১০:৩১ এম
দীর্ঘ সময় ধরে আড়ালে থাকার পর নিষিদ্ধ কুকি-চিন ন্যাশনাল ফ্রন্টের (কেএনএফ) প্রধান নাথান বম আবার আলোচনায় এসেছেন। ৮ অক্টোবর, পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) নাথানসহ ৯ জনের বিরুদ্ধে মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইনে মামলা দায়ের করেছে। এই মামলা সংগঠনটির ইউনিফর্ম তৈরিতে অর্থায়ন ও আর্থিক লেনদেনের অভিযোগে করা হয়েছে।
এদিকে, পার্বত্য অঞ্চলে কেএনএফের কার্যক্রম ফের বৃদ্ধি পাওয়ার অভিযোগে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। নাথান বম কি ভারতের মিজোরামে অবস্থান করে দেশে সংগঠনের সদস্যদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন, অর্থ সংগ্রহের চেষ্টা করছেন, এবং এর পেছনে অন্য কারো ইন্ধন রয়েছে কি না—এসব বিষয় খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
সিআইডির মামলার তথ্য অনুযায়ী, কেএনএফের ৪০ হাজার সেট চার রঙের ক্যামোফ্লেজ ইউনিফর্ম তৈরির কাপড় ও সেলাইয়ের কাজ বাবদ প্রায় এক কোটি ৬৩ লাখ টাকা লেনদেনের তথ্য পাওয়া গেছে। মামলায় নাথান বমকে এক নম্বর আসামি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
আরও পড়ুন: পুতুলের বিরুদ্ধে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পদ জালিয়াতির অভিযোগে দুদকের চার্জশিট
২০২২ সালের জানুয়ারিতে প্রথমে মিয়ানমারের মংডুতে আত্মগোপন করলেও বর্তমানে তিনি মিজোরামের আইজল শহরে বসবাস করছেন বলে জানা গেছে। সেখানে নাথান বমের উপদেষ্টা পিংলিয়ান জুং বমও রয়েছেন। আইজল এলাকায় নাথানের পূর্বপুরুষদের বসবাস ছিল। মোস্ট ওয়ানটেড আসামি হওয়ার পর তিনি সেখানে পালিয়ে গেছেন। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী অভিযোগ করেছে যে, এখন সেখান থেকেই নাথান বম সংগঠনের সদস্যদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন।
পুলিশ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একাধিক সংস্থার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বান্দরবান ও পার্বত্য জেলায় কুকি-চিনের কার্যক্রম কম ছিল। তবে তাদের সাম্প্রতিক কার্যক্রম পুলিশকে নতুন করে ভাবিয়ে তুলেছে। বান্দরবান, রাঙ্গামাটি ও খাগড়াছড়ির প্রত্যন্ত এলাকা ও পাহাড়ের এলাকায় তাদের কার্যক্রম বেড়েছে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, নাথান বম তাদের মোস্ট ওয়ানটেড আসামিদের মধ্যে একজন। কেএনএফ যাতে নতুন করে সংগঠিত হতে না পারে, সেজন্য নজরদারি বৃদ্ধি করা হয়েছে। সংগঠনটির সাম্প্রতিক কার্যক্রমের পেছনে তৃতীয় কোনো পক্ষের ইন্ধন রয়েছে কি না, তা-ও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
বান্দরবানের পুলিশ সুপার ওহাবুল ইসলাম খন্দকার গত সোমবার রাতে "আমার দেশ"কে জানিয়েছেন, কুকি-চিনের বিষয়ে পুলিশ সতর্ক রয়েছে।
আরও পড়ুন: ঢামেকের জরুরি বিভাগে ভুয়া চিকিৎসক মো. রাকিব আটক
কেএনএফের মুখপাত্র লালজানের বমের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি এ বিষয়ে কথা বলতে রাজি হননি।
নাথান বমের পরিচয় ও সংগঠন
পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, নাথান বম বান্দরবানের রুমা উপজেলার ইডেনপাড়ার বাসিন্দা এবং বম সম্প্রদায়ের সদস্য। তার বাবা মৃত জাওতন লনচে পেশায় জুমচাষি ছিলেন। পাঁচ ভাই ও এক বোনের মধ্যে নাথান সবার ছোট। তার স্ত্রীর নাম লেলসম কিম বম। ২০০৯ সালে তাদের বিয়ে হয়। স্ত্রীর পেশা নার্স এবং বর্তমানে তিনি লালমনিরহাটে কর্মরত বলে পুলিশ সূত্রে জানা গেছে।
নাথান বম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদ থেকে ২০০৮ সালে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় তিনি পাহাড়ি ছাত্র পরিষদের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। পরে মতবিরোধের কারণে ওই সংগঠন থেকে বহিষ্কৃত হন। বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াশোনা শেষে তিনি কেএনএফ প্রতিষ্ঠা করেন।
আরও পড়ুন: মকবুল হত্যা: সাবেক এমপি মনসুরসহ দুইজন গ্রেপ্তার
২০০৮ সালে রুমার ইডেনপাড়ায় কুকি-চিন ন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশন (কেএনডিও) নামে একটি বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা প্রতিষ্ঠা করেন নাথান বম। সংগঠন ঘোষিত কার্যক্রমের মধ্যে ছিল বনাঞ্চল সবুজায়ন, পশুপাখি ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্য সংরক্ষণসহ বিভিন্ন জনকল্যাণমূলক কাজ।
কেএনএফের ফেসবুক পেজে উল্লেখ করা হয়েছে, অনগ্রসর ও সুবিধাবঞ্চিত কুকি-চিন জনগোষ্ঠীর অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্য সংরক্ষণ সংগঠনটির উদ্দেশ্য। নারী-পুরুষ মিলিয়ে সংগঠনটির প্রায় ১,০০০ সদস্য রয়েছে বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে। তাদের মধ্যে অনেকে সশস্ত্র প্রশিক্ষণ নিয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। সংগঠনটির বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের ছবি ও ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করা হয়েছিল।
২০১৮ সালে নাথান বম বান্দরবান আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেন। ২০২২ সালের মে মাস থেকে কেএনএফের কর্মকাণ্ড প্রকাশ্যে আসতে শুরু করলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সংগঠনটির বিষয়ে সক্রিয় হয়।
কেএনএফের দাবি, বম সম্প্রদায় দীর্ঘদিন ধরে নির্যাতন ও অধিকার বঞ্চনার শিকার। এ অবস্থার পরিবর্তনের কথা বলে সন্তু লারমার নেতৃত্বাধীন জনসংহতি সমিতি (জেএসএস) থেকে বেরিয়ে আসা বম সম্প্রদায়ের কিছু সদস্যকে নিয়ে নাথান বম সশস্ত্র সংগঠনটি গড়ে তোলেন। সংগঠনটি বান্দরবান, রাঙামাটি ও খাগড়াছড়ি অঞ্চলের বম, পাংখোয়া, লুসাই, খিয়াং, ম্রো ও খুমি—এ ছয় জাতিগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব করার দাবিও করে।
আরও পড়ুন: নারায়ণগঞ্জের সাত খুন মামলার আপিল শুনানি ১৭ নভেম্বর
ইউনিফর্ম তৈরির অর্থায়নে মামলা
সিআইডির মামলার এজাহার অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ১৮ মে রাতে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের (সিএমপি) একটি বিশেষ দল বায়েজিদ বোস্তামী থানার মোজাফফরনগর আবাসিক এলাকায় অভিযান চালিয়ে কেএনএফের পোশাক তৈরির সঙ্গে জড়িত একজনকে আটক করে। তাকে জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে পরে হালিশহর থানার ছোটপুল এলাকার দুটি ফ্ল্যাটে অভিযান চালিয়ে আরো দুজনকে আটক করা হয়।
তাদের দেওয়া তথ্য যাচাই করে বায়েজিদ বোস্তামী থানার একটি গোডাউন ও একটি পোশাক কারখানা থেকে কেএনএফের ২০ হাজার ৩০০ সেট চার রঙের ক্যামোফ্লেজ ইউনিফর্ম উদ্ধার করা হয়। এর মধ্যে গোডাউন থেকে ১১ হাজার ২০০ সেট এবং কারখানা থেকে ৯,১০০ সেট ইউনিফর্ম জব্দ করা হয়। এ ঘটনায় বায়েজিদ বোস্তামী থানায় সন্ত্রাসবিরোধী আইনে মামলা দায়ের করা হয়।
পরবর্তী সময়ে কেএনএফের ইউনিফর্ম তৈরির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের আর্থিক কর্মকাণ্ডের অনুসন্ধান শুরু করে সিআইডি। এজাহারে বলা হয়, সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান শনাক্ত করার পাশাপাশি ব্যাংক হিসাব, চেক, নগদ অর্থ প্রদান, ক্রয়াদেশ, ব্যবসায়িক পরিচয়, পারস্পরিক যোগাযোগ ও আর্থিক লেনদেন বিশ্লেষণ করা হয়। এতে অর্থের উৎস ও ব্যবহার এবং সংশ্লিষ্টদের মধ্যে যোগসাজশের তথ্য পাওয়া গেছে বলে দাবি করেছে সিআইডি।
আরও পড়ুন: ছোট ভাইয়ের বিরুদ্ধে জমি দখলের অভিযোগ, বড় ভাইকে পড়ালেখা করিয়েছিলেন
মামলার অন্য আসামিরা হলেন—কেএনএফের প্রতিনিধি মংহলাসিন মারমা ওরফে মং, নিয়াজ হায়দার, গোলাম আজম, সাহেদুল ইসলাম, মোহাম্মদ কামরুজ্জামান, জামালুল ইসলাম, মতিউর রহমান ও তৌহিদুল ইসলাম।
অর্থ সংগ্রহের চেষ্টা
পুলিশের সূত্রগুলোর দাবি, কেএনএফের কর্মকাণ্ডের ওপর নজরদারি বাড়ানোর পর সংগঠনটির অর্থ সংগ্রহের কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হয়েছে। আগে বিভিন্ন এনজিও ও সমর্থক গোষ্ঠীর কাছ থেকে রসিদের মাধ্যমে অর্থ সংগ্রহ করা হতো বলে অভিযোগ রয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে সংগঠনটি আবার অর্থ সংগ্রহের চেষ্টা করছে—এমন তথ্যও পুলিশের কাছে এসেছে।
কেএনএফ-সংশ্লিষ্টদের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করছে পুলিশ। বিশেষ করে বান্দরবানের রুমা উপজেলায় নজরদারি জোরদার করা হয়েছে বলে সূত্রগুলো জানিয়েছে।
আরও পড়ুন: ২৩ মামলার আসামি বগা আদালতে আত্মসমর্পণ, জামিন নামঞ্জুর
ইন্টারপোলের সহায়তা নেওয়ার চিন্তা
নাথান বমকে গ্রেপ্তারে আন্তর্জাতিক পুলিশ সংস্থা ইন্টারপোলের সহায়তা নেওয়ার উদ্যোগ আগেই নেওয়া হয়েছিল বলে পুলিশ সূত্রে জানা গেছে। তবে সে প্রক্রিয়া বেশি দূর এগোয়নি। নাথান বম ও কেএনএফের কার্যক্রম নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হওয়ায় তাকে গ্রেপ্তারে ইন্টারপোলের রেড নোটিস জারির বিষয়টি আবার বিবেচনা করছে পুলিশ। দ্রুত এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে বলে জানা গেছে।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন