০২:১০ পি.এম
এক সময়ে গোটা বিশ্বের সব মানুষের ছিল। মানুষ এক অঞ্চল থেকে অন্য অঞ্চলে ঘুরে বেড়াতো।
তারপর মানুষই নিজেদের সুবিধামত সীমানা দিয়ে বিশ্বকে ভাগ করেছে। তবে কাজের খোঁজে, ভাগ্য বদলাতে মানুষের ঘুরে বেড়ানোর অভ্যাস কখনোই বদলায়নি। অনুন্নত এলাকার মানুষ উন্নত এলাকায় যেতে চান।
আরও পড়ুন: এনসিপিআই-তে যোগদানের ৪ মাস পর ইউসুফ পাঠানের পকেটে ২০ কোটি টাকার জমি
যদিও অর্থনৈতিক কারণে সীমানা পেরুতে চাওয়া মানুষগুলোর জন্য সময়টা খুবই খারাপ যাচ্ছে।
তীব্র জাতীয়তাবাদের উত্থানে অনেক দেশেই অভিবাসন বিরোধী চরমপন্থা বিকশিত হচ্ছে। ইউরোপ-আমেরিকা দূরের কথা, এমনকি অভিবাসন বিরোধী সহিংস বিক্ষোভ দক্ষিণ আফ্রিকাকেও অভিবাসীদের জন্য অনিরাপদ করে তুলেছে।
দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় আসার পর থেকে ডোনাল্ড ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসন ঠেকাতে নানা কঠোর পদক্ষেপ নিচ্ছেন। সম্প্রতি ৭০ থেকে ৮০ হাজার মানুষ ছিটমহল সিউটা দিয়ে মরক্কো থেকে স্পেনে ঢোকার চেষ্টা চালায়।
তাতে অন্তত ১১১ জন মারা যান। এ নিয়ে ইউরোপ তথা বিশ্বজুড়ে তোলপাড় সৃষ্টি হয়। শেনজেন চুক্তি ভেঙে ইতালি স্পেনের সঙ্গে সীমান্ত বন্ধ করে দেয়।
আরও পড়ুন: মার্কিন সিনেট প্রার্থী আবদুল এল-সাইয়েদ: ‘ইসরাইল আমাদের বন্ধু নয়’
তবে গত জানুয়ারি থেকে শুরু হওয়া দক্ষিণ আফ্রিকায় অভিবাসন বিরোধী বিক্ষোভ এখন সহিংস আকার ধারণ করেছে। যদিও সেদিকে বিশ্বের নজর নেই খুব একটা।
একে তো বিক্ষোভ, তার ওপর সেই বিক্ষোভের চাপে সরকারের অভিবাসন বিরোধী কঠোর অভিযান—সব মিলিয়ে দক্ষিণ আফ্রিকা এখন শুধু অভিবাসী নয়, সব বিদেশী নাগরিকদের জন্যই অনিরাপদ হয়ে উঠেছে। গত এপ্রিল থেকে বর্তমানে ১ লক্ষ ৭৮ হাজারেরও বেশি অভিবাসী ভয়ে বা বাধ্য হয়ে দক্ষিণ আফ্রিকা ছেড়ে গেছে। আকস্মিক এই গণ-স্থানান্তরে বহু শিশু, অসুস্থ ও প্রবীণ মানুষ বিপাকে পড়েছেন।
গত জানুয়ারি থেকেই উগ্র জাতীয়তাবাদী সংগঠন ‘মার্চ ফর মার্চ’ এবং ‘অপারেন দুদুলা’ অভিবাসনবিরোধী আওয়াজ তুলতে শুরু করে।
এপ্রিল-মে মাসে নানা কর্মসূচিতে আন্দোলন চাঙা হয়েছে। ৩১ জুন দক্ষিণ আফ্রিকা ছাড়ার শেষ সময় বেধে দিয়ে দেশজুড়ে বিক্ষোভের ডাক দেয় আন্দোলনকারীরা।
আরও পড়ুন: এবার ‘জেন-জি’ বিক্ষোভে উত্তাল জাকার্তা
৩০ জুনের পর থেকে বিক্ষোভকারীরা ‘ডোর টু ডোর’ অভিযান শুরু করেছে। তারা ঘরে ঘরে গিয়ে হামলা চালাচ্ছে। দোকানপাট ভাঙচুর করছে। ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে আগুন দিচ্ছে। মানুষের ওপর হামলা চালাচ্ছে। এমনকি বৈধ বিদেশী নাগরিকরাও তাদের হামলার শিকার হচ্ছেন। এসব হামলায় অনেকে মারা গেছেন। কিন্তু ঠিক কতজন মারা গেছেন, তার সঠিক হিসাব পাওয়া মুশকিল।
দক্ষিণ আফ্রিকার বাইরে থেকে প্রাপ্ত একটি হিসাব অনুযায়ী, মোজাম্বিক সরকারের দাবি, দক্ষিণ আফ্রিকায় এই ধরনের হামলায় তাদের ১১ জন নাগরিক নিহত হয়েছেন। নাইজেরিয়া ও ঘানাও তাদের কিছু নাগরিক নিহত হওয়ার দাবি করেছে। তবে দক্ষিণ আফ্রিকা এই সংখ্যার সত্যতা নিয়ে আপত্তি তুলে বলেছে যে, এর মধ্যে কিছু মৃত্যু ডাকাতির মতো সাধারণ অপরাধের সঙ্গে জড়িত, অভিবাসনবিরোধী বিক্ষোভের সঙ্গে নয়।
আফ্রিকার মধ্যে সবচেয়ে সমৃদ্ধ দেশ দক্ষিণ আফ্রিকা। সর্বশেষ আদমশুমারি অনুযায়ী, দক্ষিণ আফ্রিকার মোট ৬ কোটি ২০ লাখ জনসংখ্যার মধ্যে বিদেশি নাগরিকের সংখ্যা ছিল ২৪ লাখ।
কিন্তু আন্দোলনকারীদের দাবি, দেশটিকে অবৈধ অভিবাসীর সংখ্যা আরো অনেক বেশি।
আরও পড়ুন: পাখির ধাক্কা সামলে ১৪৮ আরোহী নিয়ে নিরাপদে নামল উড়োজাহাজ
আফ্রিকার মধ্যে সবচেয়ে সমৃদ্ধ হলেও দক্ষিণ আফ্রিকায় রয়েছে তীব্র বৈষম্য। সম্পদ কুক্ষিগত গুটিকয়েক গোষ্ঠির হাতে। দক্ষিণ আফ্রিকায় বেকারত্বের হার ৩২ দশমিক ৭ ভাগ, যা গোটা বিশ্বের মধ্যে অন্যতম শীর্ষে।
বিক্ষোভকারীদের দাবির মধ্যে রয়েছে যে, নথিপত্রহীন অভিবাসীরা কম বেতনের কাজগুলো লুফে নিয়ে দক্ষিণ আফ্রিকার উচ্চ বেকারত্বের হার আরো বাড়িয়ে দিচ্ছে এবং সরকারি সুযোগ-সুবিধার ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করছে।
দশকের পর দশক ধরে, দক্ষিণ আফ্রিকা অন্যান্য আফ্রিকান দেশ থেকে আসা লাখ লাখ অভিবাসীকে খামার, রেস্তোরা, নির্মাণ খাতসহ বিভিন্ন কম বেতনের কাজে আকৃষ্ট করেছে। বেকার যুবকদের এই ক্ষোভকে সামনে রেখেই উগ্র জাতীয়তাবাদীরা আন্দোলনকে উস্কে দিতে পেরেছে।
উগ্র জাতীয়তাবাদের পাশাপাশি দক্ষিণ আফ্রিকায় রয়েছে উগ্র বিদেশ-বিদ্বেষ (জেনোফোবিয়া)। এসব সব মিলিয়েই এবারের আন্দোলন উগ্র ও সহিংস রূপ ধারণ করেছে। ‘ডোর ডু ডোর’ অভিযানের পাশাপাশি প্রতি বৃহস্পতিবার বিক্ষোভ চালিয়ে যাচ্ছে আন্দোলনকারীরা। অভিবাসীদের দেশ ছাড়তে সময়সীমা বেধে দেওয়াকে বেআইনী বললেও সরকার আন্দোলনের চাপে অভিবাসনবিরোধী কঠোর অভিযান শুরু করেছে।
আরও পড়ুন: রাশিয়ার হুমকিতে ১০ লাখ স্থলমাইন কিনবে ফিনল্যান্ড
সব মিলিয়ে দলে দলে মানুষ দক্ষিণ আফ্রিকা ছেড়ে যাচ্ছে।
গত কিছু মাসে কত মানুষ দক্ষিণ আফ্রিকা ছেড়ে গেছেন তার সঠিক হিসাব পাওয়াও কঠিন। কারণ এসব অধিকাংশই অবৈধভাবে দক্ষিণ আফ্রিকায় ছিলেন। তাদের আসাটাও অবৈধ পথে হয়েছে, যাওয়ার পথও ভিন্ন নয়।
এমনকি যেসব দেশে ফিরে গেছে, তাদের হিসাব থেকে একটি ধারণা পাওয়া যায়।
দক্ষিণ আফ্রিকার দেশ জিম্বাবুয়ের দাবি, গত মে মাস থেকে ১ লাক ১৫ হাজারেরও বেশি মানুষ ফিরে এসেছে। মালাউইতে ফিরে গেছেন ৫৬ হাজারেরও বেশি মানুষ। অন্যদিকে নাইজেরিয়া, ঘানা, মোজাম্বিক ও লেসোথো জানিয়েছে, তাদের দেশেও গড়ে এক হাজার করে মানুষ ফিরে এসেছেন। দক্ষিণ আফ্রিকা এই সপ্তাহে জানিয়েছে, গত এপ্রিল মাস থেকে এ পর্যন্ত প্রায় ১৯ হাজার মানুষকে সরকারিভাবে ফেরত পাঠানো হয়েছে।
আরও পড়ুন: মঙ্গলের উপগ্রহে যাচ্ছে জাপানের মহাকাশযান, নমুনা সংগ্রহের অভিযান শুরু
হঠাৎ করে এত বিপুল সংখ্যক মানুষের স্থানান্তরের ফলে কিছু উদ্বেগজনক পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে বলে মানবাধিকার ও অধিকার বিষয়ক সংগঠনগুলো জানিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে হাজার হাজার শিশুর স্কুল থেকে আকস্মিক বিদায় নেওয়া এবং এইচআইভি আক্রান্ত রোগীদের জীবনরক্ষাকারী চিকিৎসা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়া।
ইউনিসেফ এবং জাতিসংঘের শিশু অধিকার কমিটি এক যৌথ বিবৃতিতে ফিরে আসা অভিবাসীদের মধ্যে থাকা শিশুদের ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। সংস্থা দুটি জানিয়েছে, হঠাৎ করে কোনো নথিপত্র ছাড়া এবং সমন্বয়হীনভাবে স্থানান্তরের কারণে এই শিশুরা সহিংসতা, শোষণ, পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়া এবং মানসিক ট্রমার চরম ঝুঁকিতে রয়েছে।
কিছু দেশ সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য প্রকাশ না করলেও মালাউই জানিয়েছে যে, দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে ফিরে আসা নাগরিকদের মধ্যে ৫ বছরের কম বয়সী শিশুর সংখ্যাই প্রায় ৪ হাজার।
একটি বেসরকারি সংস্থার হিসাব মতে, জুলাই মাসের মাঝামাঝি পর্যন্ত জিম্বাবুয়েতে ফিরে আসাদের মধ্যে ১১ হাজারেরও বেশি শিশু রয়েছে। জিম্বাবুয়ে সরকার স্কুলগুলোকে ফিরে আসা শিশুদের সঙ্গে কোনো বৈষম্য না করা এবং তাদের ভর্তির ব্যবস্থা করার নির্দেশ দিয়েছে।
স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ও সাহায্য সংস্থাগুলো জানিয়েছে, অনেক অভিবাসী কোনো ওষুধ বা চিকিৎসা সংক্রান্ত নথিপত্র ছাড়া দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে পালিয়ে এসেছেন। ফলে বিশ্বের সবচেয়ে বেশি এইচআইভি সংক্রমণ হারের এই অঞ্চলে রোগীদের জীবন রক্ষাকারী এইচআইভি চিকিৎসা বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
ডক্টরস উইদাউট বর্ডারস জিম্বাবুয়ের বেইটব্রিজ সীমান্ত চৌকিতে তাঁবু বসিয়ে অস্থায়ী ক্লিনিক স্থাপন করেছে। সেখানে জীবন রক্ষাকারী এইচআইভি এবং অন্যান্য দীর্ঘমেয়াদী রোগের ওষুধ না পেয়ে চরম মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়া মানুষদের চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।
দক্ষিণ আফ্রিকার প্রেসিডেন্ট সিরিল রামাফোসা অভিবাসীদের ওপর যেকোনো ধরনের সহিংসতার তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন। পাশাপাশি অভিবাসন আইন কার্যকরের ক্ষেত্রে সরকারের ব্যর্থতার কথাও স্বীকার করেছেন। তিনি সীমান্ত সুরক্ষায় আরো উন্নত প্রযুক্তি ও জনবল নিয়োগ, দ্রুত বহিষ্কারের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে নতুন অভিবাসন আদালত গঠন এবং নথিপত্রহীন অভিবাসীদের কাজে নিযুক্ত করার ক্ষেত্রে কঠোর শাস্তির অঙ্গীকার করেছেন।
তবে এই পরিস্থিতির কারণে দক্ষিণ আফ্রিকার সঙ্গে অন্যান্য আফ্রিকান দেশের মধ্যে কূটনৈতিক উত্তেজনা তৈরি হয়েছে, যেখানে অন্য দেশগুলো দক্ষিণ আফ্রিকার বিরুদ্ধে জেনোফোবিয়া ছড়ানোর অভিযোগ করছে। আগামী অক্টোবরে আফ্রিকান ইউনিয়নের সভার আলোচ্যসূচিতে দক্ষিণ আফ্রিকার এই অভিবাসীবিরোধী ও জেনোফোবিক সমস্যাটিকে অন্তর্ভুক্তির জোর দাবি জানিয়েছিল ঘানা। যদিও দক্ষিণ আফ্রিকা সেটি আটকে দিয়েছে।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন