০৮:৫৯ পি.এম
বাংলাদেশে গত তিন বছরে লেড-ক্রোমেটের আমদানি ৫১ দশমিক ১ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০২২ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে ক্রোমিয়াম যৌগভিত্তিক রং ও রঞ্জক পদার্থের আমদানি ৪ লাখ ২৭ হাজার ৪৮১ কেজি থেকে বেড়ে প্রায় ৬ লাখ ৪৫ হাজার ৮০০ কেজিতে পৌঁছেছে। তবে দেশে লেড-ক্রোমেটের জন্য পৃথক কোনো আমদানি কোড না থাকার কারণে সঠিকভাবে কতটুকু সীসাযুক্ত এই রাসায়নিক দেশে প্রবেশ করছে, তা শনাক্ত করা যাচ্ছে না।
সোমবার (৩ নভেম্বর) ঢাকায় পরিবেশ অধিদপ্তরে আয়োজিত এক গোলটেবিল বৈঠকে প্রকাশিত ‘রিপোর্ট অন ট্রেড অব লিড ক্রোমাটিজ : বাংলাদেশ’ শীর্ষক প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে। এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশন (এসডো), পরিবেশ অধিদপ্তর ও ইন্টারন্যাশনাল পলুট্যান্টস এলিমিনেশন নেটওয়ার্কের (আইপেন) যৌথ সহযোগিতায় এ বৈঠকের আয়োজন করা হয়।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে, বাংলাদেশে লেড-ক্রোমেট উৎপাদনের কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। ফলে রংসহ বিভিন্ন পণ্যে ব্যবহৃত এ রাসায়নিক আমদানির ওপর নির্ভরশীল। তবে আমদানির ক্ষেত্রে লেড-ক্রোমেটের জন্য আলাদা কোনো এইচএস কোড নেই। এটি এইচএস কোড ৩২০৬২০-এর আওতায় আমদানি হয়, যেখানে সীসাবিহীন ক্রোমিয়ামভিত্তিক রঞ্জকও অন্তর্ভুক্ত। ফলে কাস্টমসের বাণিজ্যিক তথ্য বিশ্লেষণ করে প্রকৃত লেড-ক্রোমেটের পরিমাণ নির্ধারণ করা কঠিন হয়ে পড়ছে।
আরও পড়ুন: বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংকের চেয়ারম্যান ও দুই পরিচালকের পদত্যাগ
ইউএন কমট্রেডের তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালে এইচএস কোড ৩২০৬২০-এর আওতায় বাংলাদেশ ৪ লাখ ২৭ হাজার ৪৮১ কেজি পণ্য আমদানি করে, যার মূল্য ছিল ১৬ লাখ ৯০ হাজার মার্কিন ডলার। ২০২৫ সালে তা বেড়ে প্রায় ৬ লাখ ৪৫ হাজার ৮০০ কেজি এবং ২২ লাখ ৯০ হাজার ডলারে দাঁড়ায়। এ সময়ে ওজনের হিসাবে আমদানির পরিমাণ বেড়েছে ৫১ দশমিক ১ শতাংশ।
বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন (বিএসটিআই) রঙে সীসা নিয়ন্ত্রণের জন্য প্রাথমিক কিছু আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। বিডিএস ১৪২৩:২০১৮ মানদণ্ডের আওতায় ডেকোরেটিভ (সাজসজ্জার) রঙে মোট সীসার সর্বোচ্চ সীমা বাধ্যতামূলকভাবে ৯০ পিপিএম (পার্টস পার মিলিয়ন) নির্ধারণ করা হয়েছে। শিল্পকারখানার রঙের জন্যও বিএসটিআই একই ৯০ পিপিএম সীমার খসড়া মান তৈরি করেছে, যা এখনো গেজেট আকারে প্রকাশের অপেক্ষায় রয়েছে। এসব নিয়ম থাকা সত্ত্বেও সীসা ক্রোমেট আমদানির কার্যকর নজরদারি, কাস্টমসের পণ্য শ্রেণিবিন্যাস, বাজার তদারকি ও আইন প্রয়োগে আরো বেশি মনোযোগ দেওয়া প্রয়োজন।
গোলটেবিল বৈঠকে এসডোর পলিসি অ্যান্ড অ্যাডভোকেসি অ্যাসোসিয়েট ড. ফয়জুন নাহার আইপিইএন-এর সহযোগিতায় প্রস্তুতকৃত ‘বাংলাদেশে লেড-ক্রোমেটের বাণিজ্য’ শীর্ষক প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন। প্রতিবেদনে দেশের লেড-ক্রোমেটের আমদানি ও রপ্তানির ধরন, বাণিজ্যিক চর্চা এবং রঙসহ অন্যান্য পণ্যে লেড-ক্রোমেট ব্যবহারের সম্ভাবনা পর্যালোচনা করা হয়েছে। প্রতিবেদনে উঠে আসা তথ্য বিদ্যমান নজরদারি ও নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার ঘাটতি বুঝতে এবং জাতীয় পর্যায়ে নিয়ন্ত্রণ জোরদারে করণীয় নির্ধারণে সহায়ক হবে।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে পরিবেশ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ড. মো. লুৎফর রহমান মন্তব্য করেন, সীসা বিষক্রিয়ার পরিস্থিতি দিন দিন আরো গুরুতর হয়ে উঠছে। আমাদের এটি সরাসরি মোকাবেলা করতে হবে। পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের এই সংক্রান্ত গবেষণার দিকে উৎসাহ দিতে সরকারের পক্ষ থেকে অর্থায়ন করা প্রয়োজন। আমাদের মনে রাখতে হবে যে রাসায়নিকভাবে সীসা আরো অনেক বিষাক্ত মৌলের সঙ্গে জড়িত। তাই এটি একটি বহুমাত্রিক সমস্যা।
আরও পড়ুন: বাংলাদেশ কমার্স ও প্রিমিয়ার ব্যাংকে পাঁচ স্বতন্ত্র পরিচালক নিয়োগ
পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব ড. মো. সাইদুর রহমান বলেন, লেড-ক্রোমেট-সংশ্লিষ্ট শিল্প খাতের একটি বিস্তারিত অর্থনৈতিক বিশ্লেষণ আমাদের প্রয়োজন। যদি আমাদের অর্থনৈতিক স্বার্থ রক্ষা করতে হয়, তাহলে বর্তমানে এই পরিস্থিতিতে গবেষণাভিত্তিক পদ্ধতি অনুসরণ করতে হবে। তাহলেই সীসামুক্ত পণ্যের দিকে অগ্রসর হওয়ার সময় সম্ভাব্য ক্ষয়ক্ষতি কমে আসবে। অর্থাৎ, সমস্যা চিহ্নিতকরণ যেমন প্রযুক্তিনির্ভর হতে হবে, তেমনি সমাধানও প্রযুক্তিনির্ভর হতে হবে।
গেস্ট অব অনার পরিবেশ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (জলবায়ু পরিবর্তন) মোহাম্মদ সোলায়মান হায়দার বলেন, প্রথমে আমাদের বুঝতে হবে সংকটটি কতটা বড় এবং এর সঙ্গে স্বাস্থ্যের কী কী ঝুঁকি জড়িত। আমাদের দেশে খোলা বাজারের বেশির ভাগই নিয়ন্ত্রণের বাইরে। তাই বাজারকে সরকারের নজরদারির আওতায় আনা জরুরি, এবং এটাই একটি বিশাল চ্যালেঞ্জ।
জাতীয় প্রতিষেধক ও সামাজিক চিকিৎসা প্রতিষ্ঠান (নিপসম)-এর পরিচালক অধ্যাপক ড. নাসরিন সুলতানা বলেন, পুরো ব্যবস্থাকে বাজার তদারকির আওতায় আনতে হবে এবং বিস্তারিতভাবে পর্যবেক্ষণ করতে হবে। নারী ও শিশুরা এসব ক্ষতিকর পদার্থের সংস্পর্শে কীভাবে আসছে, সেদিকে বিশেষ নজর দিতে হবে। শুধু খাদ্যশৃঙ্খলের মাধ্যমে নয়, খাওয়া, শ্বাস নেওয়া এবং ত্বকের সংস্পর্শের মাধ্যমেও এই ঝুঁকি তৈরি হয়।
এসডো-এর প্রতিষ্ঠাতা ও মহাসচিব ড. মো. শাহরিয়ার হোসেন বলেন, সীসার সংস্পর্শে আসার কোনো নিরাপদ বা গ্রহণযোগ্য মাত্রা নেই। শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোকে নিরাপদ বিকল্পের দিকে যেতে উৎসাহিত করতে আমাদের গ্রিন ট্যাক্সেশন-এর মতো পদক্ষেপ খতিয়ে দেখতে হবে। আমাদের ২০২৫ সালের গবেষণায় একটি উৎসাহজনক তথ্য পাওয়া গিয়েছে। ৯০ শতাংশ রঙ প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান আগে থেকেই সীসার সীমা মেনে চলছিল। এটা থেকেই বোঝা যায়, সীসার সীমা মেনে চলা সম্ভব। এর মানে বাকি ১০ শতাংশও এই পরিবর্তনের পথে যেতে পারে।
আরও পড়ুন: বিএসইসির স্থগিত বিও অ্যাকাউন্ট খুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত
এসডো-এর নির্বাহী পরিচালক সিদ্দিকা সুলতানা বলেন, সীসামুক্ত বাংলাদেশের জন্য বাংলাদেশের ইতিমধ্যে একটি জাতীয় কৌশল ও বহুবর্ষী কর্মপরিকল্পনা আছে। এখন আমাদের দরকার এর কার্যকর বাস্তবায়ন। সীসার সংস্পর্শে আসার অনেক উৎসের মধ্যে লেড-ক্রোমেট একটি মাত্র। একে মোকাবেলা করতে হবে সীসাদূষণ নির্মূলের একটি বৃহত্তর ও সমন্বিত উদ্যোগের অংশ হিসেবে।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন