০৪:৩৬ এম
কক্সবাজারের উখিয়ার ইনানীতে নলকূপ স্থাপনের সময় মাটির গভীর থেকে বের হওয়া গ্যাসে লাগা আগুন টানা চার দিন ধরে জ্বলছে। এখনো গ্যাসের নির্গমন বন্ধ হয়নি। ফলে দুর্ঘটনার আশঙ্কা বাড়ছে। পরিস্থিতি বিবেচনায় উপজেলা প্রশাসন ২০০ মিটারের মধ্যে মানুষের প্রবেশ ও অবস্থানে নিষেধাজ্ঞা দিয়ে ১৪৪ ধারা জারি করেছে।
গ্যাসের আগুন নেভানোর বিষয়ে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম এক্সপ্লোরেশন অ্যান্ড প্রোডাকশন কোম্পানি (বাপেক্স) ও পেট্রোবাংলা এখনই কোনো পদক্ষেপ নিচ্ছে না। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বক্তব্য, আপাতত পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা হবে। ১৫ দিন পর্যবেক্ষণের পর গ্যাসের নির্গমন ও আগুনের শিখার অবস্থা বিবেচনা করে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। পরিস্থিতির উন্নতি না হলে গ্যাসের প্রবাহ বন্ধ করতে রিলিফ কূপ খননের পরিকল্পনা রয়েছে।
গত কয়েক দিন ধরে ঘটনাস্থল পর্যবেক্ষণ করছেন বাপেক্সের ব্যবস্থাপক ও ভূতাত্ত্বিক জরিপ দলের দলনেতা এস এম নাফিকুন আরহামের নেতৃত্বে তিন সদস্যের একটি দল। শুক্রবার (৩০ অক্টোবর) ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন পেট্রোবাংলার পরিচালক (অপারেশন ও মাইনস) প্রকৌশলী মো. শোয়েব। তার সঙ্গে ছিলেন বাপেক্সের ভূতাত্ত্বিক বিভাগের মহাব্যবস্থাপক শামসিয়া মুকতাদিরসহ কয়েকজন কর্মকর্তা।
আরও পড়ুন: জাতীয় অগ্রগতির প্রধান চালিকাশক্তি যুবসমাজ : প্রধানমন্ত্রী
গ্যাসের আগুন নেভানোর বিষয়ে নিজেদের অবস্থান ব্যাখ্যা করেছেন বাপেক্স ও পেট্রোবাংলার শীর্ষ কর্মকর্তারা। বাপেক্সের ব্যবস্থাপক এস এম নাফিকুন আরহাম বলেন, "বর্তমান পরিস্থিতিতে বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোণ থেকে গ্যাস জ্বলতে দেওয়াই যুক্তিযুক্ত হতে পারে। তবে এ ক্ষেত্রে নিরাপত্তা নিশ্চিত করাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে।" তিনি আরও বলেন, গ্যাসের নির্গমন অব্যাহত থাকলে বিকল্প ব্যবস্থা হিসেবে রিলিফ কূপ খনন করে ভূগর্ভে সিমেন্ট পাম্প করার মাধ্যমে গ্যাসের প্রবাহ বিচ্ছিন্ন করার বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে।
তিনি উল্লেখ করেন, "এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ এবং সম্ভাব্য বিকল্পগুলো পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। এ জন্য সাত দিন পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের কথা বলা হয়েছে। এরপর পরিস্থিতি বিবেচনায় পরবর্তী পদক্ষেপ নির্ধারণ করা সহজ হবে।"
ঘটনাস্থল থেকে পাথর ও পানির নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে জানিয়ে এস এম নাফিকুন আরহাম বলেন, "আগুনের কারণে আপাতত গ্যাসের নমুনা সংগ্রহ করা সম্ভব হচ্ছে না। গ্যাস শুধু নলকূপ খননের স্থান দিয়ে বের হচ্ছে না, আশপাশের বিভিন্ন স্থান দিয়েও নির্গত হচ্ছে।"
তিনি আরও জানান, "সেখানে প্রায় এক হাজার ফুট গভীরতা পর্যন্ত বোরিং করা হয়েছিল। তবে খননের সময় গ্যাসের উপস্থিতি বোঝা যায়নি। মঙ্গলবার ভোর থেকে গ্যাসের অস্তিত্ব অনুভূত হয়। পরে তা আগুনের শিখা আকারে জ্বলতে শুরু করে। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, ভূগর্ভস্থ গ্যাসের আধার থেকে এ গ্যাস বের হচ্ছে।"
আরও পড়ুন: দেশের সব ইউনিয়নে খেলার মাঠ হবে: ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী
গ্যাসের উপাদান সম্পর্কে এই কর্মকর্তা বলেন, "প্রাকৃতিক গ্যাসে সাধারণত মিথেনের পাশাপাশি ইথেন, প্রোপেন, বিউটেন ও পেন্টেনের মতো হাইড্রোকার্বন থাকতে পারে। তবে এ গ্যাসের প্রকৃত উপাদান পরীক্ষাগারে বিশ্লেষণের পর নিশ্চিত হওয়া যাবে। আগুনের রং ও ধোঁয়ার ধরন দেখে উচ্চতর হাইড্রোকার্বনের উপস্থিতি থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।"
বাপেক্সের সহকারী ব্যবস্থাপক ইমামুল ইসলাম রোকন বলেন, "গ্যাস শনাক্ত করতে ডিটেক্টর নিয়ে ঘটনাস্থলে গিয়েছিলেন তারা। বাপেক্সের প্রোডাকশন ফিল্ডের একটি দল আশপাশের অন্য কোনো স্থান দিয়ে গ্যাস বের হচ্ছে কি না, তা-ও পরীক্ষা করেছে। তবে আগুন জ্বলতে থাকায় মূল নির্গমনস্থলে ডিটেক্টর দিয়ে গ্যাস শনাক্ত করা সম্ভব হচ্ছে না। আশপাশের বিভিন্ন স্থানে পরীক্ষা করেও অন্য কোথাও গ্যাস নির্গমনের অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি।"
ইমামুল ইসলাম রোকন যোগ করেন, "আগুনের প্রচণ্ড তাপের কারণে ঘটনাস্থলের কাছাকাছি গিয়ে গ্যাসের নমুনা সংগ্রহ করা যাচ্ছে না। প্রায় ২০ থেকে ২৫ ফুট দূর থেকেও প্রচণ্ড তাপ অনুভূত হচ্ছে। এ অবস্থায় আপাতত পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা ছাড়া তাদের আর কোনো উপায় নেই।"
বাপেক্সের ভূতাত্ত্বিক বিভাগের মহাব্যবস্থাপক শামসিয়া মুকতাদির বলেন, "এ ধরনের পরিস্থিতি মোকাবিলায় বাপেক্সের অভিজ্ঞতা ও সক্ষমতা রয়েছে। নিজেদের ব্যবস্থাপনাতেই পরিস্থিতি সামাল দেওয়া সম্ভব। তবে নিরাপত্তার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিতে হচ্ছে। কারণ, যেকোনো সময় অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।"
আরও পড়ুন: ভোলায় তথ্যমন্ত্রীর উদ্যোগে দিনব্যাপী ফ্রি মেডিকেল ক্যাম্প অনুষ্ঠিত
রিলিফ কূপ খননের পরিকল্পনা
পেট্রোবাংলার পরিচালক (অপারেশন ও মাইনস) প্রকৌশলী মো. শোয়েব বলেন, "বাপেক্স ও পেট্রোবাংলার কর্মকর্তাদের পাশাপাশি অবসরপ্রাপ্ত কয়েকজন মহাব্যবস্থাপককে নিয়ে বৃহস্পতিবার পেট্রোবাংলায় একটি সভা হয়। সেখানে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হয়েছে, নির্গত গ্যাসটি থার্মোজেনিক ও বায়োজেনিক প্রকৃতির হতে পারে। তবে আগুনের শিখার রং দেখে গ্যাসের সঙ্গে তেল বা কনডেনসেট থাকার বিষয়টিও অনুমান করা হচ্ছে।"
তিনি জানান, "আগুনের শিখার প্রকৃত অবস্থা পর্যবেক্ষণ করতে শুক্রবার রাতে তারা ঘটনাস্থলে যান। সেখানে আগুনের শিখার রং কালো দেখা গেছে। এটি গ্যাসের সঙ্গে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ তেল বা কনডেনসেট নির্গমনের ইঙ্গিত দিতে পারে। বাপেক্সের কর্মকর্তারা কয়েক দিন ধরে ঘটনাস্থলে কাজ করছেন। তাদের কাছ থেকে নিয়মিত পরিস্থিতির প্রতিবেদন নেওয়া হচ্ছে। প্রতিবেদন পর্যালোচনায় দেখা যাচ্ছে, আগুনের শিখা ক্রমেই বাড়ছে।"
মো. শোয়েব আরও বলেন, "প্রাথমিক পর্যবেক্ষণে ধারণা করা হচ্ছে, আগুনের উৎস একটি অগভীর গ্যাসের মজুত বা শ্যালো রিজার্ভার। দেশে সাধারণত ভূগর্ভের দেড় থেকে পাঁচ কিলোমিটার গভীরে গ্যাসের মজুত পাওয়া যায়। তবে এ ক্ষেত্রে গ্যাসের উৎস ও প্রকৃত পরিমাণ সম্পর্কে নিশ্চিত হতে ১৫ দিন পর্যবেক্ষণ করা হবে। এ সময় আগুনের শিখার উচ্চতা ও গ্যাস নির্গমনের পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হবে।"
আরও পড়ুন: সংগঠিত ও দক্ষ যুবসমাজ দেশের মূল্যবান সম্পদ : রাষ্ট্রপতি
পেট্রোবাংলার এই কর্মকর্তা বলেন, "১৫ দিন পর্যবেক্ষণের পর আগুনের শিখার উচ্চতা বেড়েছে বা একই রকম রয়েছে বলে দেখা গেলে আগুন বন্ধ করার জন্য প্রাথমিকভাবে একটি রিলিফ কূপ খননের পরিকল্পনা করা হবে। এ ক্ষেত্রে সাইড ট্র্যাকিং প্রযুক্তি ব্যবহার করে রিলিফ কূপ খননের মাধ্যমে গ্যাসের নির্গমন বন্ধ করার চেষ্টা করা হবে। বিশ্বব্যাপী এ ধরনের পরিস্থিতি মোকাবিলায় এ প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়।"
তবে পর্যবেক্ষণের সময় গ্যাসের প্রবাহ কমে গেলে বা বন্ধ হয়ে গেলে পরিস্থিতি অনুযায়ী পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে বলে জানান তিনি।
মো. শোয়েব বলেন, "আশপাশের কয়েকটি ভূতাত্ত্বিক স্তর থেকেও গ্যাস জ্বলতে দেখা গেছে। ভূগঠনে কিছু পরিবর্তনের কারণে এভাবে গ্যাস নির্গমন হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। পরবর্তী সময়ে বাপেক্স সেখানে ত্রিমাত্রিক (থ্রিডি) ভূকম্পন জরিপ পরিচালনা করবে। জরিপের তথ্য বিশ্লেষণ করে গ্যাসের মজুতের সম্ভাবনা যাচাই করা হবে। সেখানে অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক গ্যাসের মজুত পাওয়া গেলে নতুন কূপ খননের উদ্যোগ নেওয়া হবে।
টানা চার দিন ধরে গ্যাসের আগুন জ্বলতে থাকায় ইনানী ছোট খাল ও শফিরবিল এলাকার প্রায় ৪০০ পরিবারের মধ্যে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। একদিকে গ্যাসের উৎস ও প্রবাহ সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়ার অপেক্ষা, অন্যদিকে নিরাপত্তাঝুঁকি উপেক্ষা করে ঘটনাস্থলে মানুষের ভিড়-দুই পরিস্থিতিই সামাল দিতে হচ্ছে প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে।
আরও পড়ুন: নোবিপ্রবিতে ইনকিলাব মঞ্চের ‘মার্চ ফর ইনসাফ’ কর্মসূচি অনুষ্ঠিত
স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, সম্ভাব্য দুর্ঘটনা এড়াতে জনসচেতনতা বাড়ানোর পাশাপাশি নিরাপত্তাব্যবস্থা কঠোরভাবে কার্যকর করা জরুরি।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন