০৮:১৮ পি.এম
ভারত তার প্রতিরক্ষা উৎপাদন খাতের সবচেয়ে স্পর্শকাতর ক্ষেত্রগুলোর একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের জন্য আরও উন্মুক্ত করার পথে বড় পদক্ষেপ নিয়েছে। দেশটির রাষ্ট্রীয় প্রতিরক্ষা গবেষণা ও উন্নয়ন সংস্থা—ডিফেন্স রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট অরগানাইজেশন (ডিআরডিও)—উন্নত সব প্রচলিত ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থার প্রযুক্তি দেশীয় বেসরকারি শিল্পে হস্তান্তরের অনুমোদন দিয়েছে সরকার।
মঙ্গলবার ভারতের প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিং এ সংক্রান্ত প্রস্তাবে অনুমোদন দেন বলে দেশটির প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে।
সরকারের এ সিদ্ধান্তকে ভারতের প্রতিরক্ষা উৎপাদন খাতে বড় ধরনের পরিবর্তন হিসেবে দেখা হচ্ছে। এত দিন ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদনের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ও সরকারি গবেষণাগারের প্রভাব ছিল ব্যাপক। নতুন সিদ্ধান্তের ফলে নির্ধারিত কারিগরি যোগ্যতা, সনদ ও অন্যান্য নিয়ন্ত্রক শর্ত পূরণ সাপেক্ষে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোও ক্ষেপণাস্ত্রের প্রযুক্তি ও উৎপাদন অধিকার পাওয়ার জন্য প্রতিযোগিতা করতে পারবে।
আরও পড়ুন: পাকিস্তান-আফগান সীমান্তে তালেবানের হামলায় ১ নিহত, ৫ আহত
ভারত সরকারের দাবি, এর মূল লক্ষ্য হলো ক্ষেপণাস্ত্রের গবেষণা ও উন্নয়ন থেকে ব্যাপক উৎপাদনে যাওয়ার প্রক্রিয়া দ্রুত করা, দেশে প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম উৎপাদন বাড়ানো এবং বিদেশ থেকে অস্ত্র আমদানির ওপর নির্ভরতা কমানো।
তবে প্রশ্ন উঠেছে—ভারতের বেসরকারি প্রতিরক্ষা শিল্প কি সামরিক বাহিনীর প্রয়োজন অনুযায়ী জটিল ক্ষেপণাস্ত্র ব্যাপক পরিসরে এবং নির্ভরযোগ্যতার সঙ্গে উৎপাদন করতে পারবে? ভারত কি ধীরে ধীরে নিজস্ব সামরিক-শিল্প কাঠামো বা ‘মিলিটারি-ইন্ডাস্ট্রিয়াল কমপ্লেক্স’ গড়ে তুলছে? আর এত সংবেদনশীল প্রযুক্তি বেসরকারি খাতে হস্তান্তরে নিরাপত্তাঝুঁকি কতটা?
কী ঘোষণা দিয়েছে ভারত?
ভারতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ডিআরডিওর তৈরি সব প্রচলিত ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থার প্রযুক্তি ভারতীয় প্রতিরক্ষা কোম্পানিগুলোর কাছে হস্তান্তরের অনুমোদন দিয়েছেন রাজনাথ সিং। এর মাধ্যমে দেশেই এসব ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদনের সুযোগ তৈরি হবে।
মন্ত্রণালয়ের ভাষ্য, এই উদ্যোগের উদ্দেশ্য দেশের অভ্যন্তরীণ উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানো, প্রতিরক্ষা শিল্পের ভিত্তি শক্তিশালী করা এবং ক্ষুদ্র, ছোট ও মাঝারি শিল্পপ্রতিষ্ঠানসহ (এমএসএমই) বিভিন্ন প্রযুক্তি অংশীদারকে সরবরাহব্যবস্থায় যুক্ত করা।
আরও পড়ুন: বিদ্যুৎখাতে লুটপাটের জন্য ইনডেমনিটি দিয়েছিল আওয়ামী সরকার: রিজভী
এ উদ্যোগের মাধ্যমে ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থার গবেষণা ও উন্নয়ন পর্যায় থেকে শিল্পভিত্তিক উৎপাদনে সফলভাবে রূপান্তর ঘটানো সম্ভব হবে বলেও জানিয়েছে মন্ত্রণালয়।
বেঙ্গালুরুভিত্তিক তাকশশিলা ইনস্টিটিউশনের গবেষক আদিত্য রামানাথনের মতে, এই সিদ্ধান্তের আওতা বেশ বিস্তৃত।
তিনি বলেন, এর মধ্যে ভূমি থেকে আকাশে নিক্ষেপযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র, আকাশ থেকে আকাশে নিক্ষেপযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র, অ্যান্টি-রেডিয়েশন ক্ষেপণাস্ত্র, ট্যাংকবিধ্বংসী ব্যবস্থা এবং ভূমিতে আঘাত হানতে সক্ষম ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রের মতো অপেক্ষাকৃত ভারী অস্ত্রও থাকতে পারে।
কেন এমন সিদ্ধান্ত নিল ভারত?
ভারতে দীর্ঘদিন ধরে ডিআরডিওর তৈরি অস্ত্র ব্যাপক পরিসরে উৎপাদনের দায়িত্ব মূলত রাষ্ট্রীয় প্রতিরক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর হাতে ছিল। ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদনে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ভারত ডায়নামিকস লিমিটেডের (বিডিএল) দীর্ঘদিনের প্রায় একচেটিয়া প্রভাব ছিল।
আরও পড়ুন: দুর্লভ ডাইনোসর ‘জোডি’ ৪৭.৩ মিলিয়ন ডলারে বিক্রি, বিজ্ঞানীদের অসন্তোষ
রামানাথনের মতে, নতুন সিদ্ধান্ত সেই কাঠামোয় বড় পরিবর্তন আনবে। তার ভাষায়, এত দিন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো ক্ষেপণাস্ত্রের বিভিন্ন উপাদান তৈরি করলেও এখন তারা সরাসরি মূল ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা তৈরির পর্যায়ে যেতে পারবে।
ভারত বর্তমানে নিজেদের তৈরি ক্ষেপণাস্ত্রের ওপর অনেকটাই নির্ভরশীল হলেও রাশিয়া ও ইসরায়েলের মতো গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্র সরবরাহকারী দেশ থেকেও বিভিন্ন ক্ষেপণাস্ত্র আমদানি করে।
তবে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বাধীন সরকার গত কয়েক বছর ধরে প্রতিরক্ষা খাতে আত্মনির্ভরতা বাড়ানোর ওপর জোর দিয়েছে। ‘আত্মনির্ভর ভারত’ নীতির আওতায় দেশে অস্ত্র উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি বিদেশি প্রতিরক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকে ভারতেই উৎপাদনকেন্দ্র স্থাপনে উৎসাহিত করা হচ্ছে।
এর পেছনে ভূরাজনৈতিক বাস্তবতাও গুরুত্বপূর্ণ। পাকিস্তান ও চীনের সঙ্গে ভারতের দুটি গুরুত্বপূর্ণ সীমান্তে অনিশ্চয়তা রয়েছে। একই সময়ে গত এক দশকে ভারতের প্রতিরক্ষা বাজেট উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ২০১৪ সালে দেশটির প্রতিরক্ষা বাজেট ছিল প্রায় ৩৮ বিলিয়ন ডলার; চলতি অর্থবছরে তা বেড়ে প্রায় ৮৬ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে।
আরও পড়ুন: মার্কিন নির্বাচনে নাগরিকত্ব ছাড়াই ভোট দেওয়ার অভিযোগে বাংলাদেশি যুবকের বিরুদ্ধে মামলা
গত বছর পারমাণবিক অস্ত্রধারী প্রতিবেশী পাকিস্তানের সঙ্গে চার দিনের সংঘাতও ভারতের প্রতিরক্ষা প্রস্তুতিতে নতুন তাগিদ তৈরি করেছে। চলতি বছরের প্রতিরক্ষা বাজেট আগের বছরের তুলনায় ১৬ শতাংশ বেশি।
রামানাথনের মতে, সাম্প্রতিক বিভিন্ন যুদ্ধও ভারতের নীতিনির্ধারকদের চিন্তায় প্রভাব ফেলেছে। ইউক্রেন যুদ্ধ, ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধ এবং গত বছরের ভারত-পাকিস্তান সংঘাত থেকে ভারত বড় আকারের অস্ত্র মজুতের প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করেছে।
তার মতে, দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতে ক্ষেপণাস্ত্র ও অন্যান্য নির্ভুল অস্ত্রের মজুত দ্রুত শেষ হয়ে যেতে পারে। একই সঙ্গে প্রতিপক্ষের হামলায় অস্ত্রভাণ্ডারও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। ফলে যুদ্ধের জন্য পর্যাপ্ত ‘ম্যাগাজিন ডেপথ’ বা বড় মজুত নিশ্চিত করা জরুরি।
চীনকে ঠেকাতেও বড় অস্ত্রভাণ্ডার চায় ভারত
ভারতের সামরিক পরিকল্পনায় চীন একটি বড় বিবেচ্য বিষয় বলে মনে করেন রামানাথন।
আরও পড়ুন: ১২৪ কোটি টাকার ক্ষতিপূরণ মামলা ট্রাম্পের বিরুদ্ধে
তার মতে, ভারতের সবচেয়ে সক্ষম প্রতিপক্ষ চীনের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ তৈরি করতে হলে দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের কয়েক সপ্তাহ ধরে বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি সামাল দেওয়ার পাশাপাশি প্রতিপক্ষের ওপরও বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি চাপিয়ে দেওয়ার সক্ষমতা দেখাতে হবে।
ভারত একই সঙ্গে তিন বাহিনীর সমন্বিত প্রচলিত ক্ষেপণাস্ত্র বাহিনী গড়ে তুলছে। কার্যকর একটি ক্ষেপণাস্ত্র বাহিনী গড়ে তুলতে বিপুল পরিমাণ ক্ষেপণাস্ত্র মজুত প্রয়োজন হবে। আর এই বিশাল উৎপাদন সক্ষমতা গড়ে তুলতে বেসরকারি খাতের সক্রিয় অংশগ্রহণ অপরিহার্য বলে মনে করেন তিনি।
ভারতের বেসরকারি প্রতিরক্ষা শিল্প কতটা প্রস্তুত?
ভারতে বেসরকারি প্রতিরক্ষা শিল্প গত কয়েক বছরে দ্রুত সম্প্রসারিত হয়েছে। সামরিক উৎপাদন সক্ষমতা বাড়াতে বড় শিল্পগোষ্ঠীগুলো বিপুল বিনিয়োগ করছে।
জুনে ভারত দেশীয় নির্মাতাদের কাছ থেকে ২ বিলিয়ন ডলারের বেশি মূল্যের সামরিক ড্রোন কেনার প্রস্তুতির কথা জানায়। দেশটির ড্রোন শিল্পে ৬০০টির বেশি প্রতিষ্ঠান যুক্ত হয়েছে। এর মধ্যে আদানি, লারসেন অ্যান্ড টুব্রো এবং টাটা অ্যাডভান্সড সিস্টেমসের মতো বড় শিল্পগোষ্ঠীর পাশাপাশি বিভিন্ন স্টার্টআপও রয়েছে।
আরও পড়ুন: সরকারকে সেলিম উদ্দিনের আহ্বান, গণরায়ের বিরুদ্ধে না গিয়ে জনগণের পক্ষে দাঁড়ান
জুলাইয়ে ভারতীয় সশস্ত্র বাহিনীর জন্য ৫ দশমিক ৪৬ বিলিয়ন ডলার মূল্যের বিভিন্ন সামরিক সরঞ্জাম কেনার অনুমোদন দেওয়া হয়। এর মধ্যে ক্ষেপণাস্ত্র, ইলেকট্রনিক যুদ্ধব্যবস্থা এবং কামিকাজে ড্রোনও রয়েছে।
ভারত নৌবাহিনীও দ্রুত আধুনিকায়নের চেষ্টা করছে। ভারত মহাসাগরের গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাবের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে গত ডিসেম্বরে অন্তত ৭৫টি যুদ্ধজাহাজ ও সাবমেরিন সংগ্রহের পরিকল্পনা ঘোষণা করে নয়াদিল্লি। এর অধিকাংশই দেশে নির্মাণের কথা রয়েছে।
একই সঙ্গে বিদেশি অস্ত্র সরবরাহের উৎসও বহুমুখী করার চেষ্টা করছে ভারত। দীর্ঘদিন রাশিয়ার ওপর ব্যাপক নির্ভরতার পর গত এক দশকে যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স এবং ক্রমবর্ধমানভাবে ইসরায়েলের সঙ্গে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা বাড়িয়েছে নয়াদিল্লি।
ক্ষেপণাস্ত্র তৈরিতে বেসরকারি কোম্পানির সক্ষমতা কতটা?
ভারতের বড় বেসরকারি শিল্পগোষ্ঠীগুলো গোলাবারুদ, ড্রোন, মহাকাশ প্রযুক্তি ও সামরিক ইলেকট্রনিকস খাতে বড় বিনিয়োগ করেছে। সাম্প্রতিক সময়ে তারা ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদনের জন্য বিশেষ অবকাঠামো গড়ার দিকেও এগিয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ঘনিষ্ঠ ব্যবসায়ী গৌতম আদানির মালিকানাধীন আদানি ডিফেন্স অ্যান্ড অ্যারোস্পেস ২০২৪ সালে উত্তর প্রদেশে গোলাবারুদ ও ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদনকেন্দ্র স্থাপনে ৩০ বিলিয়ন রুপি বা প্রায় ৩১৫ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের পরিকল্পনা ঘোষণা করে।
এসব স্থাপনায় ক্ষেপণাস্ত্র ও নির্ভুল অস্ত্রে ব্যবহৃত বিস্ফোরক নিয়ে কাজ করার সক্ষমতাও থাকার কথা।
তবে শুধু বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি দিলেই জটিল ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন সম্ভব নয়। রামানাথনের মতে, শেষ পর্যন্ত সরকারের অর্ডারের ওপরই এ উদ্যোগের সাফল্য নির্ভর করবে।
তিনি বলেন, ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি অত্যন্ত জটিল ও ব্যয়বহুল। এ জন্য কোম্পানিগুলোকে অবকাঠামো, প্রযুক্তি ও দক্ষ জনবলে বিপুল বিনিয়োগ করতে হবে। এসব বিনিয়োগ তখনই লাভজনক হবে, যখন সরকার যথেষ্ট বড় অর্ডার দেবে এবং কোম্পানিগুলো গবেষণা ও উন্নয়নে পুনরায় বিনিয়োগ করার মতো মুনাফা করতে পারবে।
ভারতের হাতে কী ধরনের ক্ষেপণাস্ত্র রয়েছে?
ভারতের কাছে বিভিন্ন ধরনের ক্রুজ ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র রয়েছে। এর কয়েকটি পারমাণবিক ওয়ারহেড বহনেও সক্ষম।
চলতি বছরের মে মাসে ২০২৫ সালের ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের প্রথম বার্ষিকীতে ভারত সফলভাবে অগ্নি-৫ ক্ষেপণাস্ত্রের পরীক্ষা চালায়। এটি ভারতের সবচেয়ে উন্নত পারমাণবিক অস্ত্র বহনে সক্ষম আন্তমহাদেশীয় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রগুলোর একটি। এর পাল্লা প্রায় ৫ হাজার ৫০০ কিলোমিটার, যা চীনের পুরো ভূখণ্ড, মধ্যপ্রাচ্য এবং ইউরোপের কিছু অংশ পর্যন্ত পৌঁছাতে সক্ষম।
ভারতের অন্যান্য ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের পাল্লাও ব্যাপক। পৃথ্বী-১-এর পাল্লা প্রায় ১৫০ কিলোমিটার থেকে শুরু করে অগ্নি-৪-এর পাল্লা প্রায় ৪ হাজার কিলোমিটার পর্যন্ত।
এছাড়া ভারতের হাতে রয়েছে শক্তিশালী ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র ব্রাহ্মোস। রাশিয়ার সঙ্গে যৌথভাবে তৈরি এই ক্ষেপণাস্ত্রের পাল্লা প্রায় ৫০০ কিলোমিটার। গত বছর ভারত-পাকিস্তান সংঘাতেও এটি ব্যবহার করা হয়েছিল।
ক্ষেপণাস্ত্র রফতানিতেও এগোচ্ছে ভারত
ভারত সাম্প্রতিক বছরগুলোতে অস্ত্র রফতানি উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়েছে। মোদি ক্ষমতায় আসার সময় ২০১৪-১৫ অর্থবছরে দেশটির সামরিক রফতানি ছিল মাত্র ৭২ কোটি ডলার। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তা প্রায় ৪ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে।
দেশটির দ্রুত বেড়ে ওঠা প্রতিরক্ষা নির্মাতা প্রতিষ্ঠান প্যারাস ডিফেন্স জানিয়েছে, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে তাদের রফতানি দ্বিগুণেরও বেশি বেড়ে প্রায় ১৪ মিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে সামরিক সরঞ্জামের চাহিদা বাড়ার বিষয়টিও এর পেছনে ভূমিকা রাখছে।
ভারতীয় অস্ত্র নির্মাতারা বিদেশি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগেও কাজ করছে। আদানি ডিফেন্স ইসরায়েলের বৃহত্তম অস্ত্র নির্মাতা এলবিট সিস্টেমসের সঙ্গে অংশীদারত্বে হার্মিস-৯০০ সশস্ত্র ড্রোন তৈরি করছে।
এদিকে ২০২৪ সালে আল-জাজিরার এক অনুসন্ধানে উঠে আসে, গাজা যুদ্ধের সময় ভারত ইসরায়েলে রকেটের যন্ত্রাংশ ও গোলাবারুদ রফতানি করেছে। একই সময়ে মোদি সরকার প্রকাশ্যে গাজা যুদ্ধের অবসানে কূটনৈতিক সমাধানের আহ্বান জানিয়েছিল।
২০২৬ সালের জুনে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল এক প্রতিবেদনে দাবি করে, ইসরায়েলে ভারতের অস্ত্র রফতানি গাজায় সংঘটিত কর্মকাণ্ডে দেশটিকে জড়িয়ে ফেলেছে।
শুধু ইসরায়েল নয়, ভারতীয় অস্ত্রের ক্রেতা হিসেবে আরও কয়েকটি দেশ সামনে এসেছে। ২০২২ সালে ফিলিপাইন ভারত থেকে ব্রাহ্মোস ক্ষেপণাস্ত্রের তিনটি ব্যাটারি কেনে। পরে ভিয়েতনাম ও ইন্দোনেশিয়াও এসব ক্ষেপণাস্ত্র কেনার জন্য ভারতের সঙ্গে চুক্তি করেছে। সংযুক্ত আরব আমিরাতকেও ব্রাহ্মোস সরবরাহের প্রস্তাব দিয়েছে নয়াদিল্লি।
সামরিক-শিল্প শক্তি গড়ার পথে ভারত?
বিশ্লেষকদের মতে, সর্বশেষ পদক্ষেপটি ভারতের একটি শক্তিশালী সামরিক-শিল্প কাঠামো গড়ে তোলার বৃহত্তর পরিকল্পনার অংশ।
এর আগে চলতি বছর ভারত পরবর্তী প্রজন্মের যুদ্ধবিমান তৈরির জন্য কয়েকটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে প্রাথমিকভাবে বাছাই করেছে। টাটা অ্যাডভান্সড সিস্টেমস এবং ভারত ফোর্জের মতো প্রতিষ্ঠান এখন আর্টিলারি ব্যবস্থা, গোলাবারুদ ও মহাকাশ প্রযুক্তির গুরুত্বপূর্ণ নির্মাতা হিসেবে উঠে আসছে।
ভারতের নিজস্ব যুদ্ধবিমান থাকলেও সবচেয়ে আধুনিক কিছু যুদ্ধবিমান বিদেশ থেকে আমদানি করে দেশটি। এর মধ্যে ফ্রান্সের রাফাল যুদ্ধবিমান রয়েছে। ভারতীয় বিমানবাহিনী এখনও সোভিয়েত আমলের যুদ্ধবিমানের ওপরও ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল।
তবে রামানাথনের মতে, ভারত একটি বৃহত্তর প্রতিরক্ষা শিল্পভিত্তি গড়ে তুলতে চাইলেও যুক্তরাষ্ট্রের মতো সামরিক-শিল্প কমপ্লেক্স গড়ে তোলার পর্যায় থেকে দেশটি এখনও অনেক দূরে।
তার ভাষায়, ভারতে ক্ষমতার নিয়ন্ত্রণ এখনও মূলত সরকারের হাতেই।
অস্ত্র আমদানিতে এখনও বড় নির্ভরতা
দেশীয় উৎপাদন ও অস্ত্র রফতানি বাড়লেও সামগ্রিকভাবে ভারত এখনও বিশ্বের অন্যতম বড় অস্ত্র আমদানিকারক দেশ।
স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (সিপ্রি) তথ্যানুযায়ী, ২০২১ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে ভারত ছিল বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অস্ত্র আমদানিকারক। এ সময়ে রাশিয়াই ছিল ভারতের সবচেয়ে বড় অস্ত্র সরবরাহকারী; মোট আমদানির প্রায় ৪০ শতাংশ এসেছে রাশিয়া থেকে।
অর্থাৎ আত্মনির্ভরতার লক্ষ্য সামনে রেখে দেশীয় উৎপাদন বাড়ালেও ভারতের সামরিক সক্ষমতার বড় একটি অংশ এখনও বিদেশি প্রযুক্তি ও অস্ত্র সরবরাহের ওপর নির্ভরশীল।
বেসরকারি খাতে ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তি হস্তান্তরে ঝুঁকি কতটা?
সবচেয়ে বড় উদ্বেগের জায়গা হলো নিরাপত্তা। ক্ষেপণাস্ত্রের প্রযুক্তি অত্যন্ত সংবেদনশীল। বেসরকারি কোম্পানির হাতে এসব প্রযুক্তি গেলে তথ্য ফাঁস বা সাইবার হামলার ঝুঁকি বাড়তে পারে।
চলতি বছরের মার্চে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে হামলা চালানোর সময় একদল ইরানি হ্যাকার দাবি করে, তারা মার্কিন প্রতিরক্ষা নির্মাতা লকহিড মার্টিনের সার্ভারে ঢুকে এফ-৩৫ যুদ্ধবিমানের বিভিন্ন উপাদানের নকশা চুরি করেছে।
দাবিটি সত্য হলে তা বেসরকারি প্রতিরক্ষা প্রতিষ্ঠানের সংবেদনশীল তথ্য সংরক্ষণের ঝুঁকি কতটা, সেটিই সামনে আনে। কারণ সরকারি অত্যন্ত গোপনীয় গবেষণাগারের তুলনায় অনেক বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে নিরাপত্তা ও নজরদারি ব্যবস্থা তুলনামূলকভাবে দুর্বল হতে পারে।
তবে ভারতের ক্ষেত্রে রামানাথনের মতে, যেসব কোম্পানি ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদনের চুক্তি পাওয়ার সম্ভাবনা রাখে, তারা প্রতিরক্ষা খাতে নতুন নয়। এসব প্রতিষ্ঠান কয়েক দশক ধরে কোনও না কোনওভাবে প্রতিরক্ষা খাতে কাজ করছে এবং গোপনীয় তথ্য ব্যবস্থাপনার অভিজ্ঞতাও তাদের রয়েছে।
ভারত সরকারও প্রযুক্তি ও ক্ষেপণাস্ত্রের গোপন তথ্য যাতে প্রতিপক্ষের হাতে না যায়, তা নিশ্চিত করতে আগ্রহী। পাশাপাশি ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তি নিয়ন্ত্রণের আন্তর্জাতিক কাঠামো ‘মিসাইল টেকনোলজি কন্ট্রোল রেজিম’ বা এমটিসিআর-এর প্রতিশ্রুতিও ভারতকে মেনে চলতে হয়।
বিশ্লেষকদের মতে, ফলে নিজের নিরাপত্তা ও কৌশলগত স্বার্থেই ভারত ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তি ফাঁস রোধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে বাধ্য হবে।
সব মিলিয়ে ডিআরডিওর ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তি বেসরকারি খাতে হস্তান্তরের সিদ্ধান্ত ভারতের প্রতিরক্ষা শিল্পে একটি নতুন যুগের সূচনা করতে পারে। এর মাধ্যমে দ্রুত উৎপাদন, বড় অস্ত্রভাণ্ডার এবং রফতানি সক্ষমতা বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে। তবে এই উদ্যোগ কতটা সফল হবে, তা নির্ভর করবে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা, সরকারের বড় আকারের ক্রয়াদেশ এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণভাবে—অত্যন্ত সংবেদনশীল সামরিক প্রযুক্তির নিরাপত্তা কতটা নিশ্চিত করা যায় তার ওপর। সূত্র: আল-জাজিরা
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন