১০:২১ পি.এম
চট্টগ্রামে বৃষ্টিপাত কমে আসার সাথে সাথে বন্যার পানিও কমতে শুরু করেছে। গত দুইদিনের পাহাড়ি ঢল এবং সাঙ্গু ও ডলু নদীর পানি স্তর কমার ফলে দক্ষিণ চট্টগ্রনের বাঁশখালী এবং সাতকানিয়ার ক্ষেত্রে পানি কমে অন্তত ৩-৪ ফুট পর্যন্ত নেমে গেছে। যদিও অনেক জায়গায় এখনো বাড়িঘর এবং আঞ্চলিক সড়কগুলো ২-৮ ফুট পানির নিচে ডুবে রয়েছে। এ কারণে যারা আশ্রয়কেন্দ্র বা স্বজনদের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছেন, তারা ফিরে যেতে পারছেন না। এখনো পানিবন্দী রয়েছেন ৫ লাখ মানুষ। ফলে তাদের ওপর দুর্ভোগ যেন ছেড়ে যাচ্ছে না।
বন্যায় বিপুল পরিমাণে বসতবাড়ি, আসবাবপত্রের ক্ষতি ছাড়াও, রাস্তাঘাট, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ এবং কৃষিজmি ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়েছে। তদারকির দায়িত্বে থাকা সংস্থাগুলি প্রাথমিকভাবে কিছু ক্ষয়ক্ষতির হিসাব দিলেও সার্বিক চিত্র জানাতে তাদের জন্য আরও ২-৩ দিন সময় লাগবে বলে জানিয়েছেন দায়িত্বশীলরা। এ ছাড়া, বন্যার ফলে বিভিন্ন এলাকায় ডায়রিয়া, কলেরা, টাইফয়েডসহ পানিবাহিত রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে। এখনো বিশুদ্ধ পানি ও রান্না করা খাবারের সংকট কাটেনি।
বঙ্গোপসাগরের তীরবর্তী বাঁশখালী উপজেলার বাহারছড়া ইউনিয়নের বাসিন্দা শাহেদ এমরান সোমবার বিকালে জানিয়েছেন, ‘ইউনিয়নের কাছ থেকে ৪২ হাজার মানুষের বাস। বৃহত্তর ইলশা, রত্নপুর, চাপাছড়ি সহ অধিকাংশ গ্রামের মানুষ মাটির ঘরে বসবাস করেন। প্রায় সকলেরই ঘর ভেঙে গেছে এবং অবশিষ্ট মাটির ঘরগুলোও পানিতে ডুবে যাওয়ার কারণে ভাঙ্গতে চলছে। গ্রামে যতগুলো পাকাবাড়ি রয়েছে, কিছু মানুষ সেখানে আশ্রয়ে আছেন। তাই জরুরি প্রয়োজন হলে নৌকা বা সাঁতরে যোগাযোগ করতে হচ্ছে।’
আরও পড়ুন: উখিয়ায় ১৫ ঘণ্টা পরও জ্বলছে গ্যাসের আগুন, ১৫ কিলোমিটার এলাকায় বিদ্যুৎ বন্ধ
ক্ষতিগ্রস্ত ঘরবাড়ির ব্যাপারে জানতে চাইলে বাঁশখালী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. রুহুল আমিন বলেন, ‘উপকূলীয় এলাকাগুলোতে মাটির ঘর বেশি। এখানকার বেশিরভাগ ঘরই ভেঙে গেছে অথবা থাকার অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। তবে এখনো সড়কের ওপর পানি রয়েছে, তাই পুরো ক্ষয়ক্ষতির তালিকা করা যাচ্ছে না। আপাতত ত্রাণ ও উদ্ধার কার্যক্রম চলমান রাখা হচ্ছে। পানি পুরোপুরি নেমে গেলে ক্ষতিগ্রস্ত বাড়িঘরের তালিকা তৈরি করা হবে। একইসাথে কৃষি, মৎস্য ও সড়ক বিভাগও ক্ষয়ক্ষতির তালিকা প্রস্তুত করছে।’
বন্যা পরিস্থিতি মোকাবেলা করতে জেলা প্রশাসন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বন্যার পানি কমতে শুরু করলেও সাতকানিয়া ও বাঁশখালী উপজেলার পরিস্থিতি এখনো অপরিবর্তিত। তবে বোয়ালখালী, ফটিকছড়ি, সন্দ্বীপসহ অন্যান্য উপজেলাগুলোর সার্বিক চিত্রে কিছুটা উন্নতি হয়েছে। যারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন, তারা এখনো আশ্রয়কেন্দ্র ও স্বজনদের বাড়িতে অবস্থান করছেন। কিছু এলাকার মানুষ বাড়িতে ফিরে গেলেও ঘরের ভেতরে কাদামাটি পরিষ্কার করা এবং ঘর মেরামতের চেষ্টা করতে হচ্ছে। টানা পানির নিচে থাকার কারণে মাটির চুলা ব্যবহারের অযোগ্য হয়ে গেছে। এর ফলে খাদ্য সংকটসহ বিভিন্ন ধরনের দুর্ভোগ এখনও কাটছে না।
চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা জানাচ্ছেন, পানি কিছুটা কমার ফলে কেউ কেউ বাড়িতে ফিরছেন। তবে বন্যা পরবর্তী দুর্ভোগে অধীনস্থ রয়েছেন বন্যার্তরা। জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে শুকনো খাবার, বিশুদ্ধ পানি, রান্না করা খাবারসহ চিকিৎসা সামগ্রী বিতরণ করা হচ্ছে। পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত এই কার্যক্রম চলমান থাকবে।
এদিকে, চট্টগ্রাম জেলা মৎস্য কর্মকর্তা সালমা বেগম জানান, পূর্ণাঙ্গ তালিকার জন্য আরও সময় দরকার। তবে প্রাথমিকভাবে মৎস্য বিভাগের ১০৯ কোটি ২৩ লাখ ১০ হাজার টাকার ক্ষতি হয়েছে। এর মধ্যে ১২ হাজার ২৫১টি পুকুর-দিঘি ও ৩২০টি ঘের পানিতে তলিয়ে গেছে। সর্বাধিক ক্ষতি হয়েছে বাঁশখালীতে, যেখানে ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৫১ কোটি টাকার বেশি। সাতকানিয়া, বাঁশখালী, লোহাগাড়া, চন্দনাইশ, বোয়ালখালী এবং আনোয়ারা উপজেলায়ও মৎস্যসম্পদের ক্ষতি হয়েছে।
আরও পড়ুন: তাহিরপুরে প্রবাসীর স্ত্রী ও পাঁচ লাখ টাকা নিয়ে উধাও নাজমুল, পরিবার উদ্বিগ্ন
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের চট্টগ্রামের উপ-পরিচালক আপ্রু মারমা জানিয়েছেন, বন্যায় চট্টগ্রামের ১৬ উপজেলার ১৪ হাজার তিনশ হেক্টর কৃষিজমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এছাড়া সবজি ও পান বরজের ক্ষতি হয়েছে ২৫৯৪ দশমিক ১৭ হেক্টরের।
জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মোহাম্মদ আলমগীর জানাতেও যে, প্রাথমিকভাবে প্রায় ২৮ কোটি ৫৪ লাখ টাকার মতো ক্ষতি হয়েছে। ৩১টি গরু, ৮৭টি ছাগল, ৪০টি ভেড়া এবং ৮৭ হাজার ৩৯৫টি মুরগি এবং এক হাজার হাঁস মারা গেছে। পানি নেমে এলে চূড়ান্ত ক্ষয়ক্ষতির হিসাব জানা যাবে।
সড়ক বিভাগের তরফ থেকে জানানো হয়েছে, চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়ক, চট্টগ্রাম নগরীর বিভিন্ন এলাকায়, এবং দক্ষিণ চট্টগ্রামের বিভিন্ন উপজেলার আঞ্চলিক সড়কগুলো ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। প্রাথমিকভাবে সড়ক ও জনপথ বিভাগের আওতাধীন ২০টি সড়কের ৫০ দশমিক ৫৬ কিলোমিটার এবং স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) আওতাধীন জেলায় ৫১৪টি সড়কের ২৪৭ দশমিক ৬৫ কিলোমিটার অংশ, সাথে ১৭৬টি সেতু ও কালভার্ট ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
এদিকে, সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বন্যা শেষে পরবর্তী পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে বিশেষ নজর দেওয়া উচিত। বিশেষ করে স্বাস্থ্যঝুঁকি মোকাবিলা, ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসন, ঘরবাড়ি পুনর্নির্মাণে সহযোগিতা, কৃষক ও মৎস্য চাষিদের ক্ষতিপূরণ প্রদান, সড়ক ও অন্যান্য অবকাঠামো মেরামত কার্যকর পরিকল্পনা দ্রুত গ্রহণ করার প্রয়োজন।
আরও পড়ুন: সুন্দরবনে কোস্ট গার্ডের সঙ্গে ‘দাদা ভাই বাহিনী’র বন্দুকযুদ্ধে ৫ জেলে উদ্ধার
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন