১১:১২ পি.এম
মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের বিশাল জয়ের প্রতিক্রিয়ায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের শেয়ারবাজারে ধসের প্রভাবে শুক্রবার এশিয়ান এবং ইউরোপীয় শেয়ারবাজারে বড় পতন দেখা গেছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা-এআই খাতের বিনিয়োগের জোয়ারকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে এমন উদ্বেগের কারণে এই ধসের সূচনা হয়। প্রযুক্তি-নির্ভর এশীয় সূচকগুলো বিশেষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে শুক্রবারের এই ধসে।
এর আগে ওয়াল স্ট্রিটে এক নজিরবিহীন ধসে বাজার মূলধনের প্রায় ২.৫ ট্রিলিয়ন ডলার স্রেফ হাওয়া হয়ে যায়। দক্ষিণ কোরিয়ার ‘কোসপি’ সূচক এবং জাপানের ‘নিক্কেই ২২৫’ সূচক উভয়ই ৬ শতাংশ পতন নিয়ে দিন শেষ করেছে। অন্যদিকে তাইওয়ানের বেঞ্চমার্ক ‘তায়েক্স’ সূচক ৪.৫ শতাংশ কমে বন্ধ হয়েছে।
বাজারের এই আচরণ মূলত এ বছরের সবচেয়ে লাভজনক খাত এআই বাণিজ্য থেকে বিনিয়োগকারীদের পিছু হটার প্রতিফলন। এশীয় প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো, যারা বৈশ্বিক ইলেকট্রনিক্স সরবরাহ শৃঙ্খলে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে, তারা মূলত এআই ডেটা সেন্টারগুলো তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় সেমিকন্ডাক্টর চিপের মতো উপাদানগুলোর বিপুল চাহিদার কারণে এতদিন চাঙা ছিল।
আরও পড়ুন: এবার লস অ্যাঞ্জেলেসের মেয়র নির্বাচনে ভারতীয় বংশোদ্ভূত নিত্যা রমনের অবিশ্বাস্য জয়
ইউরোপীয় বাজারগুলোও পতনের ধারায় ছিল। শুরুতেই ইউরোপীয় বেঞ্চমার্ক ‘স্টক্স ৬০০’ সূচক ১.১ শতাংশ কমে যায়। অন্যদিকে ফ্রান্সের ‘সিএসি ৪০’ এবং জার্মানির ‘ড্যাক্স’ যথাক্রমে ১.৪ শতাংশ এবং ১.৩ শতাংশের নিচে লেনদেন করছিল।
চিপ তৈরির সরঞ্জাম প্রস্তুতকারক ওলন্দাজ প্রতিষ্ঠান এবং এআই শিল্পের সাথে যুক্ত ইউরোপের বৃহত্তম কম্পানি ‘এএসএমএল’-এর শেয়ারের দাম গত বৃহস্পতিবার ৬.৬ শতাংশ কমে গিয়েছিল; যদিও শুক্রবার সকালের মধ্যে তারা সেই ক্ষতির বেশিরভাগই কাটিয়ে উঠে প্রায় ৬ শতাংশের ওপরে লেনদেন করছিল।
শুক্রবার প্রথম দিকের লেনদেনে মার্কিন বাজার কিছুটা মিশ্র অবস্থায় ছিল। যেখানে ডাও জোন্স ০.৮ শতাংশ কমেছিল এবং এসঅ্যান্ডপি ৫০০ ও প্রযুক্তি-ভারি নাসডাক যথাক্রমে ০.৩ শতাংশ এবং ১.৪ শতাংশ বেড়েছিল। বাজারে বড় পতনের পর অনেক সময়ই কিছুটা ঘুরে দাঁড়ানোর প্রবণতা দেখা যায়। কারণ কিছু বিনিয়োগকারী কম দামে শেয়ার কেনার জন্য এই সুযোগে এগিয়ে আসেন। বৃহস্পতিবার ৯ শতাংশের বেশি ধস নামার পর প্রাক-বাজার লেনদেনে এনভিডিয়া এবং স্পেসএক্স উভয়ই প্রায় ৪ শতাংশ বেড়ে প্রাথমিক ধাক্কা কাটিয়ে উঠছিল।
মেটা, অ্যামাজন এবং গুগলের মতো মার্কিন প্রযুক্তি জায়ান্টগুলো এআই পরিচালনার জন্য নতুন ডেটা সেন্টারে বিশাল অঙ্কের ব্যয়ের কারণে ‘হাইপারস্কেলার’ হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। কলম্বিয়া বিজনেস স্কুলের একটি সমীক্ষা অনুমান করেছে যে, গত বছরের শেষ নাগাদ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দৃশ্যমান জিডিপি প্রবৃদ্ধির প্রায় পুরোটাই এই এআই-সম্পর্কিত অবকাঠামো বিনিয়োগের হাত ধরে এসেছিল। তবে, নতুন ডেটা সেন্টারগুলোর পরিবেশগত এবং স্থানীয় সামাজিক প্রভাবের বিরুদ্ধে তৈরি হওয়া গণ-অসন্তোষ এবারের ইউএস মধ্যবর্তী নির্বাচনে এআই ব্যয়কে একটি প্রধান রাজনৈতিক ইস্যুতে পরিণত করেছিল। নির্বাচনে একচেটিয়া জয় এখন এই আশঙ্কা বাড়িয়ে দিয়েছে যে, ডেমোক্র্যাট প্রার্থীরা নতুন এআই অবকাঠামোর ব্যয় আটকে দিতে বা মন্থর করতে পারেন; যা মূলত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং এশিয়া—উভয় অঞ্চলেরই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির একটি প্রধান চালিকাশক্তিকে হুমকির মুখে ফেলবে।
আরও পড়ুন: গভর্নরের নির্দেশ: উদ্যোক্তাদের জন্য নিশ্চিত করতে হবে ৬০ হাজার কোটি টাকার অর্থায়ন প্যাকেজের সুবিধা
সাম্প্রতিক এই অস্থিরতা এশীয় বাজারের জন্য বছরের পর বছর ধরে চলতে থাকা তীব্র ওঠানামারই অংশ। কারণ বিনিয়োগকারীরা এই এআই জোয়ারের স্থায়িত্ব এবং এই ধরনের বিশাল বিনিয়োগের চূড়ান্ত লাভজনকতা নিয়ে প্রতিনিয়ত হিসাব-নিকাশ করছেন। ফাইবোনাচ্চি অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট গ্লোবালের প্রতিষ্ঠাতা ও সিইও জুং ইন ইউন শুক্রবার বলেন, বিনিয়োগকারীরা এআই বিনিয়োগ এবং রাজনৈতিক নীতিমালার চারপাশের প্রত্যাশাগুলো নতুন করে মূল্যায়ন করার কারণেই সম্ভবত শুক্রবারের এই বড় ধসটি নেমেছে। তবে তিনি বিশ্বাস করেন যে, কম্পিউটিং পাওয়ারের চাহিদা বাড়তেই থাকবে এবং এর সাথে স্যামসাং ইলেকট্রনিক্স এবং এসকে হাইনিক্সের তৈরি মেমরি চিপগুলোর চাহিদাও বজায় থাকবে। তিনি বলেন, ‘দক্ষিণ কোরিয়ার প্রযুক্তি-নির্ভর বাজারটি মানুষের সেন্টিমেন্ট বা মনোভাবের পরিবর্তনের প্রতি বিশেষভাবে সংবেদনশীল, তাই বাজারে আস্থা ফিরে আসার আগে আমরা আরো কিছু ওঠানামা দেখতে পারি।’
দক্ষিণ কোরিয়া এবং জাপান—উভয় দেশের সরকারি কর্মকর্তারাই শুক্রবার তাদের নিজ নিজ শেয়ার বাজারের এই সাম্প্রতিক অস্থিরতার কথা স্বীকার করেছেন। জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি বলেন, ‘আমি অবগত আছি যে শেয়ারের দাম, বিশেষ করে এআই এবং চিপ খাতের দাম ব্যাপকভাবে কমছে।’ তিনি আরো যোগ করেন যে, সরকার বাজারের পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। তিনি বলেন, ‘আমরা একটি শক্তিশালী অর্থনীতি গড়ে তোলার পদক্ষেপগুলোর ওপর মনোনিবেশ করব।’
দক্ষিণ কোরিয়ার অর্থ ও অর্থনীতিমন্ত্রী লি হিউং-ইলও শুক্রবার মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনের ফলাফলের প্রভাব নিয়ে একটি বৈঠক করেছেন। মন্ত্রণালয়ের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, নেতৃবৃন্দ মূল্যায়ন করেছেন যে বৈশ্বিক বাজারে এর একটি প্রভাব পড়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। কোরিয়ান শেয়ার বাজারে যেন কোনো অতিরঞ্জিত প্রতিক্রিয়া তৈরি না হয়, সে জন্য তারা আগেভাগেই প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন।
এআই খাতের নতুন ডাটা বা অগ্রগতির ওপর ভিত্তি করে খুচরা এবং প্রাতিষ্ঠানিক—উভয় ধরনের বিনিয়োগকারীরা প্রতিক্রিয়া দেখানোর ফলে বিশ্বজুড়ে প্রযুক্তি শেয়ারগুলো এই বছর মনোভাবের আকস্মিক পরিবর্তনের প্রতি অত্যন্ত সংবেদনশীল ছিল। হংকংয়ের অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট ফার্ম ইই ক্যাপিটাল-এর অংশীদার থিওডোর শো বলেন, ‘আমরা যদি বাজারে কেবল এআই-সম্পর্কিত শেয়ারগুলোর ওপর ফোকাস করি, তবে আমি যুক্তি দেব যে এই বছরের শুরুর দিকে এটি নিয়ে অতিরিক্ত হাইপ তৈরি হয়েছিল। আমি মনে করি বাজার এখন নিজেই নিজেকে কিছুটা সামলে নিচ্ছে।’ এআই নিয়ে উদ্দীপনা বাড়ার সাথে সাথে থিওডোর শো বলেন যে, ‘এশীয় প্রযুক্তি শেয়ারগুলো এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি মাত্রায় তাদের মার্কিন সমকক্ষ শেয়ারগুলোর সাথে সরাসরি সম্পর্কিত হয়ে পড়েছে।’
আরও পড়ুন: ইন্দোনেশিয়ায় প্রেসিডেন্টের ফোনে আড়িপাতার অভিযোগে চিফ অব স্টাফ গ্রেপ্তার
গত বৃহস্পতিবার মার্কিন বাজারে যে ধস নেমেছিল, তার নেতৃত্ব দিয়েছিল প্রযুক্তিনির্ভর নাসডাক সূচকের ৫.৫ শতাংশের পতন। ২০২৫ সালের এপ্রিল মাসের পর এটি ছিল নাসডাকের সবচেয়ে খারাপ দিন।
ব্যবসায়ীরা যখন আগামী বছরের শুরুতে মধ্যবর্তী নির্বাচনে জয়ী প্রার্থীদের দায়িত্ব নেওয়ার অপেক্ষায় আছেন, তখন বিশ্লেষকেরা বলছেন বৈশ্বিক বাজারগুলো সম্ভবত প্রযুক্তি এবং আর্থিক নীতিমালার পরিবর্তনের প্রতি সংবেদনশীল থাকবে। এশীয় ইক্যুইটি নিয়ে কাজ করা অ্যান্ড্রু সুলিভান লিখেছেন, ‘বাজার যে জিনিসটি সবচেয়ে বেশি অপছন্দ করে তা হলো অনিশ্চয়তা। এবং বাজার আসলে যা বলছে তা হলো— আগামী জানুয়ারিতে কী ঘটতে যাচ্ছে সে বিষয়ে আমরা নিশ্চিত নই। সুতরাং, আসুন আমরা একটু পিছিয়ে যাই। আমরা কিছু টাকা নগদে রূপান্তর করে রাখি। যা পরবর্তীতে পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত হলে ব্যবহার করা যাবে।’
সূত্র : সিএনএন
আরও পড়ুন: পুতিনের দূতের সাথে বৈঠক করে ট্রাম্পের বড় ইউরোপীয় নিরাপত্তা চুক্তির ইঙ্গিত
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন