১১:১২ পি.এম
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সম্প্রতি দাবি করেছেন যে, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের কৌশলগত হরমুজ প্রণালী দিয়ে ‘গোপনে লাখ লাখ ব্যারেল’ তেল পরিবহন করে নিয়ে গেছে। এই কাজটি তেলের বৈশ্বিক দামে স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে সহায়তা করেছে।
ওভাল অফিসে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে ট্রাম্প বলেন, চলমান উত্তেজনার মধ্যেও যুক্তরাষ্ট্র সফলভাবে এই জলপথ দিয়ে তেল সরিয়েছে। তার ভাষায়, “আমরা লাখ লাখ ব্যারেল তেল বের করে এনেছি, কেউ কিছু টের পায়নি।”
তিনি আরও দাবি করেন যে, এই গোপন অভিযানের কারণেই আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি প্রায় ৯০ ডলারে স্থিতিশীল রয়েছে। যুদ্ধের শুরুতে এই দাম ১০০ ডলারের ওপরে ছিল।
আরও পড়ুন: আঘাত হানল ঘূর্ণিঝড় ‘অর্ণব’, বাতাসের গতি পৌঁছাল ১৫০ কিলোমিটারে
বিশ্বের মোট জ্বালানি বাণিজ্যের প্রায় ২০ শতাংশ প্রবাহিত হয় এই সরু ও কৌশলগত জলপথ দিয়ে। চলমান সংঘাতের কারণে মার্চের শুরু থেকে হরমুজ প্রণালী কার্যত অচল হয়ে পড়ে। ইরান ঘোষণা দিয়েছে যে, তারা কোনও জাহাজকে এই প্রণালী দিয়ে চলাচলের অনুমতি দেবে না। তবে পরবর্তীতে নির্দিষ্ট কিছু ‘বন্ধু রাষ্ট্রের’ জাহাজের জন্য সীমিত অনুমতি দেওয়া হয়েছে। শর্ত হল যে, তাদের ইরানের সঙ্গে সমঝোতা করতে হবে।
এপ্রিলের ১৩ তারিখে, তেহরানের সঙ্গে যুদ্ধবিরতির পাঁচ দিন পর, যুক্তরাষ্ট্র ইরানি জাহাজ ও বন্দর লক্ষ্য করে নৌ অবরোধ আরোপ করে। এই পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের টানাপোড়েনের মধ্যে খুব সীমিত সংখ্যক জাহাজই প্রণালীটি পার হতে সক্ষম হয়েছে।
এ প্রেক্ষাপটে প্রশ্ন উঠেছে- যুক্তরাষ্ট্র কি সত্যিই ইরানের অনুমতি ছাড়া এই জলপথ দিয়ে কোটি কোটি ব্যারেল তেল পরিবহন করতে পেরেছে?
ট্রাম্প কী দাবি করেছেন? ট্রাম্প বলেন, সাম্প্রতিক অভিযানে ‘২২টি জাহাজ রাতে আলো নিভিয়ে পার করা হয়েছে’। কারণ তার ভাষায়, ইরানের রাডার ব্যবস্থা নষ্ট করে দেওয়া হয়েছে।
আরও পড়ুন: ইসরাইল নির্বাচনে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই, সরকার গঠনে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অধরাই
তিনি আরও জানান, তিনি এই ‘গোপন মিশন’ উন্মোচন করছেন কারণ তেহরান বিষয়টি বুঝে ফেলেছে। পরবর্তীতে তিনি নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশালে লেখেন, গত মাসে তিনি মার্কিন সেনাবাহিনীকে নির্দেশ দেন হরমুজ প্রণালীর মাধ্যমে তেলবাহী জাহাজ ও বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল নিশ্চিত করতে ‘গোপন অভিযান’ পরিচালনা করতে।
তার দাবি অনুযায়ী, এই অভিযানের ফলে প্রায় ১০ কোটি ব্যারেল তেল পরিবহন সম্ভব হয়েছে। তিনি আরও বলেন, “২০০টিরও বেশি বাণিজ্যিক জাহাজ নিরাপদে প্রণালী পার হয়েছে। এখন হরমুজ প্রণালী যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে, ইরানের নয়।”
ট্রাম্প ইরানের সামরিক শক্তিকে ‘পরাজিত’ ও তাদের অর্থনীতিকে ‘ধ্বংসপ্রায়’ বলেও মন্তব্য করেন।
তবে একই দিনে মার্কিন জ্বালানি মন্ত্রী ক্রিস রাইট কংগ্রেস শুনানিতে জানান যে, তিনি হরমুজ প্রণালী দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের এমন কোনও বৃহৎ তেল পরিবহনের বিষয়ে অবগত নন। তবে তিনি স্বীকার করেন যে, কিছু ক্ষেত্রে মার্কিন সেনাবাহিনী জাহাজ চলাচলে সহায়তা করেছে। তিনি স্পষ্ট করেন যে, এসব জাহাজ ইরানি নয়।
আরও পড়ুন: ইসরায়েলে পার্লামেন্ট নির্বাচনের ভোট গণনা চলছে, লিকুদ পার্টি এগিয়ে
গালফ অঞ্চলের সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও কাতারসহ বিভিন্ন দেশ এই প্রণালী ব্যবহার করে তাদের তেল রফতানি করে।
বাস্তবে যুক্তরাষ্ট্র কি এই তেল সরাতে পেরেছে? বিশ্লেষণে দেখা যায়, ট্রাম্পের দাবি বাস্তবতার সঙ্গে পুরোপুরি মেলে না।
তার বক্তব্য অনুযায়ী, ১০ কোটি ব্যারেল তেল পরিবহন হয়েছে, যা যুদ্ধপূর্ব পরিস্থিতিতে পাঁচ দিনের সমুদ্রপথ বাণিজ্যের সমান। যুদ্ধ শুরুর আগে, হরমুজ প্রণালী দিয়ে দৈনিক প্রায় ২ কোটি ব্যারেল তেল পরিবাহিত হতো।
সেই হিসেবে, যুদ্ধ চলাকালীন সময়ে মোট সম্ভাব্য পরিবহনযোগ্য তেল প্রায় ২০০ কোটি ব্যারেল হওয়ার কথা ছিল, যদি স্বাভাবিক প্রবাহ বজায় থাকত।
আরও পড়ুন: ঘূর্ণিঝড় ‘অর্ণব’ স্থলভাগে প্রবেশ, উপকূলে তাণ্ডবের আশঙ্কা
এছাড়া যুদ্ধপূর্ব দৈনিক প্রায় ১৪০টি জাহাজ এই প্রণালী ব্যবহার করতো। সেই হিসাবে পাঁচ দিনের স্বাভাবিক ট্রাফিকেই প্রায় ৭০০টি জাহাজ পার হওয়ার কথা।
বর্তমান সময়ে বিভিন্ন ট্র্যাকিং ও গোয়েন্দা সংস্থার তথ্যেও বড় ধরনের পার্থক্য দেখা যায়। উইন্ডওয়ার্ড জানিয়েছে, গত পাঁচ সপ্তাহে প্রায় ৮০টি বাণিজ্যিক জাহাজ উপসাগর ত্যাগ করেছে। লয়েড’স লিস্ট বলছে সংখ্যা ১৪২টি, আর কেপলার জানিয়েছে সর্বোচ্চ ২৬৪টি জাহাজ পারাপার হয়েছে।
তবে এসব সংখ্যাও ট্রাম্পের দাবি করা ১০ কোটি ব্যারেল তেল পরিবহনের সমর্থনে যথেষ্ট নয় বলে বিশ্লেষকদের মত।
অনেকে জানাচ্ছে, অনেক জাহাজই ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসকে (আইআরজিসি) কর প্রদান করে প্রণালী পার হয়েছে। কিছু জাহাজ চীনা মুদ্রা ইউয়ানেও অর্থ পরিশোধ করেছে বলে জানা গেছে।
আরও পড়ুন: ঘূর্ণিঝড় ‘অর্ণব’ ১৫০ কিলোমিটার বেগে আঘাত হেনেছে অন্ধ্রপ্রদেশের উপকূলে
হরমুজ প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ কার নিয়ন্ত্রণে? যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী বলছে, তারা বাণিজ্যিক জাহাজের সঙ্গে যোগাযোগ ও সমন্বয় করছে। তবে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা হয়নি।
অন্যদিকে ইরানের আইআরজিসি এই কৌশলগত জলপথে কঠোর নিয়ন্ত্রণ বজায় রেখেছে। পাকিস্তান, ভারত ও রাশিয়ার মতো কিছু দেশ তেহরানের সঙ্গে সমঝোতার ভিত্তিতে জাহাজ পরিবহন করছে।
ইরান এই প্রণালীকে নিজেদের ভূখণ্ডসংলগ্ন অর্থনৈতিক লাইফলাইন হিসেবে বিবেচনা করছে এবং জাহাজ চলাচলের জন্য বীমাসদৃশ ফি আরোপ করেছে। যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা সমালোচকরা এই ফি-কে অবৈধ ‘টোল বুথ’ হিসেবে বর্ণনা করেছে।
তবে ইরান দাবি করছে, হরমুজ প্রণালী আন্তর্জাতিক জলসীমার অংশ নয়; এটি ইরান ও ওমানের যৌথ নিয়ন্ত্রণাধীন এলাকা।
আরও পড়ুন: জাতীয় সাঁতারে পদকজয়ীদের প্রাইজমানি বাতিল
ফ্লোরিডাভিত্তিক এনএসআই ইনস্যুরেন্স গ্রুপের সিইও অস্কার সেকালি বলেন, “ভূগোলিক সুবিধাকে আর্থিক সুবিধায় রূপান্তরের প্রচেষ্টা এটি। প্রাচীন এই কৌশলই এখন নতুনভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে।”
তিনি আরও জানান যে, একটি বড় তেলবাহী জাহাজ প্রতিদিন প্রায় এক লাখ ডলার খরচ করে, এবং ১০০ দিনের বিলম্বে ক্ষতি দাঁড়াতে পারে প্রায় ১ কোটি ডলার পর্যন্ত। তবে ইরানকে অর্থ প্রদান অনেক কোম্পানিই এড়িয়ে চলে, কারণ এতে নিষেধাজ্ঞা, আইনি ঝুঁকি ও বীমা জটিলতা তৈরি হতে পারে। সূত্র: আল-জাজিরা
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন