১০:৪৫ পি.এম
মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে একটি প্রশ্ন এখন ক্রমেই জোরালো হচ্ছে—যুদ্ধবাজ ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর অবিরাম যুদ্ধনীতি কি শেষ পর্যন্ত ডোনাল্ড ট্রাম্পকেই এমন এক কৌশলগত ফাঁদে ঠেলে দিচ্ছে, যেখানে যুক্তরাষ্ট্র তার দীর্ঘদিনের বৈশ্বিক আধিপত্য ও একক সুপার পাওয়ার হিসেবে থাকার সক্ষমতাকে ঝুঁকির মুখে ফেলছে?
ওয়াশিংটন ও তেল আবিবের পরিকল্পনা ছিল দ্রুত, স্বল্পমেয়াদি এবং সিদ্ধান্তমূলক। ধারণা করা হয়েছিল, কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই ইরানের সামরিক ও রাজনৈতিক নেতৃত্বকে অচল করে দিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলবিরোধী প্রতিরোধের শেষ অধ্যায় রচনা করা যাবে। কিন্তু বাস্তবতা যে কাগজের হিসাব মেনে চলে না, তার প্রমাণ মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক সংঘাত।
যে যুদ্ধকে কেউ কেউ এক থেকে দুই সপ্তাহের অভিযানে সীমাবদ্ধ থাকবে বলে কল্পনা করেছিলেন, তা দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতে রূপ নেয়। ইরান প্রত্যাশার বাইরে গিয়ে পাল্টা প্রতিরোধ গড়ে তোলে এবং দেখিয়ে দেয় যে মধ্যপ্রাচ্যে শক্তির ভারসাম্য আগের মতো নেই। এই প্রতিরোধ শুধু সামরিক হিসাব-নিকাশই বদলে দেয়নি, বরং যুক্তরাষ্ট্রের অপ্রতিদ্বন্দ্বী সামরিক শ্রেষ্ঠত্বের ধারণাকেও নতুন করে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে।
আধুনিক বিশ্বে যুদ্ধ কেবল যুদ্ধক্ষেত্রে জেতা বা হারার বিষয় নয়; যুদ্ধ মানে অর্থনীতি, জ্বালানি, কূটনীতি এবং জোট রাজনীতিরও লড়াই। আর এই লড়াইয়ের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে হরমুজ প্রণালী—যে সংকীর্ণ জলপথ দিয়ে বিশ্বের উল্লেখযোগ্য অংশের জ্বালানি সরবরাহ পরিবাহিত হয়। হরমুজে অস্থিতিশীলতা মানেই বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম বৃদ্ধি, সরবরাহ শৃঙ্খলের সংকট এবং বৈশ্বিক অর্থনীতিতে নতুন অনিশ্চয়তা।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের নীতিনির্ধারকদের সামনে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো—তারা কি এমন এক সংঘাতের দিকে এগোচ্ছেন, যার রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক মূল্য বহন করা তাদের পক্ষেও কঠিন হয়ে পড়বে?
এদিকে ইউরোপ কিংবা ন্যাটো ভুক্ত সব দেশও যে ওয়াশিংটনের প্রতিটি সিদ্ধান্তের সঙ্গে নিঃশর্তভাবে একমত নয়, তার ইঙ্গিত ইতোমধ্যেই স্পষ্ট। ন্যাটোভুক্ত কয়েকটি দেশ মধ্যপ্রাচ্যে আরও বড় ধরনের সামরিক জড়িয়ে পড়া নিয়ে প্রকাশ্যে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। বিশেষ করে যুদ্ধ শুরুর সময় থেকে স্পেন ইতালি এবং ইউরোপের কয়েকটি দেশ প্রকাশ্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইরানের প্রতি হামলা কে সমর্থন করেনি এবং ডোনাল্ড ট্রাম্প তাদের সমর্থন চাইলেও সেই সমর্থন তো দেয়নি বরং ক্ষেত্র বিশেষে কোন কোন রাষ্ট্র তাদের আকাশ সীমা ও ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে ব্যবহার করতে দেয়নি।
আরেকটি বাস্তবতা ক্রমেই স্পষ্ট হচ্ছে—আজকের বিশ্ব আর একমেরুকেন্দ্রিক নয়। চীন ও রাশিয়ার উত্থান, ব্রিকসের সম্প্রসারণ এবং ডলারের বিকল্প আর্থিক ব্যবস্থার আলোচনা আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে নতুন বাস্তবতা তৈরি করেছে। এমন পরিস্থিতিতে মধ্যপ্রাচ্যে একটি দীর্ঘস্থায়ী ও ব্যয়বহুল সংঘাত যুক্তরাষ্ট্রের জন্য কৌশলগত চাপ আরও বাড়াতে পারে। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যে চীন ও রাশিয়ার বৃহৎ স্বার্থ বিদ্যমান এবং সর্বশেষ ইরানের উপর হামলার সময় চীন রাশিয়া সহ বহির্বিশ্বগামী একটি রেল সেতুতে হামলা মূলত পরোক্ষভাবে চীন এবং রাশিয়ার স্বার্থেই হামলা করা হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। এর ফলে পরাশক্তি চীন এবং রাশিয়া এতদিন গোপনে কিংবা নীরবে ইরানকে সমর্থন যুগিয়ে আসছিল তারা যে প্রকাশ্যে যুদ্ধ শুরু করবে না সেই গ্যারান্টি দেবে কে?
প্রশ্ন হচ্ছে, যদি হরমুজ প্রণালীকে ঘিরে উত্তেজনা দীর্ঘস্থায়ী হয় এবং যুক্তরাষ্ট্র সেখানে তার ইচ্ছামতো প্রভাব বজায় রাখতে ব্যর্থ হয়, তাহলে কি তা বৈশ্বিক শক্তির ভারসাম্যে একটি ঐতিহাসিক পরিবর্তনের সূচনা করবে? একক পরাশক্তি হিসেবে আমেরিকার দীর্ঘদিনের অবস্থান কি তখন নতুন করে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে?
ইতিহাস বলে, সাম্রাজ্যগুলো অনেক সময় বাইরের শত্রুর আক্রমণে নয়, বরং নিজেদের অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস, ভুল কৌশলগত সিদ্ধান্ত এবং অপ্রয়োজনীয় যুদ্ধের বোঝায় দুর্বল হয়ে পড়ে। মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান সংকটও সেই পুরোনো ইতিহাসের নতুন সংস্করণ হয়ে উঠবে কি না, তা সময়ই বলে দেবে।
তবে একটি বিষয় এখন আর অস্বীকার করার উপায় নেই—হরমুজ প্রণালী কেবল জ্বালানি পরিবহনের পথ নয়; এটি আজ বৈশ্বিক ক্ষমতার রাজনীতির এক বিস্ফোরণবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। আর সেই বিস্ফোরণবিন্দুতেই হয়তো নির্ধারিত হবে আগামী বিশ্বের ক্ষমতার নতুন মানচিত্র। সেখানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের বিশ্ব আধিপত্যের ক্ষমতা টিকে থাকবে নাকি ইরানের শক্তিশালী প্রতিরোধের কারণে ধ্বংসের মাধ্যমে নতুন বিশ্ব পরাশক্তি কিংবা বহুমেরু ভিত্তিক বিশ্ব ব্যবস্থা চালু হবে সেটিই এখন দেখার বিষয়।
লেখকঃ সাংবাদিক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও কলামিস্ট।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন