০৪:১৪ এম
পোর্টরোড থেকে মহাসিন মার্কেট, নথুল্লাবাদ ও রূপাতলী—অভিযান থমকে যাওয়ায় মাদক ও দেহব্যবসার অভিযোগ; পুলিশের একাংশের ‘সমঝোতা’র অভিযোগ
বরিশাল প্রতিনিধি:
বরিশাল নগরীর বিভিন্ন আবাসিক হোটেলে মাদক সেবন, মাদক কেনাবেচা ও অনৈতিক কর্মকাণ্ড ফের জমজমাট হয়ে উঠেছে বলে অভিযোগ উঠেছে। পোর্টরোড, বিউটি রোড, মহাসিন মার্কেট, সিনেমা হল রোড, নথুল্লাবাদ ও রূপাতলীসহ নগরীর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় আবাসিক হোটেলকে ঘিরে দীর্ঘদিন ধরে এসব অভিযোগ থাকলেও সাম্প্রতিক সময়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযান অনেকটাই কমে গেছে বলে স্থানীয়দের দাবি।
সাবেক বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশ (বিএমপি) কমিশনার আসিক সাঈদ রাজশাহী রেঞ্জের ডিআইজি হিসেবে বদলি হওয়ার পর এসব কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে চলমান অভিযানে ভাটা পড়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এরই মধ্যে নতুন কমিশনার দায়িত্ব গ্রহণ করলেও পরিস্থিতির দৃশ্যমান পরিবর্তন না হওয়ায় নগরবাসীর মধ্যে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
সম্প্রতি নগরীর বিউটি রোডের একটি আবাসিক হোটেলে নিষিদ্ধ যৌন উত্তেজক ‘জিনসিন’ সিরাপ সেবনের পর এক যুবকের মৃত্যুর ঘটনাকে কেন্দ্র করে পোর্টরোড ও আশপাশের আবাসিক হোটেলগুলোতে ব্যাপক অভিযান চালানো হয়েছিল। ওই সময় বেশ কয়েকটি হোটেলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতা দেখা গেলেও পরবর্তী সময়ে তা অনেকটাই স্তিমিত হয়ে পড়ে বলে অভিযোগ।
আরও পড়ুন: শক্তিশালী ডানপন্থি সরকার গঠন করতে হবে: নেতানিয়াহুর আহ্বান
ডিবির একাংশের বিরুদ্ধে গোপন ‘সমঝোতা’র অভিযোগ:
অনুসন্ধানে সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, কোতোয়ালি থানা পুলিশের পরিবর্তে আবাসিক হোটেলগুলোতে অভিযানের বড় অংশ ডিবি পুলিশের ওপর ন্যস্ত থাকায় পুলিশের একটি অংশের বিরুদ্ধে সুযোগ নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।
সূত্রগুলোর দাবি, ডিবি পুলিশের কয়েকজন সদস্য বিভিন্ন আবাসিক হোটেলের মালিক ও পরিচালনাকারীদের সঙ্গে গোপনে বৈঠক করে হোটেল পরিচালনার জন্য কথিত একটি সময়সূচি নির্ধারণ করে দেন। অভিযোগ রয়েছে, রাত ১১টা পর্যন্ত হোটেলগুলো স্বাভাবিক রাখার এবং এরপর থেকে সকাল পর্যন্ত অনৈতিক কর্মকাণ্ড চালানোর সুযোগ দেওয়া হয়।
তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন ও নিরপেক্ষ সত্যতা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
‘হোটেল অতিথি’তে বৈঠকের অভিযোগ:
পোর্টরোডের ‘হোটেল অতিথি’র একটি কক্ষে ডিবি পুলিশের কয়েকজন সদস্যের সঙ্গে হোটেল পরিচালনাকারীদের বৈঠক এবং সেখানে কথিত আর্থিক সমঝোতার অভিযোগ উঠেছে।
আরও পড়ুন: ডা. জুবাইদা রহমানের উদ্যোগে অপসারিত হলো ইমাম হোসেনের পিঠের দুই কেজির টিউমার
অভিযোগ রয়েছে, ওই বৈঠকে হোটেল পরিচালনাকারীদের কাছ থেকে মাসিক ভিত্তিতে অর্থ নেওয়ার বিষয়ে সমঝোতা হয়। পরবর্তীতে মহাসিন মার্কেটের একটি আবাসিক হোটেলের পরিচালক সুমনের মাধ্যমে কথিত অর্থ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির কাছে পৌঁছানো হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তাদের বক্তব্য তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া যায়নি। বক্তব্য পাওয়া গেলে তা প্রতিবেদনে যুক্ত করা হবে।
পরিচালকের বক্তব্যে নতুন তথ্য:
মহাসিন মার্কেটের ‘হোটেল মনপুরা’র পরিচালক সুমনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি হোটেল ব্যবসা চালুর কথা স্বীকার করেন। তিনি বলেন, দীর্ঘদিন হোটেল বন্ধ থাকলেও মালিককে ভাড়া দিতে হয়েছে। এখন ব্যবসা শুরু হয়েছে।
এ সময় সাংবাদিকদের লেখালেখি না করার অনুরোধ জানিয়ে তিনি সাংবাদিকদের মাসিক অর্থ দেওয়া এবং ডিবি পুলিশকে প্রতিদিন নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ দেওয়ার কথাও উল্লেখ করেন।
আরও পড়ুন: অর্থনীতির বিপদ টের পেতে শুরু করেছেন ক্ষমতাসীনরা
তবে তিনি কাদের অর্থ দেওয়ার কথা বলেছেন এবং বাস্তবে কোনো অর্থ লেনদেন হয়েছে কি না, তা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
নগরীর বিভিন্ন এলাকায় একাধিক আবাসিক হোটেল:
অনুসন্ধানে নগরীর বিভিন্ন এলাকায় বিপুলসংখ্যক আবাসিক হোটেলের তথ্য পাওয়া গেছে। এসব হোটেলের সবগুলোর বিরুদ্ধে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের অভিযোগ নেই। তবে কয়েকটি হোটেলকে ঘিরে স্থানীয়দের মধ্যে নানা অভিযোগ রয়েছে।
পোর্টরোড ও কলাপট্টি ব্রিজসংলগ্ন এলাকায় ‘হোটেল অতিথি’, ‘সিভিও’সহ কয়েকটি আবাসিক হোটেল রয়েছে। জাহানারা ফলপট্টির মোড় ও নিউ মায়ের দোয়া ফল ভান্ডারের পাশের এলাকাতেও আবাসিক হোটেল রয়েছে বলে জানা গেছে।
সেটেলমেন্ট অফিসসংলগ্ন এলাকায় ‘হোটেল কাউইলী’, ‘হোটেল চিল’, ‘হোটেল সি প্যালেস’, ‘হোটেল স্বাগতম’ ও ‘হোটেল নিউ রোজ হ্যাভেন’-এর নাম স্থানীয়ভাবে উঠে এসেছে। এর মধ্যে ‘হোটেল চিল’-এর মালিক হিসেবে আলামিন সিকদারের নাম উল্লেখ করেছেন স্থানীয় সূত্র।
আরও পড়ুন: মায়ের ঠাঁই জীর্ণ ঘরে, বিলাসী জীবন কাটাচ্ছেন অধ্যক্ষ ছেলে
মহাসিন মার্কেটের ফায়ার সার্ভিসের বিপরীতে ‘হোটেল ভোলা’ ও ‘হোটেল মা বোর্ডিং’সহ আরও কয়েকটি আবাসিক হোটেল রয়েছে। ‘হোটেল ভোলা’র পরিচালক হিসেবে আজিজ এবং ‘হোটেল মনপুরা’র পরিচালক হিসেবে সুমনের নাম স্থানীয় পর্যায়ের অভিযোগে এসেছে।
চকবাজার, সিনেমা হল রোড ও বিউটি হলসংলগ্ন এলাকাতেও রয়েছে একাধিক আবাসিক হোটেল। মেইন রোডে ‘হোটেল গালিব’ এবং সোনালী সিনেমা হল মোড়ে ‘হোটেল প্যারালাইস ইন্টারন্যাশনাল’-এর নাম পাওয়া গেছে।
নথুল্লাবাদেও আবাসিক হোটেলের ছড়াছড়ি:
নথুল্লাবাদ বাসস্ট্যান্ড এলাকায় ‘হোটেল ঘাসফুল’, ‘হোটেল নাসিফ’, ‘হোটেল সিদ্দিকিয়া’, ‘হোটেল রিয়া’ ও ‘হোটেল সুইডেন প্যালেস’সহ একাধিক আবাসিক হোটেলের নাম স্থানীয়দের কাছ থেকে জানা গেছে।
এছাড়া আলী চেয়ারম্যানের কার্যালয়ের সামনের এলাকাতেও কয়েকটি আবাসিক হোটেল রয়েছে বলে জানা গেছে।
আরও পড়ুন: কুয়াকাটায় অনুমোদনহীন নির্মাণের অভিযোগে ইস্তানবুল হোটেলের কাজ বন্ধ
আমতলার মোড়, সাগরদিঘী ব্রিজসংলগ্ন এলাকা, পুরাতন র্যাব কার্যালয়ের সামনের ‘অবকাশ আবাসিক’, কালোজিরা রোডের ‘হোটেল সিঙ্গাপুর’ এবং রূপাতলী বাসস্ট্যান্ডের ‘হোটেল স্বাধীন পার্ক’সহ বিভিন্ন এলাকায় আরও আবাসিক হোটেল রয়েছে বলে অনুসন্ধানে তথ্য পাওয়া গেছে।
নজরদারি নিয়ে প্রশ্ন:
নগরীর গুরুত্বপূর্ণ ও জনবহুল এলাকায় আবাসিক হোটেলের সংখ্যা বাড়লেও এসব প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম নিয়মিতভাবে তদারক করা হচ্ছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, কিছু হোটেলে আবাসিক থাকার আড়ালে মাদক সেবন ও অনৈতিক কর্মকাণ্ডের সুযোগ তৈরি করা হচ্ছে। এর ফলে এসব এলাকার সামাজিক পরিবেশ ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।
সুশীল সমাজের প্রতিনিধিদের মতে, কোনো আবাসিক হোটেলের বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলে শুধু অভিযান পরিচালনা করাই যথেষ্ট নয়। সংশ্লিষ্ট হোটেলের লাইসেন্স, অতিথি রেজিস্টার, সিসিটিভি ফুটেজ, কর্মচারীদের তথ্য এবং মাদকসংক্রান্ত অভিযোগসহ সার্বিক কার্যক্রম নিয়মিত যাচাই করা প্রয়োজন।
আরও পড়ুন: কিশোরীকে উত্ত্যক্ত করাকে কেন্দ্র করে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় তুমুল মারামারি, পুলিশ মোতায়েন
পুলিশের ভূমিকা নিয়ে তদন্তের দাবি:
আবাসিক হোটেলকেন্দ্রিক কথিত অপরাধ কর্মকাণ্ডের সঙ্গে পুলিশের কোনো সদস্যের যোগসাজশের অভিযোগ সত্য হলে বিষয়টি অত্যন্ত গুরুতর। কারণ অপরাধ দমনের দায়িত্বে থাকা কোনো সদস্যের বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ প্রমাণিত হলে তা পুরো আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থার ভাবমূর্তিকে প্রশ্নের মুখে ফেলবে।
এ কারণে নগরবাসীর দাবি, অভিযোগগুলো নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে সত্যতা যাচাই করা হোক। কোনো পুলিশ সদস্যের সম্পৃক্ততার প্রমাণ পাওয়া গেলে তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হোক। একই সঙ্গে অভিযোগ থাকা আবাসিক হোটেলগুলোর বৈধতা, লাইসেন্স ও কার্যক্রম খতিয়ে দেখারও দাবি জানিয়েছেন তারা।
নতুন বিএমপি কমিশনার দায়িত্ব নেওয়ার পর নগরবাসীর প্রত্যাশা ছিল অপরাধ দমনে আরও কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হবে। এখন দেখার বিষয়, পোর্টরোড, বিউটি রোড, মহাসিন মার্কেট, নথুল্লাবাদ, সিনেমা হল রোড ও রূপাতলীসহ বিভিন্ন এলাকার আবাসিক হোটেলকে ঘিরে ওঠা অভিযোগের বিষয়ে বিএমপি কী পদক্ষেপ নেয়।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন