০৭:৩৮ এম
বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনতে সরকার এবার দীর্ঘমেয়াদি নীতির ধারাবাহিকতার ওপর সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়েছে। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটে এমন বেশ কিছু সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছে, যা বিনিয়োগকারীদের জন্য স্থিতিশীল, পূর্বানুমানযোগ্য ও ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ তৈরির একটি বার্তা প্রদান করছে।
এছাড়া ব্যবসা শুরু করার নিয়ম সহজ করা, করনীতিতে দীর্ঘমেয়াদি নিশ্চয়তা দেওয়া, নিয়ন্ত্রণ শিথিলকরণ (ডিরেগুলেশন) এবং বিভিন্ন সম্ভাবনাময় খাতে বিশেষ প্রণোদনার মাধ্যমে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ বৃদ্ধির চেষ্টা করা হচ্ছে।
গতকাল বৃহস্পতিবার রাজধানীর আগারগাঁওয়ের বিনিয়োগ ভবনে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) আয়োজিত ‘২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে বিনিয়োগসংক্রান্ত সিদ্ধান্ত’ শীর্ষক এক ব্রিফিংয়ে এসব তথ্য উপস্থাপন করেছেন বিডার নির্বাহী চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী।
আরও পড়ুন: ঋণ গ্রহণের ব্যয় বৃদ্ধিতে সীমিত পরিসরের বাজেটের পথে যুক্তরাজ্য
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তিবিষয়ক উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর বিনিয়োগ ও পুঁজিবাজারবিষয়ক বিশেষ সহকারী তানভীর শাহরিয়ার ঘানি এবং জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চেয়ারম্যান আহসান হাবিব।
আশিক চৌধুরী উল্লেখ করেন, বিশ্বজুড়ে বিনিয়োগ প্রবাহ এখনও বিভিন্ন অনিশ্চয়তার মধ্যে থাকলেও, বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল নীতির ধারাবাহিকতা নিয়ে বিনিয়োগকারীদের উদ্বেগ। বিদেশি বিনিয়োগকারীরা বারবার জানতে চান, সরকারের নীতিতে পরিবর্তন আসবে কি না এবং দীর্ঘমেয়াদে একই নীতি বজায় থাকবে কি না। এ কারণেই এবারের বাজেটের মাধ্যমে সরকার স্পষ্ট বার্তা দিতে চায় যে, বাংলাদেশ ধারাবাহিক ও স্থিতিশীল অর্থনৈতিক নীতি অনুসরণ করবে।
তিনি বলেন, বাজেট ঘোষণার পরপরই শত শত কোটি ডলারের বিনিয়োগ আসবে—এমন আশা করা বাস্তবসম্মত নয়। তবে যদি একই বার্তা ধারাবাহিকভাবে পৌঁছানো যায় এবং সরকার তার প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করে, তাহলে বিনিয়োগকারীদের আস্থা ধীরে ধীরে বেড়ে যাবে।
বিডার চেয়ারম্যান জানান, বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো পাঁচ বছরের করনীতি আগাম ঘোষণা করা হয়েছে, যা তিনি নীতিগত ধারাবাহিকতার বড় অগ্রগতি হিসেবে উল্লেখ করেন। ব্যক্তিগত আয়করের কাঠামো থেকে শুরু করে বিভিন্ন শিল্পখাতের কর-সুবিধা পাঁচ থেকে ১০ বছরের জন্য নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে। এর ফলে বিনিয়োগকারীদের ভবিষ্যতের পরিকল্পনা করা আরও সহজ হবে।
আরও পড়ুন: ঘোষণা দিয়েও নিরাপত্তার কারণে ঢাকা-রিয়াদ সরাসরি ফ্লাইট চালু করতে পারল না সৌদি এয়ারলাইন্স
তিনি আরও বলেন, এবারের বাজেটের মূল লক্ষ্য বিনিয়োগ, উৎপাদন ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধি। এর জন্য প্রযুক্তিনির্ভর এবং পূর্বানুমানযোগ্য করব্যবস্থা, রপ্তানি বহুমুখীকরণ, স্থানীয় মূল্যশৃঙ্খল গড়ে তোলা, নবায়নযোগ্য জ্বালানি এবং উদ্ভাবনকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে নিয়ন্ত্রণ শিথিলকরণকে সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে।
ব্যবসা সহজ করার উদ্দেশ্যে বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সংস্কারও আনা হয়েছে। এখন একক সেবা ব্যবস্থার মাধ্যমে ১৪ দিনের মধ্যে ব্যবসা শুরু করা যাবে। যদি নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ সেবা না দেয়, তাহলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে অনুমোদন কার্যকর হবে। বন্ড লাইসেন্সের মেয়াদ এক বছর থেকে তিন বছর করা হয়েছে এবং মূল কারখানার ৬০ কিলোমিটারের মধ্যে অবস্থিত উৎপাদন ইউনিটও বন্ড-সুবিধার আওতায় আসবে।
রপ্তানি বহুমুখীকরণে মোটরসাইকেল, স্পিডবোট, হস্তশিল্প, মাছ প্রক্রিয়াজাতকরণসহ ১০টি নতুন রপ্তানিমুখী শিল্পকে বন্ড লাইসেন্স ছাড়াই ব্যাংক গ্যারান্টির মাধ্যমে শুল্কমুক্ত কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দেওয়া হয়েছে। এছাড়া শুল্কমুক্ত আমদানিকৃত কাঁচামাল দিয়ে তৈরি পণ্যের ক্ষেত্রে বাধ্যতামূলক ৩০ শতাংশ স্থানীয় মূল্য সংযোজনের শর্তও তুলে দেওয়া হয়েছে, যা আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় উৎপাদনকারীদের সক্ষমতা বাড়াবে।
বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য মূলধন ও মুনাফা দেশে ফেরত নেওয়ার প্রক্রিয়াও সহজ করা হয়েছে। এখন লভ্যাংশ ৩০ দিনের মধ্যে দেশে পাঠানো যাবে এবং অনাবাসী টাকার হিসাব থেকে অর্থ স্থানান্তরের সময়সীমা এক কর্মদিবসে নামিয়ে আনা হয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পূর্বানুমোদন ছাড়াই বিদেশে অর্থ পাঠানোর সীমাও উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি করা হয়েছে। পাশাপাশি ভ্যাট মূল্যায়নের বিরুদ্ধে আপিল করতে আগের ১০ শতাংশের পরিবর্তে আপিল পর্যায়ে মাত্র ১ শতাংশ এবং উচ্চ আদালতে ২ শতাংশ অর্থ জমা দিলেই হবে।
আরও পড়ুন: সরকারের সমালোচনা করলেই গ্রেপ্তার মানবাধিকারের লঙ্ঘন: আখতার হোসেন
বাজেটে বিভিন্ন সম্ভাবনাময় শিল্পের জন্য দীর্ঘমেয়াদি কর-সুবিধাও নির্ধারণ করা হয়েছে। ভোক্তা ইলেকট্রনিকস, কম্পিউটার, জাহাজ নির্মাণ ও ব্যাটারি শিল্পের কর-সুবিধা ২০৩০ সাল পর্যন্ত কার্যকর থাকবে। সেমিকন্ডাক্টর, বৈদ্যুতিক যানবাহন উৎপাদন ও সৌরবিদ্যুৎ যন্ত্রাংশে এই সুবিধা ২০৩১ সাল পর্যন্ত এবং নিবন্ধিত স্টার্টআপ ও সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন প্রকল্পে ২০৩৫ সাল পর্যন্ত অব্যাহত থাকবে।
এছাড়া তথ্যপ্রযুক্তি, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, বৈদ্যুতিক যানবাহন, ওষুধশিল্প ও রপ্তানিমুখী উৎপাদন খাতের জন্য বিশেষ প্রণোদনা দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ৫০০ কোটি টাকার স্টার্টআপ তহবিল, স্টার্টআপ প্রতিষ্ঠানের জন্য শূন্য টার্নওভার কর, ফ্রিল্যান্সার ও কনটেন্ট নির্মাতাদের কর-ছাড়, বৈদ্যুতিক যানবাহনের আমদানি শুল্ক কমানো, সৌরবিদ্যুৎ সরঞ্জাম ও ওষুধশিল্পের গুরুত্বপূর্ণ কাঁচামালে শুল্ক অব্যাহতি এবং তুলা আমদানিতে অগ্রিম আয়কর উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনা।
তবে আশিক চৌধুরী স্বীকার করেন, গ্যাস ও বিদ্যুৎ-সংকট এখনো বিনিয়োগের বড় বাধা। এ সমস্যার তাৎক্ষণিক সমাধান না থাকলেও সরকার সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে বিষয়টি সমাধানে কাজ করছে। একই সঙ্গে মাঠপর্যায়ে নীতির বাস্তবায়ন আরও দ্রুত ও কার্যকর করার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। কারণ, নীতি প্রণয়নের পাশাপাশি সফল বাস্তবায়নই বিনিয়োগ বাড়ানোর মূল শর্ত।
আরও পড়ুন: চট্টগ্রামের ‘শীর্ষ সন্ত্রাসী’ ডেভিড ইমনকে ৭ দিনের রিমান্ডে পাঠাল আদালত
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন