হোসেনপুর (কিশোরগঞ্জ) প্রতিনিধি
০৩:৪৬ পি.এম
কিশোরগঞ্জের হোসেনপুরে, সারা দেশের মত, আগাছা দমনে মাত্রাতিরিক্ত কীটনাশক প্রয়োগের কারণে জীববৈচিত্র্য ধ্বংসের পথে রয়েছে। কৃষকদের দুরদর্শিতা এবং কৃষি বিভাগের সঠিক তদারকি না থাকায় অপ্রয়োজনীয় ও মাত্রাতিরিক্ত কীটনাশক প্রয়োগ করার বিষয়টি পরিবেশবিদদের কাছে উদ্বেগজনক বলে মনে করা হচ্ছে। কীটনাশক প্রয়োগের ফলে মিঠাপানির মাছের বিলুপ্তির পাশাপাশি পুকুর, খাল, বিল ও নদীনালা থেকে মাছ, ব্যাঙ, শামুকসহ অন্যান্য উপকারী পোকামাকড়ের জন্যও হুমকি সৃষ্টি হচ্ছে।
বোরো ধান চাষের পর দীর্ঘ ৩ মাস জমি পতিত থাকায় এই জমিতে কোমড় পরিমাণ উঁচু আগাছা জন্মাচ্ছে। আমাদের দেশে ছোট ছোট ট্রাক্টরগুলো দিয়ে এই ধরনের আগাছা ভেদ করা খুবই কঠিন বলে কৃষকেরা বাধ্য হয়ে বালাইনাশক প্রয়োগ করছেন। এতে খুব সহজে ও কম খরচে আগাছা দমনে সহায়তা লাভ হলেও, বাস্তবে খুব বেশি মাত্রায় কীটনাশক প্রয়োগের ফলে জীববৈচিত্র্য ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে গেছে।
সরেজমিনে কথা হয়, উপজেলার আড়াইবাড়িয়া ইউনিয়নের ভরুয়া গ্রামের ষাটোর্ধ কৃষক মো. সাইদুর রহমান, একই ইউনিয়নের জামাইল গ্রামের কৃষক আব্দুল হামিদ দুলাল, পুমদী ইউনিয়নের নারায়ণ ডহর গ্রামের পঁচাত্তোর্ধ আব্দুর রাশিদ, নজরুল ইসলাম(৫৫) এবং মো. নজরুল ইসলাম(৪০) এর সাথে। তাঁরা জানান, কৃষি শ্রমিকের সংকট এবং মজুরি অধিক হওয়ার কারণে, আগাছা দমনে যে এলাকায় প্রতি একরের আগাছা পরিষ্কার করতে ১০ হাজার টাকা খরচ হতো, সেখানে এখন দুই হাজার টাকা খরচে আগাছা দমন হয়ে যাচ্ছে। তাই সহজ ও কম খরচের জন্য বালাইনাশক প্রয়োগে কৃষিকর্মীরা বেশি চেষ্টা করছেন। এক সময়ে এসব জমিতে তিন ফসল আবাদ হলেও, এখন যে পরিমাণ ফসল উৎপাদন হয়, তা বিক্রি করে উৎপাদিত ফসলের মূল্য ওঠে আসেনা।
উপজেলা প্রাণি সম্পদ কর্মকর্তা ডা. মোজাহিদুল কবির জানান, ঘাস দমনে যে কীটনাশক ব্যবহার করা হয়, এগুলো বৃষ্টির পানিতে অন্যত্র ছড়িয়ে পড়ার ফলে ঘাসের সঙ্গে মিশে যাচ্ছে। এসব ঘাস অজান্তেই খেয়ে যাওয়ার কারণে অনেক গরু ও ছাগলের মৃত্যুর খবর পাওয়া যাচ্ছে, এ নিয়ে তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
উপজেলা কৃষি অফিসার কৃষিবিদ শেখ মোহাম্মদ মহসিন জানান, কচুয়া, বথুয়া ও কচুরিপানা দমনে ২, ৪-ডি-এমাইন পরিমাণ মত ব্যবহার করা যেতে পারে। তবে দীর্ঘ মেয়াদে যে কোন কীটনাশক প্রয়োগ স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ক্ষতির কারণ হয়ে উঠছে। এর ফলস্বরূপ আগামী ৫ বছরের মধ্যে অধিকাংশ মানুষ মরণব্যাধি ক্যানসারের শিকার হবে। এজন্য তিনি কৃষকদের জৈব বালাই নাশক ব্যবহার করার পরামর্শ দেন। কিন্তু জৈব বালাই নাশকের কার্যকারিতা সময় সাপেক্ষ হওয়ায় কৃষকরা এই পদ্ধতিতে আগ্রহী হচ্ছেন না।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
রাজধানীর কদমতলীতে অভিযান চালিয়ে দুইজনকে গ্রেফতার করেছে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিট, যারা বিপুল পরিমাণ জাল নোট ও জাল নোট তৈরির সরঞ্জামের সঙ্গে গ্রেফতার হয়েছে।
সোমবার ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশন্স বিভাগের অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার নিয়াজ মেহেদী একটি সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য প্রকাশ করেছেন।
গ্রেফতারদের মধ্যে মো. শাহাব উদ্দিন (৪৩) ও হাজেরা আক্তার ঋতু (৩০) রয়েছেন।
সিটিটিসি জানায়, রবিবার (২৬ জুলাই) দিবাগত রাত ১২টা ৩০ মিনিটের দিকে ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম ডিভিশনের একটি দল গোপন সংবাদের ভিত্তিতে কদমতলী থানার পলাশপুর গ্যাস রোডের ৫ নম্বর গলির একটি ভাড়া বাসায় বিশেষ অভিযান পরিচালনা করে। তাদের হাতে জাল নোট তৈরির সময় দুইজনকে গ্রেফতার করা হয়। এ সময় ২ লাখ ৫৮ হাজার টাকার জাল নোট, একটি ল্যাপটপ, একটি কালার প্রিন্টার এবং জাল নোট তৈরিতে ব্যবহৃত বিশেষ ডাইস, বিশেষ রং, সিকিউরিটি থ্রেডযুক্ত কাগজসহ বিভিন্ন সরঞ্জাম জব্দ করা হয়।
প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেফতাররা জানিয়েছেন, তারা কয়েক বছর ধরে ওই বাসা ভাড়া নিয়েছেন এবং সেখানে জাল নোট তৈরি করে আসছেন। তৈরি করা জাল নোট তারা নিজেরা এবং সহযোগীদের মাধ্যমে ঢাকা, কুমিল্লাসহ দেশের বিভিন্ন জেলার জনবহুল হাট-বাজার ও শপিংমলে ছড়িয়ে দিয়ে সাধারণ মানুষের সঙ্গে প্রতারণা করতেন।
সিটিটিসি আরো জানায়, গ্রেফতার শাহাব উদ্দিন এই চক্রের মূলহোতা। তার বিরুদ্ধে ডিএমপির রমনা, তেজগাঁও এবং মোহাম্মদপুর থানায় বিশেষ ক্ষমতা আইনে আগের পাঁচটি মামলা রয়েছে।
সিটিটিসি জানিয়েছে, তাদের বিরুদ্ধে কদমতলী থানায় বিশেষ ক্ষমতা আইনে মামলা দায়েরের প্রক্রিয়া চলমান। একইসাথে জাল নোট প্রস্তুতকারী চক্রের অন্য সদস্যদের শনাক্ত ও গ্রেফতারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
আর্জেন্টিনার প্রেসিডেন্ট হাভিয়ের মাইলেই, ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভা এবং দেশটির অন্যান্যদের সম্পর্কে ‘অপমানজনক’ মন্তব্যের কারণে ব্রাজিল তাৎক্ষণিকভাবে আর্জেন্টিনায় নিযুক্ত দেশটির রাষ্ট্রদূতকে আলোচনার জন্য ডেকে পাঠিয়েছে। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় রোববার এ তথ্য নিশ্চিত করেছে।
শনিবার সাও পাওলোতে ব্রাজিলের ডানপন্থী প্রেসিডেন্ট প্রার্থী ফ্লাভিও বলসোনারোর আনুষ্ঠানিক মনোনয়ন অনুষ্ঠানে বক্তব্যের সময় মাইলেই। ফ্লাভিও বলসোনারোর নির্বাচনী সমাবেশে হাভিয়ের মাইলেই সরাসরি নাম উল্লেখ না করে ব্রাজিলের বামপন্থী প্রেসিডেন্টকে ‘দণ্ডিত ব্যক্তি’ এবং ‘চোর’ আখ্যায়িত করেছেন। একই অনুষ্ঠানে তিনি নাম উল্লেখ না করে ব্রাজিলের সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি আলেক্সান্দ্রে দে মোরায়েসকে ‘টাকমাথা আবর্জনা’ বলেও মন্তব্য করেন।
ব্রাজিলের একটি কূটনৈতিক সূত্র এএফপিকে জানায় যে, মাইলেই ‘সরকারের দুটি অঙ্গ, ব্রাজিলের জনগণ এবং ব্রাজিলের গণতন্ত্রকে অপমান করেছেন।’
সূত্রটি আরও জানায়, এসব ‘অপমানজনক’ মন্তব্যের প্রতিবাদ জানাতে রোববার আর্জেন্টিনার রাষ্ট্রদূতকেও তলব করে ব্রাজিল।
এদিকে, রোববার শ্রমিক ইউনিয়নের একটি অনুষ্ঠানে লুলা বলেন, ‘আমি কারও হস্তক্ষেপ ছাড়াই নেতৃত্ব দিয়ে যাব। কারণ, ব্রাজিলে আমরা কাউকে তার সীমার বাইরে নাক গলাতে দিই না।’ তবে, তিনি কার উদ্দেশে এ মন্তব্য করেছেন, তা স্পষ্ট করেননি।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
২০১৩ সালের ৫ মে রাজধানীর মতিঝিলের শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলামের সমাবেশকে কেন্দ্র করে ‘গণহত্যার’ ঘটনার জন্য মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ ৪১ জনের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গ্রহণ করেছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল।
আজ আনুষ্ঠানিক অভিযোগটি দাখিলের পর শুনানি শেষে বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বে তিন সদস্যের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এর পক্ষ থেকে এই আদেশ প্রদান করা হয়েছে। মামলার আসামিদের মধ্যে যারা অন্য মামলায় গ্রেফতার রয়েছেন, তাদের হাজির করার পাশাপাশি অপর আসামিদের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়া জারি করা হয়েছে। এছাড়া আগামী ১৬ আগস্ট এই মামলার পরবর্তী শুনানির দিন ধার্য করা হয়েছে। ট্রাইব্যুনালে আজ প্রসিকিউশন পক্ষে শুনানি করেন চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম।
ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ এই মামলায় যুক্ত ৪১ জন আসামি হচ্ছেন: তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ড. মহিউদ্দিন খান আলমগীর, তৎকালীন স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী অ্যাডভোকেট শামসুল হক টুকু, তৎকালীন তথ্যমন্ত্রী জাসদ সভাপতি হাসানুল হক ইনু, আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য শেখ ফজলুল করিম সেলিম, তৎকালীন খাদ্যমন্ত্রী ড. আব্দুর রাজ্জাক, আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুবউল আলম হানিফ, তৎকালীন তথ্যমন্ত্রী ড. হাসান মাহমুদ, আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, সাবেক মন্ত্রী আব্দুল লতিফ সিদ্দিকী, সাবেক প্রতিমন্ত্রী অ্যাডভোকেট মৃণাল কান্তি দাস, আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর কবির নানক, সাবেক মন্ত্রী ডা. দীপু মনি, সাবেক মন্ত্রী মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া, তৎকালীন যুবলীগ চেয়ারম্যান ওমর ফারুক চৌধুরী, সাবেক সংসদ সদস্য সালাউদ্দিন মাহমুদ, গণজাগরণ মঞ্চের আহ্বায়ক ও মুখপাত্র ডা. ইমরান এইচ সরকার, ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির সভাপতি শাহরিয়ার কবির, ৭১ টিভির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোজাম্মেল হক বাবু, সাংবাদিক ফারজানা রুপা, সাবেক আইজিপি হাসান মাহমুদ খন্দকার, সাবেক আইজিপি একেএম শহীদুল হক, সাবেক আইজিপি ড. মোহাম্মদ জাবেদ পাটোয়ারী, সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদ, তৎকালীন র্যাব মহাপরিচালক মো. মোখলেছুর রহমান, সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল আজিজ আহমেদ, মেজর জেনারেল (অব.) জিয়াউল আহসান, তৎকালীন র্যাবের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (অপস) লেফটেন্যান্ট জেনারেল মো. মজিবুর রহমান, সাবেক ডিআইজি আব্দুল জলিল মণ্ডল, সাবেক অতিরিক্ত আইজিপি শেখ মুহাম্মাদ মারুফ হাসান, সাবেক অতিরিক্ত আইজিপি (এসবি) মাহবুব হোসেন, সাবেক অতিরিক্ত আইজিপি (এসবি) মনিরুল ইসলাম, তৎকালীন ডিএমপির ডিসি (সদর দপ্তর ও প্রশাসন) মো. আনোয়ার হোসেন, তৎকালীন ডিএমপির ডিসি (ট্রাফিক-দক্ষিণ) আশরাফুজ্জামান, তৎকালীন ডিএমপির এডিসি (মতিঝিল জোন) এসএম মেহেদী হাসান, সাবেক ডিআইজি হারুন-অর-রশীদ, সাবেক ডিআইজি বিপ্লব কুমার সরকার, সাবেক ডিআইজি সুপার সৈয়দ নুরুল ইসলাম, তৎকালীন ডিএমপির এডিসি (মতিঝিল বিভাগ) মো. আসাদুজ্জামান, অবসরপ্রাপ্ত অতিরিক্ত পুলিশ সুপার এসএম শিবলী নোমান এবং তৎকালীন মতিঝিল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) বিএম ফরমান আলী।
২০১৩ সালের ৫ মে শাপলা চত্বরে সংঘটিত বর্বরোচিত হত্যাযজ্ঞের ব্যাপারে দীর্ঘ সময় ধরে ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থা তদন্ত কাজ পরিচালনা করেছে এবং চিফ প্রসিকিউটরের কার্যালয়ে একটি খসড়া তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করেছে। সেই খসড়া তদন্ত প্রতিবেদনটি পর্যালোচনা করে আজ আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করা হয়েছে। শাপলা চত্বরে হত্যাযজ্ঞের ঘটনায় নিহতদের প্রসঙ্গে চিফ প্রসিকিউটর জানিয়েছেন, আমরা এ পর্যন্ত নিহত ৬১ জনের একটি তালিকা পেয়েছিলাম, যার মধ্যে ৫৮ জনের পরিচয় শনাক্ত করা হয়েছে।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
ভারতের সাম্প্রতিক ছাত্র আন্দোলন ভারতের সকল নাগরিকের কাছেই ছিল দীর্ঘ এক যুগের ক্রমাগত একনায়কতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা পরিচালনার ক্ষেত্রে নিপীড়ন, নির্যাতন, দুর্নীতি, অনিয়ম, বিরোধী মত দমন সহ দীর্ঘ রাজনৈতিক হতাশার বিরুদ্ধে এক নতুন আলোর দিশা। অনলাইনভিত্তিক প্ল্যাটফর্ম থেকে গড়ে ওঠা ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) আন্দোলন এমন এক সময়ে আবির্ভূত হয়, যখন বহু ভারতীয় মনে করছিলেন যে দীর্ঘদিনের মোদি শাসনের বিরুদ্ধে কার্যকর কোনো রাজনৈতিক প্রতিরোধ আর অবশিষ্ট নেই। বিরোধী কংগ্রেস কিংবা অন্যান্য দল দীর্ঘ সময় ধরে বিজেপির শক্ত ভিত নাড়াতে ব্যর্থ হয়েছে—এমন ধারণা বহু মানুষের মধ্যে তৈরি হয়েছিল। কিন্তু তা হঠাৎ থামিয়ে দেওয়ায় সারাদেশে মোদি বিরোধী আন্দোলনকারী ছাত্র-ছাত্রী ,শিক্ষার্থী, পড়ুয়াদের উপর ক্রমাগত নির্যাতন, নিপীড়ন এবং ধরপাকরের অভিযান নেমে এসেছে। অন্যদিকে আন্দোলন গড়ে তোলা ককরোচ জনতা পার্টির প্রধান বাসায় বিশ্রাম নেওয়ার ভিডিও প্রকাশ করছেন! তাহলে কি এ আন্দোলন ছিল মোদি সরকারের বিরুদ্ধে যাতে ভবিষ্যতে আরো এক যুগেও নতুন করে কোন বড় আন্দোলন গড়ে না উঠতে পারে তার দীর্ঘমেয়াদি মাস্টার প্ল্যান? এক্ষেত্রে অনেকে মনে করতে পারেন যে তার জন্য মোদীজি কেন একটি কেন্দ্রীয় শিক্ষা মন্ত্রী কে বলিদান দেবেন? এখন প্রশ্ন উঠতে পারে, দীর্ঘমেয়াদি মোদি সরকারের শাসন যদি এই আন্দোলন নিধনের মাধ্যমে আরো এক যুগ দীর্ঘায়িত হয় তাহলে এমন একটি মন্ত্রীর বলিদান সরকারের জন্য তেমন কোন বিষয় নয়। ইতিমধ্যে তাকে অন্য মন্ত্রণালয়ে পদায়নের কথাও শোনা যাচ্ছে।
সমালোচকদের অভিযোগ, এই দীর্ঘ সময়ে নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন (সিএএ) ও এনআরসি সংশ্লিষ্ট নীতিমালা, প্রশাসনিক কঠোরতা, বিরোধী মতের ওপর চাপ, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিয়ে বিতর্ক, শিক্ষা ব্যবস্থার সংকট, দুর্নীতির অভিযোগ, প্রশ্নফাঁস, সীমান্তনীতি ও পররাষ্ট্র কৌশল—সব মিলিয়ে এক গভীর অসন্তোষ সমাজের বিভিন্ন স্তরে জমা হচ্ছিল। কৃষক, শ্রমিক, দলিত, শিক্ষার্থী—অনেকেই নিজেদের বঞ্চিত ও কোণঠাসা বলে অনুভব করছিলেন।
এই প্রেক্ষাপটে ছাত্রদের আন্দোলন যেন কোটি কোটি মানুষের কাছে নতুন আশার প্রতীক হয়ে উঠেছিল। মনে হচ্ছিল, অবশেষে এমন একটি শক্তি তৈরি হয়েছে, যা দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক স্থবিরতাকে চ্যালেঞ্জ জানাতে পারবে।
কিন্তু প্রশ্নটি ঠিক সেখানেই।
যে আন্দোলনকে অনেকেই মোদি সরকারের দীর্ঘ শাসনের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছিলেন, সেই আন্দোলন হঠাৎ করেই থেমে গেল কেন? সরকারের পক্ষ থেকে দাবি মেনে নেওয়ার ঘোষণার পর আন্দোলনের নেতৃত্ব দ্রুত কর্মসূচি প্রত্যাহার করল কেন? দীর্ঘ এক যুগে সবচেয়ে বড় জনবিক্ষোভ কি এত সহজেই শেষ হয়ে যাওয়ার কথা?
আরও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—আন্দোলন বন্ধ হওয়ার পর কী ঘটল?
বিভিন্ন স্থানে আন্দোলনে অংশ নেওয়া শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে হামলা, গ্রেপ্তার, হেনস্তা ও হয়রানির অভিযোগ সামনে আসতে থাকে। অভিযোগ ওঠে, স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিকেল ও প্রকৌশল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অনেক শিক্ষার্থীকে টার্গেট করা হচ্ছে। যারা রাজপথে নেমে আন্দোলনের মুখ হয়ে উঠেছিল, তাদের অনেকেই নিজেদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন।
এমন পরিস্থিতিতে আন্দোলনের প্রধান নেতা অভিজিৎ দিপকের প্রকাশিত ভিডিও বার্তায় বিশ্রামে থাকার কথা বলাকে ঘিরেও প্রশ্ন উঠেছে। যারা তাঁর আহ্বানে রাজপথে নেমেছিলেন, তাদের নিরাপত্তা ও আইনি সহায়তার দায়িত্ব কি নেতৃত্বের নয়? আন্দোলনের কর্মীরা যদি একের পর এক হামলা-মামলার মুখে পড়েন, তবে তাদের পাশে দাঁড়ানো কি নেতৃত্বের নৈতিক কর্তব্য নয়?
এসব প্রশ্ন থেকেই আরেকটি বিতর্কিত কিন্তু আলোচিত রাজনৈতিক বিশ্লেষণ সামনে আসে।
সমালোচকদের ধারণা, মোদি সরকারের প্লানের অংশ যদি এটি হয়ে থাকে তাহলে তাদের ইচ্ছা ছিল আন্দোলনে মোদি সরকারবিরোধী সব শক্তি প্রকাশ্যে চলে আসলে এবং পরবর্তীতে তাদের শনাক্ত করে প্রশাসনিকভাবে দমন করা সহজ হবে, এর ফলে মোদি সরকার আরো দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় নিরঙ্কুশ ক্ষমতা প্রয়োগ করে থাকার যোগ্যতা অর্জন করবে। তাহলে কি পুরো ঘটনাপ্রবাহ শেষ পর্যন্ত ক্ষমতাসীনদেরই কৌশলগত সুবিধা এনে দিল? আন্দোলন কি অনিচ্ছাকৃতভাবে সেই সুযোগ তৈরি করে দিল, নাকি এটি শুরু থেকেই ক্ষমতাসীনদের বৃহত্তর রাজনৈতিক কৌশলের অংশ ছিল? এই প্রশ্নের উত্তর আজও মেলেনি। প্রমাণ ছাড়া কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানোও উচিত নয়। কিন্তু রাজনীতির ইতিহাস বলে, ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে শাসকরা নানা কৌশল গ্রহণ করে, আবার আন্দোলনের ভুল কৌশলও অনেক সময় ক্ষমতাসীন দেরই শক্তিশালী করে তোলে।
তাই আজ সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি হয়তো আন্দোলনের সাফল্য বা ব্যর্থতা নয়; বরং আন্দোলনের পর যাদের জীবনে নেমে এসেছে হামলা, মামলা ও অনিশ্চয়তা—তাদের পাশে কে দাঁড়াবে?
যদি নেতৃত্ব সেই দায়িত্ব পালন করতে ব্যর্থ হয়, তবে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠবে—এই আন্দোলনের প্রকৃত রাজনৈতিক লাভবান কে? আর যদি শেষ পর্যন্ত লাভবান হয়ে থাকে ক্ষমতাসীনরাই, তবে ইতিহাস একদিন হয়তো এই আন্দোলনকে নতুন করে মূল্যায়ন করবে।
রাজনীতিতে কেবল রাজপথে মানুষ নামানোই নেতৃত্বের পরিচয় নয়; আন্দোলন শেষে সেই মানুষগুলোর নিরাপত্তা, আইনি সুরক্ষা ও রাজনৈতিক ভবিষ্যতের দায়িত্ব নেওয়াই প্রকৃত নেতৃত্বের সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষা। কারণ এই ককরোজ জনতা পার্টি যখন ১৪০ কোটি জনতার প্রতিচ্ছবি হিসেবে নিজেকে প্রমাণ করেছিল সে সময়ে ভারতের নিপীড়িত নির্যাতিত মানুষেরা প্রত্যাশায় দিন গুনে ছিল যে হয়তো নিপীড়নমূলক শাসনের অবসান হবে। কিন্তু তেমনটি না হয়ে হঠাৎ আন্দোলন বন্ধ হওয়া এই সংশয় তৈরি করে যে, এটি কি মোদি সরকারেরই দীর্ঘমেয়াদি শাসন ব্যবস্থা পাকাপোক্ত করার একটি মাস্টার প্ল্যান ছিল এবং ককরোজ জনতা পার্টির প্রধান অভিজিৎ দীপকে কি ভারতের প্রধানমন্ত্রীর নরেন্দ্র মোদির দাবার গুটি হিসাবে কাজ করেছিল-এমন প্রশ্ন বিশ্লেষকদের মনে ওঠা আজকের দিনে মনে হয় অমূলক নয়।
লেখকঃ সাংবাদিক, রাজনৈতিক ও সামরিক বিশ্লেষক ও কলামিস্ট।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ