০৬:৩১ পি.এম
ভারতের সবচেয়ে বিখ্যাত রাজনৈতিক পরিবারের উত্তরাধিকারী ৫৬ বছর বয়সী রাহুল গান্ধী সম্প্রতি দেশের দীর্ঘকালীন রাজনৈতিক প্রথা ভেঙে অপ্রত্যাশিত বিভিন্ন ভূমিকা গ্রহণ করছেন। তিনি ভারতের ‘জেন জি’ বা যুব প্রজন্মের প্রতিবাদকারীদের সঙ্গে যোগদান করেছেন এবং পুলিশের মুখোমুখি হয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির কঠোর ও কর্তৃত্ববাদী রাজনীতির চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে তরুণদের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা আন্দোলনের সঙ্গে নিজেকে যুক্ত করার মাধ্যমে রাহুল গান্ধী বর্তমানে তাঁর রাজনৈতিক জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যায় অতিক্রম করছেন।
ভারতীয় নাগরিকদের অধিকার খর্ব হওয়ার বিষয়ে তাঁর সতর্কবার্তাগুলো আরও জোরালো হয়ে ওঠে, যখন কলেজ ভর্তির পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় পরীক্ষা বাতিল করতে হয়। এর ফলে ব্যাপক ছাত্র বিক্ষোভ শুরু হয়ে শিক্ষামন্ত্রীকে পদত্যাগ করতে বাধ্য করে। এর কয়েক সপ্তাহ পর, ভারতের ভোটার তালিকা থেকে ১৩ নাম বাদ পড়ার ঘটনা দেশজুড়ে ক্ষোভের জন্ম দেয় এবং প্রধান নির্বাচন কমিশনারকে অপসারণের দাবি ওঠে।
লেখক ও রাজনৈতিক ভাষ্যকার নীর্জা চৌধুরী বলেন, “মানুষ এখন তাঁর বার্তার প্রতি অনেক বেশি আগ্রহী, কারণ সরকারের প্রতি অসন্তোষ বাড়ছে। মানুষের মধ্যে এক ধরনের ক্লান্তি তৈরি হয়েছে, নতুন কোনো উদ্দীপনা নেই; তার ওপর মোদির কঠোর শাসনপদ্ধতি পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। এসবের ফলে রাহুল গান্ধীর আত্মবিশ্বাস বেড়েছে।” এক দশকেরও বেশি সময় আগে মোদির হিন্দু জাতীয়তাবাদী দল ‘ভারতীয় জনতা পার্টি-বিজেপি’-এর কাছে কংগ্রেস একের পর এক নির্বাচনে হারতে শুরু করে। রাহুল গান্ধী তাঁর বাবাÑসাবেক প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধীর নির্বাচনী এলাকাতেই পরাজিত হন। তাঁর দাদি ইন্দিরা গান্ধীও প্রধানমন্ত্রী ছিলেন এবং তাঁর প্রপিতামহ জওহরলাল নেহরু ছিলেন ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী। তাঁর মা সোনিয়া গান্ধী দীর্ঘ বছর কংগ্রেসের নেতৃত্ব দিয়েছেন। এরপর, নিজের এই অভিজাত ভাবমূর্তি পরিবর্তনের লক্ষ্যে ২০২২ সালের সেপ্টেম্বরে রাহুল গান্ধী প্রায় ২,৫০০ মাইল দীর্ঘ এবং ১৩৬ দিনব্যাপী ‘ভারত জোড়ো যাত্রা’ শুরু করেন।
আরও পড়ুন: কাতারের শান্তি প্রস্তাব নাকচ, মধ্যপ্রাচ্যে নতুন হামলার শঙ্কা
২০২৪ সালে এই প্রচেষ্টার সুফল কিছুটা পাওয়া যায়; বিজেপি প্রত্যাশার চেয়ে অনেক কম আসনে জয়লাভ করে, যার ফলে মোদিকে জোট সরকার গঠন করতে হয়। রাহুল গান্ধী বিরোধী দলের নেতা হন। গত বছর মহারাষ্ট্রের বিধানসভা নির্বাচনে কংগ্রেস পরাজিত হওয়ার পর, রাহুল গান্ধী অভিযোগ করেন যে বিজেপির সুবিধার্থে ভোটার তালিকায় কারচুপি করা হয়েছে। বিহারের নির্বাচনের সময়ও তিনি একই অভিযোগ তোলেন।
এছাড়া, এক বছর আগে ভোটার তালিকা সংশোধনের প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার পর তিনি নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে মোদির ইশারায় কাজ করার অভিযোগও আনেন। চেন্নাইয়ের এক জনসভায় গান্ধী তরুণদের তাদের অভিজ্ঞতা তুলে ধরার আহ্বান জানান। জুনে ‘ছাত্র কন্ঠ’ নামে একটি উদ্যোগ শুরু হয়, ঠিক সেই সময়ে যখন ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ নামের একটি গোষ্ঠী যা মূলত ‘জেন জি’ বা নতুন প্রজন্মের তরুণদের দ্বারা পরিচালিত, রাজনৈতিক জবাবদিহিতার দাবি তুলে সবার নজর কাড়ে। এই আয়োজনে অংশগ্রহণকারীরা এমন সব অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেন, যার মধ্যে ছিল মেডিকেল প্রবেশিকা পরীক্ষার চাপে এক তরুণীর আত্মহত্যা এবং একজন মুসলিম নারীর প্রতি বৈষম্যের ঘটনা। গান্ধী নিজের ভাবমূর্তি নতুন করে গড়ে তুলতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তার স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভাস, ফিটনেস বিষয়ক ভিডিও এবং নিপিড়নের বিরুদ্ধে পুলিশের সঙ্গে মুখোমুখি অবস্থানের চিত্র তুলে ধরেন।
জুলাইতে, মোদির বাসভবনের বাইরে অবস্থান কর্মসূচি থেকে পুলিশ যখন তাঁকে ও তাঁর বোন প্রিয়াঙ্কা গান্ধী ভদ্রাকে জোরপূর্বক সরিয়ে দেয়, সেই দৃশ্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়ে যায়। এ মাসেও কিছু ভিডিওতে দেখা গেছে, পুলিশ তাঁকে বল প্রয়োগ করে বাসে তোলার চেষ্টা করলে তিনি বাধা দিচ্ছেন এবং পুলিশের ব্যারিকেড টপকে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। নিজেকে সাংবিধানিক ধর্মনিরপেক্ষতা এবং কংগ্রেসের ঔপনিবেশিকতা-বিরোধী ঐতিহ্যের রক্ষক হিসেবে তুলে ধরে গান্ধী তরুণ ভোটার ও বিরোধী দলগুলোর প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন, যেন তারা সবাই মিলে সেই পরিস্থিতির বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হয়, যাকে তিনি গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের ‘হত্যা’ বলে অভিহিত করেছেন।
ব্রাউন ইউনিভার্সিটির আন্তর্জাতিক অধ্যয়ন বিভাগের অধ্যাপক আশুতোষ ভার্শনি বলেন, “এই ধরনের সংগ্রামের দৃশ্যগুলো গান্ধী ও কংগ্রেসকে মোদি এবং বিজেপির বিরুদ্ধে রাজনৈতিক সুবিধা অর্জনে সহায়তা করেছে।” গত সোমবার, ভোটার তালিকায় পরিবর্তনের প্রতিবাদে তিনি নয়াদিল্লিতে সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত একটি পদযাত্রার নেতৃত্ব দেন। তাঁর সঙ্গে ছিলেন প্রিয়াঙ্কা গান্ধী ভদ্রা, ‘ইন্ডিয়া’ জোটের প্রায় দুই ডজন প্রভাবশালী নেতা এবং ছাত্র আন্দোলনের জনপ্রিয় মুখ নেহা বোরা।
আরও পড়ুন: ক্ষমতা হারালেই কি গ্রেফতার হবেন নেতানিয়াহু?
এদিন এক সংবাদ সম্মেলনে গান্ধী বলেন, “এই লড়াইটি বিভিন্ন ক্ষেত্রে সরাসরি লড়া হচ্ছে-জনমতের ক্ষেত্রে, মনস্তাত্ত্বিক স্তরে, আইনি ক্ষেত্রে এবং রাজনৈতিক ময়দানে। আমরা সব ক্ষেত্রেই লড়াই করছি এবং সব সমরেই জয়ী হচ্ছি।”
সূত্র: দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন