১২:৫২ পি.এম
ঘনশ্যাম স্ত্রী মারা যাওয়ার পর চার সন্তান—দুই ছেলে ও দুই মেয়েকে একাই বড় করেছিলেন। তবে জীবনের শেষ চার বছর তিনি ভোপালের একটি বৃদ্ধাশ্রমে কাটিয়েছিলেন। ৭০ বছর বয়সে তার মৃত্যু হলেও শেষবারের জন্য তাকে দেখতে আসেনি চার সন্তানের কেউ। তার শেষকৃত্য সম্পন্ন হয় পুলিশ ও বৃদ্ধাশ্রম কর্তৃপক্ষের সহায়তায়।
ঘনশ্যাম ভারতের ভোপালের ইন্দোরে ছোট্ট ব্যবসা করতেন, সাইকেলের টায়ার ও টিউব বিক্রি করতেন। সেখানে ছিল একটি বাড়িও। ঘনশ্যামের স্ত্রী মারা যাওয়ার সময় তার ছোট মেয়ের বয়স ছিল মাত্র দুই বছর। সন্তানদের মানুষ করার জন্য তিনি নিজের জীবনটাই উৎসর্গ করেছিলেন।
কিন্তু জীবনের শেষ অধ্যায়ে এসে সন্তানদের কাছ থেকে প্রত্যাশিত ভালোবাসা ও যত্ন পাননি। ঘনশ্যামের শেষ ঠিকানা ছিল ভোপালের ‘আপনা ঘর’ নামের বৃদ্ধাশ্রম। প্রায় চার বছর সেখানে কাটানোর পর ৪ আগস্ট তার মৃত্যু হয়। বৃদ্ধাশ্রম কর্তৃপক্ষ পরিবারের সদস্যদের খবর দেন এবং বারবার ভোপালে এসে তাকে নিয়ে যাওয়ার জন্য অনুরোধ করেন। কিন্তু পরিবারের সদস্যদের তরফ থেকে নানান অজুহাত দেখানো হয়।
আরও পড়ুন: সৌদি রুটে ১৪৪ ফ্লাইট স্থগিত, ২২ হাজার যাত্রী ভোগান্তিতে
পরিবার থেকে বৃদ্ধাশ্রমকে বলা হয়, ঘনশ্যামের শেষকৃত্য যেন তারা সেরে ফেলে এবং মৃত্যুসনদ পাঠিয়ে দেন। ‘আপনা ঘর’-এর পরিচালনাকারী মাধুরী মিশ্র বলেন, ঘনশ্যামের সবচেয়ে ছোট মেয়ের বয়স যখন মাত্র তিন বছর, তখনই তার স্ত্রী মারা যান। তিনি বলেন, ‘একসময় একজন বাবা চার-পাঁচটি সন্তানকে মানুষ করতে পারতেন। অথচ আজ চার সন্তান মিলে একজন বাবার দেখাশোনা করতে পারল না।’
মিশ্র জানান, ঘনশ্যামের ছোট একটি বাড়ি ছিল ইন্দোরে। পরে টাকার ভাগ করে দেওয়া হয়েছিল সন্তানদের মধ্যে। ঘনশ্যাম যে জরুরি যোগাযোগ নম্বর দিয়েছিলেন, সেখানে বৃদ্ধাশ্রম থেকে ফোন করা হয়েছিল। কিন্তু উত্তর আসে, ‘আমি তাকে চিনি না। আমি তাকে ছেড়ে দিয়েছি। তার সঙ্গে আমার কোনো সম্পর্ক নেই।’ এছাড়া আরও বলা হয়, বাবার বাড়ির টাকা ভাই-বোনদের মধ্যে ভাগ হয়ে গেছে এবং এরপর তাদের সঙ্গে ঘনশ্যামের আর কোনো সম্পর্ক নেই।
বৃদ্ধাশ্রমে আসার সময় ঘনশ্যাম আংশিক পক্ষাঘাতগ্রস্ত ছিলেন। তাকে কথা বলতেও কষ্ট হতো এবং ঠিকমতো হাঁটতেও পারতেন না। মিশ্র বলেন, সন্তানরা তাকে বৃদ্ধাশ্রমে নিয়ে আসেনি। ইন্দোর থেকে বাসে ভোপালের আইএসবিটিতে আসার পর কিছু তরুণ সমাজকর্মী তাকে দেখতে পান। পরে তারাই ঘনশ্যামকে ‘আপনা ঘর’-এ নিয়ে আসেন।
যে মানুষটি একসময় নিজের চার সন্তানকে হাঁটতে শেখাতে সাহায্য করেছিলেন, জীবনের শেষ বেলায় তিনিই আংশিক পক্ষাঘাতগ্রস্ত অবস্থায় একটি বাস টার্মিনালে প্রায় একা ছিলেন। পরবর্তী চার বছর বৃদ্ধাশ্রম হয়ে যায় তার বাড়ি। অসুস্থ হলে কর্তৃপক্ষ তাকে হাসপাতালে নিয়ে যেত এবং পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করত। কিন্তু সন্তানদের কেউই তাকে দেখতে আসেননি।
আরও পড়ুন: নেতানিয়াহুকে ঠেকাতে বিদেশ থেকে দেশে ফিরছেন হাজার হাজার ইসরাইলি
৪ আগস্ট ঘনশ্যামের মৃত্যু হয়। বৃদ্ধাশ্রমে দীর্ঘদিন মরদেহ সংরক্ষণের ব্যবস্থা না থাকায় কর্তৃপক্ষ পরিবারের অপেক্ষায় ছিলেন। তার মৃত্যুর পরেও ইন্দোরের পঞ্চবটি এলাকার ঠিকানায় যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। কিন্তু কাউকে পাওয়া যায়নি। শেষ পর্যন্ত পুলিশের সহায়তায় ঘনশ্যামের শেষকৃত্য সম্পন্ন হয়।
মিশ্র জানান, সম্পত্তি ভাগাভাগি নিয়ে পরিবারের মধ্যে অসন্তোষ ছিল। তার দাবি, এক মেয়ে অভিযোগ করেছিলেন যে বাবা সম্পত্তি ছেলেদের দিয়ে দিয়েছেন এবং তিনি কিছুই পাননি। তাঁকে প্রশ্ন করা হয়েছিল, ‘আমি কেন যাব?’ অন্যদিকে ছেলেদের পক্ষ থেকেও বলা হয়েছিল, ‘তিনি আমাদের জন্য কী করেছেন?’
ঘনশ্যামের শেষকৃত্য শেষ হয়েছে। কিন্তু তার মৃত্যুর পরও ঘটনা শেষ হয়নি। এখন তার পরিবার মৃত্যুসনদ চাইছে। তবুও মাধুরী মিশ্র জানিয়েছেন, তিনি ঘনশ্যামের মৃত্যুসনদ পরিবারের হাতে তুলে দিতে চান না। তার প্রশ্ন, ‘তিনি জীবিত থাকাকালে দেখতে আসেননি, মৃত্যুর পরও এলেন না—তাহলে এখন কেন তার মৃত্যুসনদ নিতে আসছেন?’
ঘনশ্যামের জীবনের এই ঘটনা শুধু একটি পরিবারের গল্প নয়; এটি বয়স্ক বাবা-মায়ের প্রতি দায়িত্ব, পারিবারিক সম্পর্ক এবং সম্পত্তির সঙ্গে মানবিকতার সম্পর্ক নিয়েও গভীর প্রশ্ন তুলে দিয়েছে।
আরও পড়ুন: শাহজালাল রুমিকে গ্রেফতারে পুলিশের অভিযান হয়নি: রাশেদ খাঁন
তথ্যসূত্র: এনডিটিভি
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন