০১:৫২ পি.এম
সোমালিল্যান্ডের প্রেসিডেন্ট আবদিরহমান মোহাম্মদ আবদুল্লাহ ‘সিরো’ ইসরায়েল সফরকে কেন্দ্র করে মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকার কূটনৈতিক অঙ্গনে নতুন আলোচনা শুরু হয়েছে।
এটি ইসরায়েলের দ্বারা প্রথমবারের মতো সোমালিল্যান্ডের কোনো নেতাকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় স্বাগত জানানো হয়েছিল। বিশ্লেষকদের মন্তব্য, এই উদ্যোগের পিছনে কেবল কূটনৈতিক সম্পর্ক নয়, বরং লোহিত সাগর ও বাব আল-মান্দাব প্রণালীর কৌশলগত গুরুত্বও বেশ বড় ভূমিকা পালন করছে।
গত রবিবার সোমালিল্যান্ডের প্রেসিডেন্ট আবদুল্লাহ জেরুজালেমে পৌঁছান। এটি ছিল কোনও সোমালিল্যান্ড নেতার প্রথম রাষ্ট্রীয় সফর, যা ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্কের নতুন অধ্যায় হিসেবে গণ্য করা হচ্ছে।
আরও পড়ুন: জর্ডানে গির্জায় বন্দুকধারীদের হামলায় ৭ নিহত
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গে বৈঠকে আবদুল্লাহ বলেন, “আমি সোমালিল্যান্ডের প্রেসিডেন্ট হিসেবে প্রথম রাষ্ট্রীয় সফরে এসেছি। ৩৫ বছর ধরে আমরা বিশ্বকে আমাদের স্বীকৃতি দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে আসছি। ইসরায়েল এবং আপনি নিজে প্রথম আমাদের দেখেছেন ও স্বীকৃতি দিয়েছেন।”
নেতানিয়াহু এই স্বীকৃতিকে ইহুদি ইতিহাসের সঙ্গে তুলনা করে বলেন, “আমরাও একটি ছোট জনগোষ্ঠী হিসেবে বিশ্বের কাছে নিজেদের অধিকারের স্বীকৃতি চেয়েছিলাম। তাই আপনাদের প্রতি আমাদের স্বাভাবিক সহানুভূতি রয়েছে।”
কূটনৈতিক সম্পর্ক থেকে কৌশলগত অংশীদারিত্বে
সফরের সময় দুই দেশের মধ্যে একটি কৌশলগত সহযোগিতা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। উভয় দেশ জানিয়েছে, এই সম্পর্ক নিরাপত্তা, বাণিজ্য, কৃষি, স্বাস্থ্য ও আঞ্চলিক কৌশলসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিস্তৃতি লাভ করতে পারে।
আরও পড়ুন: বাংলাদেশ-ভারত করমর্দনের অপেক্ষা, আনুষ্ঠানিক ঘোষণা এখনও হয়নি
সোমালিল্যান্ড আফ্রিকার হর্ণ অঞ্চলে অবস্থিত এবং এটি ভৌগোলিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ইয়েমেনের বিপরীতে এডেন উপসাগরের তীরে অবস্থিত এই দেশটি, লোহিত সাগরের নিকटবর্তী এবং বিশ্বের অন্যতম ব্যস্ত নৌপথের কাছাকাছি দাঁড়িয়ে আছে।
নেতানিয়াহুও বৈঠকে উল্লেখ করেছেন যে, সোমালিল্যান্ডের অবস্থান বাব আল-মান্দাব প্রণালীর কাছে, যা লোহিত সাগরকে ভারত মহাসাগরের সঙ্গে সংযুক্ত করেছে। বৈশ্বিক বাণিজ্যের জন্য এই জলপথের গুরুত্ব অনেক।
ইসরায়েলের জন্য এই অঞ্চল আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে, কারণ গত দুই বছর ধরে ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীদের সঙ্গে চলমান সংঘাত এবং লোহিত সাগরে জাহাজ চলাচলে বাধার ঘটনা দেশটির নিরাপত্তা উদ্বেগ বাড়িয়েছে।
নিরাপত্তা সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা
আরও পড়ুন: নেতানিয়াহুর হেবরন ‘ধ্বংস’ করার হুমকি, নিহত ২ ইসরায়েলি সেনা
সোমালিল্যান্ডের সঙ্গে ইসরায়েলের সম্পর্কের সবচেয়ে আলোচিত দিক হল নিরাপত্তা সহযোগিতা। ইসরায়েলের পররাষ্ট্রমন্ত্রী গিদিওন সার জানুয়ারিতে সোমালিল্যান্ড সফরের সময় বলেছিলেন, দুই দেশ একটি ‘কৌশলগত অংশীদারত্ব’ এবং প্রতিরক্ষা সহযোগিতার দিকে অগ্রসর হচ্ছে।
সোমালিয়ার কর্মকর্তারা বলেছেন, ইসরায়েল ইয়েমেনের হুথিদের বিরুদ্ধে সম্ভাব্য অভিযানের জন্য সোমালিল্যান্ডে সামরিক অবকাঠামো নির্মাণে আগ্রহী। তবে সোমালিল্যান্ডের কর্মকর্তারা সঠিকভাবে এ বিষয়ে কিছু জানাননি।
সোমালিল্যান্ডের প্রেসিডেন্ট আবদিরহমান আবদুল্লাহ ইসরায়েলি গণমাধ্যম আই২৪-কে দেওয়া একটি সাক্ষাৎকারে বলেছেন, বর্তমানে সামরিক ঘাঁটির স্থাপনের কোনো পরিকল্পনা নেই। তবে ভবিষ্যতে সম্ভাবনা নিয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, “আমি তা পুরোপুরি উড়িয়ে দিতে পারছি না।”
আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু সোমালিল্যান্ডের বৃহত্তম উপকূলীয় শহর বারবেরা। এ শহরের বিমানবন্দরটি আগে সোভিয়েত ইউনিয়ন নির্মাণ করেছিল এবং পরে নাসা এটি ব্যবহার করেছিল। আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা জানাচ্ছেন, সাম্প্রতিক সময়ে এটির সামরিক ব্যবহারের উপযোগী করা হয়েছে।
আরও পড়ুন: ইতালির দক্ষিণ উপকূলে ১২টি ভূমিকম্প, সুনামি সতর্কতা জারি
ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাটজ বলেছেন, দুই দেশের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে ‘গোপনে বিভিন্ন কার্যকমে’ সহযোগিতা রয়েছে এবং ভবিষ্যতে এই সম্পর্ক আরও উচ্চ পর্যায়ের দিকে যাবে।
সোমালিয়ার উদ্বেগ
সোমালিয়া ইসরায়েল-সোমালিল্যান্ড সম্পর্ক নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। সোমালিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী আলী ওমর বলেন, তাদের সবচেয়ে বড় উদ্বেগ হলো- সোমালিল্যান্ড যেন ইসরায়েলের আঞ্চলিক সংঘাতে জড়িয়ে না পড়ে।
তিনি বলেন, “এই ধরনের হস্তক্ষেপ একটি অঞ্চলে নতুন সংঘাত তৈরি করতে পারে, যা ইতোমধ্যে অনেক সমস্যার মধ্যে রয়েছে।”
আরও পড়ুন: দুই মুসলিম দেশের সমুদ্রসীমা চুক্তিতে ক্ষুব্ধ মিসর, ইসরাইল ও ইইউ
সোমালিয়া জানায়, তারা সোমালিল্যান্ডের সঙ্গে সংলাপের জন্য সবসময় প্রস্তুত, তবে দেশের অখণ্ডতার প্রশ্নে কোনও আপস করবে না।
১৯৯১ সালে সোমালিয়ায় গৃহযুদ্ধের পর থেকে সোমালিল্যান্ড নিজেদের স্বাধীনতা ঘোষণা করেছে। তবে বহু দেশ এখনো এটিকে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেয়নি। ইসরায়েলের স্বীকৃতির ফলে দীর্ঘদিনের এই বিরোধ আন্তর্জাতিক স্তরে নতুন গুরুত্ব লাভ করেছে।
জেরুজালেমে দূতাবাস খোলা নিয়ে বিতর্ক
সফরের সময় সোমালিল্যান্ড আনুষ্ঠানিকভাবে জেরুজালেমে তাদের দূতাবাস খুলেছে। অনুষ্ঠানে ইসরায়েলের পররাষ্ট্রমন্ত্রী গিদিওন সার উপস্থিত ছিলেন।
আরও পড়ুন: গ্রিস ও সাইপ্রাসের পার্লামেন্টে ইসরায়েলের সহযোগিতামূলক কমিটি গঠন
বেশিরভাগ দেশ আন্তর্জাতিক বিরোধের কারণে জেরুজালেমের মর্যাদার ক্ষেত্রে তাদের দূতাবাস তেল আবিবে রাখে। ইসরায়েল জেরুজালেমের পুরো অঞ্চলের ওপর সার্বভৌমত্ব দাবি করে, যা আন্তর্জাতিকভাবে ব্যাপক স্বীকৃতি পায়নি।
সোমালিল্যান্ডের এই সিদ্ধান্ত ফিলিস্তিন, আরব লীগ, ইসলামি সহযোগিতা সংস্থা (ওআইসি)সহ একাধিক দেশ ও সংগঠনের দেওয়া নিন্দার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ইসরায়েলের লক্ষ্য সম্ভবত লোহিত সাগর?
দক্ষিণ আফ্রিকাভিত্তিক ইনস্টিটিউট ফর সিকিউরিটি স্টাডিজের গবেষক মোসেস ক্রিসপাস ওকেলো বলেন, “ইসরায়েলের আসল লক্ষ্য শুধু সোমালিল্যান্ড নয়, বরং এটি লোহিত সাগর।”
তার মতে, ইসরায়েল বর্তমানে আঞ্চলিকভাবে আরও বিচ্ছিন্নতার জাতীয়তায় পড়েছে। তাই সোমালিল্যান্ডের মতো একটি কৌশলগত অঞ্চলের সঙ্গে সম্পর্ক গড়া তাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটি সুযোগ।
সোমালিল্যান্ডে বিতর্কের সূচনা
ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপনের সিদ্ধান্ত সোমালিল্যান্ডে ব্যাপক সমর্থন পেলেও, এতে বিরোধিতাও তৈরি হয়েছে।
সোমালিল্যান্ডের সাবেক প্রেসিডেন্ট মুসে বিহি আবদি সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন, ইসরায়েলের সঙ্গে চুক্তির বিস্তারিত প্রকাশ করতে। তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করেন, সোমালিল্যান্ডকে কোনও আঞ্চলিক সামরিক সংঘাতে ব্যবহার করা হতে পারে।
তিনি বলেন, “আমাদের সংবিধান এমন কোনও পদক্ষেপ অনুমোদন করে না, যা মুসলিম জনগণের ক্ষাতি করে বা ধর্মীয় মূল্যবোধের বিরুদ্ধে যায়।”
দেশটির ইসলামি আলেমদের মধ্যেও এ নিয়ে মতভেদ রয়েছে। কিছু ব্যক্তি সরকারের সিদ্ধান্তকে সমর্থন জানাচ্ছেন, আবার অনেকে কঠোর সমালোচনা করছেন।
আঞ্চলিক প্রতিক্রিয়া
সোমালিল্যান্ড আশা করেছিল, ইসরায়েলের পর আরও আরও কিছু দেশ তাদের স্বীকৃতি দেবে। কিন্তু এখনও যুক্তরাষ্ট্রসহ অন্য কোনো দেশ সেরকম পথে হাঁটেনি।
সৌদি আরব, তুরস্ক, মিসর, আফ্রিকান ইউনিয়ন, ওআইসি ও আরব লীগ ইসরায়েলের এই পদক্ষেপ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।
ইয়েমেনের হুথিরা সবচেয়ে কঠোর প্রতিক্রিয়া জানিয়ে বলেছে, সোমালিল্যান্ডে ইসরায়েলিরা উপস্থিত হলে সেটিকে তারা ‘সামরিক লক্ষ্য’ হিসেবে বিবেচনা করবে।
তবে সোমালিল্যান্ডের নেতারা জানিয়েছেন, আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি অর্জনের লক্ষ্যে তারা ঝুঁকি নিতে প্রস্তুত।
চ্যাথাম হাউসের মধ্যপ্রাচ্য বিশ্লেষক ইয়োসী মেকেলবার্গ বলেন, “এই সম্পর্ক দুই পক্ষকেই কিছু সুবিধা দেবে, তবে এটি তাদের মূল সমস্যার সমাধান করবে না। ইসরায়েল ফিলিস্তিন ইস্যু এড়িয়ে অন্য দেশের সঙ্গে সম্পর্ক বাড়ানোর চেষ্টা করছে, আর সোমালিল্যান্ডও এই সম্পর্ক থেকে অনেক বেশি প্রত্যাশা করছে।” সূত্র: আল-জাজিরা
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন