০২:৪৮ পি.এম
চার মাসেরও বেশি সময় ধরে চলমান ইরান–ইসরায়েল–যুক্তরাষ্ট্রের সংঘাত পরবর্তী যুক্তরাষ্ট্রের ইচ্ছায় ও পাকিস্তানের প্রচেষ্টায় সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় ভার্সাই চুক্তির সপ্তাহ পেরোতে না পেরোতে হরমুজ প্রণালীতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের হামলা এবং লেবাননে ইসরাইলের ক্রমাগত হামলা-ই প্রমাণ করে, কোন চুক্তি নয় বরং যুদ্ধের মাধ্যমেই নির্ধারিত হবে মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যৎ রাজনীতি?
ইরান শুরু থেকেই বারবার ঘোষণা করেছে যে তারা সরাসরি সামরিক চাপের মুখেও আত্মসমর্পণের পথ বেছে নেবে না, এবং তারা এমন জাতি যে কারো কাছে কোন কালে নতি স্বীকার করবে না। ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন ও আঞ্চলিক মিত্রদের সক্ষমতার ওপর নির্ভর করে তারা পাল্টা প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলও ইরানের সামরিক অবকাঠামো, কমান্ড কাঠামো এবং কৌশলগত স্থাপনাগুলোকে লক্ষ্য করে ধারাবাহিক হামলা চালিয়ে প্রায় ধ্বংস করে দিয়েছে। উভয় পক্ষই নিজেদের সাফল্যের দাবি করেছে। যদিও যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল তাদের ক্ষয়ক্ষতির হিসাব প্রকাশ করতে সর্বোচ্চ বিধি নিষেধ আরোপ করে রেখেছে। তারপরেও যে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র তথ্য উঠে এসেছে তা পরাশক্তি আমেরিকা এবং ইসরাইলের জন্য লজ্জাজনক। এ কারণে যুদ্ধের প্রকৃত চিত্র আজও নানা তথ্য, পাল্টা তথ্য ও বিশ্লেষণের মধ্যে আলোচিত হচ্ছে।
তবে এই সংঘাতের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—যুদ্ধের প্রাথমিক পর্যায়ে যে ধারণা তৈরি হয়েছিল, বাস্তবতা তার চেয়ে অনেক বেশি জটিল। বিভিন্ন অনুসন্ধানী প্রতিবেদন ও স্যাটেলাইট বিশ্লেষণে মধ্যপ্রাচ্যের কিছু মার্কিন সামরিক স্থাপনায় উল্লেখযোগ্য ক্ষয়ক্ষতির তথ্য সামনে এসেছে। এবং এই খুঁটি এতটাই যে মধ্যপ্রাচ্যে থাকা মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলো আর একটিও অক্ষত নেই। একই সঙ্গে এটিও সত্য যে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় ইরানও সামরিক ও বেসামরিক উভয় ক্ষেত্রেই ক্ষতির সম্মুখীন হয়নি বিষয়টা তেমন নয়। তবে তুলনামূলকভাবে বিশ্ব পরাশক্তি ও ইসরাইল এর যৌথ শক্তি মিলে নিষেধাজ্ঞা গ্রস্ত একটি রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে তাদের সর্বাধুনিক প্রযুক্তি দিয়ে একপ্রকার পরাজয় ইরানকে এই যুদ্ধে জয়ী করেছে বলে ধরে নেয়া হয়। অর্থাৎ এই যুদ্ধে কোনো পক্ষই মূল্য না দিয়ে এগোতে না পারলেও পশ্চিমা বিশ্ব প্রথমবারের মতো ইরানের কাছে নাকানি চুবানি খেয়েছে।
এরপর আসে যুদ্ধবিরতি ও সমঝোতার আলোচনা। অনেকেই ভেবেছিলেন, এটাই হয়তো সংঘাত কমার সূচনা। কিন্তু হরমুজ প্রণালী, লেবানন এবং আঞ্চলিক বিভিন্ন ফ্রন্টে সাম্প্রতিক পাল্টাপাল্টি হামলা আবারও সেই আশাকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে। যদি যুদ্ধবিরতির অল্প সময়ের মধ্যেই আবার ক্ষেপণাস্ত্র ও সামরিক অভিযান ফিরে আসে, তাহলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে—এই ধরনের চুক্তি কি স্থায়ী শান্তির ভিত্তি, নাকি সাময়িক বিরতি মাত্র?
এখানেই ইরানের জন্য সবচেয়ে বড় কৌশলগত শিক্ষা লুকিয়ে আছে। যদি কোনো সমঝোতার পরও সামরিক উত্তেজনা দ্রুত ফিরে আসে, তবে শুধু কাগুজে আশ্বাসের ওপর নির্ভর করা ইরানের জন্য মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। কারণ ইরানের প্রতি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কিংবা পশ্চিমা বিশ্ব কিংবা মার্কিন বিশ্বস্ত মিত্র ইহুদীবাদী ইজরাইলের মনোভাব কি তা ইরানের নতুন করে জানার প্রয়োজন নেই। ইরানের জন্য এই ধারণা পরীক্ষিত । মধ্যপ্রাচ্যের বাস্তবতা বহুবার দেখিয়েছে, কূটনীতির পাশাপাশি সামরিক প্রস্তুতি ও প্রতিরোধক্ষমতাই আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
ইরান যুদ্ধের শুরু থেকে হরমুজ প্রণালী নিয়ন্ত্রণ এবং তাদের নিজেদের সার্বভৌমত্বের মধ্যেকার অংশ হিসেবে তারা নিজেরাই নিয়ন্ত্রণ করবে এ কথা বলে আসছে। এসব সত্য মেনেই হোক বা না মেনেই হোক যুক্তরাষ্ট্র শান্তি চুক্তির টেবিলে বসেছিল। তার অর্থ দাঁড়ায় ইরান হরমুজ প্রণালী নিয়ন্ত্রণ করবে এটাই আমেরিকা মেনে নিয়েছে। তবে এখন কেন তা মানতে নারাজ এবং পরীক্ষামূলক ভাবে ওমান সাগরের পাশ দিয়ে হরমুজ অতিক্রমের চেষ্টা করা? যার ফলশ্রুতিতে জাহাজে হামলা এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক হরমুজ উন্মুক্ত করার বা ওমানের সহায়তায় নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে পাল্টা হামলার কারণেই বর্তমান পরিস্থিতি নতুন এক বাস্তবতার ইঙ্গিত দিচ্ছে।
যুদ্ধবিরতি টিকে থাকবে, নাকি নতুন করে বিস্তৃত সংঘাতে রূপ নেবে—তা এখনও নিশ্চিত নয়। কিন্তু যদি উভয় পক্ষ আবারও ধারাবাহিক সামরিক সংঘর্ষের পথেই এগোয়, তাহলে মধ্যপ্রাচ্যের শক্তির ভারসাম্য শেষ পর্যন্ত কূটনৈতিক ঘোষণার চেয়ে যুদ্ধক্ষেত্রের বাস্তবতাই বেশি প্রভাবিত করতে পারে।
মধ্যপ্রাচ্যের ইতিহাস বারবার দেখিয়েছে—যখন বিশ্বাসের সংকট গভীর হয়, তখন শান্তিচুক্তি টেকসই হতে হলে শুধু স্বাক্ষর নয়, পারস্পরিক আস্থা, রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং বাস্তবায়নের সক্ষমতাও প্রয়োজন। অন্যথায়, প্রতিটি যুদ্ধবিরতি পরবর্তী সংঘাতের আগে একটি সাময়িক বিরতিতে পরিণত হওয়ার ঝুঁকি বহন করে। বর্তমান পরিস্থিতি সেই প্রশ্নই আবার সামনে এনে দাঁড় করিয়েছে—মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যৎ কি আলোচনার টেবিলে নির্ধারিত হবে, নাকি আবারও যুদ্ধক্ষেত্রেই তার উত্তর খোঁজা হবে? প্রশ্নটা হয়তো কঠিন, তবে পশ্চিমা বিশ্বের সাথে ইরানের যে অবিশ্বাসের সম্পর্ক এবং দীর্ঘদিন থেকে পশ্চিমা বিশ্ব কর্তৃক ইরান ধ্বংসের চক্রান্ত এই নতুন কাগজে স্বাক্ষর করা সম্পর্ক তাকে আস্থায় পরিণত করতে পারবে না। তা সাম্প্রতিক হামলা ও পাল্টা হামলাই প্রমাণ করেছে। সুতরাং শান্তি চুক্তির প্রাথমিক ধাপ অতিক্রম হতে না হতেই হামলা ও পাল্টা হামলা-ই প্রমাণ করে ইরানের পক্ষে বর্তমান পরিস্থিতির কারণে হয়তো চুক্তি নয়, যুদ্ধের মাধ্যমেই মধ্যপ্রাচ্যের ভাগ্য নির্ধারণ করার সিদ্ধান্ত নিতে হতে পারে-এবং ইরান হয়তো তা করেও দেখাবে - এমন কথা আজকের দিনে বলা অমূলক নয়।
লেখকঃ সাংবাদিক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও কলামিস্ট।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন