০৯:৪৯ পি.এম
রোববার (২১ জুন) প্রধানমন্ত্রীর তারেক রহমান মালয়েশিয়া সফরে গেছেন। এটি প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণের পর তার প্রথম দ্বিপক্ষীয় বিদেশ সফর। সফরে তিনি মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের সঙ্গে একান্ত বৈঠকে সম্পৃক্ত হবেন, প্রতিনিধিদল পর্যায়ের আলোচনা এবং উচ্চপর্যায়ের একাধিক বৈঠকে অংশ নেবেন।
সফরের উদ্দেশ্যে সরকার ও ব্যবসায়ী মহলের প্রত্যাশা, দীর্ঘদিনের শ্রমবাজারকেন্দ্রিক বাংলাদেশ-মালয়েশিয়া সম্পর্ক এবার বাণিজ্য, বিনিয়োগ, জ্বালানি, শিক্ষা, হালাল অর্থনীতি ও প্রযুক্তি সহযোগিতার মতো নতুন ভবিষ্যৎ দিকে বিস্তৃত হবে।
প্রধানমন্ত্রীর সফরের বিষয়ে শনিবার (২০ জুন) পররাষ্ট্রসচিব আসাদ আলম সিয়াম গণমাধ্যমে জানিয়েছেন, বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার মধ্যে প্রস্তাবিত মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) নিয়ে একটি সমঝোতা স্মারক সই হতে পারে। পাশাপাশি সাংস্কৃতিক সহযোগিতার সম্পর্কেও একটি সমঝোতা স্মারক সই সম্ভব।
আরও পড়ুন: বাংলাদেশ-জাপান চুক্তি: ২০২৭ সালের এপ্রিল থেকে শুরু হবে পাঁচ বছর মেয়াদি কর্মসংস্থান চুক্তি
তিনি উল্লেখ করেন, দুই দেশের সরকারপ্রধানের আলোচনায় শ্রমবাজার, বাণিজ্য ও বিনিয়োগ, শিক্ষা, কৃষি, জ্বালানি, হালাল শিল্প ও সেমিকন্ডাক্টরসহ সম্ভাবনাময় বিভিন্ন খাতে সহযোগিতা সম্প্রসারণের দিকে গুরুত্ব দেওয়া হবে। সেইসাথে মালয়েশিয়ার বিভিন্ন খাতে নতুন বাংলাদেশি কর্মী নিয়োগ এবং আসিয়ানে বাংলাদেশের সদস্যপদ এবং রোহিঙ্গাদের নিরাপদ প্রত্যাবাসনে মালয়েশিয়ার সমর্থন কামনার বিষয়টিও আলোচনায় উল্লেখিত হবে।
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় বাংলাদেশের জন্য মালয়েশিয়া একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক অংশীদার। এটি বাংলাদেশের বড় শ্রমবাজার এবং একই সাথে জ্বালানি, পাম অয়েল, শিল্পের কাঁচামাল ও বিভিন্ন ভোগ্যপণ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ সরবরাহকারী হিসেবেও পরিচিত। অন্যদিকে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক, চামড়াজাত পণ্য, সিরামিক, ওষুধ ও কৃষিপণ্য রপ্তানির সম্ভাবনা থাকলেও, দুই দেশের বাণিজ্যে বড় ধরনের ভারসাম্যহীনতা বিরাজমান। ব্যবসায়ীদের মতে, মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির আলোচনা এগিয়ে গেলে বাংলাদেশি পণ্যের বাজার সম্প্রসারণ এবং বাণিজ্য ঘাটতি কমানোর সুযোগ সৃষ্টি হবে।
বাংলাদেশ-মালয়েশিয়া চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (বিএমসিসিআই) সভাপতি মো. আনোয়ার শহীদ বলেছেন, প্রধানমন্ত্রীর সফর কেবল কূটনৈতিক নয়, বরং অর্থনৈতিক দিক থেকেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তার মতে, দুই দেশের শীর্ষ নেতৃত্বের সরাসরি আলোচনা পারস্পরিক আস্থাকে বাড়াবার পাশাপাশি বিনিয়োগকারীদের কাছেও ইতিবাচক বার্তা দেবে।
তিনি উল্লেখ করেন, বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার মধ্যে জনশক্তি খাত ছাড়া বর্তমানে বড় কোনো অমীমাংসিত বিষয় নেই। তবে দীর্ঘদিন ধরে শ্রমবাজারই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হওয়ায় বাণিজ্য, বিনিয়োগ, জ্বালানি, কৃষি, শিক্ষা ও হালাল অর্থনীতির মতো সমুজ্জ্বল খাতগুলো যথেষ্ট গুরুত্ব পায়নি। এবারের সফরের মাধ্যমে সেই পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটার সম্ভাবনা রয়েছে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
আরও পড়ুন: হাসনাত আবদুল্লাহর অভিযোগ, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ব্যর্থতার শিকার প্রতিমন্ত্রী ইশরাক
আনোয়ার শহীদের মতে, দুই দেশের মধ্যে প্রায় ৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বাণিজ্য হলেও বাংলাদেশের রপ্তানির অংশ তুলনামূলকভাবে কম। তৈরি পোশাকের পাশাপাশি কৃষিপণ্য, প্রক্রিয়াজাত খাদ্য, ওষুধ, হালকা প্রকৌশল পণ্য এবং অন্যান্য মূল্য সংযোজনকারী পণ্যের রপ্তানি বৃদ্ধির মাধ্যমে বাণিজ্য ঘাটতি কমানো সম্ভব হবে।
তিনি আরো বলেন, দক্ষ জনশক্তি গড়ে তোলায় সরকার ও বেসরকারি খাতের যৌথ উদ্যোগের ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। বিশেষ করে প্রযুক্তি, প্রকৌশল, স্বাস্থ্যসেবা ও শিল্প খাতে প্রশিক্ষিত কর্মী পাঠানো গেলে রেমিট্যান্স আয় উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধির সম্ভাবনা রয়েছে।
মালয়েশিয়াপ্রবাসী ব্যবসায়ী এবং বাংলাদেশ-মালয়েশিয়া চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (বিএমসিসিআই) সাবেক পরিচালক মাহবুব আলম শাহ মনে করেন, প্রধানমন্ত্রীর সফর দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ককে নতুন গতি দেওয়ার সক্ষমতা রাখে। তার মতে, মালয়েশিয়ার বিনিয়োগকারীদের বাংলাদেশের উৎপাদনশিল্প, বিদ্যুৎ, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, তথ্যপ্রযুক্তি এবং হালাল শিল্পে আগ্রহ রয়েছে। সফরের পর সরকারি পর্যায়ে গৃহীত সিদ্ধান্তগুলোর দ্রুত বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা গেলে সেই আগ্রহ বাস্তব বিনিয়োগের রূপ নিতে পারে।
তিনি বলেন, মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশি দক্ষ জনশক্তির চাহিদা ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে। তাই শ্রমিক পাঠানোর পরিবর্তে প্রশিক্ষিত কর্মী, প্রকৌশলী, তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ ও স্বাস্থ্যকর্মী পাঠানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া আবশ্যক। এতে একদিকে যেমন রেমিট্যান্স আয় বাড়বে, তেমনি আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে বাংলাদেশের দক্ষ মানবসম্পদের গ্রহণযোগ্যতাও বৃদ্ধি পাবে।
আরও পড়ুন: ইশরাকের পদত্যাগের পর স্ত্রীর রহস্যময় পোস্ট
মাহবুব আলম শাহ জানিয়েছেন, বৈশ্বিক হালাল অর্থনীতিতে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ বৃদ্ধির এটি উপযুক্ত সময়। মালয়েশিয়া বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী হালাল ইকোসিস্টেম গড়ে তুলেছে। এই খাতে প্রযুক্তি, মান নিয়ন্ত্রণ ও সনদায়নে সহযোগিতা জোরদার করে বাংলাদেশের খাদ্য, ওষুধ, প্রসাধনীসহ নানান পণ্যের রপ্তানিতে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করা যাবে।
ব্যবসায়ী নেতাদের মতে, শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়নেও দুই দেশের মধ্যে সহযোগিতার যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে। মালয়েশিয়ার আন্তর্জাতিক মানের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের সংখ্যা বাড়ছে। যৌথ গবেষণা, কারিগরি শিক্ষা এবং শিল্পের চাহিদাবহিরাগত দক্ষতা উন্নয়ন কর্মসূচি চালু করার মাধ্যমে উভয় দেশই সুফল লাভ করতে পারে।
ব্যবসায়ীদের মতে, সফরের প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করবে সফর-পরবর্তী বাস্তবায়নের উপরে। এফটিএ-সংক্রান্ত আলোচনা এগিয়ে নিয়ে যাওয়া, বিনিয়োগ সহজীকরণ, দক্ষ জনশক্তি রপ্তানি, জ্বালানি সহযোগিতা এবং হালাল অর্থনীতিতে অংশীদারত্ব বৃদ্ধির জন্য কার্যকর উদ্যোগ নিলে বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার সম্পর্ক নতুন উচ্চতায় পৌঁছাতে সক্ষম হবে।
দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার পাঁচ দশকের অধিক সময় পর এবারের সফরকে কেবল একটি আনুষ্ঠানিক রাষ্ট্রীয় সফর হিসেবে নয়, বরং ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক অংশীদারিত্বের ভিত্তি আরও শক্তিশালী করার একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ হিসেবে দেখছেন ব্যবসায়ী নেতারা।
আরও পড়ুন: সরকার ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সম্প্রীতিতে বিশ্বাসী: আমানউল্লাহ আমান
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন