০৯:৩৫ এম
থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককের উপকণ্ঠে একটি স্কুলে ১৪ বছর বয়সী এক কিশোরের গুলিতে আটজন নিহত হয়েছেন। এই ঘটনায় আহত হয়েছেন আরো ২২ জন।
নিহতদের মধ্যে পাঁচজন শিক্ষক রয়েছেন। হামলার পর প্রধানমন্ত্রী আনুতিন চার্নভিরাকুল দেশে অস্ত্র নিয়ন্ত্রণে নতুন আইন করার ঘোষণা দিয়েছেন।
শুক্রবার প্রধানমন্ত্রী বলেন, জনসমক্ষে আগ্নেয়াস্ত্র বহনের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করতে নতুন আইন করা হবে। প্রস্তাবিত আইনে দায়িত্ব পালনরত সরকারি কর্মকর্তারা ছাড়া অন্যদের জনসমক্ষে বন্দুক বহনের সুযোগ থাকবে না।
আরও পড়ুন: মালয়েশিয়ায় সরকারি কর্মকর্তাদের জন্য ইসরায়েলি অ্যাপ ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা
আনুতিন মন্তব্য করেন, এই ঘটনা ‘ঘটা উচিত ছিল না’। তিনি বলেন, ‘আমি শুধু নিহতদের জন্য দুঃখিত নই। এই ঘটনা ঘটেছে বলেও আমি দুঃখিত। আমাদের দেশে এমন ঘটনা কীভাবে ঘটতে পারে?’ পুলিশ ও স্থানীয় গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, শুক্রবার ভোর ৫টার দিকে ১৪ বছর বয়সী ওই কিশোর তার ৭৩ বছর বয়সী দাদা এবং ৭৪ বছর বয়সী দাদিকে গুলি করে হত্যা করে।
তারা ননথাবুরি এলাকায় একই দোতলা বাড়িতে বসবাস করতেন। পুলিশ জানায়, দুজনের মাথায় একটি করে গুলি করা হয়েছিল।
দাদা-দাদিকে হত্যার পর কিশোরটি তাদের একটি বন্দুক ও কয়েক ডজন গুলি নিয়ে স্কুলবাসে ওঠে। পরবর্তীতে সে ননথাবুরির দেবসিরিন স্কুলে যায়। ওই স্কুলেই সে পড়াশোনা করত।
আরও পড়ুন: ইরান: হুমকি ও অবরোধের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা অসম্ভব
সকাল সাড়ে ৮টার দিকে সে প্রথম ক্লাসে যোগ দেয়। পরে সকাল ৯টা ২০ মিনিটে দ্বিতীয় ক্লাস শুরু হয়। দ্বিতীয় ক্লাস শুরুর প্রায় আধা ঘণ্টা পর সে বন্দুক বের করে গুলি চালাতে শুরু করে। পুলিশের ধারণা, কিশোরটি প্রথমে স্কুলের ষষ্ঠ তলায় শিক্ষকদের লক্ষ্য করে গুলি চালায়। সেখানে তিন শিক্ষক নিহত হন। পুলিশের মেজর জেনারেল দেজরাপি কংদে বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে বলেন, এরপর কিশোরটি সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামছিল। এসময় স্কুলের উপপরিচালক ও পরিচালকের সচিব পরিস্থিতি দেখতে সিঁড়ি দিয়ে ওপরে উঠছিলেন। হামলাকারী সিঁড়িতেই তাদের দুজনকে গুলি করে হত্যা করে।
গুলির খবর পেয়ে স্কুলে পুলিশ মোতায়েন করা হয়। পুলিশের মেজর জেনারেল দেজরাপি বলেন, সকাল ১০টা ৪০ মিনিটের দিকে পুলিশ হামলাকারীকে খুঁজে পায়। ততক্ষণে সে নিজেকেও গুলি করেছিল। প্রাথমিকভাবে পাঁচজন নিহত এবং অন্তত ২৩ জন আহত হওয়ার কথা জানানো হয়েছিল। পরে আহতদের একজন মারা যান। থাইল্যান্ডের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম ও ব্যাংকক পোস্টের প্রতিবেদনে বলা হয়, পরে আরো দুজনের মৃত্যুর খবর পাওয়া যায়। এতে মোট নিহতের সংখ্যা দাঁড়ায় আটজনে। জাতীয় পুলিশপ্রধান জেনারেল কিত্তিরাত ফানফেত সাংবাদিকদের বলেন, ফরেনসিক পরীক্ষায় দেখা গেছে, হামলাকারীর গুলির নিশানা বেশ নিখুঁত ছিল। কয়েকটি গুলি শরীরের গুরুত্বপূর্ণ অংশে লাগে। প্রধানমন্ত্রী আনুতিন বলেন, হামলাটি ভালোভাবে প্রস্তুত করা হয়েছিল। তার ভাষায়, হামলার ‘পরিষ্কার ধাপ ও পরিষ্কার লক্ষ্য’ ছিল।
পুলিশের কর্নেল থাদসাকর্ন কনথং বলেন, হামলায় ব্যবহৃত বন্দুক ও গুলিগুলো কিশোরটির দাদার ছিল। প্রাথমিক তদন্তে দেখা গেছে, দাদার শোবার ঘর থেকে বন্দুকটি নেওয়া হয়েছিল। আন্তর্জাতিক ও স্থানীয় গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা গেছে, বন্দুকটি আইন অনুযায়ী নিবন্ধিত ছিল। এর বৈধ অনুমতিপত্রও ছিল। পুলিশ এখন তদন্ত করে দেখছে, কিশোরটি কীভাবে বন্দুকটি হাতে পেল এবং হামলার আগে কীভাবে তা প্রস্তুত করেছিল। স্থানীয় গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে আরো বলা হয়েছে, পুলিশ কিশোরটির বিভিন্ন ইলেকট্রনিক যন্ত্র পরীক্ষা করে যুক্তরাষ্ট্রের স্কুলে গুলি চালানোর ঘটনা নিয়ে বেশ কয়েকটি ভিডিও পেয়েছে।
আরও পড়ুন: পাকিস্তান ও মালদ্বীপের ২০ দফা সমঝোতা, বাণিজ্য ২০০ কোটি ডলারে উন্নীত করার লক্ষ্য
কিশোরটির পরিবারের সদস্যরা তাকে শান্ত ও ভালো আচরণের ছেলে হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তার এক চাচা থাই গণমাধ্যমকে বলেন, কিশোরটি বেশির ভাগ সময় বাড়ির ভেতরেই থাকত। সে সহিংস ধরনের ভিডিও গেম খেলত এবং খুব কমই বাইরে যেত। তবে হামলার পরিকল্পনা করছিল, এমন কোনো লক্ষণ আগে দেখা যায়নি বলে জানান তার চাচা। কিশোরটি তার দাদা-দাদির সঙ্গে থাকত। তার বাবা-মায়ের মধ্যে বিবাহবিচ্ছেদ হয়েছিল। হামলার পর থাইল্যান্ডে আবারও আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ন্ত্রণের বিষয়টি সামনে এসেছে। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় বেসামরিক নাগরিকদের কাছে বন্দুক থাকার দিক থেকে থাইল্যান্ড অন্যতম শীর্ষ দেশ। দেশটিতে বেসামরিক নাগরিকদের কাছে প্রায় এক কোটি তিন লাখ আগ্নেয়াস্ত্র রয়েছে বলে ধারণা করা হয়। এর মধ্যে প্রায় ৪০ লাখ বন্দুক অবৈধভাবে মালিকানাধীন বলে বিভিন্ন হিসাবে উল্লেখ করা হয়েছে।
থাইল্যান্ডে আগ্নেয়াস্ত্র রাখার বিষয়ে কঠোর আইন রয়েছে। অবৈধভাবে বন্দুক রাখার অপরাধে সর্বোচ্চ ১০ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড হতে পারে। কিন্তু এসব আইন কার্যকর করার ক্ষেত্রে দীর্ঘদিন ধরে নানা সমস্যা রয়েছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী থাকাকালেও আনুতিন বন্দুক নিয়ন্ত্রণে কয়েকটি পদক্ষেপ নিয়েছিলেন। এর মধ্যে নতুন বন্দুকের লাইসেন্স দেওয়ার ওপর স্বল্পমেয়াদি নিষেধাজ্ঞা এবং বন্দুক আমদানিতে বিধিনিষেধ ছিল। এবার স্কুলে হামলার পর তিনি জনসমক্ষে বন্দুক বহন বন্ধ করতে নতুন আইন করার পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন। প্রস্তাবিত আইন কার্যকর হলে দায়িত্ব পালনরত সরকারি কর্মকর্তারাই শুধু জনসমক্ষে বন্দুক বহন করতে পারবেন।
আরও পড়ুন: জাপান মস্কোয় পাঠাল জ্যেষ্ঠ কূটনীতিক, সাংবাদিক মুক্তির আলোচনা
যে দেবসিরিন স্কুলে হামলার ঘটনা ঘটেছে, সেটি থাইল্যান্ডের অন্যতম পরিচিত মাধ্যমিক বিদ্যালয়। ব্যাংককে ১৮৮৫ সালে স্কুলটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। দেশটির বিভিন্ন জায়গায় এই স্কুলের শাখা রয়েছে। থাইল্যান্ডের অনেক পরিচিত ব্যক্তি এই স্কুলের সাবেক শিক্ষার্থী হিসেবে পরিচিত। তাদের মধ্যে কূটনীতিক, ক্রীড়াবিদ এবং কয়েকজন সাবেক প্রধানমন্ত্রীও রয়েছেন। এমন একটি ঐতিহ্যবাহী স্কুলে শিক্ষকদের ওপর গুলির ঘটনায় থাইল্যান্ডজুড়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। হামলার পর অস্ত্রের সহজলভ্যতা এবং বিদ্যমান আইন কতটা কার্যকরভাবে প্রয়োগ হচ্ছে, তা নিয়েও নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন