০৫:৪০ এম
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো। ছবি: ফিফা
বিশ্বকাপ টিকেটের বরাদ্দ বাতিলের অভিযোগ ইরানের। বিসিবি পরিচালকরা কে কোন দায়িত্বে। ট্রায়ালে অংশ নিতে আমেরিকা থেকে ঢাকায় জিনাত। ঢাকায় শুরু হচ্ছে ৬ জাতির আন্তর্জাতিক হ্যান্ডবল। মাঠে ফিরেই ম্যাচসেরা, যা বললেন মোসাদ্দেক।
আরও পড়ুন: "অসহিষ্ণু বক্তব্য রাজনীতিকে ‘পয়েন্ট অফ নো রিটার্ন’-এ নিয়ে যেতে পারে": সৈয়দ এমরান সালেহ প্রিন্স
২০২৬ ফুটবল বিশ্বকাপ শুরুর আগেই যুক্তরাষ্ট্রের ভিসানীতি নিয়ে সৃষ্টি হয়েছে নানা বিতর্ক। সোমালিয়ার এক রেফারিকে মিয়ামি বিমানবন্দর থেকে ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে, ইরান ও আফ্রিকার বিভিন্ন দেশের সাংবাদিকরা ভিসা পাননি এবং ইরান জাতীয় দলের প্রশিক্ষণ শিবির মেক্সিকোতে সরিয়ে নেওয়ার মত ঘটনা বিশ্বকাপের আয়োজনকে ঘিরে নতুন প্রশ্নের সৃষ্টি করেছে।
সমালোচকদের মতে, এই সমস্যাগুলোর ইঙ্গিত আগেই দেখা গিয়েছিল। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ক্ষমতায় ফিরে দ্বিতীয় মেয়াদে প্রথম দিনেই আগ্রাসনের বিরুদ্ধে আমেরিকান জনগণকে রক্ষা করা’ শিরোনামে একটি নির্বাহী আদেশে স্বাক্ষর করেন। পরে মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকার কিছু দেশের ওপর ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা জারি করেন। কিছু দেশের নাগরিকদের জন্য ব্যবসা বা পর্যটক ভিসা আবেদন করতে ১৫ হাজার ডলারের মতো বন্ড জমা দেওয়ার শর্ত আরোপ করা হয়। এছাড়া ৭৫টি দেশের নাগরিকদের অভিবাসন ভিসা আবেদনও স্থগিত রাখা হয়।
এমন বাস্তবতায় বিশ্বকাপের সঙ্গে যুক্ত ভিসা সমস্যা দেখা দেওয়াকে অনেকেই অস্বাভাবিক মনে করছেন না।
তবে দীর্ঘদিন ধরে ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো এসব উদ্বেগকে গুরুত্ব দেননি। তিনি ২০২৫ সালে প্যারাগুয়েতে অনুষ্ঠিত ফিফা কংগ্রেসে বলেছিলেন, ‘বিশ্বকে আমেরিকায় স্বাগত জানানো হবে।’ তিনি আরও বলেন, ‘খেলোয়াড়, সংশ্লিষ্ট সবাই এবং অবশ্যই সমর্থকরা স্বাগত। এটা শুধু আমার কথা নয়, এটা মার্কিন সরকারের অবস্থান।’
আরও পড়ুন: আনোয়ারায় কেইপিজেড ও চায়না ইকোনমিক জোন পরিদর্শন করলেন প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী
একই বছরের গ্রীষ্মে কেনিয়ার এক দক্ষিণ আফ্রিকান সাংবাদিক ইনফান্তিনোকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, আমরা এমন একটি দেশে খেলতে যাচ্ছি যেখানে আমাদের অনেকেই নিজেদের স্বাগত মনে করি না। আফ্রিকা ও বিশ্বের অন্যদের যেন বহিরাগত বা দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক মনে না হয়, তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব আপনার।
এ ব্যাপারে ইনফান্তিনো জবাবে বলেন, এ বিষয়ে অনেক ভুল ধারণা রয়েছে। আগামী বছরের বিশ্বকাপে কানাডা, মেক্সিকো এবং যুক্তরাষ্ট্রে সবাইকে স্বাগত জানানো হবে। যোগ্যতা অর্জনকারীরা তাদের সমর্থকদের নিয়ে আসতে পারবেন।
বিশ্লেষকদের মতে, এটি মূলত যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি নীতির বিষয় এবং এর জন্য সরাসরি ফিফাকে দায়ী করা যায় না। তবে ইনফান্তিনোর বাণিজ্যিক আশ্বাস এবং অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস এখন ফিফাকে অস্বস্তিকর অবস্থায় ফেলেছে। কাতার বিশ্বকাপের সময়ও তিনি স্বাগতিক দেশের পক্ষে নানা প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। এবার তিনি একই কৌশল নিয়েছেন।
সাম্প্রতিক সময়ে ফিফার কিছু কর্মকর্তা দাবি করেছেন, একটি ফুটবল সংস্থা হিসেবে তারা কোনো দেশের অভিবাসন নীতিতে হস্তক্ষেপ করার ক্ষমতা রাখেন না। কিন্তু সমালোচকরা বলছেন, ইনফান্তিনো নিজেই ফিফাকে এমনভাবে উপস্থাপন করেছেন যেন এটি কেবল একটি ক্রীড়া সংস্থা নয়, বরং বৈশ্বিক ঐক্যের একটি প্রতীক। তার স্লোগান হলো ‘
আরও পড়ুন: রাত পোহালেই ভোট, বিএনপি না জামায়াত হাসবে?
ফুটবল বিশ্বকে একত্রিত করে’ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে, পৃথিবীর কোনো রাজনৈতিক নেতার চেয়ে বেশি বার হোয়াইট হাউসের ওভাল অফিসে দেখা গেছে ইনফান্তিনোকে। ট্রাম্পের অভিষেকের আগের একটি সমাবেশে তিনি রিপাবলিকানদের প্রতীকী লাল টাই পরেন। মার-আ-লাগো সফর করেন এবং ট্রাম্পের অভিষেক অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করেন। এক সম্মেলনে তিনি বলেন, ‘ট্রাম্প যা করছেন, আমেরিকানদের তা সমর্থন করা উচিত, কারণ বিষয়টি ভালো দেখাচ্ছে।’
শুধু তাই নয়, নিউইয়র্কের ট্রাম্প টাওয়ারে ফিফা অফিস খোলা হয়েছে। ফলে ফিফা সরাসরি ট্রাম্প পরিবারের ব্যবসায় ভাড়া দিচ্ছে। বিশ্বকাপের ড্র অনুষ্ঠানের স্থানও শেষ মুহূর্তে লাস ভেগাস থেকে সরিয়ে ওয়াশিংটনের কেনেডি সেন্টারে স্থানান্তর করা হয়, যেখানে ট্রাম্পপন্থিদের প্রভাব বিদ্যমান ছিল।
এসব কারণে সমালোচকদের প্রশ্ন, এত ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকার পরও ফিফা কীভাবে দাবি করছে যে তারা কেবল একটি ফুটবল টুর্নামেন্টের আয়োজক এবং ভিসা সমস্যার বিষয়ে তাদের কিছু করার নেই?
ফিফার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা জটিলতা ট্রাম্প আমলেই শুরু হয়নি। প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের সময়েও এ নিয়ে উদ্বেগ ছিল। বিশ্বকাপের আয়োজক শহরগুলো ও পর্যটন খাতের প্রতিনিধিরা দীর্ঘ ভিসা সাক্ষাৎকারের অপেক্ষা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন। পরে কংগ্রেস ৫ কোটি ডলার বরাদ্দ দিয়ে সেই জট কমানোর উদ্যোগ নেয়।
কাতার বিশ্বকাপে দর্শকদের জন্য ‘হায়া কার্ড’ ব্যবস্থার মতো একটি বিশেষ সুবিধা ২০২৬ বিশ্বকাপেও চালু করতে চেয়েছিল ফিফা। কিন্তু নিরাপত্তাজনিত কারণে যুক্তরাষ্ট্র তা প্রত্যাখ্যান করে। এমনকি কানাডা, যুক্তরাষ্ট্র এবং মেক্সিকো মিলিয়ে একটি অভিন্ন ভিসা ব্যবস্থার প্রস্তাবও গৃহীত হয়নি। ফলে তিনটি দেশের জন্য আলাদা প্রবেশ নীতি বহাল রয়েছে।
আরও পড়ুন: সৌদি আরব থেকে ৯ মাসে ২ হাজার মরদেহ, নারী কর্মীরা সন্তানের বাবার পরিচয় জানেন না
ট্রাম্প ক্ষমতায় ফিরে আসার পর পরিস্থিতি আরও কঠোর হয়েছে। ২০২৫ সালের শুরুতে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের কিছু কর্মকর্তা আশঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন যে, বিশ্বকাপে অংশগ্রহণকারী কিছু দেশের নাগরিকদের ওপর ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা আরোপ হতে পারে। বর্তমানে বিশ্বকাপে অংশ নেওয়া চার দেশের নাগরিক—সেনেগাল, আইভরি কোস্ট, ইরান এবং হাইতির ওপর ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা কার্যকর রয়েছে।
ফিফা কিছু সাফল্যের দাবি করলেও সেগুলোর প্রভাব সীমিত। ‘ফিফা পাস’ নামে একটি ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে, যার মাধ্যমে সমর্থকেরা দ্রুত ভিসা সাক্ষাৎকারের সুযোগ পেতে পারেন। তবে এটি ভিসা পাওয়ার কোনো নিশ্চয়তা দেয় না। মে মাসের মাঝামাঝি পর্যন্ত মাত্র প্রায় ২০ হাজার মানুষ এই সুবিধা গ্রহণ করেছিলেন।
এদিকে বিশ্বকাপের টিকিটধারীদের জন্য কিছু দেশের নাগরিকদের ভিসা বন্ড মওকুফ করার ঘোষণা হলেও শর্ত ছিল কঠোর। নির্দিষ্ট সময়ে টিকিট কেনা এবং ফিফা পাসে নিবন্ধন করা ব্যক্তিরাই কেবল এ সুবিধা পান। তাই বাস্তবে উপকৃত হয়েছেন খুব অল্পসংখ্যক সমর্থক।
ভিসা সাক্ষাৎকারের বাস্তবতাও উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। সাধারণত কয়েক মিনিটের মধ্যে আবেদনকারীদের যুক্তরাষ্ট্রে ভ্রমণের বৈধ কারণ প্রমাণ করতে হয়। সাক্ষাৎকারে দেখাতে হয় যে তাদের স্থায়ী বাসস্থান রয়েছে এবং সফর শেষে তারা দেশে ফিরে যাবেন। সাবেক কনস্যুলার কর্মকর্তারা মনে করেন, বর্তমান রাজনৈতিক পরিবেশে অনেক কর্মকর্তা ঝুঁকি নিতে অনিচ্ছুক। ফলে মধ্যপ্রাচ্য, আফ্রিকা এবং দক্ষিণ আমেরিকার আবেদনকারীদের ক্ষেত্রে প্রত্যাখ্যানের হার বেশি হতে পারে।
আরও পড়ুন: দুধের উৎপাদন খরচ ৪৪.৮০ টাকা, বিক্রি ১০০-১১০ টাকায়
এগুলোর প্রেক্ষিতে ফিফা সভাপতিকে গণমাধ্যমের সামনে খুব কমই জবাব দিতে দেখা গেছে। বিশ্বকাপের টিকিট বিতর্ক, স্টেডিয়ামে পানির বোতল নেওয়ার বিধিনিষেধ, উচ্চ পরিবহন খরচ কিংবা দর্শকদের জন্য অতিরিক্ত অর্থের বিনিময়ে জায়ান্ট স্ক্রিনে নাম প্রদর্শনের মতো বিষয়গুলোতেই তিনি নীরব থেকেছেন।
তিন দিন আগে মিয়ামিতে বিশ্বকাপের রেফারিদের উদ্দেশ্যে ইনফান্তিনো বলেছিলেন, আমরা আপনাদের জন্য সেরা পরিবেশ ও সেরা সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করতে চাই। আমি আপনাদের পাশে আছি। আমরা আপনাদের সমর্থন করব।
কিন্তু একই দিনে সোমালিয়ার রেফারি ওমর আবদুলকাদির আরতান মিয়ামিতে পৌঁছে মার্কিন সীমান্ত কর্মকর্তাদের জিজ্ঞাসাবাদের মুখোমুখি হন এবং শেষ পর্যন্ত দেশে প্রবেশের অনুমতি পাননি।
বিবিসিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে হোয়াইট হাউসের বিশ্বকাপ টাস্কফোর্স পরিচালক অ্যান্ড্রু জুলিয়ানি বলেন, সীমান্ত কর্তৃপক্ষ সঠিক সিদ্ধান্তই নিয়েছে।
আরও পড়ুন: লিবিয়ার বন্দিশালা থেকে দেশে ফিরছেন ১৭২ বাংলাদেশি
অন্যদিকে নিউইয়র্ক টাইমসকে আরতান বলেন, ‘আমার কাছে প্রয়োজনীয় সব কাগজপত্র ছিল। আমার বৈধ ভিসাও ছিল।’
ঘটনার বিস্তারিত এখনও পরিষ্কার নয়। তবে ফিফার প্রতিক্রিয়া ছিল সংক্ষিপ্ত।
এ ঘটনায় ফিফার এক মুখপাত্র বলেন, স্বাগতিক দেশের অভিবাসন প্রক্রিয়ায় ফিফা জড়িত নয়। আগের টুর্নামেন্টগুলোর মতোই একজন ব্যক্তিকে ভিসা দেওয়া হবে কিনা এবং তার দেশে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হবে কিনা, সেই সিদ্ধান্ত স্বাগতিক দেশের সরকারের হাতে।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন