১১:৪০ এম
বিদেশি পর্যটকদের কাছে কিউবার আকর্ষণের হ্রাস দ্রুতগতিতে ঘটছে। চলতি বছরের প্রথম পাঁচ মাসে দেশটিতে বিদেশি পর্যটকের সংখ্যা অর্ধেকেরও বেশি কমে গেছে।
এটি যুক্তরাষ্ট্রের কড়া নিষেধাজ্ঞাকে প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে। কিউবার জাতীয় পরিসংখ্যান সংস্থার প্রকাশিত তথ্য ও পরিসংখ্যান অনুসারে, বিষয়টি পরিস্কারভাবে প্রতিভাত হয়েছে।
বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর নিষেধাজ্ঞা এবং অর্থনৈতিক চাপের ফলস্বরূপ পর্যটন খাত একটি বড় সংকটে পড়ে গিয়েছে। এর প্রভাব কিউবার সামগ্রিক অর্থনীতিতে এখন স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান হচ্ছে।
আরও পড়ুন: তারেক রহমান: জামায়াত-এনসিপি আমার রাষ্ট্রীয় সম্মান সহ্য করতে পারছে না
কিউবার জাতীয় পরিসংখ্যান সংস্থা ওনেইর অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে মে মাসে দেশটিতে ৩ লাখ ৬০ হাজারেরও কম বিদেশি পর্যটক ভ্রমণ করেছেন। গত বছরের একই সময়ের তুলনায় এই সংখ্যাটি ৫৮ দশমিক ৪ শতাংশ কমে গেছে।
পর্যটন খাতটি কিউবায় বিদেশি মুদ্রা অর্জনের অন্যতম প্রধান উৎস। অর্থনৈতিক সংকটে থাকা দেশের জন্য এই খাতের গুরুত্ব অপরিসীম।
তবে সাম্প্রতিক সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের পদক্ষেপের ফলস্বরূপ খাতটি নতুন করে চাপে পড়েছে। বিশেষ করে, ট্রাম্প প্রশাসন কিউবার সরকারের ওপর চাপ বাড়ানোর কৌশল হিসেবে দেশটির পর্যটন খাত এবং সংশ্লিষ্ট ব্যবসাগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করেছিল, যার ফলে কয়েকটি বিদেশি বিমান সংস্থা ও আন্তর্জাতিক হোটেল প্রতিষ্ঠান কিউবায় তাদের কার্যক্রম কমিয়ে দিয়েছে বা বন্ধ করেছে। এতে আগের তুলনায় পর্যটকের সংখ্যা চলমানভাবে আরো কমে গেছে।
এ মাসের শুরুতে, কানাডার বিমান সংস্থা এয়ার কানাডা ঘোষণা করেছে যে, তারা অনির্দিষ্ট সময়ের জন্য কিউবায় ফ্লাইট পরিচালনা বন্ধ রাখবে। প্রতিষ্ঠানটি তার এই সিদ্ধান্তের জন্য কিউবার রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তাকে উল্লেখ করেছে। এর আগে ফেব্রুয়ারি মাসে কিউবায় বিমান জ্বালানি সংকট দেখা দেওয়ায় সাময়িকভাবে ফ্লাইট বন্ধ করেছিল এয়ার কানাডা, যা কিউবার পর্যটন খাতের জন্য একটি বড় ধাক্কা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
আরও পড়ুন: আদাবরে যুবদল নেতাকে চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে জখম
কারণ চলতি বছর কিউবায় আসা বিদেশি পর্যটকদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ছিল কানাডার নাগরিক। শুধু বিমান সংস্থাগুলো নয়, আন্তর্জাতিক হোটেল ব্যবসাও কিউবায় সংকুচিত হতে দেখা যাচ্ছে। স্পেনের দুটি বড় হোটেল চেইন মেলিয়া ও ইবেরোস্টার কিউবার বেশ কয়েকটি হোটেলে তাদের কার্যক্রম বন্ধ করে দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র কিউবার রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান গায়েসার সঙ্গে ব্যবসা বন্ধ করার জন্য বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলোকে ৫ জুন পর্যন্ত সময় দিয়েছিল। সেই সময়ের আগে স্প্যানিশ প্রতিষ্ঠান দুটি কিউবায় কার্যক্রম সীমিত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও অভিযোগ করেছেন যে, গায়েসা কিউবার সশস্ত্র বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে পরিচালিত হয় এবং এটি ‘রাষ্ট্রের ভেতরে আরেকটি রাষ্ট্র’ হিসেবে কাজ করে। সম্প্রতি এক ভাষণে তিনি এই নিয়ে মন্তব্য করেন যে, গায়েসা তাদের ব্যবসায়িক লাভ দেশের সাধারণ মানুষের পরিবর্তে একটি ছোট প্রভাবশালী গোষ্ঠীর স্বার্থে ব্যয় করে। তার অভিযোগ, যারা এর বিরুদ্ধে কথা বলে, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়।
যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা এবং তেল সরবরাহে বাধা সৃষ্টি হওয়ায় কিউবার অর্থনৈতিক সংকট আরো গভীর হয়েছে। দেশে জ্বালানি, খাদ্য এবং ওষুধের ঘাটতি আগে থেকেও বেড়ে গেছে। বহু খাতে উৎপাদন এবং সেবা কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। জানুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সতর্ক করেছিলেন যে, কিউবাকে তেল সরবরাহকারী যেকোনো দেশ বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সে ঘোষণার পর থেকেই পরিস্থিতির আরও অবনতি ঘটেছে বলে দাবি করেছে কিউবার রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম।
কিউবার রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম কিউবাডিবাতে প্রকাশিত প্রতিবেদনে জানিয়েছে, ওষুধ এবং চিকিৎসা সরঞ্জামের সংকটের কারণে ক্যানসারে আক্রান্ত শিশুদের জীবিত থাকার হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। প্রতিবেদনগুলোতে উল্লেখ করা হয়েছে, যেখানে এই হার আগে ৮৫ শতাংশ ছিল, এখন তা নামিয়ে ৬৫ শতাংশে এসে দাঁড়িয়েছে। স্বাস্থ্য খাতে এ অবস্থা দেশের চলমান অর্থনৈতিক সংকটের অন্যতম বড় প্রভাব হিসেবে দেখা হচ্ছে।
আরও পড়ুন: শেরপুরে বাসের চাপায় সিএনজি যাত্রী নিহত, আহত ৪
জ্বালানির ঘাটতির কারণে কিউবার অর্থনীতির বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ খাত প্রায় অচল হয়ে পড়েছে। এর মধ্যে বর্জ্য সংগ্রহ ব্যবস্থাও অন্তর্ভুক্ত। যথেষ্ট জ্বালানি না থাকার কারণে নিয়মিত ময়লা অপসারণ করা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে বিভিন্ন শহরের রাস্তায় আবর্জনার স্তূপ জমে উঠেছে।
দেশজুড়ে দীর্ঘ সময়ের বিদ্যুৎ বিভ্রাট এখন কিউবার মানুষের দৈনন্দিন জীবনের অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনেক এলাকায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকে না, কোথাও কোথাও পরিস্থিতি ক্ষেত্রফল আরও খারাপের দিকে যাচ্ছে। এ কারণে দেশটিতে সাম্প্রতিক সময়ে কিছু বিক্ষোভও অনুষ্ঠিত হয়েছে।
তবে মানবাধিকার সংগঠনগুলোর অভিযোগ, কিউবায় সরকারবিরোধী প্রতিবাদ সাধারণত কঠোরভাবে দমন করা হয় এবং অনেক ক্ষেত্রে দীর্ঘ কারাদণ্ড দেওয়ার ঘটনা ঘটে।
অর্থনৈতিক সংকটের প্রভাব এখন ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপরেও পড়ছে। বার্তা সংস্থা এএফপির রিপোর্টে বলা হয়েছে, ক্যাথলিক ধর্মীয় অনুষ্ঠানের জন্য ব্যবহৃত কমিউনিয়ন ওয়েফারের সংকটও দেখা দিয়েছে। কয়েকজন ক্যাথলিক পুরোহিত জানিয়েছেন, তাদের ওয়েফার ব্যবহার সীমিত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সাধারণত ধর্মীয় উপাসনার সময় এই বিশেষ ধরনের রুটি বিশ্বাসীদের মধ্যে বিতরণ করা হয়। ওয়েফারগুলো হাভানার একটি মঠে তৈরি হয়। সেখানকার সন্ন্যাসিনীরা জানিয়েছেন, ঘন ঘন বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে উৎপাদন ধরে রাখা তাদের জন্য চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে। বলা হচ্ছে, তাদের অধিকাংশ সময় মাত্র দুই ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকে। ফলে প্রয়োজনীয় পরিমাণ ওয়েফার তৈরি করা সম্ভব হচ্ছে না।
আরও পড়ুন: কোনো দল সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পেলে পেলে কতদিন ক্ষমতায় থাকবেন নেতানিয়াহু?
পর্যটকের সংখ্যার এই পতন, বিদেশি বিনিয়োগের হ্রাস, এবং জ্বালানি, খাদ্য ও ওষুধের ঘাটতি—এই সব মিলিয়ে কিউবার অর্থনৈতিক পরিস্থিতি প্রতিদিন আরো কঠিন হয়ে উঠছে। পরিস্থিতির দ্রুত উন্নতি না হলে দেশটির পর্যটন শিল্পের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাও বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন