১০:৩৩ পি.এম
ইরানের যুদ্ধের ফলশ্রুতিতে গত তিন মাস ধরে কার্যত অচল হয়ে পড়েছে বিশ্ব জ্বালানি বাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রুট হরমুজ প্রণালী। এর ফলে ইতিহাসে অন্যতম বড় জ্বালানি সরবরাহ সংকট সৃষ্টি হয়েছে বিশ্বজুড়ে। তবে বিষয়টি বিস্ময়ের, কেন তেলের বাজার এখনও তুলনামূলকভাবে শান্ত রয়েছে? এটি যেন বর্তমানে বিশ্ব অর্থনীতির অন্যতম বড় ধাঁধা হয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে গত তিন মাস ধরে সংঘাত শুরু হয়ে আছে। এই সংঘাতের কারণে ইরান হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দিয়েছে। সাথে যুক্ত হয়েছে মার্কিন নৌ অবরোধও। যদিও হরমুজ প্রণালী কার্যত অচল হয়ে পড়েছে, আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম আশঙ্কাজনকভাবে বাড়েনি।
মার্কিন বিনিয়োগ ব্যাংক জেপি মরগানের পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে, যুদ্ধের সময়ের তুলনায় এই পথে একদম দৃশ্যমান জাহাজ চলাচল মাত্র ১৫ শতাংশে নেমে এসেছে।
আরও পড়ুন: ৯ শিক্ষকের বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী উপস্থিতি ১১ জন
কিন্তু আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম এখনও বড় ধরনের সংকটের পর্যায়ে পৌঁছাতে পারেনি। বিশ্লেষকদের মতে, এর পেছনে সম্ভবত একটি কারণ হলো, হরমুজ প্রণালীর ওপর আরোপিত কঠোর নিয়ন্ত্রণের মধ্যেও কিছু পরিমাণ তেল গোপনে কিংবা নজর এড়িয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে।
গোপন প্রবাহ বাজারের ধাক্কা সামলাচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, কিছু তেলবাহী জাহাজ শনাক্তকরণ ব্যবস্থা বন্ধ করে নজরদারি এড়িয়ে হরমুজ প্রণালী পার হয়ে যাচ্ছে। এসব তেল পরিবহণকে বলা হচ্ছে ‘ক্ল্যান্ডেস্টাইন ফ্লো’ বা গোপন প্রবাহ।
জেপি মরগানের তথ্য অনুযায়ী, মে মাসের শেষ দুই সপ্তাহে প্রতিদিন আনুমানিক ২১ লাখ ব্যারেল তেল এভাবে পরিবহণ হয়েছে। যদিও যুদ্ধের আগে হরমুজ প্রণালী দিয়ে প্রতিদিন প্রায় ১ কোটি ৫৬ লাখ ব্যারেল তেল যেতো। এই পরিমাণ সামান্য হলেও এটি বৈশ্বিক বাজারে চাপ কমানোর জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।
জেপি মরগানের বৈশ্বিক পণ্যবাজার কৌশল বিভাগের প্রধান নাতাশা কানেভা এক নোটে লিখেছেন, “নৌ অবরোধ ও বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের বড় পতনের পরও আশ্চর্যজনক পরিমাণ অপরিশোধিত তেল ও পেট্রোলিয়াম পণ্য এখনও হরমুজ প্রণালী দিয়ে পার হয়ে যাচ্ছে।”
আরও পড়ুন: জুলাই সনদ বাস্তবায়ন হলে লংমার্চ-রোডমার্চের অস্তিত্ব থাকবে না: জামায়াত সেক্রেটারি
র্যাপিডান এনার্জি গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রেসিডেন্ট বব ম্যাকন্যালি বলেছেন, গোপন তেল পরিবহন সংকটকে কিছুটা বিলম্বিত অথবা কম তীব্র করতে পারে। তিনি বলেন, “আমরা ধারণা করেছিলাম যুদ্ধের পর হরমুজ দিয়ে তেল পরিবহন শূন্য থেকে ১০ শতাংশে নেমে আসবে। কিন্তু এই গোপন প্রবাহের কারণে প্রকৃত পরিমাণ একটু বেশি হতে পারে।”
তবে তিনি সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, প্রাণঘাতী সংকটটা পুরোপুরি এড়ানোর মতো যথেষ্ট নয়, বরং এটি কেবল বাজারের ওপর চাপ কমাচ্ছে।
পাইপার স্যান্ডলারের বৈশ্বিক জ্বালানি অর্থনীতিবিদ ও কৌশলবিদ জান স্টুয়ার্টের হিসাব অনুযায়ী, মে মাসে প্রতিদিন প্রায় ২৯ লাখ ব্যারেল তেল হরমুজ প্রণালী দিয়ে বের হয়ে গেছে। এর মধ্যে প্রায় ২১ লাখ ব্যারেল এমন জাহাজ বহন করেছে, যেগুলো ইরানি প্রতিষ্ঠানের কাছে ফি দিয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। অন্যদিকে, প্রায় ৯ লাখ ব্যারেল ছিল ‘ভূতের মতো’ পরিবহন- অর্থাৎ ট্রান্সপন্ডার বন্ধ রেখে অন্ধকারে চলাচল করা জাহাজ।
স্টুয়ার্ট বলেন, “এই গোপন প্রবাহ সংকট মোকাবিলায় সাহায্য করছে। বাস্তবে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখার সক্ষমতা আমার প্রত্যাশার চেয়ে বেশি দেখা যাচ্ছে।”
আরও পড়ুন: ডিসেম্বরে হাসিনার ফেরার গুঞ্জন নিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর মন্তব্য
আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের মানদণ্ড ব্রেন্ট ক্রুডের দাম শুক্রবার ব্যারেলপ্রতি ৯৩ ডলারে নেমে এসেছে। যুদ্ধের আগে যেখানে দাম ছিল ৭০ ডলার, সেখানে এটি বেশি হলেও সাম্প্রতিক সর্বোচ্চ ১১৪ ডলারের তুলনায় কম।
তবে বাজারের স্থিতিশীলতার পেছনে গোপন তেল পরিবহন একমাত্র কারণ নয়। পাইপার স্যান্ডলারের মতে, প্রতিদিন প্রায় ৪৫ লাখ ব্যারেল তেল পারস্য উপসাগর থেকে বিকল্প পথে বের হচ্ছে। এর বড় অংশ সৌদি আরবের ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইনের মাধ্যমে পাঠানো হচ্ছে, যা দেশটির তেল ক্ষেত্রগুলোকে লোহিত সাগরের ইয়ানবু বন্দরের সঙ্গে যুক্ত করছে।
এছাড়া, বিশ্বের অন্যতম সবচেয়ে বড় জ্বালানি ব্যবহারকারী দেশ চীন তেল আমদানি কমাচ্ছে এবং নিজেদের বড় মজুত থেকে চাহিদা পূরণ করছে। এর ফলে বৈশ্বিক বাজারে সরবরাহ সংকটের চাপ কিছুটা কমেছে।
জেপি মরগানের কানেভা বলেছেন, চাহিদা কমে যাওয়া এবং প্রত্যাশার চেয়ে বেশি মজুত পরিস্থিতি সামাল দিতে ভূমিকা রাখছে। তার মতে, প্রতি ব্যারেল তেলের দাম ১০০ ডলারের কাছাকাছি থাকা মানে সংকট ছোট নয়; বরং বাজার ব্যয়বহুল উপায়ে পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নিচ্ছে।
আরও পড়ুন: মেট্রোরেল স্টেশনগুলোতে আধুনিক নিরাপত্তা সরঞ্জাম স্থাপন করবে ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট
যদিও কিছু জ্বালানি বিশেষজ্ঞ মনে করছেন, বর্তমান বাজার বিকল্প ব্যবস্থার কারণে প্রকৃত ঝুঁকি পুরোপুরি বুঝতে পারছে না। যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর বাণিজ্যিক তেলের মজুত দ্রুত কমেছে। যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত তেল মজুত ১৯৮০-এর দশকের পর সর্বনিম্ন স্তরের দিকে যাচ্ছে।
জান স্টুয়ার্ট সতর্ক করে বলেছেন, “পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে যাচ্ছে।” তিনি পূর্বাভাস দিয়েছেন, জুলাই ও আগস্টে ব্রেন্ট তেলের গড় দাম ব্যারেলপ্রতি ১৩০ ডলারের ওপর উঠতে পারে। যদি এমনটি ঘটে, তাহলে যুক্তরাষ্ট্রে গ্যাসের দাম প্রতি গ্যালন ৫ ডলারের বেশি হতে পারে, যেখানে বর্তমানে তা প্রায় ৪ দশমিক ২০ ডলার।
স্টুয়ার্টের মতে, আরও জরুরি তেল ছাড়তে এবং বিশ্বব্যাপী জ্বালানি ব্যবহার কমাতে হলে তেলের দাম দ্রুত বাড়ার প্রয়োজন হতে পারে। তিনি মন্তব্য করেছেন, “মানুষকে পরিবর্তনে রাজি করাতে হবে। আর দাম বেশি হলে সেটি করা অনেক সহজ হয়।”
বিশেষজ্ঞদের মতে, হরমুজ প্রণালীর বর্তমান অবস্থান সাময়িকভাবে বাজারকে স্থিতিশীল করে রাখলেও, দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত হলে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে বড় ধাক্কা আসার ঝুঁকি রয়ে যাচ্ছে। সূত্র: সিএনএন
আরও পড়ুন: সরকারের ব্যর্থতা বিরোধীদের ওপর চাপাবেন না: ডা. শফিকুর রহমান
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন