প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
ভারতের সাম্প্রতিক ছাত্র আন্দোলন ভারতের সকল নাগরিকের কাছেই ছিল দীর্ঘ এক যুগের ক্রমাগত একনায়কতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা পরিচালনার ক্ষেত্রে নিপীড়ন, নির্যাতন, দুর্নীতি, অনিয়ম, বিরোধী মত দমন সহ দীর্ঘ রাজনৈতিক হতাশার বিরুদ্ধে এক নতুন আলোর দিশা। অনলাইনভিত্তিক প্ল্যাটফর্ম থেকে গড়ে ওঠা ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) আন্দোলন এমন এক সময়ে আবির্ভূত হয়, যখন বহু ভারতীয় মনে করছিলেন যে দীর্ঘদিনের মোদি শাসনের বিরুদ্ধে কার্যকর কোনো রাজনৈতিক প্রতিরোধ আর অবশিষ্ট নেই। বিরোধী কংগ্রেস কিংবা অন্যান্য দল দীর্ঘ সময় ধরে বিজেপির শক্ত ভিত নাড়াতে ব্যর্থ হয়েছে—এমন ধারণা বহু মানুষের মধ্যে তৈরি হয়েছিল। কিন্তু তা হঠাৎ থামিয়ে দেওয়ায় সারাদেশে মোদি বিরোধী আন্দোলনকারী ছাত্র-ছাত্রী ,শিক্ষার্থী, পড়ুয়াদের উপর ক্রমাগত নির্যাতন, নিপীড়ন এবং ধরপাকরের অভিযান নেমে এসেছে। অন্যদিকে আন্দোলন গড়ে তোলা ককরোচ জনতা পার্টির প্রধান বাসায় বিশ্রাম নেওয়ার ভিডিও প্রকাশ করছেন! তাহলে কি এ আন্দোলন ছিল মোদি সরকারের বিরুদ্ধে যাতে ভবিষ্যতে আরো এক যুগেও নতুন করে কোন বড় আন্দোলন গড়ে না উঠতে পারে তার দীর্ঘমেয়াদি মাস্টার প্ল্যান? এক্ষেত্রে অনেকে মনে করতে পারেন যে তার জন্য মোদীজি কেন একটি কেন্দ্রীয় শিক্ষা মন্ত্রী কে বলিদান দেবেন? এখন প্রশ্ন উঠতে পারে, দীর্ঘমেয়াদি মোদি সরকারের শাসন যদি এই আন্দোলন নিধনের মাধ্যমে আরো এক যুগ দীর্ঘায়িত হয় তাহলে এমন একটি মন্ত্রীর বলিদান সরকারের জন্য তেমন কোন বিষয় নয়। ইতিমধ্যে তাকে অন্য মন্ত্রণালয়ে পদায়নের কথাও শোনা যাচ্ছে।
সমালোচকদের অভিযোগ, এই দীর্ঘ সময়ে নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন (সিএএ) ও এনআরসি সংশ্লিষ্ট নীতিমালা, প্রশাসনিক কঠোরতা, বিরোধী মতের ওপর চাপ, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিয়ে বিতর্ক, শিক্ষা ব্যবস্থার সংকট, দুর্নীতির অভিযোগ, প্রশ্নফাঁস, সীমান্তনীতি ও পররাষ্ট্র কৌশল—সব মিলিয়ে এক গভীর অসন্তোষ সমাজের বিভিন্ন স্তরে জমা হচ্ছিল। কৃষক, শ্রমিক, দলিত, শিক্ষার্থী—অনেকেই নিজেদের বঞ্চিত ও কোণঠাসা বলে অনুভব করছিলেন।
এই প্রেক্ষাপটে ছাত্রদের আন্দোলন যেন কোটি কোটি মানুষের কাছে নতুন আশার প্রতীক হয়ে উঠেছিল। মনে হচ্ছিল, অবশেষে এমন একটি শক্তি তৈরি হয়েছে, যা দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক স্থবিরতাকে চ্যালেঞ্জ জানাতে পারবে।
কিন্তু প্রশ্নটি ঠিক সেখানেই।
যে আন্দোলনকে অনেকেই মোদি সরকারের দীর্ঘ শাসনের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছিলেন, সেই আন্দোলন হঠাৎ করেই থেমে গেল কেন? সরকারের পক্ষ থেকে দাবি মেনে নেওয়ার ঘোষণার পর আন্দোলনের নেতৃত্ব দ্রুত কর্মসূচি প্রত্যাহার করল কেন? দীর্ঘ এক যুগে সবচেয়ে বড় জনবিক্ষোভ কি এত সহজেই শেষ হয়ে যাওয়ার কথা?
আরও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—আন্দোলন বন্ধ হওয়ার পর কী ঘটল?
বিভিন্ন স্থানে আন্দোলনে অংশ নেওয়া শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে হামলা, গ্রেপ্তার, হেনস্তা ও হয়রানির অভিযোগ সামনে আসতে থাকে। অভিযোগ ওঠে, স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিকেল ও প্রকৌশল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অনেক শিক্ষার্থীকে টার্গেট করা হচ্ছে। যারা রাজপথে নেমে আন্দোলনের মুখ হয়ে উঠেছিল, তাদের অনেকেই নিজেদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন।
এমন পরিস্থিতিতে আন্দোলনের প্রধান নেতা অভিজিৎ দিপকের প্রকাশিত ভিডিও বার্তায় বিশ্রামে থাকার কথা বলাকে ঘিরেও প্রশ্ন উঠেছে। যারা তাঁর আহ্বানে রাজপথে নেমেছিলেন, তাদের নিরাপত্তা ও আইনি সহায়তার দায়িত্ব কি নেতৃত্বের নয়? আন্দোলনের কর্মীরা যদি একের পর এক হামলা-মামলার মুখে পড়েন, তবে তাদের পাশে দাঁড়ানো কি নেতৃত্বের নৈতিক কর্তব্য নয়?
এসব প্রশ্ন থেকেই আরেকটি বিতর্কিত কিন্তু আলোচিত রাজনৈতিক বিশ্লেষণ সামনে আসে।
সমালোচকদের ধারণা, মোদি সরকারের প্লানের অংশ যদি এটি হয়ে থাকে তাহলে তাদের ইচ্ছা ছিল আন্দোলনে মোদি সরকারবিরোধী সব শক্তি প্রকাশ্যে চলে আসলে এবং পরবর্তীতে তাদের শনাক্ত করে প্রশাসনিকভাবে দমন করা সহজ হবে, এর ফলে মোদি সরকার আরো দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় নিরঙ্কুশ ক্ষমতা প্রয়োগ করে থাকার যোগ্যতা অর্জন করবে। তাহলে কি পুরো ঘটনাপ্রবাহ শেষ পর্যন্ত ক্ষমতাসীনদেরই কৌশলগত সুবিধা এনে দিল? আন্দোলন কি অনিচ্ছাকৃতভাবে সেই সুযোগ তৈরি করে দিল, নাকি এটি শুরু থেকেই ক্ষমতাসীনদের বৃহত্তর রাজনৈতিক কৌশলের অংশ ছিল? এই প্রশ্নের উত্তর আজও মেলেনি। প্রমাণ ছাড়া কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানোও উচিত নয়। কিন্তু রাজনীতির ইতিহাস বলে, ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে শাসকরা নানা কৌশল গ্রহণ করে, আবার আন্দোলনের ভুল কৌশলও অনেক সময় ক্ষমতাসীন দেরই শক্তিশালী করে তোলে।
তাই আজ সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি হয়তো আন্দোলনের সাফল্য বা ব্যর্থতা নয়; বরং আন্দোলনের পর যাদের জীবনে নেমে এসেছে হামলা, মামলা ও অনিশ্চয়তা—তাদের পাশে কে দাঁড়াবে?
যদি নেতৃত্ব সেই দায়িত্ব পালন করতে ব্যর্থ হয়, তবে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠবে—এই আন্দোলনের প্রকৃত রাজনৈতিক লাভবান কে? আর যদি শেষ পর্যন্ত লাভবান হয়ে থাকে ক্ষমতাসীনরাই, তবে ইতিহাস একদিন হয়তো এই আন্দোলনকে নতুন করে মূল্যায়ন করবে।
রাজনীতিতে কেবল রাজপথে মানুষ নামানোই নেতৃত্বের পরিচয় নয়; আন্দোলন শেষে সেই মানুষগুলোর নিরাপত্তা, আইনি সুরক্ষা ও রাজনৈতিক ভবিষ্যতের দায়িত্ব নেওয়াই প্রকৃত নেতৃত্বের সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষা। কারণ এই ককরোজ জনতা পার্টি যখন ১৪০ কোটি জনতার প্রতিচ্ছবি হিসেবে নিজেকে প্রমাণ করেছিল সে সময়ে ভারতের নিপীড়িত নির্যাতিত মানুষেরা প্রত্যাশায় দিন গুনে ছিল যে হয়তো নিপীড়নমূলক শাসনের অবসান হবে। কিন্তু তেমনটি না হয়ে হঠাৎ আন্দোলন বন্ধ হওয়া এই সংশয় তৈরি করে যে, এটি কি মোদি সরকারেরই দীর্ঘমেয়াদি শাসন ব্যবস্থা পাকাপোক্ত করার একটি মাস্টার প্ল্যান ছিল এবং ককরোজ জনতা পার্টির প্রধান অভিজিৎ দীপকে কি ভারতের প্রধানমন্ত্রীর নরেন্দ্র মোদির দাবার গুটি হিসাবে কাজ করেছিল-এমন প্রশ্ন বিশ্লেষকদের মনে ওঠা আজকের দিনে মনে হয় অমূলক নয়।
লেখকঃ সাংবাদিক, রাজনৈতিক ও সামরিক বিশ্লেষক ও কলামিস্ট।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন