০৬:৫১ পি.এম
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এবং মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মধ্যে সম্পর্ককে দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম শক্তিশালী কৌশলগত জোট হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। ১৯৪৮ সালে ইসরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর থেকেই ওয়াশিংটনের সামরিক, অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক সহায়তা দেশটির নিরাপত্তার মূল ভিত্তি হিসেবে কাজ করেছে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে দুই নেতার মধ্যে প্রকাশ্য মতপার্থক্য ও কূটনৈতিক উত্তেজনা নতুন প্রশ্ন উঠিয়েছে- যুক্তরাষ্ট্র কি সত্যিই ইসরায়েল থেকে দূরত্ব তৈরি করছে?
বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমানে দুই দেশের সম্পর্ক চাপের মুখে রয়েছে, কিন্তু সম্পূর্ণ বিচ্ছেদের সম্ভাবনা এখনও খুবই ক্ষীণ। প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক সংকটও গভীর হয়েছে, বর্তমান সময়ে দুর্নীতির মামলায় অভিযুক্ত নেতানিয়াহু কঠিন সময় পার করছেন। চলতি বছরের শেষের দিকে সাধারণ নির্বাচনে ক্ষমতা হারানোর ঝুঁকির পাশাপাশি দোষী সাব্যস্ত হলে কারাদণ্ডের আশঙ্কাও তাঁর ওপর রয়েছে।
একই সময়ে, ইরানের সঙ্গে সম্ভাব্য সমঝোতা এবং দক্ষিণ লেবাননে চলমান সংঘাত নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের অবস্থানের পার্থক্য নেতানিয়াহুর ওপর নতুন চাপ সৃষ্টি করেছে। ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে শান্তিচুক্তির আলোচনায় তেহরান দক্ষিণ লেবাননে ইসরায়েলের সামরিক অভিযান বন্ধ করার শর্ত উঠিয়েছে। এ কারণে ওয়াশিংটন এবং তেল আবিবের মধ্যে মতবিরোধ তীব্র হয়েছে।
আরও পড়ুন: সাতক্ষীরা সীমান্তে বিজিবির অভিযানে ভারতীয় মালামাল জব্দ
ট্রাম্প এবং নেতানিয়াহুর সম্পর্কের অবনতি একটি ফাঁস হওয়া ফোনালাপে প্রকাশ পেয়েছে। ওই ফোনালাপের সত্যতা রিপোর্ট লেখার সময় পর্যন্ত অস্বীকার করেনি হোয়াইট হাউস। এতে উল্লেখ করা হয়েছে যে, সংঘাত দ্রুত শেষ করতে আগ্রহী ট্রাম্প নেতানিয়াহুকে লেবাননে হামলা বন্ধে অনীহা দেখানোর জন্য কঠোর ভাষায় ভর্ৎসনা করেন। তিনি নেতানিয়াহুকে ‘পাগল’ বলেও আখ্যা দেন এবং বলেন, যদি তাঁর হস্তক্ষেপ না থাকতো, তাহলে নেতানিয়াহু ইতোমধ্যেই কারাগারে থাকতেন। ট্রাম্প ফোনালাপে বলেন, “এখন সবাই তোমাকে ঘৃণা করে। এই যুদ্ধের কারণে সবাই ইসরায়েলকেও ঘৃণা করছে।”
গত সপ্তাহে মার্কিন সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওসে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেছেন, “নেতানিয়াহু জানেন, আসল সিদ্ধান্ত কে নেয়।” রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই মন্তব্য দুই নেতার সম্পর্কে অস্বাভাবিক উত্তেজনার ইঙ্গিত দেয়।
মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স জুনে এক সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, বর্তমানে বিশ্বে ইসরায়েলের প্রতি সবচেয়ে সহানুভূতিশীল নেতা হলেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। তবে তিনি ইসরায়েলের কয়েকজন মন্ত্রীর সমালোচনার জবাবে বলেন, ইসরায়েলকে রক্ষা করার জন্য ব্যবহৃত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার দুই-তৃতীয়াংশ অস্ত্র যুক্তরাষ্ট্রের অর্থায়নে তৈরি হয়েছে এবং সেগুলোর ব্যয় মার্কিন করদাতাদের। এ বক্তব্যকে অনেকেই ইসরায়েলের প্রতি ওয়াশিংটনের স্পষ্ট সতর্কবার্তা হিসেবে দেখছেন।
‘মাগা’ শিবিরের মধ্যে অসন্তোষ বৃদ্ধি পাচ্ছে। ট্রাম্পের ‘মেক আমেরিকা গ্রেট অ্যাগেইন (মাগা)’ আন্দোলনের অংশ কিছু লোক ইসরায়েলের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের নিঃশর্ত সমর্থনের বিরোধিতা করছে। এক সময়ের ট্রাম্প-ঘনিষ্ঠ রিপাবলিকান কংগ্রেস সদস্য মার্জোরি টেলর গ্রিন ইসরায়েলকে সমর্থনের সমালোচনা করেছেন। ডানপন্থী ভাষ্যকার টাকার কার্লসন দাবি করেন, ইসরায়েল ট্রাম্পকে ইরানে হামলা চালাতে প্রভাবিত করেছে যাতে পরে লেবাননের বিরুদ্ধে বড় সামরিক অভিযান চালানো যায়। কার্লসনের ভাষ্য অনুযায়ী, ট্রাম্প বুঝতে পেরেছেন, ইসরায়েল তাঁর প্রশাসনের জন্য একটি বড় কৌশলগত ঝুঁকি হয়ে উঠেছে।
আরও পড়ুন: নোট অব ডিসেন্টে পরিবর্তন চাইলে বৈঠকে আসতে হবে: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ
ওয়াশিংটনভিত্তিক জর্জটাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ-এর গবেষক ড্যানিয়েল বাইম্যান বলেছেন, ট্রাম্প চাইলে ইসরায়েলের ওপর চাপ প্রয়োগের রাজনৈতিক সক্ষমতা রাখেন। রিপাবলিকান পার্টি ঐতিহ্যগতভাবে ইসরায়েলপন্থী, কিন্তু ট্রাম্পের নিজস্ব শক্তিশালী রাজনৈতিক ভিত্তি রয়েছে। তিনি চাইলে দলের বড় অংশকেই নিজের অবস্থানের পক্ষে আনতে পারবেন। এছাড়া ডেমোক্রেটিক পার্টির একটি বড় অংশও এখন ইসরায়েলের সমালোচনায় ক্রমেম সোচ্চার হচ্ছে। ২০১৬ সালে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মধ্যে স্বাক্ষরিত সমঝোতার আওতায় দশ বছরে ৩৮ বিলিয়ন ডলার সামরিক সহায়তার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়, যা অন্য কোনও দেশের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় সামরিক সহায়তা চুক্তি। আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরে ইসরায়েলের সবচেয়ে বড় কূটনৈতিক রক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করছে। গাজা যুদ্ধের সময় জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে ইসরায়েলের পক্ষে অন্তত ছয়বার ভেটো দিয়েছে ওয়াশিংটন।
নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে বিরোধী দলের আক্রমণ বাড়ছে। আসন্ন নির্বাচনের আগে বিরোধী দলগুলো নেতানিয়াহুর পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে তীব্র সমালোচনা করছে। সাবেক ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী ও বর্তমান বিরোধীদলীয় নেতা ইয়াইর লাপিদ অভিযোগ করেছেন, নেতানিয়াহুর ব্যর্থতার ফলে ইসরায়েল ক্রমেই আন্তর্জাতিকভাবে একঘরে হয়ে পড়ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে তিনি উল্লেখ করেছেন, “যদি সরকারকে দ্রুত পরিবর্তন করা না যায়, তাহলে ইসরায়েলের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক কার্যত ধ্বংস হয়ে যাবে।” অন্যদিকে সাবেক সেনাপ্রধান গাদি আইজেনকট, যিনি আসন্ন নির্বাচনে নেতানিয়াহুর প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে বিবেচিত হচ্ছেন, অভিযোগ করেছেন যে, নেতানিয়াহুর ভুল কূটনীতির কারণে ট্রাম্প ইসরায়েলকে পাশ কাটিয়ে একাই ইরানের সঙ্গে সমঝোতার পথ খুঁজছেন।
আকাঙ্ক্ষিত বিচ্ছেদের সম্ভাবনা কতটা? ইসরায়েলি রাজনৈতিক বিশ্লেষক নিমরোদ ফ্লাশেনবার্গের মতে, “যুক্তরাষ্ট্রই ইসরায়েলের আন্তর্জাতিক অবস্থানের মূল ভিত্তি। প্রতিরক্ষা, প্রযুক্তি এবং কূটনৈতিক সমর্থন- সব ক্ষেত্রেই ইসরায়েল যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরশীল।” সাবেক মার্কিন কূটনীতিক অ্যারন ডেভিড মিলারের মতে, অতীতেও মার্কিন প্রেসিডেন্টদের সঙ্গে ইসরায়েলি নেতাদের মধ্যে মতবিরোধ হয়েছে, তবে বর্তমান প্রশাসনের মতো এত কঠোর ভাষায় সমালোচনা আগে খুব কমই ঘটেছে। বর্তমান যুক্তরাষ্ট্রে কংগ্রেস এবং সাধারণ মানুষের ইসরায়েলের প্রতি জনপ্রিয়তা আগের যেকোনও সময়ের তুলনায় কম। তবে, সমস্ত উত্তেজনা সত্ত্বেও তিনি মনে করেন, ট্রাম্প প্রশাসন ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করার কোনও পরিকল্পনা করছে না। মিলারের মতে, “ট্রাম্প যদি কখনও ইসরায়েলের ওপর চাপ তৈরি করেন, তা হবে এমন কোনও কূটনৈতিক সাফল্যের জন্য, যা তাঁর রাজনৈতিক ভাবমূর্তি শক্তিশালী করবে।” লেবানন, গাজা কিংবা ইসরায়েল-সৌদি আরব সম্পর্কের স্বাভাবিকীকরণের ক্ষেত্রে এমন অগ্রগতির সম্ভাবনা নেই, যার জন্য ওয়াশিংটন দীর্ঘমেয়াদি ও কঠোর চাপ প্রয়োগ করবে। অতএব, বর্তমান উত্তেজনা সত্ত্বেও যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল সম্পর্কের ভিত্তি আপাতত অটুট থাকবে বলেই মনে করছেন অধিকাংশ আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক। সূত্র: আল-জাজিরা
আরও পড়ুন: তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান হিসেবে স্পিকারকে প্রস্তাব, জানালেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন