০৫:০৩ পি.এম
গাজীপুরের কালিয়াকৈর পৌরসভা ২০০৪ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। তবে ২০ বছর পেরিয়ে গেলেও এখনও নির্দিষ্ট কোনো ডাম্পিং জোন বা বর্জ্যাগার ব্যবস্থা নেই। প্রতিদিন পৌরসভার নীল রঙের ট্রাক দিয়ে টনের পর টন ময়লা ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কের কোল ঘেঁষে ফেলে দেওয়া হচ্ছে। মহাসড়কের পাশেই রয়েছে ১০-১৫ ফুট উঁচু ময়লার পাহাড়। পৌর কর্মীরা ট্রাক থেকে ময়লা নামাচ্ছে, আর পাশ দিয়ে চলছে শতাধিক বাস, ট্রাক, অটো রিক্সা ও কলেজগামী শিক্ষার্থীরা। এই পরিস্থিতিতে ২০ বছরের স্মার্ট মডেল পৌরসভা এখন মহাসড়ক দূষণের জাতীয় নজির হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সরেজমিনে কালিয়াকৈর উপজেলার মৌচাক, চান্দুরা ও খাড়াজোড়া হাইটেক পার্কের সংলগ্ন এলাকায় দেখা যায়, ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কের একপাশে ১০-১৫ ফুট উঁচু ময়লার স্তূপ বেড়ে উঠেছে। পৌরসভার ট্রাক এসে মহাসড়কের কোল ঘেঁষেই ময়লা ফেলছে। পচা সবজি, পলিথিন এবং প্লাস্টিকসহ গৃহস্থালি আবর্জনায় স্তূপ হয়ে রয়েছে। ড্রেনের ওপরেও ময়লা স্তূপিত হয়ে গেছে, ফলে পানি প্রবাহ বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। বৃষ্টি হলে সেই ময়লা থেকে কালো দুর্গন্ধযুক্ত পানি গড়িয়ে মহাসড়কে পড়ছে। পচা গন্ধ এত প্রচণ্ড যে, ৫০ মিটার দূর থেকেও মানুষের নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসছে। কাক-কুকুর, মশা-মাছির উৎপাতে এলাকাটি বসবাসের অযোগ্য হয়ে পড়েছে।
কালিয়াকৈর সরকারি কলেজ ও আশপাশের স্কুলের হাজারো ছাত্র-ছাত্রী প্রতিদিন এ ময়লার পাশ দিয়ে ক্লাসে যান। ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কের একটি পাশে বাস এবং প্রাইভেটকার চলছে, অন্যদিকে শিক্ষার্থীরা নাকে রুমাল চেপে দৌড়াচ্ছে। এক ছাত্রী কান্না জড়িত কণ্ঠে বলেন, "স্যার, প্রতিদিন এই গন্ধের মধ্যে দিয়ে колледে যাই। বই-খাতা, জামা-কাপড় সব ময়লার গন্ধে মাখা থাকে। বৃষ্টি হলে পচা পানি গায়ে লাগে। ২০ বছরেও পৌরসভা একটি ডাম্পিং জোন করতে পারলো না, আমরা কি এভাবেই পড়াশোনা করবো।"
আরও পড়ুন: নওগাঁয়ে ঘরে মাটির নিচে ২৪৫ কেজির কষ্টিপাথরের শিবলিঙ্গ উদ্ধার, আটক ১
স্থানীয় অটোরিকশাচালক মো. জাহাঙ্গীর হোসেন বলেন, "ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কই এখন ময়লার ভাগাড়। সারাদিন গাড়ি চালাই, গন্ধে মাথা ঘোরে বমি আসে। যাত্রী উঠাতে লজ্জা লাগে। পৌরসভার ট্রাক প্রতিদিন ময়লা ফেলে দেয়, সাধারণ মানুষ কি করবে?"
স্থানীয় বাসিন্দা মো. নিতাই চন্দ্র বলেন, "কালিয়াকৈর পৌরসভা ২০ বছরে ময়লার ডাম্পিং ব্যবস্থা করতে পারছে না। নির্বাচনের সময় মেয়র-কাউন্সিলররা বলেছিল স্মার্ট মডেল পৌরসভা বানাবো। আর এখন মহাসড়কেই ডিজিটাল ডাস্টবিন বানিয়েছে। মানুষের স্বাস্থ্য নিয়ে চলছে খেলা।"
পরিবেশবিদরা সতর্ক করে বলছেন, মহাসড়কের পাশে খোলা ময়লা থেকে লিচেট পানি মাটির নিচে যাচ্ছে, ফলে ভূগর্ভের পানি দূষিত হচ্ছে। মশা-মাছির সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে যা ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়া ছড়াচ্ছে। ময়লার স্তূপের কারণে মহাসড়কে দৃষ্টিসীমা কমে যাওয়ায় দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ছে।
কালিয়াকৈর পৌরসভার প্রশাসক এ এইচ এম ফখরুল হোসাইন এ বিষয়ে বলেন, "পৌরসভার ময়লা রাখার নিজস্ব কোনো জায়গা নেই। জমি কিনে ডাম্পিং পয়েন্ট করার প্রক্রিয়া কয়েকবার বিফলে গিয়ে। ঊর্ধ্বতনের কাছে জমি চেয়ে আবেদন করেছি। খুব দ্রুত বিকল্প ব্যবস্থা নেওয়া হবে।" তিনি বলেন, "অপাতত ময়লা ঢেকে দেওয়া ও ব্লিচিং ছিটানোর কাজ চলছে। জনদুর্ভোগ লাঘবে আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি।"
আরও পড়ুন: দিনাজপুর বোর্ডের ১ কোটি ২৬ লাখ টাকার দুর্নীতির তদন্তের নির্দেশ
বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, "শুধু ডাম্পিং জোন নয়, প্রতিটি ওয়ার্ডে বর্জ্য আলাদা করা ও কম্পোস্ট প্ল্যান্ট স্থাপন, মেডিকেল বর্জ্য আলাদাভাবে সংগ্রহ ও ইনসিনারেশন, রিসাইক্লিংয়ের মাধ্যমে ৬০% ময়লা কমানো সম্ভব।" কালিয়াকৈর পৌরসভা ২০০৪ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়ে ২০ বছরেও নির্দিষ্ট ডাম্পিং জোন করতে ব্যর্থ হয়েছে। এর ফলে ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কের মৌচাক, চান্দুরা ও খাড়াজোড়া এলাকা ময়লার ভাগাড় হয়ে গেছে। পৌরসভার নিজস্ব ট্রাকই প্রতিদিন মহাসড়কের পাশে ময়লা ফেলে দিচ্ছে, যার দুর্গন্ধ ও দূষণের কারণে হাজারো শিক্ষার্থী ও পথচারী চরম ভোগান্তিতে পড়েছে।
জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশ হুমকির মুখে পড়লেও পৌর কর্তৃপক্ষ "জমি নাই" অজুহাতে দায় এড়াচ্ছে। এলাকাবাসী এবং বিশেষজ্ঞরা দ্রুত স্থায়ী ডাম্পিং জোন নির্মাণ, মেডিকেল বর্জ্য আলাদাকরণ ও রিসাইক্লিং ব্যবস্থা চালুর দাবি তুলেছেন। "স্মার্ট মডেল পৌরসভা"র স্বপ্ন দেখানো কালিয়াকৈর পৌরসভার কাছে প্রশ্ন হলো, ২০ বছর পরও যদি মহাসড়কই ডাস্টবিন হয়, তবে উন্নয়ন কোথায়?
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন