০৮:৩৭ পি.এম
যুক্তরাষ্ট্র কি সত্যিই গোলাবারুদ সঙ্কটে ভুগছে? এই প্রশ্নটি বর্তমানে বিশ্ব রাজনীতির ক্ষেত্রেও এবং সামরিক বিশ্লেষকদের আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। সাম্প্রতিক একটি প্রতিবেদনে নির্দেশ করা হয়েছে যে, ইউক্রেন যুদ্ধ এবং মধ্যপ্রাচ্যে চলমান দীর্ঘস্থায়ী উত্তেজনার কারণে মার্কিন সামরিক ভাণ্ডার প্রায় তলানিতে পৌঁছেছে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প অবশ্য প্রকাশ্যে দাবি করেছেন যে, যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্রের কোনো পরিমাণেই অভাব নাই, কিন্তু প্রকৃত চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। ইউক্রেনীয় প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির কাছে প্যাট্রিয়ট মিসাইল ইন্টারসেপ্টর পাঠাতে অস্বীকৃতি জানিয়ে ট্রাম্প বলেছে যে, এই অস্ত্রগুলো আমেরিকার নিজস্ব সুরক্ষার জন্য অত্যন্ত জরুরি।
পেন্টাগনের কিছু ফাঁস হওয়া তথ্য থেকে জানা যায় যে, সংকটটি সাধারন অনুমানের ভিত্তিতে নয়, বরং এটি সুনির্দিষ্ট পরিসংখ্যানের বাস্তবতা। ইরানের সঙ্গে চলমান এবং সম্ভাব্য সংঘাতের প্রেক্ষাপটে, মার্কিন প্রতিরক্ষা বাহিনী তাদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার বড় একটি অংশ ইতোমধ্যে ব্যবহার করে ফেলেছে। থাড এবং প্যাট্রিয়ট মিসাইল সিস্টেমের মতো গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্র এখন মারাত্মকভাবে ফুরিয়ে এসেছে। মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের ড্রোন ও মিসাইল হামলার কারণে মার্কিন থাড ব্যবস্থার প্রধান উপাদান হিসেবে ব্যবহৃত একাধিক এক্স-ব্যান্ড রাডার গুরুতর ক্ষতিগ্রস্ত কিংবা পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে গেছে, যা মার্কিন সুরক্ষাবলয়ের নিরাপত্তাকে মারাত্মকভাবে ঝুঁকির মধ্যে ফেলেছে।
এমনকি প্যাট্রিয়ট এয়ার ডিফেন্স সিস্টেমের অবস্থাও একই। তথ্যানুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র এবং তাদের মিত্র বাহিনী তাদের পিএসি-২ এবং পিএসি-৩ ইন্টারসেপ্টরের বড় একটি অংশ ইতিমধ্যেই ব্যবহার করে ফেলেছে। মধ্যপ্রাচ্য সংঘাতে যাওয়ার আগে আমেরিকায় যে পরিমাণ পিএসি-৩ ইন্টারসেপ্টর ছিল, তার একটি বড় অংশ ড্রোন ও ব্যালিস্টিক মিসাইল প্রতিহত করার কাজে ব্যয় হয়েছে। বর্তমানে যে কয়েকটি ইন্টারসেপ্টর রয়েছে, তা দিয়ে কার্যক্ষম ব্যাটারিগুলো চালু রাখা খুবই কষ্টকর হয়ে দাঁড়িয়েছে। যদিও পুরোনো প্রযুক্তির পিএসি-২ মিসাইলগুলো মজুদ রয়েছে, সেগুলোর কার্যকারিতা আধুনিক ও জটিল হুমকির মোকাবিলায় যথেষ্ট সন্দেহজনক।
আরও পড়ুন: সীতাকুণ্ডে ইয়াবা কারবারিদের ধরে টাকা নিয়ে ছেড়ে দেয় পুলিশ, থানার ক্যাশিয়ার নিয়ে উঠেছে প্রশ্ন
অস্ত্র উৎপাদনের গতি বর্তমান চাহিদার তুলনায় অত্যন্ত ধীর। প্যাট্রিয়ট ইন্টারসেপ্টরের প্রধান উৎপাদক লকহিড মার্টিন এবং এর সহায়ক যন্ত্রাংশ প্রস্তুতকারক বোয়িং সংস্থার উৎপাদন লাইনে বেশ কিছু জটিল ব্যাঘাত দেখা দিয়েছে। একটি সম্পূর্ণ প্যাট্রিয়ট ইন্টারসেপ্টর প্রস্তুত করতে এবং এর প্রয়োজনীয় মান নিশ্চিত করতে যাৎ দীর্ঘ সময়ের প্রয়োজন হয়। বর্তমান বৈশ্বিক চাহিদা এবং উৎপাদনের ব্যবধান এতটাই অনেক যে, পুরনো গতিতে উৎপাদন চালিয়ে গেলে এই ঘাটতি পূরণ করতে বহু বছর সময় লাগবে।
এ বিষয়টি আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার দিকেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং স্থলযুদ্ধের এক গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্র এটিএসিএমএস মিসাইলের অবস্থাও প্রায় একই রকম। ইউক্রেনে সামরিক সহায়তা প্রদান এবং মধ্যপ্রাচ্যে চলমান ব্যবহারের ফলে মার্কিন সেনাবাহিনীর এই দীর্ঘপাল্লার গাইডেড মিসাইলের ভাণ্ডারও প্রায় শূন্য হতে চলেছে। বিকল্প হিসেবে যে প্রিজম মিসাইল আসার কথা ছিল, সেটি এখনও উৎপাদনের প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। এ কারণে বর্তমানে ইউক্রেন, মধ্যপ্রাচ্য, কিংবা তাইওয়ান ও কোরিয়ার মতো সংবেদনশীল অঞ্চলে এই বিশেষ মিসাইল সরবরাহের পথ আপাতত বন্ধ হয়ে গেছে বললে চলে।
স্থলবাহিনীর পদাতিক যুদ্ধের সবচেয়ে বড় চালিকাশক্তি ১৫৫ মিলিমিটার আর্টিলারি শেলের সাপ্লাই চেইনও কঠিন সংকটে রয়েছে। গত কয়েক বছর ধরে, ইউক্রেন এবং মধ্যপ্রাচ্যের ফ্রন্টলাইনে কোটি কোটি রাউন্ড শেল ব্যবহার হয়ে গেছে যার কারণে পশ্চিমা বিশ্বের মজুদে বড় ধরনের ধস নেমেছে। মার্কিন সরকার টেক্সাসে একটি নতুন স্বয়ংক্রিয় উৎপাদন কেন্দ্র স্থাপন করে উৎপাদন বাড়ানোর প্রচেষ্টা চালালেও বিভিন্ন প্রশাসনিক ও প্রযুক্তিগত জটিলতার জন্য তা এখনও প্রত্যাশিত ফল দিতে পারেনি। এর ফলে, নতুন কোনো নির্ভরযোগ্য বিকল্প না পাওয়া পর্যন্ত আর্টিলারি শেলের এই ঘাটতি কাটিয়ে ওঠা মার্কিন সেনাবাহিনীর জন্য একটি বিশাল চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এই বিশেষ অস্ত্র সংকট আগামী দশকে মার্কিন নিরাপত্তা নীতি ও বৈশ্বিক কৌশলগত স্থিতিতে সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলতে বাধ্য। বিশ্বমঞ্চে যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য প্রতিপক্ষরা এই দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে ভূ-রাজনীতিতে নিজেদের প্রভাব বৃদ্ধি করতে পারে, যার ফলস্বরূপ ইউক্রেনের পতন কিংবা তাইওয়ান এবং কোরিয়া উপদ্বীপে বড় ধরনের সামরিক সংঘাতের ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যেতে পারে। যদিও মার্কিন সশস্ত্র বাহিনী বিমান চলাচল এবং প্রযুক্তিগত দিক থেকে এখনও শক্তিশালী, তবে লজিস্টিক এবং যুদ্ধাস্ত্রের এই দীর্ঘমেয়াদি ঘাটতি আমেরিকার বৈশ্বিক প্রভাবকে দুর্বল করে দিচ্ছে।
আরও পড়ুন: ইশরাকের পদত্যাগের পর স্ত্রীর রহস্যময় পোস্ট
বিশ্লেষকদের মতে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে এখন তাদের সামগ্রিক প্রতিরক্ষা কৌশল পুনরুদ্ধারের প্রয়োজন এবং প্রতিরক্ষা শিল্পের উৎপাদন ব্যবস্থাকে মৌলিক পরিবর্তন আনতে হবে। মিত্র দেশগুলোকেও তাদের নিজস্ব নিরাপত্তার দায়িত্ব নিজেদের কাঁধে নেওয়ার সময় এসেছে, কারণ আমেরিকান নিরাপত্তার ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতার দিন শেষ হচ্ছে। আগামী দশকটি স্নায়ুযুদ্ধের সমাপ্তির পর বিশ্ব শান্তি ও নিরাপত্তার জন্য সবচেয়ে বড় পরীক্ষার সময় হতে যাচ্ছে, যেখানে সামান্য ভুলের মাশুল গোটা বিশ্বকে দিতে হতে পারে।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন