০৫:০১ পি.এম
স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বুধবার রাজধানীর সেগুনবাগিচায় মাতৃভাষা ইনিস্টিটিউটে আয়োজিত একটি অনুষ্ঠানে বক্তৃতা প্রদান করেন। তিনি বলেন, সরকারি হাসপাতাল থেকে রোগী ভাগিয়ে নিয়ে যাওয়ার দালাল চক্রের অপতৎপরতা স্থায়ীভাবে বন্ধ করা হবে।
আজ বুধবার সকালে মাতৃভাষা ইনিস্টিটিউটে ‘বাংলাদেশের জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার ঘাটতি নিরসন: সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবার উপযোগী সেবা নিশ্চিত করতে ব্যয় দক্ষতার একটি দ্রুত প্রতিষ্ঠানভিত্তিক মূল্যায়ন’ শীর্ষক গবেষণার ফলাফল প্রকাশের সময় এসব কথা বলেন তিনি। গবেষণাটি যৌথভাবে পরিচালনা করেছে পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেন্ট রিসার্চ সেন্টার (পিপিআরসি) এবং স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইউনিট।
অনুষ্ঠানে পিপিআরসির নির্বাহী চেয়ারম্যান ড. হোসেন জিল্লুর রহমান গবেষণার ফলাফল উপস্থাপন করেন। স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইউনিটের মহাপরিচালক ড. মো. এনামুল হক স্বাগত বক্তব্য দেন।
আরও পড়ুন: ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করলে এলাকার উন্নয়ন ত্বরান্বিত হবে: খাদ্যমন্ত্রী আফরোজা খানম রিতা
এই গবেষণাটি দেশের আটটি প্রশাসনিক বিভাগের প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও তৃতীয় পর্যায়ের ২২টি সরকারি স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানে পরিচালিত হয়েছে। গবেষণায় ২০২৪-২৫ অর্থবছরের বাজেট বাস্তবায়ন এবং সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত নথিপত্র পর্যালোচনা করা হয়েছে এবং প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যক্ষমতা মূল্যায়ন করা হয়েছে।
এছাড়া ৯৫ জন কর্মকর্তার জ্ঞান, দৃষ্টিভঙ্গি ও পেশাগত চর্চা সম্পর্কে একটি জরিপও পরিচালিত হয়। স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপক, জাতীয় পর্যায়ের নীতিনির্ধারক, সরবরাহকারী, শিক্ষাবিদ এবং রোগীদের সঙ্গে মোট ৩২টি সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়।
গবেষণায় দেখা গেছে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে জরিপভুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর সামগ্রিক বাজেট ব্যবহারের হার ছিল ৮৫ শতাংশ। মাধ্যমিক পর্যায়ের স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানে বাজেট বাস্তবায়নের হার ছিল সবচেয়ে কম, ৭৮ শতাংশ। অর্থবছর শেষে ৯৪ শতাংশ প্রতিষ্ঠানে অব্যয়িত অর্থ ছিল, তবে মাত্র ১১ শতাংশ এই অব্যবস্থাপনাকে উদ্বেগজনক বলে উল্লেখ করেছে।
টেন্ডার প্রক্রিয়ার অনিয়ম বিষয়ে স্বাস্থ্য মন্ত্রী বলেন, পছন্দের লোককে কাজ দেওয়ার জন্য টেন্ডারে অবাস্তব শর্ত যোগ করা হয়, যাতে নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানই ডাক পায়। উদাহরণস্বরূপ, পাঁচ বছরে ১০ হাজার কোটি টাকার ট্রানজেকশনের অভিজ্ঞতা চাওয়া হয়। সোনার চামচ নিয়ে জন্ম নেওয়া কয়জন ব্যবসায়ী এই শর্ত পূরণ করতে পারবেন? এর মাধ্যমে মূলত প্রতিযোগিতা সীমিত করে পছন্দের পাত্রকে কাজ পাইয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়।
আরও পড়ুন: ইসরাইলের নির্বাচনে সম্ভাব্য ৪ পরিস্থিতি ২৭ অক্টোবর
স্বাস্থ্য খাতে অপ্রয়োজনীয় কেনাকাটা এবং কোটি কোটি টাকার সরকারি অর্থ অপচয়ের উদাহরণ তুলে ধরেন তিনি। আওয়ামী লীগ সরকার আমলে ১১ কোটি টাকার রেডিওথেরাপি মেশিন ১৮ কোটি টাকায় কেনা হয়েছিল। যেখানে বসানো হয়েছে, সেখানে প্রস্তুতিও ছিল না। কেন কেনা হয়েছিল? প্রতি মেশিনে ৪ থেকে ৬ কোটি টাকা লাভ ছিল। একটি ফরিদপুরে এবং অন্যটি খুলনায় পড়ে আছে। দেশের বিভিন্ন স্থানে কারিগরি লোকবল ছাড়া এক্স-রে এবং অন্যান্য টেকনোলজির সরঞ্জাম কেনা হয়েছে, যা পরে ভাঙ্গারির কাছে বিক্রি করতে হয়েছে।
টেস্ট বাণিজ্য বন্ধের উদ্যোগের কথাও তিনি উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, সরকারি হাসপাতালের দায়িত্বে থেকে পাশের ক্লিনিকে নিয়ে যাওয়ার ঘটনা বন্ধ করতে হবে। এগুলো মনিটর করা হবে।
বিগত সরকারের সমালোচনা করে তিনি বলেন, গত চার বছরে যেখানে হামের টিকা দেওয়ার কথা ছিল, তারা টিকা সংগ্রহ করেনি। ২০২০ সালের ডিসেম্বরের পর কোনো ক্যাম্পেইন হয়নি। ইউনিসেফ যখন অনুরোধ করেছে, তখনও তারা টিকা কেনেনি। বর্তমান সরকারের দায়িত্ব নেওয়ার পর হাম দেখা দিয়েছে। বর্তমানে যেসব শিশু হামে আক্রান্ত হচ্ছে, ৯৯% আনভ্যাক্সিনেটেড। তাই টিকাদান কর্মসূচিকে আরও বেগবান করা হয়েছে এবং সম্প্রতি ১ লাখেরও বেশি নতুন শিশুকে এর আওতায় আনা হয়েছে।
মন্ত্রী জানান, আওয়ামী লীগ আমল থেকে একটি বিদেশি কোম্পানি চট্টগ্রাম ও ঢাকায় ডায়ালাইসিসের বাজার দখল করে রেখেছিল। নভেম্বরে তাদের চুক্তির মেয়াদ শেষ হলে আর রিনিউ (নবায়ন) হবে না। সরকার নিজস্ব উৎস থেকে ডায়ালাইসিস মেশিন কিনবে, ফলে ডিসেম্বরের প্রথম থেকেই বৈদেশিক মুদ্রা বাঁচবে এবং সাধারণ মানুষ কম খরচে ডায়ালাইসিস সেবা পাবে। এছাড়া প্রতি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ৫০ শয্যার ডায়ালাইসিস সেন্টার এবং প্রতি জেলা হাসপাতালে ১০ শয্যার ডায়ালাইসিস কেন্দ্র চালু করা হচ্ছে।
আরও পড়ুন: গাড়িচাপায় দুই পা হারালেন অস্ট্রেলীয় এমপি হেলেন হেইনস
দেশের নারীদের স্তন ক্যান্সার, জরায়ু ক্যান্সার এবং ডায়াবেটিসের প্রকোপ বৃদ্ধি পাওয়া সত্ত্বেও মানুষের অসচেতনতা নিয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রী যুগান্তকারী উদ্যোগের কথা জানান। দেশের ১০টি উপজেলা এবং ৯০টি ওয়ার্ডে পরীক্ষামূলকভাবে স্বাস্থ্যকর্মীদের সাইকেল, স্মার্টফোন এবং এআই সমৃদ্ধ ‘কিট বক্স’ প্রদান করা হবে। এটি আগামী তিন মাসের মধ্যে শুরু হবে। স্বাস্থ্যকর্মীরা মানুষের ঘরে ঘরে গিয়ে দৈহিক মাপ (উচ্চতা, ওজন), ডায়াবেটিস, রক্তচাপ এবং মেশিনের সাহায্যে রক্তের লিপিড প্রোফাইল, আরবিসি ও সিবিসি টেস্ট করবেন। পুরুষদের কাছে পুরুষ স্বাস্থ্যকর্মী এবং নারীদের কাছে নারী স্বাস্থ্যকর্মী যাবেন।
মন্ত্রণালয় ও স্বাস্থ্য অধিদফতরের আর্থিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে তিনি কঠোর বার্তা দেবেন, মন্ত্রণালয়ের কাজের জন্য অডিটের নামে এক টাকাও ঘুষ দেওয়া যাবে না। সৎ থাকলে কাউকেই ভয় পাওয়ার প্রয়োজন নেই। আমাকে কেউ ভয় দেখাতে পারবে না, জেলে নিতে পারবে না। আপনি যদি সৎ থাকেন, অডিটে অনৈতিক টাকা চাইলেই দেওয়া বন্ধ করুন এবং সরাসরি আমার কাছে আসুন। পরিস্থিতি যা-ই হোক, আমি নিজে তা মোকাবেলা করবো।
হাসপাতালে নরমাল ডেলিভারির হার বাড়ানোর ওপর তিনি বিশেষ গুরুত্ব দেন। তিনি বলেন, হাসপাতালে সন্তানসম্ভবা মায়েদের সিজারিয়ান অপারেশনে বাধ্য করার প্রতারণামূলক ব্যবসা চলছে, তা বন্ধে কঠোর তদারকি চলছে। সিভিল সার্জন ও জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটদের সমন্বয়ে সারাদেশে প্রাইভেট ক্লিনিকগুলোতে সারপ্রাইজ ভিজিট ও তদারকি বাড়ানো হয়েছে। নিয়ম অনুযায়ী অপারেশন চালানোর জন্য ন্যূনতম আধুনিক যন্ত্রপাতি ছাড়াই অনেক ক্লিনিক ইতিমধ্যে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। এই অভিযান আরও জোরদার করা হবে।
অনুষ্ঠানে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস, নার্সিং ও মিডওয়াইফারি অধিদপ্তরের মহাপরিচালক দিল আফরোজা প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।
আরও পড়ুন: ফ্রান্সে বিক্ষোভ দমনে সেনাবাহিনী মোতায়েন
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন