০৮:০৭ পি.এম
প্রধানমন্ত্রী এবং একনেক চেয়ারম্যান তারেক রহমান বারবার প্রকল্পের মেয়াদ ও ব্যয় বৃদ্ধির প্রবণতায় তীব্র ক্ষোভ ও বিরক্তি প্রকাশ করেছেন। যেসব কর্মকর্তার অবহেলা বা গাফিলতির কারণে প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ছে, তাদের খুঁজে বের করে দ্রুত শাস্তির আওতায় আনার জন্য সংশ্লিষ্টদের কঠোর নির্দেশ দিয়েছেন তিনি।
মঙ্গলবার (৯ জুন) বাংলাদেশ সচিবালয় কক্ষে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় এই নির্দেশনা দেওয়া হয়।
সভার সময়ে মোট ৩ হাজার ৮৯০ কোটি ৯৭ লাখ টাকা ব্যয় সম্বলিত ১০টি প্রকল্প অনুমোদন করা হয়েছে। অনুমোদিত ব্যয়ের মধ্যে রয়েছে সরকারের নিজস্ব অর্থায়ন ৩ হাজার ৮১০ কোটি ৬২ লাখ টাকা এবং সংস্থার নিজস্ব তহবিল থেকে ৮০ কোটি ৩৫ লাখ টাকা জোগান দেওয়ার কথা।
আরও পড়ুন: প্রতিবন্ধীদের জন্য অন্তর্ভুক্তিমূলক কর্মপরিকল্পনা ঘোষণা করলেন সমাজকল্যাণমন্ত্রী
বৈঠক সূত্রে জানা গেছে, একনেক সভায় খুলনা শিপইয়ার্ড সড়ক প্রশস্তকরণ ও উন্নয়ন প্রকল্পের তৃতীয় সংশোধনের প্রস্তাব উপস্থাপন করা হলে প্রধানমন্ত্রী সেই প্রস্তাবে তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করেন। বারবার মেয়াদ বৃদ্ধির কারণে প্রকল্পটি অনুমোদন না দিয়ে একনেক সভা থেকে ফেরত পাঠানো হয়। প্রধানমন্ত্রী এই প্রকল্পের জন্য কোন কর্মকর্তার কারণে বারবার মেয়াদ বেড়ে চলেছে, তাকে চিহ্নিত করার তাগিদ দেন।
সভায় তিনি সবার জন্য প্রকল্পের খরচ কমানো এবং রেট সিডিউল একীভূত করার নির্দেশ দেন। এলজিইডি ও পিডাব্লিউডিসহ বিভিন্ন বিভাগের রেট সিডিউল আলাদা হওয়ায় তিনি বিরক্তি প্রকাশ করেন এবং অধিকাংশ প্রকল্পের ব্যয়কে অস্বাভাবিক মনে করেন। তাই সকল বিভাগের রেট সিডিউল দ্রুততম সময়ের মধ্যে একই কাঠামোতে নিয়ে আসার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
সড়কের পাশে পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর ইউক্যালিপটাস বা ইপিল-ইপিল গাছ না লাগানোর জন্য সংশ্লিষ্টদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে প্রধানমন্ত্রী জানান, 'বিনা কারণে গাছ কেটে ফেলা মানুষ হিসেবে আমাকে ব্যথিত করে।'
এদিনের সভায় অনুমোদিত ১০টি প্রকল্পের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত বরিশাল সেচ প্রকল্পের রক্ষণাবেক্ষণ ও পুনর্বাসন (১ম পর্যায়), সমন্বিত উপজেলা ভূমি কমপ্লেক্স নির্মাণ, ময়মনসিংহ সিটি কর্পোরেশনের নগর ভবন নির্মাণ এবং আনোয়ারা-বাঁশখালী-টইটং-পেকুয়া-বদরখালী-চকরিয়া আঞ্চলিক মহাসড়ক যথাযথমান ও প্রশস্ততায় উন্নীতকরণ প্রকল্প।
আরও পড়ুন: ফেনীতে সাংবাদিককে মারধর ও হত্যার হুমকির অভিযোগে সাবেক কাউন্সিলর আটক
এছাড়া বাংলাদেশের ৩৩টি জেলায় সার্কিট হাউজ ও জেলা প্রশাসকের কার্যালয়, ঠাকুরগাঁওয়ে লিফট সংযোজন, বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউট সম্প্রসারণ, ঢাকা সিএমএইচে ক্যান্সার সেন্টার নির্মাণ (২য় পর্যায়), মাদ্রাসা এডুকেশন ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড ইনফরমেশন সিস্টেম (এমইএমআইএস) সাপোর্ট, দেশের ৬৫৩টি মাদ্রাসায় মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম স্থাপন এবং বিদ্যমান গ্রিড উপকেন্দ্র ও সঞ্চালন লাইনের ক্ষমতাবর্ধন (১ম সংশোধিত) প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।
এদিকে, দীর্ঘ প্রায় এক দশক ধরে ঝুলে থাকা ‘চাইনিজ ইকোনমিক অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল জোন’ (সিইআইজেড) প্রকল্পটির জট অবশেষে খুলতে যাচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান চলতি মাসের ২৩ থেকে ২৬ তারিখ পর্যন্ত নির্ধারিত চার দিনের চীন সফরের আগেই এই অঞ্চলের অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প একনেকের এজেন্ডায় বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, এটি বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারের ‘ভঙ্গুর অর্থনীতির পুনর্গঠন ও পুনরুদ্ধার’ এবং ‘চট্টগ্রামকে বাণিজ্যিক রাজধানী হিসেবে প্রতিষ্ঠা’ করার প্রতিশ্রুতিরই অংশ। চট্টগ্রামের কর্ণফুলী নদীর পূর্ব তীরে আনোয়ারা উপজেলার বেলচূড়া এলাকায় প্রায় ৮০০ একর জমির ওপর এই অর্থনৈতিক ও শিল্পাঞ্চলটি গড়ে তোলা হচ্ছে, যা বঙ্গবন্ধু টানেল থেকে মাত্র চার কিলোমিটার দূরে অবস্থিত।
বিশেষ এই অর্থনৈতিক অঞ্চলের অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পের মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ৪ হাজার ১৮৯ কোটি টাকা, যার মধ্যে ২ হাজার ৪৬৭ কোটি টাকা চীনা ঋণ এবং বাকি অংশ বাংলাদেশ সরকারের নিজস্ব তহবিল থেকে দেওয়া হবে। চীনের ‘চায়না রোড অ্যান্ড ব্রিজ করপোরেশন’ (সিআরবিসি) জিটুজি ভিত্তিতে ২০৩১ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে এই প্রকল্পের কাজ শেষ করবে। এই প্রকল্পের আওতায় সেতুসহ সংযোগ সড়ক, ২০ হাজার ৩০৪ ঘনমিটার ধারণক্ষমতার পানি সংরক্ষণাগার, গ্যাস পাইপলাইন, ২৫ এমএলডি ক্ষমতাসম্পন্ন কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগার (সিইটিপি), কঠিন বর্জ্য সংগ্রহ স্টেশন, ২০ হাজার ডিডব্লিউটি ধারণক্ষমতার বহুমুখী জেটি, বিদ্যুৎ সাবস্টেশন এবং ১২ কিলোমিটার সীমানা প্রাচীর নির্মাণ করা হবে।
আরও পড়ুন: ইসরাইলে নির্বাচন: ৮৫ শতাংশ ভোট গণনা শেষ, চূড়ান্ত ফলাফল দুই দিনে আসবে
২০১৬ সালে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের ঢাকা সফরের সময় এর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হলেও তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের অনীহা, ডিপিপি অনুমোদন ও অর্থায়ন জটিলতায় প্রকল্পটি স্থবির হয়ে পড়েছিল। পরবর্তী সময়ে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের চীন সফরকে কেন্দ্র করে এই প্রক্রিয়া গতি পায় এবং বর্তমান বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর তা চূড়ান্ত অনুমোদনের পর্যায়ে নিয়ে আসে। এই প্রকল্প সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে এক লাখের বেশি মানুষের কর্মসংস্থান হবে এবং ৫০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার সরাসরি বৈদেশিক বিনিয়োগ (এফডিআই) আসবে বলে আশা করা হচ্ছে। প্রথম মাইলপাথের খাতও চূড়ান্ত করা হয়েছে, যেখানে আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছর থেকে শুরু করে ২০৩০-৩১ অর্থবছর পর্যন্ত পর্যায়ক্রমে নিজস্ব তহবিল ও ঋণের অর্থ খরচ করা হবে।
সভায় অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীসহ মন্ত্রিপরিষদের সদস্য এবং সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন