০৩:০৪ পি.এম
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের ওপর হামলা শুরু করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। এই হামলায় শীর্ষ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি সহ বেশ কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্বকে হারায় ইরান। পাল্টা জবাব হিসেবে ইসরায়েল এবং মধ্যপ্রাচ্যে আমেরিকার ঘাটিসমূহে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়ে ব্যাপক ক্ষতিসাধন করে ইরান। এই সংঘাত তখন থেকে চলমান রয়েছে এবং যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান তাদের হাতে থাকা অত্যাধুনিক সামরিক প্রযুক্তি ব্যবহার করছে, যেমন ক্ষেপণাস্ত্র, যুদ্ধবিমান, ড্রোন, বিস্ফোরক নৌকা, সমুদ্র মাইন।
একই সঙ্গে, দুই দেশ পরোক্ষ আলোচনাও চালিয়ে যাচ্ছে যুদ্ধের অবসানের লক্ষ্যে। এই সংঘাতে হাজারো মানুষের মৃত্যু হয়েছে, লাখো মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে এবং বিশ্বব্যাপী জ্বালানি সংকট সৃষ্টি হয়েছে। সংঘাতের তিন মাসের বেশি সময় পার হলেও কে এগিয়ে রয়েছে তা স্পষ্টভাবে বলা কঠিন। কারণ যুক্তরাষ্ট্র এবং ইরান উভয়েই ভিন্ন ভিন্ন কৌশলগত লক্ষ্য নিয়ে যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে।
এমন অচলাবস্থার মধ্যেই ১১ জুন থেকে যুক্তরাষ্ট্র, মেক্সিকো ও কানাডায় শুরু হতে যাচ্ছে বিশ্বকাপ ফুটবলের ২৩তম আসর। রাজনৈতিক সংঘাত সত্ত্বেও ইরান সরকার তাদের ফুটবল দলকে যুক্তরাষ্ট্রে বিশ্বকাপ ম্যাচ খেলতে পাঠিয়েছে। প্রধান ক্যাম্প হিসেবে ইরান মেক্সিকোর তিহুয়ানা শহরকে বেছে নিলেও, গ্রুপ পর্বে তাদের তিনটি ম্যাচের ভেন্যু আমেরিকা। এর মধ্যে দুটি ম্যাচ হবে ক্যালিফোর্নিয়ায় এবং বাকি ম্যাচটির ভেন্যু হবে ওয়াশিংটন অঙ্গরাজ্য।
আরও পড়ুন: জাতিসংঘে মানবাধিকারভিত্তিক অর্থনৈতিক নীতিনির্ধারণের আহ্বান বাংলাদেশ
ফুটবলপ্রেমী এবং বিশ্লেষকদের মধ্যে এখন ব্যাপক আলোচনা চলছে, এই দুই ঐতিহাসিক প্রতিদ্বন্দ্বী কি এবারের বিশ্বকাপে কোনো পর্যায়ে মুখোমুখি হবে? আলাদা আলাদা গ্রুপে থাকা সত্ত্বেও আসরের নকআউট পর্বে এই দুই দলের মুখোমুখি হওয়ার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেয়া যায় না। অনেকেই এই সম্ভাব্য ম্যাচটিকে 'মাদার অব অল ম্যাচ' বলে আখ্যায়িত করছেন।
বাস্তবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মুখোমুখি হওয়ার সম্ভাবনা খুব বেশি নয়। তবে চলমান যুদ্ধ এবং ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে সম্ভাব্য ম্যাচটি ব্যাপক আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।
২০২৫ সালের ৫ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্বের ড্রয়ে, দুই দলকে আলাদা গ্রুপে রাখা হয়েছে। ইরান পড়েছে গ্রুপ ‘জি’-তে, যেখানে তাদের প্রতিপক্ষ বেলজিয়াম, মিশর এবং নিউজিল্যান্ড। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র রয়েছে গ্রুপ ‘ডি’-তে, যেখানে তাদের সঙ্গে আছে অস্ট্রিয়া, প্যারাগুয়ে ও তুরস্ক।
এজন্য গ্রুপপর্বে দুই দলের মুখোমুখি হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। তাদের দেখা হতে পারে শুধুমাত্র নকআউট পর্বে। সবচেয়ে বাস্তবসম্মত সম্ভাবনা হলো রাউন্ড অব ৩২। তবে এর জন্য উভয় দলকেই নিজেদের গ্রুপে রানার্স-আপ হতে হবে।
আরও পড়ুন: এবিজি ইউনিভার্সিটি কাপে আজ মুখোমুখি হচ্ছে কে-কার
ফিফার নকআউট ব্র্যাকেট বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, যদি যুক্তরাষ্ট্র গ্রুপ ডি-তে দ্বিতীয় হয় এবং ইরান গ্রুপ জি-তে দ্বিতীয় হয়, তাহলে টেক্সাসের আর্লিংটনে রাউন্ড অব ৩২ পর্বে তারা একে অপরের মুখোমুখি হবে।
অন্য একটি সম্ভাবনা হলো রাউন্ড অব ১৬-এ দুই দলের সাক্ষাৎ। এই ক্ষেত্রে সমীকরণ তুলনামূলক সহজ; দুই দলকেই নিজেদের গ্রুপে চ্যাম্পিয়ন হতে হবে। এরপর রাউন্ড অব ৩২-তে নিজেদের প্রতিপক্ষকে হারিয়ে পরবর্তী পর্বে যেতে হবে। যদি যুক্তরাষ্ট্র গ্রুপ ডি-এর শীর্ষে থাকে, তাহলে রাউন্ড অব ৩২-এর ম্যাচ ৮১-তে তারা গ্রুপ বি, ই, এফ, আই অথবা জে-এর কোনো তৃতীয়-স্থানধারী দলের মুখোমুখি হবে।
আর অন্যদিকে, ইরান যদি গ্রুপ জি-এর শীর্ষে থাকে, তাহলে ম্যাচ ৮২-তে তারা গ্রুপ এ, ই, এইচ, আই অথবা জে-এর কোনো তৃতীয়-স্থানধারী দলের বিপক্ষে ম্যাচ খেলবে। দুই দলই যদি নিজেদের ম্যাচ জিতে যায়, তাহলে রাউন্ড অব ১৬-এ বহু প্রতীক্ষিত যুক্তরাষ্ট্র–ইরান দ্বৈরথের মঞ্চ তৈরি হতে পারে।
যদিও গাণিতিক সম্ভাবনা বলছে কোয়ার্টার ফাইনালে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের দেখা হতে পারে, তবে এটি রাউন্ড অব ৩২ বা রাউন্ড অব ১৬-এর তুলনায় অনেক বেশি জটিল একটি সমীকরণ। এই ক্ষেত্রে দুই দলের অন্তত একটিকে রানার্স আপ এবং অপরটিকে তৃতীয় হয়ে নকআউট পর্বে আসতে হবে। উদাহরণস্বরূপ, যুক্তরাষ্ট্রকে গ্রুপ ডি-তে দ্বিতীয় স্থান অর্জন করতে হবে, আর ইরানকে সেরা তৃতীয়-স্থানধারী দলগুলোর একটি হিসেবে নকআউট পর্বে উঠে একই ব্র্যাকেটে আসতে হবে, যা যুক্তরাষ্ট্রের পাশে থাকবে।
আরও পড়ুন: জামায়াত নেতাদের ভারতীয় গোয়েন্দাদের সঙ্গে বৈঠকের দাবি, রাশেদকে চ্যালেঞ্জ
এরপর দুই দলকেই রাউন্ড অব ৩২ এবং রাউন্ড অব ১৬-এর ম্যাচ জিততে হবে। তাহলেই কোয়ার্টার ফাইনালে তাদের মুখোমুখি হওয়ার সুযোগ তৈরি হবে। অন্যদিকে, উল্টো পরিস্থিতি সম্ভব। সেক্ষেত্রে ইরানকে গ্রুপ জি-তে দ্বিতীয় হতে হবে এবং যুক্তরাষ্ট্রকে সেরা তৃতীয়-স্থানধারী দল হিসেবে নকআউট পর্বে উঠতে হবে। এরপর উভয় দল নিজেদের প্রথম দুই নকআউট ম্যাচ জিতলে কোয়ার্টার ফাইনালে তাদের দেখা হবে।
যুক্তরাষ্ট্র–ইরান অতীত লড়াই: যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান এ পর্যন্ত তিনবার মুখোমুখি হয়েছে। ১৯৯৮ বিশ্বকাপে প্রথম দেখায় ইরান ২-১ গোলে জয় পায়। ২০০০ সালে একটি প্রীতি ম্যাচে দুই দল ১-১ গোলে ড্র করে। ২০২২ কাতার বিশ্বকাপে যুক্তরাষ্ট্র ১-০ গোলে জিতে গ্রুপপর্ব থেকে ইরানকে বিদায় করে। ১৯৯৮ বিশ্বকাপে ম্যাচটি ছিল রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত স্পর্শকাতর। ১৯৭৯ সালের ইরান হস্টেজ ক্রাইসিসের দুই দশকেরও কম সময় পরে অনুষ্ঠিত হওয়ার কারণে, ম্যাচটিকে অনেক সংবাদমাধ্যম ও বিশ্লেষক ‘মাদার অব অল গেমস’ নামে অভিহিত করেছিল। কিন্তু রাজনৈতিক উত্তেজনার মাঝেও ইরানের খেলোয়াড়রা ম্যাচের আগে মার্কিন খেলোয়াড়দের হাতে সাদা ফুল তুলে দিয়েছিলেন, যা ছিল শান্তি এবং সৌহার্দ্যের একটি প্রতীক।
এই অনন্য ক্রীড়াসুলভ আচরণের জন্য যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান উভয় দলই ফিফার ফেয়ার প্লে পুরস্কার লাভ করেছিল। যুক্তরাষ্ট্রের হয়ে সেই ম্যাচটি খেলেছিলেন বাংলাদেশ জাতীয় ফুটবল দলের নতুন প্রধান কোচ থমাস ডুলি। ২০২৬ সালে কী অপেক্ষা করছে? ২০২৬ বিশ্বকাপে দুই দলেরই নকআউট পর্বে ওঠার সম্ভাবনা যথেষ্ট উজ্জ্বল। ফলে বহু প্রতীক্ষিত আরেকটি যুক্তরাষ্ট্র–ইরান দ্বৈরথের সম্ভাবনাও উড়ানো যাচ্ছে না।
এশিয়া থেকে ইরান নিয়মিতই বিশ্বকাপে জায়গা করে নিলেও কখনোই গ্রুপ পর্বের বাধা পার হতে পারে না। এবার টুর্নামেন্টের ফরম্যাটের কারণে সেই সম্ভাবনা বেশ উজ্জ্বল। অন্যদিকে স্বাগতিক যুক্তরাষ্ট্র তাদের তথাকথিত ‘গোল্ডেন জেনারেশন’ নিয়ে এবার অনেক দূর যাওয়ার স্বপ্ন দেখছে।
আরও পড়ুন: গাজীপুরে ছিনতাইকারীর ছুরিকাঘাতে গার্মেন্টস শ্রমিক কার্তিক নিহত
গ্রুপপর্ব শুরু হলে দুই দলের প্রকৃত শক্তি ও ফর্ম সম্পর্কে আরও পরিষ্কার ধারণা পাওয়া যাবে। তখনই বোঝা যাবে রাউন্ড অব ৩২, রাউন্ড অব ১৬ কিংবা কোয়ার্টার ফাইনালে বহুল আলোচিত যুক্তরাষ্ট্র–ইরান ম্যাচ সত্যিই বাস্তবে রূপ নেয় কি না।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন