০১:০৬ এম
বিশ্বকাপ ফুটবলের উন্মাদনায় যখন পুরো দেশ ভাসছে, তখন নীরবে তৈরি হচ্ছে বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনের নতুন একটি ইতিহাস। কক্সবাজারের দুই সার্ফার মোহাম্মদ মান্নান ও ফাতেমা আক্তার প্রথমবারের মতো এশিয়ান গেমসের মঞ্চে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করতে যাচ্ছেন। যদিও আন্তর্জাতিক আসরের দিকে লক্ষ্য রেখে উন্নত প্রশিক্ষণের অভাব এখনও একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাংলাদেশ সার্ফিং অ্যাসোসিয়েশন জানিয়েছে, অ্যাথলেটদের বিদেশে প্রশিক্ষণের জন্য পাঠানোর পরিকল্পনা থাকলেও স্পন্সর না পাওয়ায় এটি এখনও বাস্তবায়িত হয়নি।
কক্সবাজারের সার্ফার ফাতেমা আক্তার প্রথমবারের মতো এশিয়ান গেমসের মঞ্চে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করতে যাচ্ছেন।
আরও পড়ুন: নাটোরে জুয়া ও হ্যাকিং চক্রের ৬ সদস্য গ্রেপ্তার
সমুদ্রের ঢেউয়ের সঙ্গে প্রতিদিন লড়াই করে মান্নান ও ফাতেমা। ভোরের আলো ফোটার আগেই কক্সবাজার সৈকতে তাদের প্রস্তুতি শুরু হয়। তারা বাংলাদেশের সার্ফিংয়ের উজ্জ্বল মুখ। এবার এশিয়ান গেমসে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করার সুযোগ পেয়েছেন তারা। আগামী সেপ্টেম্বর মাসে জাপানের মাটিতে দেশের পতাকা বহন করবেন এই দুই তরুণ সার্ফার।
সার্ফার ফাতেমা আক্তার বলেন, ‘২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে আমরা জাপানে একটি আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে যাব। সেই লক্ষ্যকে সামনে রেখে এখন থেকেই আমাদের কঠোর অনুশীলন চালিয়ে যেতে হবে। আমাদের কোচ রাশেদ ভাই প্রতিদিন সকাল-বিকেল অনেক পরিশ্রম করে আমাদের সাহায্য করছেন, যাতে আমরা নিজেদের পারফরম্যান্স আরও উন্নত করতে পারি। আমরা আশা করি, জাপানে গিয়ে দেশের জন্য ভালো কিছু অর্জন করব। কিন্তু সেখানে ঢেউ অনেক বড়, আর আমাদের দেশে তুলনামূলকভাবে ছোট ঢেউয়ে অনুশীলন করতে হয়। তাই সুযোগ পেলে প্রতিযোগিতার আগে দুই সপ্তাহ বা এক মাসের জন্য আমরা এমন কোনো দেশে গিয়ে অনুশীলন করতে চাই, যেখানে বড় ঢেউয়ে নিয়মিত প্রশিক্ষণের সুযোগ আছে। এতে আমাদের দক্ষতা ও আত্মবিশ্বাস দুটোই বেড়ে যাবে।
এদিকে, আমাদের দেশের অনেক মানুষ এখনও সার্ফিং সম্পর্কে তেমন জানেন না। আমরা চাই, সার্ফিংও অন্য জনপ্রিয় খেলার মতো সবার কাছে পরিচিত ও সমাদৃত হোক। দেশের মানুষ যদি আমাদের সমর্থন করে, উৎসাহ দেয় এবং পাশে থাকে, তাহলে আমরা আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আরও ভালো ফল করতে পারব। আমাদের স্বপ্ন হলো, একদিন সার্ফিং বাংলাদেশের একটি জনপ্রিয় খেলায় পরিণত হবে।’
যদিও স্বপ্ন বড়, কিন্তু প্রস্তুতির পথটা সহজ নয়। বাংলাদেশে সার্ফিংয়ের জন্য আন্তর্জাতিক মানের ঢেউ কিংবা আধুনিক প্রশিক্ষণ সুবিধা নেই বললেই চলে। এশিয়ার সেরা ক্রীড়াবিদদের বিপক্ষে লড়তে হলে দরকার উন্নত পরিবেশে অনুশীলন। আর সেই কারণে বিদেশে প্রশিক্ষণ ক্যাম্পের দাবি সার্ফারদের।
আরও পড়ুন: পরিবেশ দূষণ রোধ, প্লাস্টিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে Helping Hand Foundation কার্যক্রম অনুষ্ঠিত
সার্ফার মো. মান্নান বলেন, ‘আমরা আগামী সেপ্টেম্বরে জাপানে যাব। প্রতিযোগিতার নির্ধারিত তারিখ ১৬ সেপ্টেম্বর, তবে তার আগেই সেখানে যাওয়ার চেষ্টা করব, যাতে পরিবেশ ও ঢেউয়ের সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারি। কারণ জাপানের সার্ফিং পরিস্থিতি এবং অনুশীলনের ধরন আমাদের দেশের তুলনায় অনেক ভিন্ন।’
তিনি বলেন, ‘প্রস্তুতির কথা বললে, বিশেষ কোনো প্রশিক্ষণ কর্মসূচি এখনও আয়োজন করা হয়নি। আমরা নিয়মিত সমুদ্রে অনুশীলন করছি, কিন্তু এত বড় একটি আন্তর্জাতিক আসরের জন্য আরও পরিকল্পিত ও উন্নত মানের প্রশিক্ষণের প্রয়োজন রয়েছে।’
মান্নান আরও বলেন, ‘আমরা আশা করি, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ও পৃষ্ঠপোষকদের সহযোগিতায় ভালো প্রস্তুতি নিতে পারব এবং জাপানে গিয়ে দেশের জন্য সম্মানজনক ফলাফল অর্জন করতে সক্ষম হব। শুধু খেলোয়াড় নন, তাদের সামর্থ্যের ওপর আস্থা রয়েছে কোচেরও। আমাদের কোচ বলছেন, সঠিক প্রশিক্ষণ ও আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা পেলে বাংলাদেশের সার্ফাররা এশিয়ান গেমসেই নয়, একদিন অলিম্পিকের মঞ্চেও দেশের প্রতিনিধিত্ব করতে পারবেন।’
সার্ফিং কোচ রাশেদ আলম বলেন, ‘এশিয়ান গেমসে অংশগ্রহণের আগে যদি আমাদের সার্ফারদের জন্য ইন্দোনেশিয়ায় অন্তত ১০ দিন থেকে দুই সপ্তাহের একটি প্রশিক্ষণ ক্যাম্পের ব্যবস্থা করা যায়, তাহলে তারা আরও ভালোভাবে প্রস্তুতি নিতে পারবে। আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, সঠিক দিকনির্দেশনা ও প্রশিক্ষণ পেলে আমাদের সার্ফাররা এশিয়ান গেমসে চমৎকার পারফরম্যান্স দেখাবে। তাদের মধ্যে যে দক্ষতা ও সম্ভাবনা আমি দেখছি, তা সত্যিই আশাব্যঞ্জক। বাংলাদেশের লাল-সবুজের পতাকাকে এশিয়ান গেমস থেকে শুরু করে অলিম্পিকের মঞ্চ পর্যন্ত পৌঁছে দেয়ার সামর্থ্য তাদের রয়েছে। সেই স্বপ্ন ও বিশ্বাস আমি তাদের মধ্যেই দেখতে পাচ্ছি।’
আরও পড়ুন: টাঙ্গাইলের নাগরপুরে মা"দক বি"রোধী অ"ভিযানে ৩ মা"দক কারবারি গ্রে"ফতার, বিভিন্ন মেয়াদে সা"জা প্রদান..
তবে এই স্বপ্নের পথে সবচেয়ে বড় বাধা হচ্ছে অর্থসংকট। বাংলাদেশ সার্ফিং অ্যাসোসিয়েশন বলছে, অ্যাথলেটদের বিদেশে প্রশিক্ষণ পাঠানোর পরিকল্পনা থাকলেও স্পন্সর না পাওয়ায় সেটি এখনও বাস্তবায়ন সম্ভব হচ্ছে না। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কাছে পৃষ্ঠপোষকতার আবেদন জানানো হলেও এখন পর্যন্ত কাঙ্ক্ষিত সাড়া মেলেনি।
বাংলাদেশ সার্ফিং অ্যাসোসিয়েশনের কোষাধ্যক্ষ মো. সাইফুল্লাহ সিফাত বলেন, বিষয়টি সরাসরি বাংলাদেশ অলিম্পিক অ্যাসোসিয়েশন (বিওএ) তত্ত্বাবধান করছে। তবে এখনো তাদের পক্ষ থেকে নির্দিষ্ট কোনো তারিখ জানানো হয়নি, কবে থেকে আনুষ্ঠানিক যাত্রা বা কার্যক্রম শুরু হবে।
তিনি জানান, নির্বাচিত অ্যাথলেটরা নিজেদের প্রস্তুতি ধরে রাখতে নিয়মিত অনুশীলন চালিয়ে যাচ্ছে। পাশাপাশি বাংলাদেশ অলিম্পিক অ্যাসোসিয়েশনের নির্ধারিত মানদণ্ড অনুযায়ী যে তালিকা জমা দেয়ার কথা ছিল, তা ইতোমধ্যে তাদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। এছাড়া পোশাক-পরিচ্ছদসহ অন্যান্য আনুষ্ঠানিক বিষয়ে পরবর্তীতে নির্দেশনা দেয়া হবে বলে জানানো হয়েছে।
সাইফুল্লাহ সিফাত বলেন, ‘আমরা এখনও বাংলাদেশ অলিম্পিক অ্যাসোসিয়েশনের চূড়ান্ত নির্দেশনার অপেক্ষায় রয়েছি। তবে সামনে প্রায় চার মাস সময় থাকায় আমরা আশাবাদী।’
আরও পড়ুন: দিনাজপুর সীমান্তে বিজিবির অভিযানে ১ হাজার ৬শ’ ৩ পিস ভারতীয় মাদক উদ্ধার
তিনি আরও বলেন, ‘অর্থসংকটের কারণে এখনও অ্যাথলেটদের উন্নত মানের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা সম্ভব হচ্ছে না। এ জন্য অ্যাসোসিয়েশনের পক্ষ থেকে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কাছে স্পন্সরশিপের প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে, কিন্তু এখনো কোনো ইতিবাচক সাড়া আসেনি।
‘যদি আমরা স্পন্টসর পাই, তাহলে নির্বাচিত অ্যাথলেটদের উন্নত মানের ঢেউয়ে অনুশীলনের জন্য পার্শ্ববর্তী দেশ যেমন ইন্দোনেশিয়া বা শ্রীলঙ্কায় নিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে, যাতে আন্তর্জাতিক মানের পরিবেশে প্রশিক্ষণ নিয়ে তারা নিজেদের আরও ভালোভাবে প্রস্তুত করতে পারে’, যোগ করেন তিনি।
ফুটবলের বিশ্বকাপ কিংবা ক্রিকেটের আলোচনার ভিড়ে হয়তো তাদের গল্প খুব বেশি শোনা যায় না। তবে কক্সবাজারের এই দুই তরুণ—তরুণী প্রতিদিন সমুদ্রের ঢেউকে সঙ্গী করে বুনছেন বাংলাদেশের নতুন এক স্বপ্ন। যে স্বপ্ন একদিন লাল—সবুজের পতাকাকে পৌঁছে দিতে পারে এশিয়ান গেমস থেকে অলিম্পিকের মঞ্চ পর্যন্ত।
আরও পড়ুন: কালকিনিতে আন্তঃ ঠেংগামারা ফুটবল প্রিমিয়ার লিগের উদ্বোধন, মেয়র প্রার্থী নজরুল ইসলাম
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন