১০:৫৪ এম
রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের কার্ডিওলজি বিভাগে এক রোগীর মৃত্যুর ঘটনাকে কেন্দ্র করে চিকিৎসকদের এবং রোগীর স্বজনদের মধ্যে পাল্টাপাল্টি অভিযোগ উঠে এসেছে।
এই ঘটনার প্রেক্ষিতে, ওই রোগীর লাশ আটকে রাখেন চিকিৎসকরা। তারা জরুরি বিভাগের কার্যক্রম তিন ঘণ্টা বন্ধ রেখে রাখেন। তারপর মৃতের ছেলে রিফাত হোসেনকে ডেকে আনা হয় এবং তার মায়ের মরদেহ ফেরত দেওয়ার শর্তে হাসপাতালের পরিচালকের কার্যালয়ের একটি কক্ষে কান ধরে ওঠবস করানো হয়। এরপর চিকিৎসকরা রিফাতকে মায়ের মরদেহ ফেরত দেন। এই ঘটনার ভিডিও ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়লে সমালোচনার ঝড় ওঠে। মৃতের ছেলেকে কান ধরে ওঠবস করানো এবং মরদেহ আটকে রাখার ঘটনার বিরুদ্ধে স্থানীয় লোকজন ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।
স্বজনদের এবং হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, শুক্রবার রাত আড়াইটার দিকে রংপুর নগরীর নিউ জুম্মপাড়া পাড়া মহল্লার মাহবুব রহমানের স্ত্রী নুরজাহান বেগম (৫৫) হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়লে, তিনি ছেলের কাছ থেকে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে যান। সেখানকার চিকিৎসকদের কাছে রোগীর জন্য অক্সিজেন দেওয়ার আর্জি জানালে, ভর্তিপ্রক্রিয়া সম্পন্ন করার পরামর্শ দেন। এর মধ্যে রোগীর শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটে এবং রাত ৪টায় তার মৃত্যু হয়।
আরও পড়ুন: ঠাকুরগাঁও-১ আসনের উপনির্বাচন সেনাবাহিনী মোতায়েন ও ইউএনও প্রত্যাহারসহ চার দফা দাবি ১১-দলীয় জোটের
চিকিৎসকদের অভিযোগ রয়েছে যে, রোগীর মৃত্যুর পর, তার স্বজনরা দায়িত্বরত চিকিৎসকদের ওপর হামলা করেন। ঘটনার পর মরদেহ মর্গে রাখা হয়েছিল। দিনের বেলা ১২টা থেকে বিকেল ৩টা পর্যন্ত জরুরি বিভাগ বন্ধ করে ধর্মঘট পালন করেন চিকিৎসকরা। চিকিৎসকদের দাবি ছিল, রিফাতকে এসে ক্ষমা চাইতে হবে। তারপরই মরদেহ মিলবে। পরে ১১ ঘণ্টা পর, বিকেল ৩টায় রিফাত হাসপাতালে আসেন এবং তাকে একটি কক্ষে নিয়ে কান ধরে ১০ বার ওঠবস করানো হয়। এরপর মায়ের মরদেহ ফেরত দেওয়া হয়।
মৃত নুরজাহানের বড় ছেলে নুরুজ্জামান রিন্টু জানান, তার স্ত্রী ফোন করে মায়ের অসুস্থতার খবর দেন। হাসপাতালে এসে তাদের উত্তেজনাকর পরিস্থিতির শিকার হতে হয়, যেখানে সামান্য ঘটনাকে কেন্দ্র করে মায়ের মরদেহ আটকে রাখা হয়েছিল। অ্যাম্বুলেন্সে তুলে দেওয়া হলেও মরদেহ নামিয়ে নেওয়া হয়। মরদেহ দিতে গড়িমসি করায়, বেলা দেড়টার দিকে মরদেহ নেওয়ার দাবিতে মেডিকেল মোড় এলাকায় মহাসড়ক অবরোধ করে তারা।
প্রত্যক্ষদর্শী, ইন্টার্ন চিকিৎসক, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ, পুলিশ এবং রোগীর স্বজনদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, কার্ডিওলজি বিভাগে অক্সিজেন না দেওয়ার কারণে মায়ের মৃত্যুর পর, দায়িত্বরত সহকারী রেজিস্ট্রার ডা. রাকিবুল হাসান ও ইন্টার্ন চিকিৎসক নাঈমের ওপর চড়াও হন ছেলে রিফাত এবং হাতাহাতির ঘটনা ঘটে।
এর প্রতিবাদে ভোর থেকে কয়েকজন ইন্টার্ন হাসপাতালের ডেড হাউজের সামনে অবস্থান নেন। তারা বলেছিলেন, মৃতের ছেলেকে গ্রেপ্তার না করা পর্যন্ত মরদেহ না দেওয়ার ঘোষণা দেন। সকাল ১০টায় হাসপাতালের সামনে বিক্ষোভ শুরু হয়। দুপুর সোয়া ১২টার দিকে চিকিৎসকরা জরুরি বিভাগে তালা দিয়ে ধর্মঘট জানান। এর মধ্যে স্বজনরা কয়েক দফায় মরদেহ নিতে গেলে ব্যর্থ হন। একপর্যায়ে স্বজনরা অ্যাম্বুলেন্স নিয়ে মর্গের সামনে আসেন। খবর পেয়ে হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. আশিকুর রহমান ঘটনাস্থলে এসে মরদেহ স্বজনদের দেওয়ার জন্য চিকিৎসকদের অনুরোধ করেন, কিন্তু চিকিৎসকরা তা রাখেননি। মরদেহ অ্যাম্বুলেন্সে তুলতে যাওয়া হলে বাধা দেওয়া হয় এবং মরদেহ আটকে রাখা হয়।
আরও পড়ুন: ঠাকুরগাঁও-১ আসনের উপনির্বাচনে ১৮৫টি ভোটকেন্দ্রের মধ্যে ১১৫টি ঝুঁকিপূর্ণ
রংপুর ইন্টার্ন ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মো. মিরাজ বলেন, ‘আমরা সকাল থেকে বলছিলাম, লাশ নিয়ে আমাদের কোনো বক্তব্য নেই। তবে যে ব্যক্তি চিকিৎসকদের ওপর হামলা করেছে তাকে এখানে আসতে হবে। আমাদের দাবি, তাকে আইনের আওতায় আনা। এরপরই মরদেহ নিয়ে যেতে দেব।’ বিকেলে অভিযুক্ত ছেলে কান ধরে ওঠবস করে, ক্ষমা চেয়ে মরদেহ নিয়ে যায়।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. আশিকুর রহমান বলেন, ‘এটি অত্যন্ত দুঃখজনক ঘটনা। রোগী হাসপাতাল আসার পরপরই মৃত্যু হয়েছে। সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, দায়িত্বরত চিকিৎসকদের গাফিলতি ছিল না। অজুহাতহীনভাবে চিকিৎসক নাঈম, রাকিবসহ অন্যদের মারধরের চেষ্টা করা হয়। এমনকি দায়িত্বরত নার্সের সঙ্গেও অশোভন আচরণ করা হয়েছে। রোগীর স্বজনদের আচরণ গ্রহণযোগ্য নয়।’ মা'র মরদেহ ফেরত দিতে বিটে কান ধরে ওঠবস করানোর বিষয়ে তিনি বলেন, ‘এটিও খুবই নিন্দনীয় ঘটনা।’
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন