০১:১৩ পি.এম
বিশ্বজুড়ে সংকট দেখা দিলে সাধারণত স্বর্ণের দাম বেড়ে যায়। কারণ বিনিয়োগকারীরা মূলত মূল্যস্ফীতি ও অনিশ্চয়তার সময় স্বর্ণকে নিরাপদ সম্পদ হিসেবে বিবেচনা করেন। কিন্তু এবারের পরিস্থিতি ভিন্ন। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরানবিরোধী সামরিক অভিযানের মধ্যেও স্বর্ণের দাম ঊর্ধ্বমুখী না হয়ে বরং কমে যাচ্ছে।
গত কয়েক মাসে স্বর্ণের বাজারে অসাধারণ চাপ তৈরি হয়েছে। চলতি বছরের ২৮ জানুয়ারি প্রতি আউন্স (প্রায় ৩১ দশমিক ১ গ্রাম) স্বর্ণের দাম সর্বোচ্চ ৫ হাজার ৩০৩ ডলারে ওঠে। কিন্তু শুক্রবার তা নেমে এসেছে প্রায় ৪ হাজার ২৩৫ ডলারে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই পতনের প্রধান কারণ হলো মূল্যস্ফীতি বেড়ে যাওয়ার কারণে যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভ সুদের হার কমানোর পরিবর্তে বাড়ানোর আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
আরও পড়ুন: ‘জমি দখল-চাঁদা তুলতে যাইনি, মাদকের বিরুদ্ধে যুদ্ধে গিয়েছি’ : ইশরাক হোসেন
মূল্যস্ফীতির চাপ ও ইরানের হরমুজ সংকট
বর্তমান মূল্যস্ফীতির বড় একটি কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে হরমুজ প্রণালীর সংকট। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে সংঘাতের পর ইরান পাল্টা পদক্ষেপ হিসেবে হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচলে বাধা সৃষ্টি করেছে। বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জলপথ এটি, যেখানে বিপুল পরিমাণ তেল ও গ্যাস পরিবহন হয়। সরবরাহে বাধার ফলে জ্বালানির দাম বেড়ে যাচ্ছে, যার প্রভাব পড়ছে সামগ্রিক মূল্যস্ফীতে।
যুক্তরাষ্ট্রে বর্তমানে মূল্যস্ফীতি তিন বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে, যা প্রায় ৪ দশমিক ২ শতাংশ। একই সময়ে দেশটির শ্রমবাজারও তুলনামূলক স্থিতিশীল রয়েছে। ফলে সুদের হার দ্রুত কমানোর যে প্রত্যাশা ছিল তা দুর্বল হয়ে পড়েছে।
সুদের হার বাড়লে স্বর্ণ কেন কমে যায়?
আরও পড়ুন: ইশরাক কাণ্ডে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ব্যর্থতা স্পষ্ট: আখতার হোসেন
স্বর্ণ সাধারণত মূল্যস্ফীতির বিরুদ্ধে সুরক্ষা হিসেবে বিবেচিত হয়। তবে সুদের হার বেড়ে গেলে সেই স্বর্ণের আকর্ষণ কমতে শুরু করে। কারণ সোনা একটি ‘নন-ইল্ডিং’ বা আয়বিহীন সম্পদ। অর্থাৎ স্বর্ণ থেকে কোনো সুদ বা লভ্যাংশ পাওয়া যায় না। আনুমানিক দাম বাড়লেই বিনিয়োগকারীরা লাভবান হন।
আর্থিক ওয়েবসাইট অপশন স্প্রেডার্স ডটকমের প্রধান অপশন বিশ্লেষক জাস্টিন কার্ডওয়েল বলেছেন, “সম্পদ হিসেবে স্বর্ণ বাস্তব অর্থের সবচেয়ে কাছাকাছি। এটি কোনো লভ্যাংশ দেয় না, তবে এর মূল্য বাড়লে বিনিয়োগকারীরা লাভবান হন।”
তার মতে, সুদের হার বেশি হলে বিনিয়োগকারীরা ডলারের দিকে ঝুঁকতে শুরু করেন এবং তখন স্বর্ণের চাহিদা কমে যায়।
এক মাসে পতন ৯ শতাংশ
আরও পড়ুন: আমি হাসপাতালের প্রতিমন্ত্রী নই: স্বাস্থ্যের প্রতিমন্ত্রী ড. এম এ মুহিত
সম্প্রতি স্বর্ণের দাম প্রতি আউন্স ৪ হাজার ১৬০ ডলারের নিচে নেমে এসেছে, যা চলতি বছরের সর্বনিম্ন।
বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধ, মূল্যস্ফীতির চাপ এবং সুদের হার বৃদ্ধির সম্ভাবনা- সকল কারণেই বিনিয়োগকারীরা স্বর্ণ বিক্রি করে অন্য সম্পদে ঝুঁকে পড়ছেন।
এছাড়া ইরানের সংকটের কারণে মার্কিন ডলার শক্তিশালী হয়ে উঠেছে। যেহেতু আন্তর্জাতিক বাজারে স্বর্ণের দাম ডলারে নির্ধারিত হয়, তাই ডলার শক্তিশালী হলে স্বর্ণের দাম চাপের মুখে পড়ে।
নোবেল গোল্ড ইনভেস্টমেন্টসের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা কলিন প্লুম বলেছেন, “ডলার শক্তিশালী হলে স্বর্ণের ওপর চাপ তৈরি হয়, এবং ডলার দুর্বল হলে সাধারণত স্বর্ণের দাম বাড়ে। বর্তমানে ডলার শক্তিশালী হওয়ার কারণে স্বর্ণের ওপর চাপ তৈরি হয়েছে।”
আরও পড়ুন: লন্ডনে ব্যবসায়ীদের মিলনমেলা, ২০ ক্যাটাগরিতে পুরস্কার প্রদান
ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তা
প্লুম বলেন, “এ বছরের বাকি সময় এবং সম্ভবত আগামী কয়েক বছরের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো- এরপর কী হবে?”
তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, কয়েক মাস আগেও বাজারে প্রত্যাশা ছিল সুদের হার কমবে। ফলে বিভিন্ন সম্পদের দাম বাড়ছিল। কিন্তু বর্তমানে পরিস্থিতি পরিবর্তিত হয়েছে। সুদের হার বাড়ার সম্ভাবনা তৈরি হওয়ায় সব ধরনের সম্পদই প্রভাবিত হচ্ছে, আর সুদের হারের প্রতি স্বর্ণ সবচেয়ে বেশি সংবেদনশীল।
ইরান যুদ্ধের আগে নীতিগত অবস্থানের অংশ হিসেবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ফেডারেল রিজার্ভকে সুদের হার কমানোর জন্য চাপ দিয়েছিলেন। তবে বর্তমানে বাজার বিশ্লেষক সিএমই ফেডওয়াচ টুলের পূর্বাভাস অনুযায়ী, চলতি বছরের ডিসেম্বরের মধ্যে সুদের হার বাড়ার সম্ভাবনা ৫০ শতাংশের বেশি।
আরও পড়ুন: রোগ প্রতিরোধ সরকারের প্রধান অগ্রাধিকার : স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী
বিশ্লেষকদের মতে, এই পরিস্থিতি স্বর্ণের দামের ওপর ব্যাপক প্রভাব ফেলতে পারে।
যুদ্ধ শেষ হলে কী হবে স্বর্ণের দাম?
যুক্তরাষ্ট্র এবং ইরানের মধ্যে সম্ভাব্য সমঝোতার খবর প্রকাশ হওয়ার পর শুক্রবার স্বর্ণের দাম আগের দিনের তুলনায় সামান্য বৃদ্ধি পেয়েছে।
কার্ডওয়েলের মতে, যুদ্ধ শেষ হওয়ার সম্ভাবনার খবর স্বর্ণের জন্য ইতিবাচক হতে পারে। কারণ যুদ্ধের উত্তেজনা কমলে মূল্যস্ফীতি ধীরে ধীরে কমার সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে।
আরও পড়ুন: এলডিসি উত্তরণ পেছানোর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত চলতি মাসেই: বাণিজ্যমন্ত্রী
তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, এর প্রভাব দেখতে কয়েক মাস সময় লাগতে পারে।
তার মতে, বর্তমানে স্বর্ণের যে দাম রয়েছে, সেটি একটি গুরুত্বপূর্ণ সমর্থন স্তর হতে পারে। যুদ্ধ শেষ হলেও সুদের হার, ডলারের অবস্থান এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতির মতো অনেক বিষয় স্বর্ণের দামের ওপর প্রভাব ফেলবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, স্বর্ণ এখনও দীর্ঘমেয়াদে নিরাপদ সম্পদ হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ থাকলেও স্বল্পমেয়াদে সুদের হার ও ডলারের শক্তির কাছে চাপের মুখে রয়েছে। সূত্র: আল-জাজিরা
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন