০৮:০২ পি.এম
আর্জেন্টিনার মহাতারকা লিওনেল মেসি অবসর নিয়েছেন মাসখানের হয়েছে। ২১ বছরের দীর্ঘ ক্যারিয়ারে তিনি আর্জেন্টিনার জাতীয় দলের জার্সিতে একের পর এক র্কীতি গড়েছেন। সোনালি ট্রফি উঁচিয়ে ধরা ছিল তার সবচেয়ে আরাধ্য স্বপ্ন। ৩৬ বছর বয়সে সেই শিরোপা খরা কাটিয়ে তিনি আনন্দে ভাসিয়েছেন বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি আর্জেন্টাইন ভক্তদের। তাই অবসরের পর মেসির পরবর্তী যুগ কেমন হবে, সেই নিয়ে আলোচনা চলবে অবশ্যম্ভাবীভাবে।
‘মেসির পরবর্তী যুগ : কীভাবে ঘুরে দাঁড়াবে আর্জেন্টিনা?’ শিরোনামে আর্জেন্টিনার জনপ্রিয় সংবাদমাধ্যম মুন্দো আলবিসেলেস্তেতে একটি নিবন্ধে এই মহাতারকাকে নিয়ে স্মৃতিচারণ করা হয়েছে এবং পরবর্তী আর্জেন্টিনা কেমন হবে তা তুলে ধরা হয়েছে।
ভবিষ্যতে আমরা হয়তো এই গ্রীষ্মের দিনগুলোর দিকে ফিরে তাকাব এবং ভাবব—কী জাদুকরী সময় কেটেছে আর্জেন্টিনা দলের সাথে! লম্বা দিনগুলোর প্রহর গোনা শুরু হয়েছিল দুটি কারণে—প্রথমে বিশ্বকাপ শুরুর অপেক্ষায়, আর তারপর প্রিয় ‘আলবিসেলেস্তে’দের মাঠে দেখার তাড়নায়। আর্জেন্টিনার প্রতিটি ম্যাচে আমরা যেন এক আবেগের রোলার কোস্টারে চড়েছিলাম।
আরও পড়ুন: মরিনহোর মন্তব্য: আতলেতিকো-বার্সেলোনা ম্যাচে দুই দলই হারুক
উন্মাদনার মাঝে একটি নির্মম চিন্তা অনেকের মতো আমার মাথাতেও এসেছিল—এই বিশ্বকাপের যেকোনো ম্যাচই হয়তো আর্জেন্টিনা জাতীয় দলের জার্সিতে মহাতারকা লিওনেল মেসির শেষ ম্যাচ হতে পারে। অথচ তিনি তখনো খেলছিলেন ঠিক বিশ বছর আগে জার্মানির গেলসেনকারখেনের সেই তপ্ত দুপুরের মতো—একেবারে স্বপ্নের মতো। জার্মানরা সেই গ্রীষ্মকে ‘সামার ফেয়ারিটেল’ বা গ্রীষ্মের রূপকথা বলে মনে রাখে, কারণ সেবার আকাশ সপ্তাহের পর সপ্তাহ অসম্ভব নীল ছিল।
আর্জেন্টাইন ভক্তরাও সেই গ্রীষ্মকে খুব ভালো করেই মনে রেখেছে এক হাতছাড়া হওয়া সুযোগের জন্য, কিন্তু তারা তখন জানত না যে একটা রূপকথা কেবল শুরু হতে যাচ্ছিল।
কাতার বিশ্বকাপ যদি আমাদের দীর্ঘদিনের জমে থাকা হতাশার বোতল খুলে দিয়ে ছোটবেলার স্বপ্ন পূরণ করে থাকে, তবে ২০২৬ বিশ্বকাপ আমাদের দিয়েছে গভীর আনন্দের কিছু মুহূর্ত—ফাইনালের ফলাফল যা-ই হোক না কেন।
এমন কিছু মুহূর্তে নিজেকে সত্যিই জীবন্ত মনে হয়, এমন এক তীব্র অনুভূতি যা সচরাচর পাওয়া যায় না। এর সঠিক শব্দ কি ‘ইউফোরিয়া’ বা পরম উল্লাস? শব্দটা জানার দরকার নেই, যখন মেসি ওভাবে খেলেন তখন শুধু সেই অনুভূতিটাই টের পাওয়া যায়। এখানে কোনো ব্যাখ্যার প্রয়োজন নেই।
আরও পড়ুন: ‘যোগাযোগ করলে তার কাছে শিখব’: বাবর আজমের ইউসুফের পরামর্শে আগ্রহ
এখন, যে চিন্তাটার জন্য একসময় অপরাধবোধ হতো, সেটাই সত্যি হয়ে গেছে। ফুটবল ইতিহাসের সর্বকালের সেরা খেলোয়াড়টি ফিসফিস করে বলে দিয়েছেন—‘এবার থামার সময় হয়েছে।’
ফলে অনেকের জন্যই এক নতুন পথচলা শুরু হলো—মেসি-পরবর্তী আর্জেন্টিনার সাথে। আপনি হয়তো এখনো তাকে এমএলএস-এ খেলতে দেখবেন এবং আস্তে আস্তে মাঠের ঘাস থেকে দূরে, বহু দূরে হারিয়ে যেতে দেখবেন। কিন্তু এই নতুন পথে আমরা কীভাবে এগিয়ে যাব? সামনের দিনগুলো কেমন হবে? নিশ্চিত করে কেউ জানে না, তবে চেষ্টা তো করতেই হবে।
এমন ঘটনা অবশ্য আগেও ঘটেছে। আর্জেন্টিনা এর আগেও তাদের ইতিহাসের সেরা খেলোয়াড়টিকে বিদায় জানিয়েছিল, যতদিন না রোজারিও থেকে সেই ছোট ছেলেটি এসে অনেকের চোখেই ‘গোল্ডেন পিব’ বা ডিয়েগো ম্যারাডোনাকেও ছাড়িয়ে গেল।
মেসির মতোই ম্যারাডোনারও জাতীয় দল থেকে বিদায় ঘটেছিল উত্তর আমেরিকার এক বিশ্বকাপের পর। তবে ম্যারাডোনার জন্য তখন কোনো আনুষ্ঠানিক বিদায় ছিল না, সেটা এসেছিল অনেক পরে। কিন্তু তার বিদায়ের পর মাঠের সব সমস্যা সমাধান করার জন্য দলে ‘আরেকজন ম্যারাডোনা’র আসার এক তীব্র হাহাকার তৈরি হয়েছিল।
আরও পড়ুন: অসুস্থ বাটলার, সিঙ্গাপুরে বাংলাদেশ নারী ফুটবল দলের দায়িত্বে টিটু
এভাবেই শুরু হয়েছিল এক ‘নতুন ম্যারাডোনা’র খোঁজ। রিকেলমে থেকে স্যাভিওলা, ওর্তেগা থেকে আইমার—সবাইকেই ম্যারাডোনার সেই ছায়ার মুখোমুখি হতে হয়েছিল, যা ড্রেসিংরুম থেকে কখনোই পুরোপুরি মুছে যায়নি। এই আচ্ছন্নতা বেশ কিছুদিন চলেছিল, যতদিন না মেসির আগমন ঘটে। অনেকের কাছে মনে হয়েছিল, ঈশ্বর যেন আবার জন্ম নিয়েছেন।
আর্জেন্টিনা সবসময়ই অসাধারণ সব ফুটবল প্রতিভা তৈরির দেশ এবং কোনো সন্দেহ নেই যে ভবিষ্যতেও তা অব্যাহত থাকবে। নিকো পাজ, মাস্তানতুওনো, প্রেস্তিয়ান্নি কিংবা ফ্লোরেসের মতো উদীয়মান তরুণেরা তার প্রমাণ।
সহজেই অনুমান করা যায় যে, আগামী বছরগুলোতে আর্জেন্টিনা আবার ‘আরেকজন মেসি’র জন্য হাহাকার করবে। এই শূন্যস্থান এত বড় যে তা অল্প সময়ে পূরণ করা অসম্ভব। যখনই দলের পারফরম্যান্স খারাপের দিকে যাবে, তখনই গ্যালারিতে তাদের ত্রাতা বা ‘মেসায়াহ’র ফেরার জন্য স্লোগান উঠবে। আবার নতুন তরুণদের এমন এক উচ্চতার সাথে তুলনা করে অন্যায় চাপ দেওয়া হবে, যা ছোঁয়া অসম্ভব এবং সম্ভবত ফুটবলের ইতিহাসে আর কখনো তা দেখা যাবে না।
তবে যাওয়ার আগে মেসি দলটিকে একটি দিকনির্দেশনা দিয়ে গেছেন। তিনি দেখিয়ে গেছেন, সাফল্যের ধারা বজায় রাখতে হলে বাকিদের কী করতে হবে।
আরও পড়ুন: মেক্সিকোর বিবাদ ভুলে সামনে এগোচ্ছেন হ্যামিলটন-লেক্লের
আমরা মেসিকে বিদায় জানালেও ‘লা স্কালোনেতা’র (কোচ স্কালোনির দল) বিদায় বলার সময় এখনো আসেনি। খুব শিগগিরই আমরা হয়তো দেখতে পাব ‘লা স্কালোনেতা ২.০’।
এই স্কালোনেতা দলের সবচেয়ে বড় গুণ ছিল তাদের লড়াকু মানসিকতা। প্রকৃতপক্ষে, এই দলটিই প্রথম আর্জেন্টিনার ‘মেসি-নির্ভরতা’ ভেঙেছিল। যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতে দলটির ফর্ম হয়তো খুব একটা ভালো ছিল না, কিন্তু তাদের মানসিক শক্তি ছিল তুঙ্গে। এই দলটি যেন এক ভাইদের দল, যারা সবসময় একে অপরের পাশে থাকে এবং যেকোনো মূল্যে জয় ছিনিয়ে আনতে পারে। এই লড়াকু মনোভাব ধরে রাখতে পারলে দল অবশ্যই লড়াই করবে।
কদিন আগে কোচ লিওনেল স্কালোনির বলা কথার সূত্র ধরে বলা যায়—এখন যেহেতু দলে সেই বিশেষ ব্যবধান গড়ে দেওয়ার মতো একা কেউ নেই, তাই দলটিকে আগের চেয়েও অনেক বেশি একক ইউনিট হিসেবে খেলতে হবে।
২০২৬ সালের ৬ অক্টোবর, এল মনুমেন্টাল স্টেডিয়ামে নিজের শেষ ম্যাচেও মেসি একটি থ্রু পাসের পেছনে ছুটছিলেন। পাসটি একটু জোরে হওয়ায় রিভার প্লেটের হোম গ্রাউন্ডের মসৃণ ঘাসের ওপর দিয়ে দ্রুত সীমানার বাইরে চলে যাচ্ছিল।
আরও পড়ুন: দক্ষিণ আফ্রিকা সফর থেকে ছিটকে গেলেন সাদমান
মেসি সেটির পেছনে দৌড়ালেন। সেই বয়সেও তিনি এমনভাবে ছুটলেন যেন বলটি মাঠের ভেতরে রাখাটাই তার জীবনের সবচেয়ে বড় কাজ, অথচ সেই ম্যাচে তার নতুন করে পাওয়ার কিছু ছিল না। তিনি জাস্ট আরো একটি গোল করতে চেয়েছিলেন, একটা সহজ সুযোগ হাতছাড়া করায় তার চোখেমুখে রাগ ছিল, তিনি দলকে দিকনির্দেশনা দিচ্ছিলেন—কী করতে হবে, কোথায় যেতে হবে…
একটু ভাবলেই অবাক হতে হয়। খেলোয়াড়ি জীবনের শেষ ম্যাচে এই মহাতারকার বাড়তি কিছু করার কোনো প্রয়োজন ছিল না, তাও তিনি করেছেন। কেন?
আপনি যদি বছরের পর বছর ধরে মেসিকে দেখে থাকেন, তবে উত্তরটা আপনার জানা। পেপ গার্দিওলা যেমনটা বলেছিলেন—মেসি হলো মাঠের এক ‘ক্ষুধার্ত সিংহ’। এটাই তার আসল রূপ। তিনি মানুষের মাঝে এক ফুটবল দেবতা, যার জেতার ক্ষুধা কখনো মেটে না। লড়াই করার এবং জেতার এই মানসিকতা বিরল ও অতুলনীয়।
তার টেকনিক্যাল স্কিল হয়তো নতুন করে তৈরি করা যাবে না, তার ফুটবল মেধা হয়তো কপি করা সম্ভব নয়। তবে আশা করা যায়, আর্জেন্টিনার তরুণ খেলোয়াড়েরা তার এই মাঠের মনোভাব খুব কাছ থেকে দেখেছে এবং শিক্ষা নিয়েছে।
আরও পড়ুন: নাইজেরিয়া ইতিহাস গড়ল, ফিফা অনূর্ধ্ব-১৭ নারী বিশ্বকাপে শিরোপা জয়
যাকে সবসময় ‘সবটাই জন্মগত প্রতিভা, কঠোর পরিশ্রমের অবদান কম’ বলে প্রচার করা হতো, তিনিও রেখে গেছেন এক জ্বলন্ত উদাহরণ—যেখানে শুধু স্কিল নয়, জয়ের জন্য বুকের ভেতরের আগুনটাও কতটা জরুরি তা প্রমাণিত।
মেসি-পরবর্তী সময়ে আর্জেন্টিনা আরো মাঠে নামবে, তবে ফুটবলপ্রেমীদের মনে যে ছবিটা চিরকাল গেঁথে থাকবে, তা হলো ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে সেমিফাইনালের সেই দৃশ্য। ম্যাচের শেষ কয়েক মিনিটের খেলা বারবার দেখলেও বোঝা যায়, তিনি কীভাবে কখনোই হাল ছাড়েননি।
আশা করি, আর্জেন্টিনার ড্রেসিংরুমে এই আগুনটা সবসময় জ্বলবে। মেসি-পরবর্তী জীবনে খেলোয়াড় এবং ভক্তদের হৃদয়ে এই আগুন জ্বলতে থাকবে, যা শেখাবে কীভাবে মাঠে নিজের সবটুকু উজাড় করে দিতে হয় এবং ট্রফি ছাড়া অন্য কিছুতে সন্তুষ্ট না হতে হয়।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন