০৪:৫৮ পি.এম
ঢাকা ২১ জুন, ২০২৬: ক্যামেরার ফ্ল্যাশ আর গ্ল্যামারাস লাইটের আড়ালে লুকিয়ে ছিল এক অন্ধকার অপরাধ জগৎ। কমার্শিয়াল ফটোগ্রাফির খোলস ব্যবহার করে গত দুই দশক ধরে গড়ে তোলা হয়েছিল এক ভয়ংকর মাফিয়া চক্র। পুরান ঢাকাভিত্তিক কথিত ও অনুমোদনহীন সংগঠন ‘ফটোগ্রাফার অ্যান্ড ভিডিওগ্রাফার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (পিভিএ)’-কে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে সাধারণ সদস্যদের কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার এক লোমহর্ষক কেলেঙ্কারি উন্মোচিত হয়েছে। আর এই পুরো অপরাধ সাম্রাজ্যের মূল হোতা ও ‘গডফাদার’ হিসেবে সুনির্দিষ্টভাবে নাম এসেছে আরইসি গ্রুপ বিডি (REC GROUP BD)-এর প্রতিষ্ঠাতা ও সিইও **এমডি জাহারুল ইসলাম উজ্জ্বলের।
সরকারি কোনো বৈধ অনুমোদন ছাড়াই সম্পূর্ণ বেআইনিভাবে পরিচালিত এই সংগঠনের আড়ালে জমি জালিয়াতি, ভুয়া নির্বাচন, অর্থ পাচার এবং সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে কথা বলা সদস্যদের ওপর মধ্যযুগীয় কায়দায় মানসিক নির্যাতন ও প্রাণনাশের হুমকি দেওয়ার সুনির্দিষ্ট অভিযোগের নথিপত্র এখন সাংবাদিকদের হাতে।
নিমতলি আবাসন কেলেঙ্কারি: চটকদার ফাঁদে কোটি কোটি টাকা লোপাট:
অনুসন্ধানে জানা যায়, জাহারুল ইসলাম উজ্জ্বল তার দীর্ঘ ২১ বছরের তথাকথিত ‘পেশাদার ইমেজ’কে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে সাধারণ ও তরুণ ফটোগ্রাফারদের মাঝে এক চতুর ফাঁদ পাতেন। মুন্সিগঞ্জের নিমতলি এলাকায় একটি কথিত ‘লাক্সারিয়াস হাউজিং প্রজেক্ট’-এর স্বপ্ন দেখিয়ে সংগঠনের সদস্যদের কাছ থেকে বিগত কয়েক বছরে কোটি কোটি টাকা চাঁদা ও বিনিয়োগের নামে হাতিয়ে নেন তিনি।
আরও পড়ুন: যেকোনো বাধা উপেক্ষা করে ফুটপাত দখলমুক্ত করবে ডিএনসিসি প্রশাসক
অনুসন্ধানী সূত্র নিশ্চিত করেছে, ২০২৬ সালের বর্তমান বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে উক্ত জমিটি চরম আইনি জটিলতা, ভুয়া খতিয়ান এবং একাধিক মালিকানা সংক্রান্ত দেওয়ানি ও ফৌজদারি বিরোধে জর্জরিত। মূলত সাধারণ সদস্যদের পকেট কাটার জন্যই এই ডামি প্রজেক্টের নীল নকশা সাজিয়েছিলেন উজ্জ্বল। বিনিয়োগ করা সদস্যরা এখন তাদের আসল টাকা ফেরত চাইতে গেলে তাদের কপালে জুটছে চরম লাঞ্ছনা ও ক্যাডার বাহিনীর হুমকি।
৭১ ভোটারের বিপরীতে ২৮ নেতা! অভিনব স্বৈরাচারী ‘পকেট নির্বাচন’
গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার মুখে ছাই দিয়ে পিভিএ-তে কায়েম করা হয়েছে এক অভিনব স্বৈরাচারী শাসন। মাত্র ৭১ জন সাধারণ ভোটারের বিপরীতে জাহারুল ইসলাম উজ্জ্বলের একক ইশারায় গঠন করা হয় ২৮ সদস্যের এক বিশাল ‘পকেট প্যানেল’।
ভুক্তভোগী সদস্যরা জানান, সংগঠনের ভেতরে যেন কোনো সাধারণ সদস্য বা সৎ ব্যক্তি আর্থিক অনিয়মের বিরুদ্ধে মাথা তুলে দাঁড়াতে না পারে, সেজন্য নির্বাচনের নাটক করে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নিজেদের পছন্দের লোকদের পদায়ন করা হতো। এই ২৮ জনের সিন্ডিকেট মূলত জাহারুল ইসলাম উজ্জ্বলের ব্যক্তিগত লাঠিয়াল বাহিনী হিসেবে কাজ করে, যাদের মূল কাজই হলো বার্ষিক অডিট ও আর্থিক অনিয়মের হিসাব ধামাচাপা দেওয়া।
আরও পড়ুন: জমির শেয়ারে প্রতারণা, ৪০ হাজার ক্রেতার ১২ হাজার কোটি টাকার ক্ষতি
পিভিএ সিন্ডিকেটের অপরাধের চালচিত্র (জুন ২০২৬):
┌────────────────────────────────────────────────────────┐
│ ১. নিমতলি প্রজেক্টের নামে কোটি টাকার ভুয়া আবাসন ফাঁদ │
├────────────────────────────────────────────────────────┤
│ ২. ৭১ ভোটারের বিপরীতে ২৮ জনের পকেট স্বৈরাচারী কমিটি │
├────────────────────────────────────────────────────────┤
│ ৩. জাহারুল ইসলাম উজ্জ্বলের নেতৃত্বে ভিন্নমত দমন ও হুমকি │
└────────────────────────────────────────────────────────┘
ভিন্নমত দমনে ‘মাফিয়া স্টাইল’: নিরাপত্তাহীনতায় নির্বাচিত প্রতিনিধিরা
সংগঠনের অভ্যন্তরে কোনো সদস্য যদি আর্থিক স্বচ্ছতা বা হিসাবের খাতা দেখার দাবি তোলেন, তবে তার ওপর নেমে আসে জাহারুল ইসলাম উজ্জ্বলের সিন্ডিকেটের নির্মম খড়্গ। গঠনতন্ত্রের মনগড়া ধারা ব্যবহার করে সদস্যদের কণ্ঠরোধ করা হতো। অতীতে এই সিন্ডিকেটের তীব্র মানসিক নির্যাতন, সামাজিক হেনস্তা এবং ব্ল্যাকমেইলের শিকার হয়ে সংগঠনের একাধিক সম্মানিত ও প্রবীণ কর্মকর্তা পদত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছেন।
সবচেয়ে বিস্ফোরক তথ্য দিয়েছেন সংগঠনটিরই এক বর্তমান নির্বাচিত প্রতিনিধি। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তিনি সাংবাদিকদের জানান, জাহারুল ইসলাম উজ্জ্বলসহ শীর্ষ নেতাদের প্রাতিষ্ঠানিক আর্থিক অনিয়মের বিরুদ্ধে মুখ খোলায় তাকে সাংগঠনিকভাবে সম্পূর্ণ একঘরে ও কোণঠাসা করা হয়েছে। এমনকি তাকে ও তার পরিবারকে বিভিন্ন সন্ত্রাসী বাহিনী দিয়ে প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হচ্ছে। বর্তমানে ওই প্রতিনিধি চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন এবং আইন প্রয়োগকারী সংস্থার শরণাপন্ন হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
আড়ালে আরইসি গ্রুপ: গণমাধ্যম দেখে পালাচ্ছেন গডফাদার উজ্জ্বল:
আরও পড়ুন: ৮ ট্রেন ও ২৩ রেলওয়ে স্টেশন বন্ধ, বিপাকে নিম্ন আয়ের যাত্রীরা
পেশাদারিত্বের আড়ালে জাহারুল ইসলাম উজ্জ্বলের নিজস্ব প্রতিষ্ঠান 'আরইসি গ্রুপ বিডি'-কে এই অবৈধ অর্থ লেনদেনের অন্যতম নিরাপদ মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করা হতো কিনা, তা নিয়ে গভীর সন্দেহ দানা বেঁধেছে।
এই চাঞ্চল্যকর জালিয়াতি, কোটি টাকার কেলেঙ্কারি এবং নির্বাচিত প্রতিনিধিকে হুমকির বিষয়ে বক্তব্য নিতে আরইসি গ্রুপের কাওরান বাজার ও পুরান ঢাকার কার্যালয় এবং পিভিএ-এর মূল হোতা জাহারুল ইসলাম উজ্জ্বলের ব্যক্তিগত মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। কিন্তু অপরাধের খবর ফাঁস হওয়ার পর থেকেই জাহারুল ইসলাম উজ্জ্বলসহ চক্রের শীর্ষ নেতারা মোবাইল বন্ধ করে আত্মগোপনে চলে গেছেন। গণমাধ্যমের মুখোমুখি হতে ভয় পেয়ে তারা মূলত পালিয়ে বেড়াচ্ছেন বলে নিশ্চিত করেছে স্থানীয় সূত্র।
উচ্চপর্যায়ের তদন্ত ও দুদকের হস্তক্ষেপের দাবি:
দেশের ফটোগ্রাফি ও সৃজনশীল শিল্পের সাধারণ মানুষ এই ভয়ংকর মাফিয়া চক্রের হাত থেকে মুক্তি চান। সংশ্লিষ্ট মহলের জোর দাবি-অনতিবিলম্বে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), সিআইডি (CID) এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী যেন এই নামসর্বস্ব ‘পিভিএ’র সমস্ত ব্যাংকিং লেনদেন জব্দ করে। একই সাথে জাহারুল ইসলাম উজ্জ্বলসহ এই কোটি টাকার প্রতারক চক্রের মূল হোতাদের গ্রেপ্তার করে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করলে আরও ভয়ংকর সব তথ্য বেরিয়ে আসবে বলে মনে করছেন ভুক্তভোগীরা। চলমান থাকবে.................
আরও পড়ুন: সিলেট সীমান্তে বিজিবির অভিযানে ২৩ লাখ ৫৭ হাজার টাকার ভারতীয় পণ্য জব্দ
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন