০১:৩৭ এম
ছবি: সংগৃহীত
দেশের পুলিশ বাহিনীতে বিগত দেড় দশকে সদস্য সংখ্যা প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে, তবুও আবাসন সুবিধা তেমন বাড়েনি। ফলে পুলিশ বাহিনীকে কার্যক্রম পরিচালনা করতে হচ্ছে আবাসন সুবিধা ছাড়াই। বর্তমানে আড়াই লাখ সদস্যের পুলিশ বাহিনীর মধ্যে মাত্র ১০ শতাংশ সদস্য আবাসন সুবিধা পায়। বাকি ৯০ শতাংশ পুলিশ সদস্যকেই বাসস্থানের মৌলিক চাহিদা মেটাতে ভাড়া বাসায় কিংবা অন্য কোনো উপায় অবলম্বন করতে হচ্ছে। আবাসনসহ অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা তৈরি না করেই সদস্য সংখ্যা বাড়ানোয় পুলিশ বাহিনীর ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে। এইভাবে সমস্যাগুলো পুলিশ সদস্যদের মধ্যে নৈতিকতার চর্চা কঠিন করে তুলছে। মূলত পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা না বাড়িয়েই পুলিশে পদ সৃষ্টি করা হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র অনুযায়ী, বাংলাদেশ পুলিশের সদস্য সংখ্যা বিগত ২০১০ সালে প্রায় ১ লাখ ১৭ হাজার ছিল। বর্তমানে ওই সংখ্যা আড়াই লাখে পৌঁছেছে। বাংলাদেশ পুলিশ বাহিনীতে সদস্য সংখ্যা দেড় দশকের ব্যবধানে ১ লাখ ৩৩ হাজার বেড়েছে। এই সময়ে বাহিনীটিতে ৬টি নতুন ইউনিট সৃষ্টি করা হয়েছে। ইউনিটগুলো হল- পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই), ট্যুরিস্ট পুলিশ, নৌ-পুলিশ, অ্যান্টি-টেরোরিজম ইউনিট (এটিইউ), বাংলাদেশ পুলিশ মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর এবং ম্যাস র্যাপিড ট্রানজিট (এমআরটি)। বর্তমানে পুলিশ বাহিনীতে মোট ১ লাখ ৭৩ হাজারের মতো কনস্টেবল রয়েছে, যারা সরাসরি মাঠ পর্যায়ে দায়িত্ব পালন করেন। তাদের মধ্যে কেউ কেউ থানায় যুক্ত থাকে, আবার কেউ রিজার্ভ ফোর্স হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। বর্তমানে বাহিনীর মোট সদস্যের মধ্যে মাত্র ১০ শতাংশ সদস্য আবাসন সুবিধা পায়। বাকি সদস্যরা নিজেদের ব্যবস্থাপনায় অবস্থান করছেন।
আরও পড়ুন: পেরুতে ৫.৫ মাত্রার শক্তিশালী ভূমিকম্পে নিহত ৫
সূত্র জানায়, পুলিশ সদস্যদের আবাসনের জন্য রাজধানীতে রয়েছে মিরপুর স্টাফ কোয়ার্টার, তিনতলা অফিসার্স কোয়ার্টার্স, সৈনিক ব্যারাক, অফিসার্স মেস, ইস্কাটনে পুলিশ অফিসার্স মেস, ডেমরা পুলিশ অফিসার্স কোয়ার্টার্স ও নীলক্ষেতে ১৫ তলা একটি অফিসার্স কোয়ার্টার। নীলক্ষেতের ভবনটিতে ৬০০ বর্গফুটের বাসায় পরিদর্শক ও উপপরিদর্শক পদমর্যাদার কর্মকর্তারা অবস্থান করেন। উত্তরা এলাকায় এসপিবিএনসহ বিভিন্ন ইউনিটের জন্য বেশ কিছু কোয়ার্টার নির্মাণ করা হয়েছে। তাছাড়া পুরনো রমনা থানা ভবনের পাশেও পাঁচতলা একটি অফিসার্স কোয়ার্টার রয়েছে। রাজারবাগে সাতটি ব্যারাক আছে, যেখানে পরিদর্শক পদমর্যাদার কর্মকর্তাদের সঙ্গে কনস্টেবলরাও অবস্থান করছেন। রাজারবাগ হাসপাতালের পাশে মধুমিতা নামে ১৬ তলা একটি অফিসার্স কোয়ার্টার রয়েছে, যা সম্প্রতি ২০ তলায় উন্নীত করা হচ্ছে। ভবনটির সব ফ্ল্যাট ১ হাজার ১০০ বর্গফুটের। পাশেই তিতাস নামে পাঁচতলা একটি অফিসার্স কোয়ার্টারও অফিসারদের জন্য বরাদ্দ রয়েছে। এছাড়া রাজারবাগে পদ্মা, যমুনা ও মেঘনা নামে আরো তিনটি চার-পাঁচ তলা বিশিষ্ট অফিসার্স কোয়ার্টার রয়েছে।
সূত্র আরো জানায়, ব্যারাকে থাকা পুলিশ সদস্যদের আবাসন সীমিত হওয়ায় তা স্বাস্থ্যকর নয়। বরং ৩০ হাজার সদস্যের আবাসন ব্যবস্থায় দ্বিগুণের বেশি সদস্যকেই থাকতে হচ্ছে। ডিএমপির প্রটেকশন অ্যান্ড প্রটোকল বিভাগের সদস্যদের আবাসনের জন্য দুটি ভবন বরাদ্দ রয়েছে, যেখানে ১ হাজার ০৫১ জন থাকার সক্ষমতা রয়েছে; কিন্তু সেখানে ২ হাজার ১২২ জনকে থাকতে হচ্ছে। অধিক অবস্থানের কারণে অনেক পুলিশ সদস্যকে সিঁড়ির নিচে বিছানা পেতে থাকতে হচ্ছে। পর্যাপ্ত জায়গা না পাওয়া গেলে অনেককে ভবনের বাইরে খোলা আকাশের নিচে তাঁবু টাঙিয়ে অবস্থান করতে হচ্ছে। পুলিশদের কাছ থেকে ভালো সেবা পেতে হলে তাদের স্বাস্থ্যকর আবাসনসহ মৌলিক সুবিধাগুলো নিশ্চিত করা জরুরি। কারণ দীর্ঘ ডিউটির পর ভালো বিশ্রাম না পেলে তা পুলিশের কার্য প্রভাবিত করে। এই কারণে পুলিশ বিভাগের উভয় সেবাগুলো নিশ্চিত করাই প্রথমPriority। পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধার ব্যবস্থা না করে লোকবল বাড়ালে পুলিশের বাহিনীতে একটি ভারসাম্যহীনতা তৈরি হয়।
এদিকে স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, একটি স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনের জন্য সাধারণভাবে জনপ্রতি ১০০-৪০০ বর্গফুট জায়গা প্রয়োজন। ক্ষেত্রবিশেষে তা কিছু কমবেশি হলেও ৭০ বর্গফুটের কম হওয়ার কোনো কারণ নেই। কারণ, অতিরিক্ত মানুষের সংমিশ্রণ ঘটলে বহু ধরনের রোগে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। বিশেষ করে জনঘনত্ব বেশি হলে ছোঁয়াচে রোগের দ্রুত বিস্তার ঘটাতে সুবিধা তৈরি হয়। এ ছাড়া দীর্ঘ ডিউটির পরে গাদাগাদি অবস্থায় থাকার ফলে পুলিশ সদস্যদের মধ্যে মানসিক অবসাদেরও সৃষ্টি হতে পারে। কেননা একাধিক মানুষের জন্য নির্দিষ্ট স্থানের ধারণক্ষমতা অতিক্রম হলে অভ্যন্তরীণ বাতাসের মান দুর্বল হয়ে যায়। এটি শরীরের অঙ্গপ্রত্যঙ্গের কার্যকারিতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। অবশিষ্ট থাকলে নোংরা ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে থাকার কারণে স্ক্যাবিস ও ইউরিনারি ইনফেকশনের মতো রোগ ছড়ানোর পরিবর্তন দেখা দেয়। অন্যদিকে বিগত ১৬ বছরে পুলিশে দফায় দফায় নিয়োগ কার্যক্রম চলছে। কিছু বছরে দুবারও নিয়োগ দেয়া হয়েছে। ফলে স্বল্প সময়ের মধ্যে সদস্স সংখ্যা দ্বিগুণ করার মাধ্যমে পুলিশ বাহিনী রয়েছে। তবে সে অনুযায়ী আবাসন, স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও অন্যান্য মৌলিক সুবিধাগুলো গড়ে তোলা হয়নি এবং পুলিশ সদস্যদের দক্ষতাও বাড়ানো যায়নি। যানবাহন সংকটের কারণে টহল কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারে না অনেক থানা পুলিশ, যদিও লোকবলের ঘাটতি নেই। এর ফলে পুলিশ বাহিনী, যা আড়াই লাখ সদস্য নিয়ে গঠিত, তা একইভাবে সীমিত সেবা কার্যক্রম বজায় রেখেছে।
পুলিশের আবাসন সঙ্কট প্রসঙ্গে পুলিশ সদর দপ্তরের এআইজি (মিডিয়া) এএইচএম শাহাদাত হোসাইন জানান, পুলিশের আবাসন সংকট দীর্ঘদিনের। এই সংকট কাটিয়ে উঠতে চেষ্টা চলছে। ইতিমধ্যে একটি পরিকল্পনাও নেয়া হয়েছে। সরকার পুলিশের আবাসন সংকট নিরসনে আন্তরিক প্রচেষ্টা চালাচ্ছে।
আরও পড়ুন: ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠকের কয়েক দিন পর তেহরান সফরে যাচ্ছেন ইরাকের প্রধানমন্ত্রী
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন