১০:৪৮ পি.এম
নেইমার জুনিয়রকে নিয়ে আক্ষেপের অনুভূতি তাঁর ভক্ত ও সমর্থকদের মধ্যে খুব প্রবল। সর্বকালের অন্যতম সেরা ফুটবলারের তকমা নিয়ে তিনি ক্যারিয়ার শুরু করেছিলেন। এখনও তিনি দলের পরিবর্তনের ইতিহাসে বিশ্বের সবচেয়ে দামি ফুটবলার হিসেবেই পরিচিত।
কিন্তু, নেইমার কি নিজের প্রতি সুবিচার করেছেন? সদ্য উত্তর এসেছে — না। ব্রাজিলের এই ফুটবল খেলোয়াড়, যে এক সময় ফুটবল জগতে শাসক ছিল, তাঁর পতন নিশ্চিত ভাবেই মৌজুরিয়া থেকে ‘হেক্সা’র আকাঙ্খা পর্যন্ত দীর্ঘ দুই দশক ধরে চলে আসছে। সেখানে কি নেইমারের কিছু দোষ নেই?
মাঠের বাইরের জীবনটি সব সময়ই তাঁর জন্য চমৎকার, একজন সামাজিক হিসেবে তিনি আমুদে। কিন্তু, মাঠে যখন তাঁকে দেখা যায়, সেখানে অধিকাংশ সময়ই লুকায়িত থাকে বেদনা, অপূর্ণতা এবং হাহাকার।
আরও পড়ুন: বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্রের দশম স্থলবাহিনী সংলাপ ঢাকা সেনানিবাসে সফলভাবে সম্পন্ন
সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও লিওনেল মেসি কিংবা ক্রিস্তিয়ানো রোনালদোর মতো পর্যায়ে নিজেকে নিয়ে যেতে পারেননি নেইমার। ব্যালন ডি’অর কিংবা ফিফা দ্য বেস্ট পুরস্কার পেতে পারেননি। বিশ্বকাপ ট্রফি না জেতার বিষয়টি তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় অপূর্ণতা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
তবে, নেইমার সব সময় আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে থেকেছেন, আছেন এবং ভবিষ্যতেও থাকবেন। কারণ, যে ৩৪ বছর বয়সের এই ফরোয়ার্ড, তিনি এখনও ব্রাজিলের একটি বড় ভরসার নাম। তাঁর বেপরোয়া জীবন, আনন্দ, আড্ডা, নারী আসক্তি ও চোট — এসব কাহিনী একে একে তাঁকে আবারও খবরের শিরোনাম বানিয়ে দেয়।
বর্তমানে নেইমার জুনিয়র চোট থেকে সেরে ওঠার জন্য সংগ্রামে রয়েছেন। ক্যারিয়ারের প্রায় ১৪০০ দিন তিনি মাঠের বাইরে ছিলেন। প্রায় তিন বছর পর এবারের বিশ্বকাপে অংশ নিতে গিয়েছে ব্রাজিল স্কোয়াডে জায়গা পেয়ে। তবে, যদি কার্লো আনচেলোত্তি তাঁর প্রতি আস্থা না রাখতেন, তাহলে এ লেখাটি লেখা সম্ভবপর হতো না।
সাম্প্রতিক সময়ে একটি সাক্ষাৎকারে নেইমার জানিয়েছেন, ২০২৬ বিশ্বকাপ হবে তাঁর শেষ বিশ্বকাপ। তিনি অবধারিতভাবে সাফল্য অর্জনের আকাঙ্ক্ষা বোঝাতে চান।
আরও পড়ুন: জামায়াতের মহিলা বিভাগের প্রতিবাদ: নারী উদ্যোক্তা সাথী আক্তার গ্রেপ্তার
কিন্তু, যদি এমন কিছু ঘটে না, তাহলে পরিণতি কি হবে? কি মানুষ নেইমারকে চিরকাল মনে রাখবে, অথবা তরুণ প্রজন্মের একটি বড় অংশ তখনও তাঁকে আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করবে?
ক্রিস্তিয়ানো রোনালদোর পুত্র ক্রিস্তিয়ানো জুনিয়র কিংবা মেসির তিন পুত্র থিয়াগো, মাতেও এবং চিরো ফুটবলে মনোনিবেশ করেছে। যেভাবে তারা এগিয়ে যাচ্ছে, ফুটবলপ্রেমীরা তাঁদের মধ্যে পরবর্তী রোনালদো এবং মেসিকে দেখার প্রত্যাশা করছেন।
কিন্তু, নেইমারের একমাত্র ছেলে দাভি লুকা ফুটবলে পুরোপুরি মনোনিবেশ করেননি। এই ১৫ বছর বয়সী কিশোর বাবার খেলা দেখতে মাঠে আসে, উৎসাহ দেয়; তবে, বন্ধুদের সাথে খেলার মাঝেই সীমাবদ্ধ।
নেইমার সামাজিকভাবে দাভির উপর প্রতিভাসের চাপ প্রয়োগ করেননি। ফিফাকে দেওয়া একটি সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছেন, ‘আমার ছেলে খেলাধুলা ভালোবাসে। সে তাঁর বন্ধুদের সাথে ফুটবল খেলতে পছন্দ করে। তবে, সে আমার থেকে আলাদা। ফুটবলের প্রতি ওর খুব বেশি আগ্রহ নেই। সে মেসি, এমবাপ্পে এবং ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোকে পছন্দ করে। সত্যি বলতে, ভিডিও গেম খেলার সময় ওর টিমে থাকে মেসি, রোনালদো, এমবাপ্পে এবং আমি।’
আরও পড়ুন: চীনে পাচারের চেষ্টা, ১২ ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর নারী উদ্ধার
নেইমারের আরও তিন সন্তান রয়েছে। তিন শিশুকন্যা মাভি, যে অক্টোবর ২০২৩ সালে জন্মগ্রহণ করেছে, হেলেনা, যে জুলাই ২০২৪ সালে এবং মেল, যে জুলাই ২০২৫ সালে জন্মগ্রহণ করেছে। অবশ্যই, ফুটবলের সম্পর্কে তাদের ‘ফ’ বোঝার বয়সও হয়নি।
কিন্তু, নেইমার মনে করেন, কন্যাসন্তানদের জন্ম তাঁর জীবন পরিবর্তন করেছে। তাঁকে দায়িত্বশীল হতে শিখিয়েছে, নারী আসক্তি থেকে ফিরিয়ে আনতে সাহায্য করেছে এবং এক নারীর প্রতি গভীর হওয়ার চিন্তা তৈরি করেছে।
নেইমারের জীবনের প্রথম প্রেম ছিলেন কারোলিনা দান্তাস। তাঁদের ভালোবাসার ফলস্বরূপ ২০১১ সালে জন্ম নেয় পুত্রসন্তান দাভি লুকা। তখন নেইমারের বয়স ছিল মাত্র ১৯ বছর! দাভির জন্মের কিছুদিন পরেই প্রথম প্রেমকে ভুলে যান নেইমার। তিনি ইনফ্লুয়েন্সার দান্তাসের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করেন। এরপর তাঁর জীবনে এসেছেন অনেক সুন্দরী তরুণী, যাদের মধ্যে কেউ মডেল, কেউ অভিনেত্রী, সংগীতশিল্পী এবং কেউ বা রিয়ালিটি শোর তারকা।
নেইমারের জীবনে দুটি ব্রুনা এসেছিলেন। একজন ব্রুনা মার্কেজিন এবং অন্যজন ব্রুনা বিয়ানকার্দি। মার্কেজিনের সাথে সম্পর্ক ভেঙে গেছে অনেক আগে। বর্তমানে বিয়ানকার্দির সাথে তাঁর প্রেমের বিষয়টিও উল্লেখযোগ্য। বিয়ানকার্দি একাধিক সন্তানের মা, যার মধ্যে দুটি কন্যাসন্তান মাভি ও মেল রয়েছে।
আরও পড়ুন: মুশফিক ছাড়া একাদশে, টসে জিতে ব্যাটিংয়ে বাংলাদেশ
বিস্তারিতভাবে বললে, মাঝে বিয়ানকার্দিকে ধোঁকা দিয়ে আমান্দা কিম্বার্লির সাথে প্রেমে জড়িয়ে পড়েছিলেন। নেইমারের তৃতীয় সন্তান তথা দ্বিতীয় কন্যাসন্তান হেলেনাকে কিম্বার্লি জন্ম দেন। খবরটি শোনার পর বিয়ানকার্দির সাথে তাঁর সম্পর্ক প্রায় শেষ হয়ে গিয়েছিল। যদিও পরে ক্ষমা চেয়ে ভরসা পুনরুদ্ধার করেছেন।
জীবন সত্যিই বড় অদ্ভুত। যে নেইমার ২০২২ সালে কাতার বিশ্বকাপে একমাত্র ছেলে লুকাকে সাথে নিয়ে এসেছিলেন, সেই নেইমার চার বছরের মধ্যে তাঁর চতুর্থ এবং সম্ভবত শেষ বিশ্বকাপ খেলতে যাচ্ছেন চার সন্তানের গর্বিত বাবা হিসেবে! এখন তিনি অনেকটা স্থিতিশীল, দায়িত্বশীল এবং আরও ধৈর্যশীল। নাহলে কি আর নিজেকে বিশ্বকাপে খেলার মতো ফিট প্রমাণ করে আনচেলোত্তির স্কোয়াডে জায়গা করে নিতে পারেন?
নেইমার জুনিয়রের বাবা নেইমার সান্তোস সিনিয়র নিজেও একজন ফুটবলার ছিলেন। তিনি ব্রাজিলের নিচু স্তরের লিগে খেলে ছিলেন। মাঠে খুব একটা সফল হননি নেইমার সিনিয়র। ফলে, তিনি খেলতে পারার পর ছেলের তত্ত্বাবধায়ক ও এজেন্ট হয়েছেন। যা তিনি নিজে পারেননি, সেই স্বপ্ন তাঁর ছেলের মারফত পূরণ করতে চান।
ব্রাজিলের সমর্থকরা নেইমারের হাতে বিশ্বকাপ ট্রফি দেখার অপেক্ষা করছেন। তিনি সম্ভাবনার সামনে রয়েছেন। তাঁর সামনে স্বপ্নপূরণের চ্যালেঞ্জ রয়েছে, ‘হেক্সা’ জিতিয়ে ব্রাজিলকে ষষ্ঠ স্বর্গে নিয়ে যাওয়ার। তবে, নেইমার কি পারবেন? সময় সেটাই বলে দেবে। কে জানে, বাবার হাতে বিশ্বকাপ দেখা পর, ছেলে লুকার মন কেমন পরিবর্তিত হতে পারে। পেশাদার ফুটবলের প্রতি ছেলের আগ্রহ জন্মাবে কি না। ব্রাজিলের সমর্থক এবং নেইমারভক্তরা সেটার অপেক্ষা করছেন।
আরও পড়ুন: বাংলাদেশসহ ২৯ দেশের নাগরিকদের রাশিয়ায় পাচার, জাতিসংঘের প্রতিবেদনে ভয়ংকর তথ্য!
এখন প্রশ্ন হচ্ছে, যদি লুকা সেই চাওয়া পূরণে ব্যর্থ হয়, তবে নেইমারের উত্তরসূরি হিসেবে কে সামনে আসবে?
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন