০৪:২৬ পি.এম
শিক্ষাজীবনের আনুষ্ঠানিক ইতি ঘটে মাত্র ৯ বছর বয়সে। কিন্তু সেখান থেকেই জন্ম নেয় নতুন একটি যাত্রা, যা পরবর্তীকালে তাকে বাংলা চলচ্চিত্রের কিংবদন্তি খ্যাতিতে আসীন করে।
একটি ছোট্ট মেয়ের নাম আফরোজা সুলতানা রত্না, যিনি পরে হয়ে ওঠেন কোটি কোটি দর্শকের প্রিয় অভিনেত্রী শাবানা। তার অসাধারণ অভিনয়-দক্ষতা, পর্দায় অনবদ্য উপস্থিতি এবং অদ্বিতীয় সৌন্দর্য কারণে তিনি ‘ঢালিউডের বিউটিকুইন’ খ্যাতি অর্জন করেন।
১৯৫২ সালের ১৫ জুন চট্টগ্রামের রাউজান উপজেলার ডাবুয়া গ্রামে তার জন্ম। তার বাবা ছিলেন ফয়েজ চৌধুরী এবং মা ফজিলাতুন্নেসা।
আরও পড়ুন: যাত্রাবাড়ীতে ছিনতাই সন্দেহে গণপিটুনিতে আহত যুবক নিশাত মিয়ার মৃত্যু
১৯৬২ সালে পরিচালক আজিজুর রহমানের মাধ্যমে শিশু শিল্পী হিসেবে তার চলচ্চিত্রে যাত্রা শুরু হয়। তার প্রথম অভিনয় ছিল এহতেশাম পরিচালিত ‘নতুন সুর’ ছবিতে। পরে তিনি নৃত্যশিল্পী হিসেবেও কাজ করেন।
অভিনয়ে যাত্রা শুরুর মাত্র পাঁচ বছর পরেই নায়িকা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন রত্না। ১৯৬৭ সালে এহতেশাম পরিচালিত ‘চকোরী’ চলচ্চিত্রে পাকিস্তানি অভিনেতা নাদিমের বিপরীতে অভিনয় করেন তিনি। এই ছবির মাধ্যমেই তার নাম পরিবর্তন করে রাখেন ‘শাবানা’, আর সেই নামেই তিনি ইতিহাসের অংশ হয়ে যান।
বাংলা চলচ্চিত্রে শাবানাকে কেন্দ্র করে একটি বহুল প্রচলিত কথা রয়েছে ‘সেলাই মেশিন মানেই শাবানা’। কারণ, তিনি পর্দায় অসহায়, সংগ্রামী নারী কিংবা মায়ের চরিত্রে এত বাস্তবসম্মত অভিনয় করেছেন যে দর্শকের মনে চিরস্থায়ী ছাপ ফেলেছে। বহু ছবিতে দেখা গেছে, স্বামী পরিত্যক্ত এক নারীর চরিত্রে সন্তানকে মানুষ করার জন্য তিনি সেলাইয়ের কাজ করছেন।
সুতরাং, সেলাই মেশিন যেন তার অভিনয় জীবনের এক প্রতীক হয়ে উঠেছে।
আরও পড়ুন: গণভোটের রায় না মানলে তারেক রহমানের ক্ষমতায় থাকার অধিকার নেই: জুনায়েদ
অভিনয়ের পাশাপাশি প্রযোজনাতেও তার সফল পদচারণা ছিল। ১৯৭৯ সালে নিজস্ব প্রতিষ্ঠান এস এস প্রোডাকশনের ব্যানারে নির্মিত ‘মাটির ঘর’ ছিল তার প্রথম প্রযোজিত চলচ্চিত্র। আজিজুর রহমান পরিচালিত এই ছবিতে রাজ্জাক ও শাবানার অভিনয় দর্শকদের মুগ্ধ করে এবং ছবিটি বাণিজ্যিকভাবে সফল হয়।
১৯৮৮ সালে ভারত-বাংলাদেশ যৌথ প্রযোজনার ছবিতে ‘বিরোধ’ অভিনয় করে তিনি আন্তর্জাতিক পর্যায়েও আলোচনায় আসেন। এ ছবিতে তার বিপরীতে ছিলেন বলিউড কিংবদন্তি অভিনেতা রাজেশ খান্না। পরে ছবিটি হিন্দিতে ‘শত্রু’ নামে ডাবিং করে মুক্তি দেওয়া হয়।
দেশীয় কিংবদন্তিদের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক অঙ্গনের কিংবদন্তিদের সঙ্গেও সাক্ষাতের সুযোগ তার ছিল। ১৯৮৯ সালের অক্টোবরে ইউনিসেফের শুভেচ্ছাদূত ও বিশ্বখ্যাত হলিউড অভিনেত্রী অড্রে হেপবার্ন বাংলাদেশ সফরে এসে এফডিসি পরিদর্শন করেন। সে সময়ে তিনি শাবানাসহ দেশের বেশ কয়েকজন জনপ্রিয় শিল্পীর সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন।
ব্যক্তিগত জীবনে ১৯৭৪ সালে তিনি সরকারি কর্মকর্তা ও ব্যবসায়ী ওয়াহিদ সাদিককে বিয়ে করেন। তারা যৌথভাবে এস এস প্রোডাকশন্স প্রতিষ্ঠা করেন। তাদের সংসারে দুটি মেয়ে—সুমি ও ঊর্মি এবং এক ছেলে নাহিন রয়েছে।
আরও পড়ুন: বিয়ের ১৫ দিনের মাথায় সড়কে প্রাণ গেল ইতালি প্রবাসী তানভীরের
পুরস্কারের দিক থেকে শাবানা বাংলাদেশের চলচ্চিত্র ইতিহাসে অনন্য। ১৯৭৭ সালে ‘জননী’ চলচ্চিত্রে অভিনয়ের জন্য জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে পার্শ্বচরিত্র বিভাগে মনোনীত হয়েছিলেন, তবে তিনি সেই পুরস্কার গ্রহণ করেননি। ১৯৮০ সালে ‘সখী তুমি কার’ ছবির জন্য প্রথমবার সেরা অভিনেত্রীর জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার লাভ করেন।
এরপর তিনি মোট ১১ বার সেরা অভিনেত্রী হিসেবে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার অর্জন করেছেন, যা এখনো কোনো বাংলাদেশি অভিনেত্রীর জন্য সর্বোচ্চ অর্জন। তার অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ২০১৭ সালে তাকে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে আজীবন সম্মাননা দেওয়া হয়।
১৯৯৯ সালে অভিনয় থেকে বিদায় নিয়ে সপরিবারে যুক্তরাষ্ট্রে স্থায়ী হন শাবানা। যদিও তার শেষ মুক্তিপ্রাপ্ত চলচ্চিত্র ‘ঘরে ঘরে যুদ্ধ’ মুক্তি পায় ২০০১ সালে। আজিজুর রহমান পরিচালিত এই ছবিটি ছিল শাবানা-আলমগীর জুটির শেষ সিনেমা। বাংলা চলচ্চিত্রে সবচেয়ে বেশি জুটিবদ্ধ হয়ে অভিনয়ের রেকর্ড তাদের দখলে রয়েছে। শাবানা মোট ২৯৯টি চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছেন, যার মধ্যে ১৩০টিতে তার সহশিল্পী ছিলেন আলমগীর।
সর্বশেষ ২০১৯ সালের ডিসেম্বরে তিনি বাংলাদেশে এসেছিলেন এবং ২০২০ সালের জানুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্রে ফিরে যান। এরপর তার দেশে আসা হয়নি। পর্দা থেকে দূরে থাকলেও বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে এবং দর্শকের হৃদয়ে শাবানা আজও এক অমলিন কিংবদন্তি।
আরও পড়ুন: হাসিনার পতনের আগে ইউনূসকে দায়িত্ব নেওয়ার আহ্বান করেন শফিকুল আলম
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন