০৭:৪৪ এম
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে ধন্যবাদ। তিনি গত রবিবার জাতীয় সংসদে জনগণের মনের কথা বলেছেন।
তার বক্তব্যে জন-আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটেছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে সর্বোচ্চ দুর্নীতি হয়েছে। ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে, যা তদন্ত হওয়া প্রয়োজন। দেবপ্রিয় ভট্টাচার্যের নেতৃত্বাধীন শ্বেতপত্রের রিপোর্টের ওপর ভিত্তি করে এ তদন্ত হতে পারে। জাতীয় সংসদের বাজেট অধিবেশনে প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর সাধারণ আলোচনায় অংশ নিয়ে এসব কথা তিনি বলেন।
আরও পড়ুন: সিজেপির দুই মুখপাত্র এক সপ্তাহ পর মুক্তি
ড. ইউনূসের নেতৃত্বে দেড় বছরের শাসনকালে অন্তর্বর্তী সরকারের অপকর্ম এবং অপশাসনের ক্ষতচিহ্ন সব জায়গায় দেখা যাচ্ছে।
রাজনীতি থেকে অর্থনীতি, পররাষ্ট্রনীতি থেকে শুরু করে দেশরক্ষার কৌশল, আইন- বিচার, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সংস্কৃতি, ক্রীড়া—কোথায় নেই ইউনূসের অপশাসনের কালো ছায়া? গভীরভাবে ইউনূসের শাসন বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ইউনূস ও তার সহযোগীরা যেন দেশ ধ্বংসের এক মহোৎসবে মেতে ছিলেন। লুটেরা দুর্বৃত্ত ডাকাত দল যেমন একটি গ্রামে আগুন ধরিয়ে লুটপাট করে, ঠিক তেমনটাই করেছে ইউনূস গং দেড় বছরে বাংলাদেশের মাটিতে।
২০২৪-এর ৫ আগস্টের পর বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের নেতারা ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে বেছে নেন। দেশবাসী আশা করেছিল, শান্তিতে নোবেলজয়ীর নেতৃত্বে বাংলাদেশ নতুন সম্ভাবনার পথে যাত্রা শুরু করবে। দেশে শান্তিশৃঙ্খলা ফিরে আসবে, আইনের শাসন এবং ন্যায়বিচার নিশ্চিত হবে। মানুষের মানবিক মর্যাদা ও অধিকার প্রতিষ্ঠিত হবে। মানুষ নতুনভাবে বাঁচতে পারবে।
কিন্তু দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই ইউনূসের ভদ্রবেশী মুখোশ খুলে যায়। দেশের মানুষ দেখে শান্তির দূতের আড়ালে হিংস্র দানবের রূপ। ড. ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্র্বর্তী সরকার দেড় বছরে দুটি কাজ অত্যন্ত সফলভাবে করেছে। প্রথমত, দেশকে বিভক্ত করা। দ্বিতীয়ত, দেশের সম্পদ লুটপাট করা।
আরও পড়ুন: ‘ভাই ফটো তুললেন না, বিজিবি দেখলে বিপদ’
২৪-এর ৫ আগস্ট ছিল বাংলাদেশের রাজনৈতিক ঐক্যের প্রতীক। দলমত নির্বিশেষে সব রাজনৈতিক দল এবং জনগণ ঐক্যবদ্ধ হয়েছিল। এই ঐক্যের শক্তি কী অসাধারণ, সেটি জুলাই গণ অভ্যুত্থানের মাধ্যমে প্রমাণিত হয়। ইউনূসের দায়িত্ব ছিল খুব সংক্ষিপ্ত ও সহজ। অন্তর্র্বর্তী সরকার দ্রুততম সময়ের মধ্যে একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন সম্পন্ন করে জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করবে। কিন্তু ক্ষমতা নিয়েই ড. ইউনূস বাংলাদেশে রাজনৈতিক বিভাজনের বিষবাষ্প ছড়িয়ে দেন। সংস্কারের নামে তিনি পরিকল্পিতভাবে সৃষ্টি করেন রাজনৈতিক অনৈক্য, অবিশ্বাস। এর একমাত্র কারণ ছিল ক্ষমতা আঁকড়ে রাখা।
সংস্কারের নামে ইউনূস সরকার শুরু করছিল নাটক। যে নাটক দেশের ক্ষতি করেছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সঠিকভাবে জাতীয় সংসদে বলেছেন, জাতীয় নির্বাচন এবং জাতীয় স্বার্থে সবাই মিলে একমত হয়ে জুলাই সনদে স্বাক্ষর করা হয়েছে। সংস্কার নাটকের মাধ্যমে রাজনৈতিক দলগুলোর দৃষ্টি তিনি অন্যত্র সরিয়ে নেন। এরপর ইউনূস সরকার এবং তাঁর উপদেষ্টাদের লুটপাটের কাহিনি এখন সারা বিশ্ব জানে। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের মতে, ইউনূস আমলে ঘুষ লেনদেনের নতুন রেকর্ড হয়েছে। সুইস ব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, ইউনূস আমলে সেখানে টাকা রাখার রেকর্ড হয়েছে।
ইউনূসের নিজস্ব দুর্নীতির ফিরিস্তি বাংলাদেশের সব গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে, এনিয়ে নতুন করে কিছু লিখতে চাই না। বলা যায়, ইউনূস একা নন, আসিফ নজরুল, রিজওয়ানা হাসান, আদিলুর রহমানসহ অধিকাংশ উপদেষ্টার একমাত্র কাজ ছিল দুর্নীতি এবং লুটপাট। দেড় বছর একজন উপদেষ্টা যখন নিজের চিকিৎসার নামে প্রায় কোটি টাকা রাষ্ট্রীয় তহবিল থেকে আত্মসাৎ করেন, তখন এই অন্তর্বর্তী সরকারের নৈতিকতার মান কতটা নিচে ছিল, তা বুঝতে অসুবিধা হয় না।
অন্তর্র্বর্তী সরকার, কোথায় দুর্নীতি করেনি? বিচারক নিয়োগ থেকে সরকারি কর্মকর্তাদের পদায়নে দেড় বছরে সীমাহীন দুর্নীতি হয়েছে। শিশুদের হামের টিকা থেকে পুলিশের পোশাক কেলেঙ্কারি—সর্বত্র ইউনূস সরকারের দুর্নীতির চিত্র স্পষ্ট। এসব দুর্নীতি, অনিয়ম এবং স্বেচ্ছাচারিতা যেন রাষ্ট্র পরিচালনার নতুন সংজ্ঞা আমাদের সামনে হাজির করেছে। ক্ষমতায় যাওয়া মানেই দুর্নীতির লাইসেন্স। ক্ষমতায় যাও, দুর্নীতি কর, দেশ বেচে দাও, বিদেশে টাকা পাচার করো—তারপর জাতির বিবেক হয়ে জনগণকে জ্ঞান দাও। এইটাই ছিল ইউনূস সরকারের মূলমন্ত্র।
আরও পড়ুন: সাইবার সিকিউরিটি আইনসহ বিভিন্ন আইন সংশোধনের উদ্যোগ: তথ্যমন্ত্রী
যেকোনো দেশের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা ও আইনের শাসনের জন্য এটি রীতিমতো চ্যালেঞ্জ। ইউনূস সরকার কেবল সীমাহীন দুর্নীতি এবং লুটপাট করেনি, রাষ্ট্রব্যবস্থাকে ধ্বংস করেছে। রাষ্ট্র পরিচালনার আইনকানুন, রীতিনীতিকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়েছেন। আর এ কারণেই ইউনূস শাসনের দেড় বছরের নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া প্রয়োজন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের একজন মেধাবী শিক্ষার্থী ছিলেন। তিনি ভালো করেই জানেন আইনের শাসনের মূল ভিত্তি। এখন তিনি আইনের শাসন ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার দায়িত্বে। বিগত চার মাসে তিনি নিশ্চয়ই অনুভব করছেন আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতিতে বাধা কোথায়? ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার জন্য করণীয় কী?
আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার মৌলিক নীতি হলো, প্রতিটি অপরাধের বিচার নিশ্চিত করা। একজন অপরাধী, দুর্নীতিবাজের একমাত্র পরিচয় হচ্ছে, তিনি অপরাধী। বাংলাদেশের সংবিধানের মৌলিক অধিকারের অংশ সুস্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, আইনের দৃষ্টিতে সব নাগরিকের সমান অধিকার। আইনসম্মত সাম্যতার নীতি তখনই কার্যকর হবে, যখন ড. ইউনূস এবং তাঁর উপদেষ্টাদের মতো হোয়াইট কালার ক্রিমিনালরা আইনের আওতায় আসবে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে নিশ্চয়ই উপলব্ধি করেছেন, একটি অন্যায়ের বিচার না করলে, আরেকটি অন্যায়ের বিচার করার নৈতিক অধিকার নেই। আইনের পরিভাষায় বলা হয়, একটি বিচারহীনতা আরও দশটি অপরাধের জন্ম দেয়। ইউনূস সরকারের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগের নিষ্পত্তি না হলে জনগণের কাছে ভুল বার্তা যাবে।
সাধারণ মানুষ মনে করবে, ক্ষমতায় থাকলে যা খুশি তাই করা যায়, তার বিচার হয় না। এর ফলে নির্বাচিত সরকার সম্পর্কে মানুষের মধ্যে ভুল ধারণা তৈরি হতে পারে। পাশাপাশি সরকারের ভিতরে অনেক সুযোগসন্ধানী মনে করবে, যদি ড. ইউনূস ও তাঁর উপদেষ্টারা এত দুর্নীতি করেও পার পেয়ে যায়, তবে আমরা একটু করলে দোষের কী?
আমাদের মনে রাখতে হবে, বাংলাদেশে আবার তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা চালু হয়েছে। ইউনূস সরকার নামে অন্তর্র্বর্তী সরকার হলেও, এটি আসলে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আদলে গঠিত হয়েছিল। আজ যদি ইউনূসের অনিয়মের তদন্ত না হয়, তবে পরবর্তী তত্ত্বাবধায়ক সরকার একই পথে হাঁটবে। ইউনূস এবং তাঁর উপদেষ্টারা সুশীল সমাজের সফেদ পোশাককে কালি লেপন করেছেন। দেড় বছরের ইউনূস শাসনের পর সাধারণ মানুষের মধ্যে সুশীল সমাজ সম্পর্কে ভিন্ন ধারণা তৈরি হয়েছে। নিরীহ মানুষ এখন মনে করে, সুশীল মানেই ইউনূস গংদের মতো মতলববাজ এবং দুর্নীতিবাজ। এই কারণেই সুশীল সমাজের ইমেজ রক্ষার জন্য হলেও, ইউনূস সরকারের দেড় বছরের সব অপকর্মের নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া দরকার।
আরও পড়ুন: আসামে মুসলিমদের ১১০০ ঘরবাড়ি গুঁড়িয়ে দেওয়ার নিন্দা নাহিদ ইসলামের
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রবিবার জাতির কণ্ঠ হিসেবে ভাষণ দিয়েছেন। মনে রাখতে হবে, বিএনপি জনগণের কাছে তিনটি প্রধান অঙ্গীকার করেছে নির্বাচনের আগে। আইনশাসন প্রতিষ্ঠা, দুর্নীতির বিরুদ্ধে শূন্য সহিষ্ণুতা এবং রাষ্ট্রীয় অপচয় বন্ধ। এই তিনটি প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করতে হলে ইউনূস সরকারের অপকর্মের তদন্ত করতেই হবে। ইউনূস আমলে মব সন্ত্রাসের মাধ্যমে আইনশাসনের চরম লঙ্ঘন ঘটেছে। তাই এখন আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার জন্য আগের আবর্জনা পরিষ্কার করতে হবে। দুর্নীতি দমন করতে হলে, দেড় বছরের সীমাহীন দুর্নীতির তদন্তে কোনো বিকল্প নেই। সরকার দুর্নীতি দমন কমিশন গঠনের প্রক্রিয়া শুরু করেছে। আশা করি, স্বল্পতম সময়ের মধ্যে নতুন কমিশন গঠিত হবে। নতুন কমিশনের প্রথম কাজ হবে ড. ইউনূস এবং তাঁর উপদেষ্টাদের বিরুদ্ধে জমাকৃত অভিযোগের তদন্ত। রাষ্ট্রীয় অপচয়েও ইউনূস সরকার ছিল শীর্ষে। ড. ইউনূসের উড়োজাহাজ ভর্তি প্রমোদ ভ্রমণ থেকে ধর্ম উপদেষ্টার ৮২ লাখ টাকার চিকিৎসা বিল, সবই রাষ্ট্রীয় অর্থের অপচয় প্রমাণ করে। এসবের সুষ্ঠু তদন্ত না করলে নতুন করে অপচয়বিরোধী পদক্ষেপ নেওয়া সম্ভব নয়। তাই এই সরকারকে সফল হতে হলে, ইউনূস সরকারের আমলে সব ধরনের অনিয়মের তদন্ত করতেই হবে। এর কোনো বিকল্প নেই।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন