১১:০০ পি.এম
বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষ বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ)-এ পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের সুবিধাভোগী একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট এখনো সক্রিয় রয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এই সিন্ডিকেটের নেতৃত্বে রয়েছেন সংস্থাটির আলোচিত তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মো. সুলতান আহমেদ খান। তার বিরুদ্ধে রাজধানীর ভাটারা থানায় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলনে হত্যাকাণ্ড সংশ্লিষ্ট মামলা থাকলেও রহস্যজনক কারণে এখনো তাকে গ্রেফতার করা হয়নি বলে অভিযোগ উঠেছে।
অভিযোগ রয়েছে, হত্যা মামলা থেকে রেহাই পেতে প্রায় ৫ কোটি টাকার তহবিল নিয়ে তদবির ও প্রভাব খাটানোর মিশনে নেমেছেন সুলতান খান। নিজেকে “সৎ, দক্ষ ও বিএনপি-ঘনিষ্ঠ কর্মকর্তা” হিসেবে পরিচয় দিয়ে বিভিন্ন মহলে সহানুভূতি আদায়েরও চেষ্টা করছেন তিনি।
সূত্র বলছে, বিগত ১৫ বছর আওয়ামী লীগের সাবেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব-উল আলম হানিফ–এর ভাগ্নে পরিচয়ে বিআইডব্লিউটিএতে একক আধিপত্য বিস্তার করেন সুলতান আহমেদ খান। বদলি, নিয়োগ, টেন্ডার ও ড্রেজিং প্রকল্প নিয়ন্ত্রণ করে গড়ে তোলেন শক্তিশালী সিন্ডিকেট। তার অনুমতি ছাড়া সংস্থায় কোনো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত কার্যকর হতো না বলেও অভিযোগ সংশ্লিষ্টদের।
আরও পড়ুন: বর্ষপূর্তিতে ম্যাগাজিন বর্ষবার্তা বের হচ্ছে
‘সৎ কর্মকর্তাদের টার্গেট, দুর্নীতিবাজদের ছত্রচ্ছায়া’
অভিযোগ রয়েছে, সুলতানের ঘনিষ্ঠ শ্রমিক লীগ নেতা সনজিব কুমার দাসকে ব্যবহার করে বিভিন্ন গণমাধ্যমে সৎ ও মেধাবী কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালানো হতো। ফলে অনেক কর্মকর্তা দীর্ঘদিন কোণঠাসা অবস্থায় ছিলেন।
গত বছরের ২ অক্টোবর সুলতান আহমেদ খানকে বিআইডব্লিউটিএ থেকে তাৎক্ষণিক অব্যাহতি দিয়ে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ে প্রেষণে পাঠানো হলেও তার প্রভাবএখনো কমেনি বলে দাবি সংশ্লিষ্টদের। অভিযোগ রয়েছে, তার অনুসারীরা এখনো সংস্থার ভেতরে অস্থিতিশীলতা তৈরির চেষ্টা করছে।
সম্প্রতি বিআইডব্লিউটিএতে শ্রমিক দলের সভাপতি মাজহারুল ইসলামের ওপর হামলার ঘটনায়ও সুলতান খানের অনুসারীদের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় মতিঝিল থানায় মামলাও হয়েছে।
১২০০ কোটি টাকার প্রকল্পে ‘লুটপাট’ অভিযোগ
অনুসন্ধানে জানা গেছে, পাবনা ও কুষ্টিয়ার ড্রেজিং প্রকল্পে প্রকল্প পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে প্রায় ১২০০ কোটি টাকার প্রকল্পে ভয়াবহ অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে সুলতান আহমেদ খানের বিরুদ্ধে।
আরও পড়ুন: মদনে শিশু ধর্ষণ ও গর্ভধারণ মামলা, রায় ১১ নভেম্বর
অভিযোগ অনুযায়ী, নদী খননের মাটি বিক্রি করে শত শত কোটি টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে। প্রকল্পের রাজস্ব রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা না দিয়ে তা ব্যক্তিগতভাবে ভোগ করা হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।
আরও অভিযোগ রয়েছে, তিনি ডিপ্লোমা প্রকৌশলী হয়েও ভুয়া সনদের মাধ্যমে পদোন্নতি নিয়ে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী হন। এমনকি ১৯৯৬ সালে তার চাকরিতে প্রবেশও ছিল সম্পূর্ণ অনিয়ম ও রাজনৈতিক প্রভাবনির্ভর।
“মামার প্রভাবেই ছিল অপ্রতিরোধ্য দাপট”
বিআইডব্লিউটিএ সূত্র জানায়, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা–ঘনিষ্ঠ মহলের আশীর্বাদে সুলতান আহমেদ খান বছরের পর বছর ধরেই ছিলেন বেপরোয়া। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ, তিনি বলতেন—“আওয়ামী লীগ ২০৪১ সাল পর্যন্ত ক্ষমতায় থাকবে, আমাকে কেউ ছুঁতে পারবে না।
সুলতানের বিরুদ্ধে আরও অভিযোগ, তিনি পাবনা জেলার শতাধিক ব্যক্তির কাছ থেকে মোটা অঙ্কের অর্থ নিয়ে চাকরি দিয়েছেন। বদলি ও নিয়োগ বাণিজ্যের মাধ্যমে বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছেন বলেও দাবি করা হচ্ছে। বর্তমানে তিনি উত্তরার একটি বিলাসবহুল ফ্ল্যাটে বসবাস করছেন বলে জানা গেছে।
আরও পড়ুন: গাইবান্ধায় নানা আয়োজনে যুবদলের ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালন
তদন্ত চলছে, ক্ষোভ বাড়ছে এনিয়ে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে।
বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) বর্তমান চেয়ারম্যান,নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মো. মুহিদুল ইসলাম জানিয়েছেন, সুলতান আহমেদ খানের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এদিকে দুদকের ঢাকা বিভাগীয় কার্যালয়ের একটি টিমও তার বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগ তদন্ত করছে বলে জানা গেছে।
সংস্থাটির একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, এখনো বিভিন্ন দফতরে বেনামি চিঠি পাঠিয়ে সৎ কর্মকর্তাদের হয়রানি করা হচ্ছে। এতে অনেক কর্মকর্তা সামাজিক ও পারিবারিকভাবে বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়ছেন এবং কর্মস্পৃহা হারাচ্ছেন।
আরও পড়ুন: মধুপুরে জালেমন বেগম হত্যা মামলার আসামি নরসিংদী থেকে গ্রেপ্তার
অন্তর্বর্তী সরকারের উদ্যোগে বাধা?বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের নৌখাত সংস্কার উদ্যোগকে ব্যাহত করতেই একটি চক্র সক্রিয় রয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। নৌপথের নাব্যতা রক্ষা, রাজস্ব আদায় ও দুর্নীতি প্রতিরোধে সরকারের উদ্যোগের বিপরীতে অবস্থান নিয়ে তারা বিআইডব্লিউটিএকে অকার্যকর করার চেষ্টা করছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
নৌখাত বিশেষজ্ঞদের মতে, বিআইডব্লিউটিএতে দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক প্রভাব, টেন্ডার সিন্ডিকেট ও দুর্নীতির শিকড় উপড়ে ফেলা না গেলে দেশের অভ্যন্তরীণ নৌ-ব্যবস্থাপনায় কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আনা কঠিন হবে।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন