০৮:১১ পি.এম
জেলা পরিষদের প্রশাসক ও সিইওর বিরুদ্ধে জায়গা দখল করে মার্কেট নির্মাণের অভিযোগ, আধুনিক হাসপাতাল করার দাবি সচেতন মহলের
কিশোরগঞ্জের ভৈরব বাজার উপস্বাস্থ্য কেন্দ্রের শতকোটি টাকার জমি জোরপূর্বক দখল করে মার্কেট নির্মাণের অভিযোগ উঠেছে জেলা পরিষদের প্রশাসক ভিপি খালেদ সাইফুল্লাহ সোহেল ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) মোছা. মোস্তারি কাদেরীর বিরুদ্ধে। হাসপাতালের জমিতে মার্কেট নির্মাণের এমন উদ্যোগের খবরে স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে ক্ষোভ ও উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। উপস্বাস্থ্য কেন্দ্রের জায়গা রক্ষা এবং প্রতিষ্ঠানটিকে আধুনিক হাসপাতালে রূপান্তরের দাবিতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে সরব হয়েছেন ভৈরবের সচেতন নাগরিক ও নেটিজেনরা।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, পাকিস্তান আমলে ভৈরব বাজার এলাকায় সাধারণ মানুষের চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে উপস্বাস্থ্য কেন্দ্রটি প্রতিষ্ঠা করা হয়। স্বাধীনতার পর থেকে দীর্ঘদিন ধরে এখানে চিকিৎসাসেবা চালু রয়েছে। তবে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর থেকে হাসপাতালের জায়গা নিয়ে বিভিন্ন মহলের তৎপরতা শুরু হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
আজ মঙ্গলবার সকালে কিশোরগঞ্জ জেলা পরিষদের প্রশাসক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তাসহ বিএনপি নেতাকর্মীদের পরিদর্শন এবং হাসপাতালের পেছনের পুরোনো ভবন ভাঙার চেষ্টা করলে নতুন করে বিতর্ক সৃষ্টি হয়। অভিযোগ রয়েছে, সচল থাকা ভৈরব উপ স্বাস্থ্য কেন্দ্রেটিকে জেলা পরিষদ থেকে পরিত্যক্ত দেখিয়ে তা দখলে নেয়ার জন্য উর্ধতন কর্মকর্তাদের ভুল বুঝনো হয়েছে।
আরও পড়ুন: সীতাকুণ্ডে লরির ধাক্কায় প্রাণ গেল IIUC শিক্ষার্থী মাইশার, মহাসড়ক ও রেললাইন অবরোধ
জানা গেছে, প্রায় তিন মাস আগে কিশোরগঞ্জ জেলা পরিষদের পক্ষ থেকে প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ও একটি দল উপজেলা ভূমি অফিসে গিয়ে উপস্বাস্থ্য কেন্দ্রের জমির বিষয়ে খোঁজখবর নেয়। প্রায় এক সপ্তাহ আগে জেলা পরিষদের প্রশাসক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ভৈরবে এসে জায়গাটি পরিদর্শনও করেন। সর্বশেষ আজ ৩ নভেম্বর, মঙ্গলবার সকালে তাঁরা স্থানীয় বিএনপির কয়েকজন নেতাকর্মীকে সঙ্গে নিয়ে হাসপাতাল এলাকায় যান। এ সময় হাসপাতালের পেছনে থাকা একটি পুরোনো ভবন ভাঙার চেষ্টা করা হয় বলে অভিযোগ উঠেছে।
সাংবাদিকেরা খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে পৌঁছানোর আগেই সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা সেখান থেকে চলে যান। পরে সাংবাদিকেরা গিয়ে হাসপাতালের সীমানাপ্রাচীরের ভেতরে দুই ভাগে রাখা বিপুল পরিমাণ নতুন ইট দেখতে পান। ইটের সংখ্যা প্রায় ১০ হাজার বলে ধারণা করা হচ্ছে। এছাড়া পেছনের পুরোনো ভবনটির কিছু অংশ ভাঙা অবস্থায় দেখা যায়।
নামপ্রকাশে অনিচ্ছুক একজন বাসিন্দা জানান, মার্কেট নির্মাণের জন্য ইট এনে রাখা হয়েছে। তাছাড়া মার্কেট নির্মাণের আগেই প্রতি দোকান (১সাটার) ৩৫ লাখ টাকায় বিক্রি করা হবে বলে বিভিন্ন মানুষের কাছে শুনেছেন তিনি।
ভৈরব উপ স্বাস্থ্য কেন্দ্রের দায়িত্বে থাকা জারকা বেগম বলেন, সকালে এসে তিনি হাসপাতালের ভেতরে শ্রমিকদের ইট আনতে দেখেন। পরে জেলা পরিষদের প্রশাসক, প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ও কয়েকজন নেতাকর্মী সেখানে উপস্থিত হন। এ সময় পেছনের পুরোনো ভবনটি ভাঙার চেষ্টা করা হয়। তিনি বলেন, প্রতিদিন গড়ে শতাধিক সাধারণ রোগী ও গর্ভবতী নারী এ হাসপাতাল থেকে চিকিৎসাসেবা নেন। হাসপাতালটি আরও উন্নত করে আধুনিক চিকিৎসাসেবার ব্যবস্থা করা প্রয়োজন।
আরও পড়ুন: শিবগঞ্জে বালুর ভেতর লুঙ্গিতে মোড়ানো নবজাতক উদ্ধার, আশ্রয়ে রেখেছেন গোলাপ হোসেন
জমির মালিকানা নিয়ে উপজেলা ভূমি অফিস সূত্রে জানা গেছে, ভৈরব উপস্বাস্থ্য কেন্দ্রের নামে থাকা বিএস খতিয়ান নম্বর-৪, দাগ নম্বর-৯০১৭ প্রায় ৪৬ শতাংশ জায়গা স্বাস্থ্য বিভাগের নামে রেকর্ড রয়েছে এবং স্বাস্থ্য বিভাগ নিয়মিত ভূমি উন্নয়ন কর পরিশোধ করছে। তবে সিএস খতিয়ানে জমিটি জেলা পরিষদের নামে রেকর্ড রয়েছে।
এ বিষয়ে উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) এএইচএম আজিমুল হক বলেন, প্রায় তিন মাস আগে জেলা পরিষদের পক্ষ থেকে প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (উপসচিব) জমিটির বিষয়ে জানতে এসেছিলেন। তখন দেখা যায়, বিএস খতিয়ানে জমিটি স্বাস্থ্য বিভাগের নামে রয়েছে এবং তারা নিয়মিত খাজনা পরিশোধ করছে। তবে সিএস খতিয়ানে জমিটি জেলা পরিষদের নামে রেকর্ড রয়েছে।
তিনি আরও বলেন, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার কাছ থেকে যতটুকু জেনেছেন, ২০১৯ সালে আন্তমন্ত্রণালয়ের এক সভার কার্যবিবরণীতে পরিত্যক্ত উপস্বাস্থ্য কেন্দ্রগুলো জেলা পরিষদের অধীনে নেওয়ার বিষয়ে সিদ্ধান্ত হয়েছিল। সে অনুযায়ী সচল হাসপাতালটি রেখে বাকি জায়গা জেলা পরিষদের অধীনে নেওয়ার বিষয়টি আলোচনায় ছিল। তবে সেখানে মার্কেট নির্মাণ করা হবে কি না, সে বিষয়ে তাঁকে কিছু জানানো হয়নি।
ভৈরব উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. কিশোর কুমার ধর বলেন, এ বিষয়ে তিনি কিশোরগঞ্জের সিভিল সার্জনের কাছে লিখিত আবেদন করেছেন। ভৈরব বাজার উপস্বাস্থ্য কেন্দ্রটি স্বাধীনতার পূর্ব থেকে পরিচালিত হয়ে আসছে। প্রতিদিন শতাধিক রোগী এখান থেকে বহির্বিভাগের চিকিৎসাসেবা পান।
আরও পড়ুন: চাঁপাইনবাবগঞ্জে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষ, ককটেল ও রামদাসহ গ্রেপ্তার ২
তিনি জানান, বর্তমানে এখানে একজন মেডিকেল অফিসার, একজন উপসহকারী কমিউনিটি মেডিকেল অফিসার, একজন মিডওয়াইফ, একজন ফার্মাসিস্ট ও একজন অফিস সহায়ক কর্মরত রয়েছেন। ভৈরবের প্রাণকেন্দ্র বাজার এলাকায় ১৫ হাজারের বেশি মানুষের চিকিৎসাসেবার অন্যতম নির্ভরযোগ্য কেন্দ্র এটি। এ ছাড়া ভৈরব পৌরসভা এখানে নিয়মিত টিকাদান কার্যক্রম পরিচালনা করছে।
স্বাস্থ্য কর্মকর্তা আরও বলেন, হাসপাতালের অব্যবহৃত পুরোনো ভবন ভেঙে নতুন স্থাপনা নির্মাণের উদ্দেশ্যে কিছু ইট রাখা হয়েছে বলে তিনি জানতে পেরেছেন। স্থানীয় মানুষের স্বাস্থ্যসুরক্ষার কথা বিবেচনা করে উপস্বাস্থ্য কেন্দ্রটিকে আধুনিক চিকিৎসাসেবার উপযোগী করে গড়ে তোলা জরুরি। তিনি আরও জানান, স্থানীয় সংসদ সদস্য ও প্রতিমন্ত্রী মো. শরীফুল আলম এখানে ২০ শয্যার একটি ডায়াবেটিক হাসপাতাল স্থাপনের জন্য চেষ্টা করছেন।
এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) কে.এম. মামুনুর রশীদ বলেন, জেলা পরিষদের কর্মকর্তারা সেখানে এসেছিলেন বলে তিনি শুনেছেন। ২০১৯ সালের আন্তমন্ত্রণালয়ের সভায় পরিত্যক্ত স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলো জেলা পরিষদের অধীনে নেওয়ার বিষয়ে আলোচনা হয়েছিল। তবে ভৈরব বাজার উপস্বাস্থ্য কেন্দ্রটি সচল রয়েছে। এ বিষয়ে জেলা পরিষদের পক্ষ থেকে তাঁকে কোনো বৈধ কাগজপত্র দেখানো হয়নি।
কিশোরগঞ্জের সিভিল সার্জন বলেন, উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা বিষয়টি তাঁকে লিখিতভাবে জানিয়েছেন।
আরও পড়ুন: চাঁদপুরে মোটরসাইকেলের ধাক্কায় যুবক নিহত
অভিযোগের বিষয়ে জানতে কিশোরগঞ্জ জেলা পরিষদের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মোছা. মোস্তারি কাদেরী জানান, এই উপ স্বাস্থ্য কেন্দ্রটি সচল আছে। কিন্তু বাকী জায়গাটি আমরা নিজেরা মার্কেট করবো। এখনো কাউকে লিজ দেয়া হয়নি। কাজের জন্য ইট আনা হয়েছে। জায়গাটি স্বাস্থ্য বিভাগের নামে রেকর্ড আছে। তবে জায়গাটি জোরপূর্বক দখলের অভিযোগটি সত্য না।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে কিশোরগঞ্জ জেলা পরিষদের প্রশাসক ভিপি খালেদ সাইফুল্লাহ সোহেলকেও একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
স্থানীয় সচেতন মহলের দাবি, জমির মালিকানা নিয়ে কোনো বিরোধ থাকলে তা আইনগতভাবে নিষ্পত্তি করতে হবে। কোনো অবস্থাতেই দীর্ঘদিন ধরে সাধারণ মানুষকে চিকিৎসাসেবা দিয়ে আসা একটি সচল স্বাস্থ্যকেন্দ্রের কার্যক্রম ব্যাহত করা যাবে না। বরং হাসপাতালের অবকাঠামো উন্নয়ন, চিকিৎসক ও প্রয়োজনীয় জনবল বৃদ্ধি এবং আধুনিক চিকিৎসা সরঞ্জাম নিশ্চিত করে প্রতিষ্ঠানটিকে পূর্ণাঙ্গ আধুনিক চিকিৎসাকেন্দ্রে রূপান্তর করা হোক। তাছাড়া এই উপ স্বাস্থ্য কেন্দ্রটিকে পাট ও বস্ত্র প্রতিমন্ত্রী ২০ শয্যা বিশিষ্ট একটি ডায়াবেটিস হাসপাতাল করার জন্য চেষ্টা করছেন, যদি এখানে মার্কেট করা হয় তাহলে প্রতিমন্ত্রী শরীফুল আলমসহ সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হবে।
আরও পড়ুন: কলারোয়ায় গুদামে আগুনে ১৩০০ মণ পাট পুড়ে, ক্ষতি ৬৫ লাখ টাকা
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন