০৫:৫৯ পি.এম
ফরিদপুরের আলফাডাঙ্গা উপজেলার বড়ভাগ গ্রামে নিহত কলেজছাত্র সুমন শেখের বড় বোন সরজনার আহাজারি।
‘আমার তিন বছরের ছোট ভাইটা আমার চোখের সামনে না থাকলেও আমি বেঁচে আছি। অথচ আজ আমার বাবাকে নিজের সন্তানের লাশ কাঁধে নিতে হবে।
এর চেয়ে কষ্টের দৃশ্য আর কী হতে পারে! আমার ভাইয়ের ডিগ্রি পরীক্ষা দেওয়া আর হলো না। বাবা একজন কৃষক, কিন্তু কত কষ্ট করে আমাদের লেখাপড়া করিয়েছেন। আমার ছোট ভাইটার সব স্বপ্ন শেষ করে দিল ওরা।’ কান্নায় বারবার ভেঙে পড়ছিলেন সুমন শেখের (২৪) ছোট বোন সরজনা (২৭)।
আরও পড়ুন: নরসিংদীতে কনসার্ট থেকে ফেরার পথে সড়কে ঝরল দুই বন্ধুর প্রাণ
কথা বলতে বলতে কখনো মাটিতে বসে পড়ছেন, কখনো স্বজনদের জড়িয়ে ধরে বিলাপ করছেন। তাঁর আহাজারিতে উপস্থিত অনেকেই চোখের পানি ধরে রাখতে পারেননি।
আজ শনিবার দুপুর থেকে নিহতের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, এক হৃদয়বিদারক দৃশ্য। উঠানজুড়ে স্বজন, প্রতিবেশী ও বিভিন্ন এলাকা থেকে আসা মানুষের ভিড়।
কেউ পরিবারকে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করছেন, আবার কেউ নীরবে চোখ মুছছেন। বাড়িজুড়ে শুধু আহাজারি আর কান্নার শব্দ।
এর আগে শুক্রবার সন্ধ্যায় ফরিদপুরের আলফাডাঙ্গা উপজেলার টগরবন্দ ইউনিয়নের বড়ভাগ পূর্বপাড়া এলাকায় মোটরসাইকেলে যাওয়ার পথে ধারালো অস্ত্রের হামলায় নিহত হন কাশিয়ানী এম.এ. খালেক ডিগ্রি কলেজের প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী সুমন শেখ। পরিবারের দাবি, দীর্ঘদিনের পূর্বশত্রুতার জেরে পরিকল্পিতভাবে তাঁকে হত্যা করা হয়েছে।
আরও পড়ুন: যশোরে ট্রেনে কাটা পড়ে ৪৫ বছর বয়সী নারীর মৃত্যু
নিহতের মা শেফালী বেগম বারবার জ্ঞান হারিয়ে ফেলছেন।
ছেলের ছবি বুকে জড়িয়ে বিলাপ করতে করতে বলছেন, ‘আমার সুমনকে ফিরিয়ে দাও। আমার ছোট ছেলেটাকে আমি আর একবার দেখতে চাই।’ স্বজনরা তাঁকে সামলানোর চেষ্টা করলেও তাঁর কান্না থামানো যাচ্ছিল না।
অন্যদিকে ছেলের মৃত্যুর খবর শুনে বারবার মূর্ছা যাচ্ছেন সত্তরোর্ধ্ব বাবা শেখ আলাউদ্দিন (৭২)। বয়সের ভার ও অসুস্থ শরীর নিয়ে তিনি কোনো কথাই ঠিকমতো বলতে পারছিলেন না।
শুধু একবার ছেলের নাম ধরে ডাকছেন, আবার নির্বাক হয়ে বসে থাকছেন। স্বজনরা তাঁকে ধরে রাখলেও তিনি বারবার বলছিলেন, “আমার সুমন কোথায়?”
আরও পড়ুন: ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় কৃষকের লাউবাগানের গাছ কেটে রাতের আঁধারে স্বপ্ন শেষ
এলাকারাবাসী ও নিহতের পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, ফরিদপুরের আলফাডাঙ্গা উপজেলার টগরবন্দ ইউনিয়নের বড়ভাগ পূর্বপাড়া এলাকার বাসিন্দা শেখ আলাউদ্দিন একজন সাধারণ কৃষক। অভাব-অনটনের মধ্যেও তিনি সন্তানদের লেখাপড়া বন্ধ হতে দেননি। কঠোর পরিশ্রম করে দুই ছেলে ও দুই মেয়েকে মানুষ করার চেষ্টা করেছেন। সুমন ছিল দুই ভাই ও দুই বোনের মধ্যে সবার ছোট। পরিবারের সবার আদরের সন্তান ছিল সে। বড় ভাই-বোনদের মতো সেও উচ্চশিক্ষা নিয়ে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার স্বপ্ন দেখত। সামনে তার ডিগ্রি প্রথম বর্ষের পরীক্ষা ছিল। ইতিমধ্যে পরীক্ষার ফরমও পূর্ণ করেছিল। কিন্তু পরীক্ষার হলের বদলে আজ তাকে যেতে হচ্ছে চিরনিদ্রার ঠিকানায়।
বড় বোন সরজনা বলেন, ‘আমার ভাই কারো ক্ষতি করেনি। ও শুধু পড়াশোনা করত। আমাদের বাবা কৃষক হলেও আমাদের শিক্ষিত করার জন্য জীবনের সব কষ্ট সহ্য করেছেন। ভাইটাও বাবার স্বপ্ন পূরণ করতে চেয়েছিল। কিন্তু ওর সেই স্বপ্ন শেষ করে দেওয়া হলো। আমি শুধু আমার ভাই হত্যার বিচার চাই।’
গ্রামের বাসিন্দারা জানান, সুমন ছিল ভদ্র, শান্ত স্বভাবের ও সবার সঙ্গে মিশুক। পড়াশোনার পাশাপাশি পরিবারকেও সময় দিত। তার এমন মৃত্যু মেনে নিতে পারছেন না গ্রামের মানুষও।
এদিকে নিহতের লাশ শনিবার বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে নিজ গ্রাম বড়ভাগে পৌঁছানোর কথা রয়েছে। পরে স্থানীয় বড়ভাগ ঈদগাহ ময়দানে বাদ মাগরিব জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে তাকে দাফন করা হবে। শেষবারের মতো সুমনকে দেখতে সকাল থেকেই গ্রামের মানুষ তাঁর বাড়িতে ভিড় করছেন।
আরও পড়ুন: সীতাকুণ্ডের সাংবাদিক জয়নাল আবেদীনকে মিথ্যা মামলায় গ্রেফতারের প্রতিবাদে চট্টগ্রামে মানবন্ধন
একদিকে উঠানে পড়ে আছে সুমনের ব্যবহৃত মোটরসাইকেল, অন্যদিকে ঘরের ভেতরে বুক চাপড়ে কাঁদছেন মা। বৃদ্ধ বাবা নির্বাক, ভাই-বোনেরা শোকে স্তব্ধ। যে ঘরে কয়েকদিন আগেও ডিগ্রি পরীক্ষার প্রস্তুতি নিয়ে পড়ালেখা চলছিল, সেই ঘরেই আজ শুধুই কান্নার শব্দ। এক কৃষক পরিবারের বহু বছরের স্বপ্ন যেন মুহূর্তেই রক্তাক্ত হয়ে মাটিতে লুটিয়ে গেল।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন