০৫:০৫ পি.এম
ন্যাশনালিস্ট সিটিজেন্স পার্টি অফ ইন্ডিয়া বা এনসিপিআই নামে কোনো রাজনৈতিক দল রয়েছে, সেটা গতকাল রবিবার (১৪ জুন) সন্ধ্যা পর্যন্ত প্রায় কেউ জানতেন না। পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসা এই এনসিপিআই দলটি তৃণমূলকে ‘উপড়ে’ ফেলেছে। এর পেছনে কারণ হলো তৃণমূলের বিদ্রোহী বিধায়করা এই দলে যোগ দিচ্ছেন।
তৃণমূলের বিদ্রোহী বিধায়করা লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লার সঙ্গে দেখা করে জানান, তারা ব্লক এনসিপিআইতে যোগ দেবে, ঠিক তখনই দলটির নাম প্রথম শোনা যায়।
জনকৌতূহলের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠা এনসিপিআই হঠাৎ করেই ফেসবুক পেজ খুলে ফেলে। পেজটিতে সর্বশেষ ফলোয়ারের সংখ্যা ছিল ৮৭০ এবং এই সংখ্যাটা ক্রমশ বাড়ছে। দলটির ফেসবুক পেজের তথ্য অনুযায়ী, এর প্রধান কার্যালয় পশ্চিমবঙ্গের হাওড়া জেলার সাঁকরাইল থানার হাটগাছা গ্রামে অবস্থিত। ত্রিপুরায় আত্মপ্রকাশ করা এই রাজনৈতিক দলটির পশ্চিমবঙ্গের অন্যতম সংগঠনমূলক দায়িত্বে আছেন হাটগাছার বাসিন্দা শিউলি কুন্ডু।
আরও পড়ুন: মালয়েশিয়া ৯ দেশের ১৮২ অভিবাসীকে ফেরত পাঠালো
স্থানীয়রা জানিয়েছেন, পেশায় আইনজীবী শিউলি দীর্ঘদিন ধরে সমাজসেবামূলক কাজের সঙ্গে যুক্ত এবং তিনি একটি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা পরিচালনা করেন। তার স্বামী উত্তীয় কুন্ডুও এ কাজে সহযোগিতা করেন। এনসিপিআইয়ের ফেসবুক পেজে তৃণমূলের বিদ্রোহী সাংসদদের স্বাগত জানিয়ে একাধিক পোস্ট করা হয়েছে। এর মধ্যে বারাসতের সাংসদ কাকলি ঘোষ দস্তিদারকে লোকসভায় দলের নেতা হিসেবে শুভেচ্ছা জানিয়ে একটি পোস্টও করা হয়েছিল, কিন্তু পরে সেটি মুছে ফেলা হয়।
ভাবার বিষয় হলো, এনসিপিআই দাবি করে যে, লোকসভায় বিধায়কের সংখ্যার বিচারে তারা পশ্চিমবঙ্গের সবচেয়ে বড় দল। ওই পোস্টে প্রকাশিত একটি গ্রাফিকে দেখা যায়, রাজ্যে বিজেপির ১২ জন, তৃণমূলের ৮ জন এবং কংগ্রেসের ১ জন বিধায়ক রয়েছেন। একই সঙ্গে দাবি করা হয়, এনসিপিআইয়ের সাংসদ সংখ্যা ২০। পোস্টে লেখা হয়, ‘লোকসভায় ২০টি আসন নিয়ে এনসিপিআই এখন সংসদীয় শক্তির বিচারে পশ্চিমবঙ্গের বৃহত্তম রাজনৈতিক শক্তি এবং জাতীয় পর্যায়ে রাজ্যের কণ্ঠস্বর।’
নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, ‘ন্যাশনালিস্ট সিটিজেন্স পার্টি অফ ইন্ডিয়া’ (এনসিপিআই) ২০২৩ সালে নিবন্ধিত কিন্তু অস্বীকৃত রাজনৈতিক দল (আরইউপিপি) হিসেবে তালিকাভুক্ত হয়। দলটি ২০২৩ সালের ত্রিপুরা বিধানসভা নির্বাচনে দুটি আসনে প্রার্থী দেয়, কৈলাসহর ও চৌমানুতে। তাদের নির্বাচনী প্রতীক ছিল কলমের নিব ও সাতটি রশ্মি। যদিও, কোনো প্রার্থীই জয়ী হতে পারেনি। কৈলাসহর আসনে দলের প্রার্থী জাহাঙ্গির আলি ২৮৬ ভোট পান এবং চৌমানু আসনে বড়জেদা ত্রিপুরা পান ৫৩৬ ভোট।
জল্পনার মাঝে রবিবার লোকসভার বিদ্রোহী ২০ জন সাংসদ নতুন দল এনসিপিআই-এর পাশে দাঁড়িয়েছেন। বিধানসভায় আগের বিদ্রোহ ও জটিল পরিস্থিতি দেখে লোকসভার বিদ্রোহীরা সতর্ক অবস্থান নিয়েছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। এর আগে বিধানসভায় দলীয় সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে গিয়ে বিদ্রোহী বিধায়কেরা ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়কে পরিষদীয় দলনেতা হিসেবে বেছে নেন, যিনি পরে বিরোধী দলনেতা হন। কিন্তু এই নিয়োগের ব্যাপারে বিতর্ক তৈরি হয় এবং বিষয়টি আদালতে পৌঁছায়। তৃণমূলের দাবি, বহিষ্কৃত কেউ কীভাবে বিরোধী দলনেতা হতে পারেন, এ নিয়ে মামলা এখনও হাইকোর্টে বিচারাধীন। এই আইনি জটিলতা মাথায় রেখে লোকসভার বিদ্রোহী সাংসদরা ঝুঁকি এড়িয়ে নতুন অবস্থান নিয়েছেন বলে রাজনৈতিক মহলের ধারণা।
আরও পড়ুন: রোহিঙ্গা গণহত্যা: আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে মামলার রায় ১৯ নভেম্বর
স্থানীয়দের মতে, ২০২২ সাল থেকে হাটগাছায় এনসিপিআইয়ের কার্যালয় রয়েছে। দলটি ২০২৩ সালের পঞ্চায়েত নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেছিল। তবে পরে লোকসভার ও বিধানসভার নির্বাচনে কোনো প্রার্থী দেয়নি। আলোচনায় আসার পরেই দলটির দলীয় কার্যালয়ের সামনে বহু মানুষ ভিড় করতে শুরু করেন। যদিও সেখানে গিয়ে ডাকাডাকি করেও কাউকে পাওয়া যায়নি। উদ্ভূত পরিস্থিতির কথা মাথায় রেখে এনসিপিআইয়ের কার্যালয়ের সামনে পুলিশ এবং কেন্দ্রীয় বাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে।
স্থানীয়দের দাবি, ২০২৩ সালের পঞ্চায়েত নির্বাচনে হাওড়ার ঝোড়হাট গ্রাম পঞ্চায়েতের একটি আসনে এনসিপিআই প্রার্থী দেওয়ার পরই তারা প্রথম এই দলের নাম শোনেন। কিন্তু এরপর তাঁরা লোকসভা ও ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে দলটিকে তেমন সক্রিয়ভাবে দেখতে পাননি।
আনন্দবাজারকে এনসিপিআইয়ের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ও সাবেক জাতীয় সংগঠক সাধারণ সম্পাদক শান্তনু দে বলেছেন, ‘আমি এই দলের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য। আজ যা ঘটেছে, সে সম্পর্কে আমাকে কিছু জানানো হয়নি। আগে জানলে আমি এর বিরোধিতা করতাম। এখনও আমি এর বিরোধিতা করছি।’
তিনি আরো জানান, দলের সভাপতি উত্তীয় কুন্ডু। উত্তীয় বলেছেন, তৃণমূলের বিদ্রোহী সাংসদদের যোগদানের বিষয়ে তিনি আর কিছু বলতে চান না। কিন্তু শান্তনুর ব্যাপারে তিনি বলেছেন, ‘তার দলের যে কার্যকালের মেয়াদ ছিল তা শেষ হয়ে গিয়েছে।’
আরও পড়ুন: যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে কয়েকটি অঙ্গরাজ্যে ভোটগ্রহণ বিঘ্নিত
দলের আরো এক নারী সদস্য শিউলি কুন্ডু বলেন, ‘আমি প্রতিষ্ঠাতা প্রেসিডেন্ট ছিলাম। পদত্যাগ করেছি, এই মুহূর্তে আমি কিছু বলব না, যা বলার পরে বলব।’ তৃণমূলের এই যোগদানে তিনি খুশি কি না জানতে চাওয়া হলে সংক্ষিপ্তভাবে ‘হ্যাঁ’ বলেন এবং তিনি স্বাগত জানাচ্ছেন বলে জানান। তবে এখনই কিছু বলতে চাননি তিনি।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন