০৮:৪৭ পি.এম
ভারতের বিরোধী দলগুলোর শীর্ষ নেতারা শনিবার (৩১ অক্টোবর) ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) প্রক্রিয়ায় কথিত কারচুপির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতে গিয়ে মুখ্য নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) জ্ঞানেশ কুমারকে ‘ভ্যানিশ কুমার’ আখ্যা দেন। তাঁরা ‘দিল কা হাল সুনে দিলওয়ালা’ গানের স্মরণে ক্ষোভ প্রকাশ করেন।
রাজাজি মার্গে অবস্থিত সিইসি জ্ঞানেশ কুমারের বাসভবনের সামনে অনুষ্ঠিত এই ‘জনসমক্ষে অভিশংসন’ অনুষ্ঠানে কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়গে মূল প্রস্তাবটি উত্থাপন করেন। বিচারিক এই প্রতীকী আয়োজনে সভাপতিত্ব করেন লোকসভার সাবেক স্পিকার মীরা কুমার।
খাড়গে সিইসির বিরুদ্ধে একের পর এক অভিযোগ উপস্থাপন করে দেশদ্রোহিতার মতো মারাত্মক অভিযোগ তোলেন। তিনি অবিলম্বে সিইসি-র অপসারণ, ২০২৩ সালের বিতর্কিত নির্বাচন কমিশনার নিয়োগ আইন বাতিল এবং চলমান ‘বিশেষ নিবিড় সংশোধন’ (এসআইআর) কার্যক্রম বন্ধের দাবি জানান।
আরও পড়ুন: কাশ্মীরের মুখ্যমন্ত্রী ওমর আবদুল্লাহর বিয়ে, কনে নিধি রাজদান
রাজ্যসভার বিরোধীদলীয় নেতা অভিযোগ করেন যে, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের প্রত্যক্ষ নির্দেশে সিইসি জ্ঞানেশ কুমার নির্বাচন কমিশন পরিচালনা করছেন। খাড়গে বলেন, "আজ দেশের প্রতিটি নাগরিকের ভোটাধিকার চরম হুমকির মুখে। কারণ সিইসি জ্ঞানেশ কুমার মোদী ও শাহের ইশারায় নির্বাচন কমিশন চালাচ্ছেন।"
তিনি আরও জানান, সংসদ সদস্য হিসেবে তাঁরা লোকসভা ও রাজ্যসভা উভয় কক্ষে সিইসি-র অপসারণের জন্য নোটিশ দিয়েছিলেন, কিন্তু তাঁদের আবেদনগুলো বাতিল বা প্রত্যাখ্যান করা হয়।
কংগ্রেস সভাপতি উল্লেখ করেন যে, সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের মর্যাদা রক্ষার স্বার্থেই এই প্রতীকী অভিশংসন প্রস্তাব আনা হয়েছে। তিনি বলেন, "সিইসির সাথে আমাদের কোনো ব্যক্তিগত শত্রুতা নেই। আমরা চাই নির্বাচন কমিশন নিরপেক্ষভাবে কাজ করুক। দিল্লিতে বসে কম্পিউটারের বোতাম চেপে স্বৈরাচারী উপায়ে কারো ভোট কেটে ফেলার অধিকার কাউকেই দেওয়া উচিত নয়।"
বর্তমান ক্ষমতাসীনদের প্রতি কটাক্ষ করে খাড়গে বলেন, "ক্ষমতায় টিকিয়ে রাখতে মোদী সরকার সবই করেছে: ‘সংসদ চুরি’, ‘দল চুরি’, ‘ইলেক্টোরাল বন্ড’ এবং এখন শুরু করেছে সরাসরি ‘ভোট চুরি’।" তিনি অভিযোগ করেন, ‘মুখ্য নির্বাচন কমিশনার এবং অন্যান্য নির্বাচন কমিশনার (নিয়োগ, সেবার শর্তাবলী এবং মেয়াদের সময়সীমা) আইন, ২০২৩’-এর কারণে সিইসি এ ধরনের বেপরোয়া পদক্ষেপে ভরসা পাচ্ছেন। এই আইনটি নির্বাচন কমিশন প্রধানকে আইনি সুরক্ষা দিয়েছে, যা সাধারণ প্রক্রিয়ায় খর্ব করা কঠিন।
আরও পড়ুন: দিল্লির জামিয়া যেন পুলিশ ক্যাম্পের মতো পরিস্থিতি
তিনি উল্লেখ করেন যে, বিরোধী দলের ১৪৫ জন সংসদ সদস্যকে সংসদ থেকে বরখাস্ত করে এই বিতর্কিত আইনটি পাস করা হয়েছিল। এটি অত্যন্ত লজ্জাজনক। যারা দেশের স্বার্থে কাজ করছিলেন তাঁদের বাইরে রেখে এই আইন পাস করা হয়। এই আইন সিইসিকে এমন এক আইনি সুরক্ষা দিয়েছে যা এমনকি ভারতের রাষ্ট্রপতি বা প্রধানমন্ত্রীরও নেই।
পরবর্তীতে মল্লিকার্জুন খাড়গে তাঁর ‘এক্স’ (সাবেক টুইটার) অ্যাকাউন্টে সিইসির বিরুদ্ধে ৬টি প্রধান অভিযোগ তালিকাভুক্ত করেন। সেগুলো হলো নির্বাচন চুরির ষড়যন্ত্র করা, প্রায় ১৩.২ কোটি ভোটারের নাম তালিকা থেকে মুছে ফেলা, সংসদের অনুমোদন ছাড়াই ভোটার ফর্ম-৬ পুনর্লিখন, ‘ইসিআইনেট’ ব্যবস্থার মাধ্যমে ভোটার তালিকা জিম্মি করা, অন্য দুই নির্বাচন কমিশনারকে সিদ্ধান্ত গ্রহণ থেকে দূরে রাখা বা নিষ্ক্রিয় করা এবং মোদী ও শাহের ইশারায় বা নির্দেশে কাজ করা।
সমাবেশের মঞ্চটিকে ঠিক লোকসভার মতো করে সাজানো হয়েছিল—পেছনে কাঠের প্যানেলিং এবং অর্ধচন্দ্রাকারে আসন বিন্যাস করা হয়। প্রথম তিন সারির আসনের সামনে আলাদা মাইক্রোফোনও স্থাপন করা হয়েছিল।
‘এমএসজি (মোদী-শাহ-জ্ঞানেশ) জোট’
আরও পড়ুন: হতাশা আর ক্ষোভ থেকে যেভাবে বদলে গেল ইসরায়েলের রাজনীতির সমীকরণ
তৃণমূল কংগ্রেসের (টিএমসি) সংসদ সদস্য সাগরিকা ঘোষ সিইসি জ্ঞানেশ কুমারকে 'ভ্যানিশ কুমার' বলে কটাক্ষ করেন, যিনি নিমেষেই মানুষের ভোট গায়েব বা 'ভ্যানিশ' করে দেন। তিনি বর্তমান কেন্দ্রীয় সরকারকে ‘মোদী-শাহ-জ্ঞানেশ (এমএসজি) জোট’ হিসেবে আখ্যায়িত করেন এবং অবিলম্বে সিইসি-র পদত্যাগ দাবি করেন। একইভাবে মঞ্চে উপস্থিত প্রতিটি বিরোধী দলের নেতাই কেন্দ্র সরকার এবং সিইসির ‘ভোট চুরি’ ব্যবস্থার তীব্র সমালোচনা করেন।
ভুক্তভোগী সাধারণ মানুষের ক্ষোভ
অনুষ্ঠানে অনিতা জয়সোয়াল নামের এক একক মা তাঁর অভিজ্ঞতা তুলে ধরে বলেন, তিনি বহু বছর ধরে নিয়মিত ভোট দিয়ে আসছেন, কিন্তু হঠাৎ করেই দেখেন তালিকা থেকে তাঁর নাম মুছে দেওয়া হয়েছে। তিনি ক্ষোভের সাথে প্রশ্ন তোলেন, "আমাকে দেওয়ার মতো যখন আপনাদের কিছুই নেই, তখন আমার পরিচয় বা ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়ার অধিকার আপনাদের কে দিয়েছে?"
এমকেএসএস-এর নিখিল দে মঞ্চে নিয়ে আসেন কান্ত প্রসাদ নামের এক প্রবীণ নাগরিককে, যাঁকে খসড়া তালিকায় 'মৃত' হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। কান্ত প্রসাদ জনসমক্ষে দাঁড়িয়ে বলেন, একটি 'জন শুনানি'তে গিয়ে তিনি জানতে পারেন যে খাতায়-কলমে তিনি আর জীবিত নেই! পরে বিএলও এসে তাঁর কাছ থেকে নতুন ভোটারদের জন্য প্রযোজ্য ‘ফর্ম-৬’ পূরণ করিয়ে নেন, অথচ তিনি বিগত ৩৫ বছর ধরে দিল্লির মঙ্গলপুরী থেকে ভোট দিয়ে আসছেন।
আরও পড়ুন: আলোচনা উদ্যোগকে স্বাগত, তবে যুদ্ধের আশঙ্কা অস্বীকার করছে না আরাগচি : ইরান
একইভাবে ময়ূর বিহারের বাসিন্দা মায়া দেবী জানান, তাঁর বস্তি ভেঙে উচ্ছেদ করা হয়েছে। তাঁর কাছে আধার কার্ড, প্যান কার্ড এবং ব্যাংক অ্যাকাউন্ট সবই আছে, কেবল নতুন করে আর ভোটার আইডি কার্ড পাওয়া যাচ্ছে না।
আগামীকাল ১ নভেম্বর দিল্লির ঐতিহ্যবাহী রামলীলা ময়দানে বিরোধী ‘ইন্ডিয়া’ জোটের বিশাল মহাসমাবেশ অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। সিইসি-র বিরুদ্ধে চলমান এই আন্দোলনের অংশ হিসেবে এই প্রতীকী ‘অভিশংসন’-এর আয়োজন করা হয়। ১ নভেম্বরের মহাসমাবেশে ‘কাকরোজ জনতা পার্টি’সহ বেশ কয়েকটি নাগরিক সংগঠন ও দল সমর্থন ঘোষণা করেছে।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন