০২:১৭ পি.এম
যুক্তরাষ্ট্রের অন্তত সাতটি অঙ্গরাজ্যের পানি সরবরাহ ও বর্জ্যপানি শোধনাগারের প্রযুক্তি ব্যবস্থায় বড় ধরনের সাইবার হামলার ঘটনা ঘটেছে। হামলার ফলে বিভিন্ন স্থাপনার স্বয়ংক্রিয় নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা অচল হয়ে পড়েছে।
এ কারণে অনেক এলাকায় কর্মীদের দ্বারা পরিচালিত পদ্ধতিতে পানি ও পয়োনিষ্কাশন সেবা চালিয়ে যেতে হচ্ছে। মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিবিএস নিউজের প্রতিবেদনে কর্মকর্তাদের ও তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাত দিয়ে জানানো হয়েছে, হামলার সঙ্গে ইরানের সংশ্লিষ্টতা আছে কি না, তা খতিয়ে দেখছে ফেডারেল ও অঙ্গরাজ্য পর্যায়ের তদন্তকারী সংস্থাগুলো। তবে এখন পর্যন্ত কোন পক্ষকে আনুষ্ঠানিকভাবে দায়ী করা হয়নি।
তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর মতে, হামলাকারীরা ইচ্ছাকৃতভাবে ইরানি হ্যাকারদের পরিচিত কৌশল অনুসরণ করে থাকতে পারে। এমনকি এতে তদন্তকে ভিন্ন দিকে নেওয়া অথবা যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের চলমান উত্তেজনাকে আরো বাড়ানোর চেষ্টা করা হয়ে থাকতে পারে। এফবিআই জানিয়েছে, অন্তত সাতটি অঙ্গরাজ্যে এই সাইবার হামলার ঘটনা ঘটেছে। কিন্তু নিরাপত্তার কারণে কোন কোন অঙ্গরাজ্য আক্রান্ত হয়েছে, তা প্রকাশ করা হয়নি। তবে জানা গেছে, মিনেসোটা রাজ্যে 30টিরও বেশি স্থানীয় পানি সরবরাহ ব্যবস্থা এই হামলার লক্ষ্যবস্তু হয়েছে।
আরও পড়ুন: এমপি আব্দুল আজিজের আপত্তিকর ভিডিও ভাইরাল, ক্ষোভ বৃদ্ধি
অন্যদিকে, কর্মকর্তারা জানান, হামলায় মূলত প্রোগ্রামযোগ্য লজিক কন্ট্রোলার (পিএলসি) ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এই যন্ত্রের মাধ্যমে দূর থেকে পানি সরবরাহ, পাম্প ও বর্জ্যপানি শোধনাগারের বিভিন্ন যন্ত্রপাতি নিয়ন্ত্রণ এবং পর্যবেক্ষণ করা হয়। মিনেসোটা রাজ্যের বিভিন্ন শহরের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, প্রযুক্তিগত সমস্যা হলেও এখন পর্যন্ত পানির মান বা সরবরাহে কোন সমস্যা দেখা যায়নি। সাউথ সেন্ট পল শহরের কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, হামলার পর জনকল্যাণ বিভাগের কর্মীরা সঙ্গে সঙ্গেই হাতে পরিচালিত পদ্ধতিতে কাজ শুরু করেন। ফলে পানি ও পয়োনিষ্কাশন সেবা স্বাভাবিক রাখা সম্ভব হয়েছে।
এছাড়া গ্রাহকদের কোন ব্যক্তিগত তথ্যও ফাঁস হয়নি। ব্রাহামে একটি কূপের পাম্প সোমবার ভোরে অচল হয়ে যায়। মেয়র নেট জর্জ জানান, কর্মীরা মাত্র 90 মিনিটের মধ্যে বিকল্প ব্যবস্থা চালু করে সেবা স্বাভাবিক রাখেন। অন্যদিকে, প্লাইমাউথ শহরে দুটি পানির টাওয়ার এবং 14টি পয়োনিষ্কাশন পাম্পিং স্টেশনের নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। শহরের জনকল্যাণ বিভাগের পরিচালক মাইকেল থম্পসন বলেন, মঙ্গলবার বিকেলে পুরো ব্যবস্থা পুনরুদ্ধার হওয়ার আগ পর্যন্ত কর্মীরা হাতে পরিচালিত পদ্ধতিতে সব কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছিলেন।
ফেডারেল কর্মকর্তারা জানিয়েছে, ২০২৩ সালেও যুক্তরাষ্ট্রের পানি অবকাঠামোর বিরুদ্ধে একই ধরনের সাইবার হামলা হয়েছিল। সে সময় ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি)-সংশ্লিষ্ট হ্যাকাররা ইন্টারনেটে উন্মুক্ত ও কারখানার নির্ধারিত ডিফল্ট পাসওয়ার্ড ব্যবহার করা নিয়ন্ত্রণ যন্ত্রে প্রবেশ করেছিল। বর্তমানে হামলার সঙ্গে একই ধরনের কৌশল ব্যবহার করা হয়েছে কি না, সেটিও তদন্ত করা হচ্ছে।
এই সাইবার হামলার ঘটনা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে রাজনৈতিক বিতর্কও শুরু হয়েছে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প মিনেসোটা রাজ্যের পানি অবকাঠামোতে হামলার জন্য ইরানকে দায়ী করার প্রতিবেদন প্রত্যাখ্যান করেছেন। তিনি বরং অঙ্গরাজ্যের প্রশাসন এবং ডেমোক্র্যাট গভর্নর টিম ওয়ালজের সমালোচনা করেছেন। ক্যাম্প ডেভিডে মন্ত্রিসভার বৈঠকে ট্রাম্প বলেন, মিনেসোটায় 30টি পানি স্থাপনায় সাইবার হামলা হয়েছে। তবে তিনি মনে করেন, এর জন্য ইরান নয়, বরং মিনেসোটার প্রশাসনিক ব্যর্থতাই দায়ী। তার ভাষায়, মিনেসোটার নেতৃত্ব অযোগ্য এবং তারা নিজেদের ব্যর্থতা ঢাকতে ইরানকে দোষারোপ করছে।
আরও পড়ুন: স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য ঢামেকে আনা হলো আনিসুল, পলক ও মামুন
ট্রাম্পের বক্তব্যের জবাবে গভর্নর টিম ওয়ালজ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে প্রতিক্রিয়া জানান। তিনি লেখেন, হামলার জন্য কে দায়ী, প্রেসিডেন্ট তা ভালোভাবেই জানেন। একই ধরনের হামলা অন্য অঙ্গরাজ্যেও হয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন। ওয়ালজ দাবি করেন, আধুনিক যুদ্ধ এখন শুধু অস্ত্রের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, সাইবার হামলাও এর গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তার মতে, এই ঘটনা যুক্তরাষ্ট্রের সাইবার নিরাপত্তা আরো শক্তিশালী করার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেছে। ঘটনার পর যুক্তরাষ্ট্রের সাইবার নিরাপত্তা ও অবকাঠামো নিরাপত্তা সংস্থা (সিআইএসএ) পানি অবকাঠামো পরিচালনাকারী সব প্রতিষ্ঠানের জন্য জরুরি সতর্কতা জারি করেছে।
সংস্থাটির ভারপ্রাপ্ত পরিচালক নিক অ্যান্ডারসন বলেন, ছোট-বড় সব ধরনের পানি সরবরাহ ব্যবস্থার নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র বর্তমানে সাইবার হামলাকারীদের প্রধান লক্ষ্য হয়ে উঠেছে। তিনি জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত ইন্টারনেট থেকে তাদের পরিচালন প্রযুক্তি এবং মোবাইল নেটওয়ার্কের মডেম দ্রুত বিচ্ছিন্ন করার আহ্বান জানান। এছাড়া মিনেসোটা স্বাস্থ্য বিভাগ জানিয়েছে, সাইবার হামলার পরেও কোথাও পানীয় পানি ব্যবহারে কোন সতর্কতা জারি করা হয়নি। তাদের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে পানীয় পানির নিরাপত্তার জন্য কোন পরিচিত ঝুঁকি নেই।
যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তারা জানান, দেশটির গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো অতীতে বিদেশি হ্যাকারদের লক্ষ্যবস্তু হয়েছে। সিআইএসএ-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে ইরান-সংশ্লিষ্ট হ্যাকাররা ডিফল্ট ব্যবহারকারী তথ্যের দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে কয়েকটি পানি সরবরাহ ও বর্জ্যপানি শোধনাগারের নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থায় প্রবেশ করেছিল। এছাড়া ২০১৩ সালে নিউইয়র্ক অঙ্গরাজ্যের রাই শহরের একটি বাঁধের নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থায় অবৈধভাবে প্রবেশের অভিযোগে একজন ইরানি হ্যাকারকে অভিযুক্ত করেছিল যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগ।
আরও পড়ুন: বটিয়াঘাটায় তিন গুলির ঘটনায় গ্রেফতার নেই, ওসি প্রত্যাহার
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন