে আসছেন।
আরও পড়ুন: টঙ্গীতে সড়ক দুর্ঘটনায় বাবা-ছেলে নিহত, পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছেছে
এ বিষয়ে পটুয়াখালীর উপকূলীয় বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা ড. মো. জাহিদুর রহমান মিয়ার মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি। পরে বরিশাল বন সংরক্ষক ড. মোল্যা রেজাউল করিম বলেন, এ বিষয়ে জেলা বন কর্মকর্তা বক্তব্য দেবেন।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন