০৫:১৮ পি.এম
ঢাকা, ১২ অক্টোবর, ২০২৬ : সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদের আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে রোববার পুনরায় হামলা চালিয়েছে ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীরা। হামলায় একজন নিহত হয়েছে এবং ১১ জন আহত হয়েছে।
একদিন আগে গোষ্ঠীটির দ্বারা সংঘটিত প্রাণঘাতী হামলার পর কর্তৃপক্ষ বিমানবন্দরটির কার্যক্রম বন্ধ করে দেয়।
এটি শনিবারের হামলাটি এক দশকেরও বেশি সময়ের মধ্যে সৌদি ভূখণ্ডে সবচেয়ে প্রাণঘাতী হামলা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এই ঘটনার ফলে ইয়েমেনের চলমান যুদ্ধে উত্তেজনা আরও বৃদ্ধি পেয়েছে।
আরও পড়ুন: বাগদাদে বায়ুদূষণ শীর্ষে, ঢাকার অবস্থান ১৩তম
সৌদি আরব দীর্ঘদিন ধরে ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারকে সামরিক সহায়তা প্রদান করে আসছে। এই সরকারের বিরুদ্ধে লড়াই করছে হুতিরা।
রোববার, ইরানের সমর্থনপুষ্ট হুতি গোষ্ঠী দাবি করেছে, গত ২৪ ঘণ্টায় তারা একাধিক হামলা চালিয়েছে, যার মধ্যে রিয়াদ বিমানবন্দরে হামলাও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
এছাড়া, গোষ্ঠীটি সৌদি আরবের গুরুত্বপূর্ণ পরিবহনকেন্দ্রগুলোতে ভবিষ্যতে হামলা অব্যাহত রাখার হুমকি দিয়েছে। তারা এসব স্থাপনাকে ‘আমাদের বাহিনীর অভিযান পরিচালনার ক্ষেত্র’ হিসেবে অভিহিত করেছে।
হামলার কয়েক ঘণ্টা পর সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট জানায়, কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে একটি ক্ষেপণাস্ত্র বা বিস্ফোরকবাহী প্রক্ষেপণ বস্তু আঘাত হেনেছে, যার ফলে সেখানে আগুন ধরে যায়। এছাড়া, বিমানবন্দরের কাছাকাছি এলাকায় আরেকটি ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করার কথাও জানায় জোটটি।
আরও পড়ুন: বৃহস্পতিবার ঢাকার মগবাজার, বেইলি রোড, সিদ্ধেশ্বরীসহ বিভিন্ন এলাকায় দোকানপাট বন্ধ
সৌদি আরবের বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে জানায়, নতুন এই হামলায় পাকিস্তানের একজন নাগরিক নিহত হয়েছেন এবং আরও ১১ জন আহত হয়েছেন।
কর্তৃপক্ষ জানায়, হামলায় স্থাপনারও ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, তবে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ এখনো নিরূপণ করা হচ্ছে।
বিমান চলাচল পর্যবেক্ষণকারী ওয়েবসাইট ফ্লাইটরাডার২৪ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এক্সে জানিয়েছে, রিয়াদ বিমানবন্দরের কার্যক্রম বন্ধ রাখার সময় আরও ২৪ ঘণ্টা বাড়ানো হয়েছে। সোমবার গ্রিনিচ মান সময় রাত ৯টা পর্যন্ত বিমানবন্দরটি বন্ধ থাকবে।
রোববার সৌদি রাজধানীতে একাধিক বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে বলে জানিয়েছেন এএফপির সাংবাদিক ও স্থানীয় বাসিন্দারা।
আরও পড়ুন: নেসেটে ১৯ আসন পেয়েও সংশয়: নেতানিয়াহুকে ক্ষমতাচ্যুত করতে পারবে তো আরব দলগুলো?
শহরের উত্তরাঞ্চলের আল-আরিদ এলাকার একজন বাসিন্দা বলেন, ‘বিস্ফোরণের শব্দে পাখিগুলো আতঙ্কিত হয়ে ছুটোছুটি শুরু করে। পুরো বাড়ি কেঁপে উঠেছিল।’
সৌদি বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, দেশটির পূর্বাঞ্চলের দাম্মাম বিমানবন্দরেও আরেকটি হামলা হয়েছে। হুতিরা ওই বিমানবন্দরকে লক্ষ্যবস্তু করার দাবি করেছে।
এর আগে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট জানিয়েছিল, বিমানবন্দরের কাছাকাছি একটি প্রক্ষেপণ বস্তু আঘাত হেনেছে। এর কিছুক্ষণ পর পূর্বাঞ্চলে একটি ড্রোন ভূপাতিত করার কথা জানায় জোটটি।
সোমবার ভোরে জোটটি আরও জানায়, সৌদি আরবের দক্ষিণাঞ্চলীয় খামিস মুশাইত শহরের দিকে ধেয়ে আসা হুতিদের একটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত ও ধ্বংস করা হয়েছে। শহরটিতে দেশটির একটি গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ঘাঁটি রয়েছে।
আরও পড়ুন: বর্জন ভেঙে কেন নির্বাচনে ভোট দিলাম: ইসরায়েলের ফিলিস্তিনি নাগরিকের অভিজ্ঞতা
‘পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধাপরাধ’
সাম্প্রতিক সময়ে রিয়াদ বিমানবন্দরের পাশাপাশি সৌদি আরবের তেল স্থাপনা ও লোহিত সাগরে চলাচলকারী ট্যাংকারেও হামলা বৃদ্ধি পেয়েছে।
বৃহস্পতিবারও রিয়াদ বিমানবন্দরে হামলায় তিনজন নিহত হয়েছিল। সৌদি আরব সামরিক খাতে বিপুল অর্থ ব্যয় করলেও হুতিদের কিছু হামলা প্রতিরোধ করা সম্ভব হচ্ছে না।
কানাডার অটোয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের নিরাপত্তা বিশ্লেষক থমাস জুনো বলেন, ‘সৌদি আরবের আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা হুতিদের কিছু ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা ঠেকাতে পারছে। কিন্তু সৌদি আরবের ভূখণ্ড এত বিশাল যে সব সময় সব হামলা ঠেকানো তাদের পক্ষে কার্যত অসম্ভব।’
আরও পড়ুন: ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ আমরা শুরু করিনি: ট্রাম্প
হুতিদের বিরুদ্ধে লড়াইরত জোট শনিবারের হামলাকে ‘পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধাপরাধ’ বলে আখ্যা দিয়েছে এবং এর ‘কঠোর জবাব’ দেওয়ার অঙ্গীকার করেছে।
অন্যদিকে, হুতিদের নিয়ন্ত্রণাধীন ইয়েমেনের সানা প্রদেশে রোববার সৌদি আরবের দুটি হামলার খবর জানিয়েছে হুতিপন্থী গণমাধ্যম।
হুতিদের নিয়ন্ত্রণাধীন স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের এক মুখপাত্র এক্সে জানিয়েছেন, হামলাগুলোর একটিতে একজন বেসামরিক নাগরিক নিহত ও পাঁচজন আহত হয়েছেন।
শনিবারের হামলার নিন্দা জানিয়েছে জাতিসংঘসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের নেতারা। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও এ হামলার নিন্দা জানিয়ে বলেছেন, হুতিদের বিরুদ্ধে সৌদি আরবের হামলায় যুক্তরাষ্ট্র যোগ দেবে কি না, তা তিনি বিবেচনা করছেন।
আরও পড়ুন: প্রধানমন্ত্রী চার দিনের জাপান সফর শেষে আজ দেশে ফিরছেন
ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুও হামলাটিকে ‘ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলা’ আখ্যা দিয়ে নিন্দা জানিয়েছেন। সৌদি আরবের সঙ্গে ইসরায়েলের কোনো কূটনৈতিক সম্পর্ক নেই।
সৌদি বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, শনিবারের হামলায় সৌদি আরবের চারজন, বাংলাদেশের দুজন, যুক্তরাষ্ট্রের একজন, মিসরের একজন, জর্ডানের একজন, সিরিয়ার একজন, ফিলিস্তিনের একজন ও সুদানের একজন নাগরিক নিহত হয়েছেন। এ ঘটনায় আহত হয়েছেন ৩০৯ জন।
এদিকে, সৌদি আরবে অবস্থিত ভারতীয় দূতাবাস জানিয়েছে, শনিবারের হামলায় আহত দেশটির এক নাগরিক রোববার মারা গেছেন।
বিমানবন্দরের কার্যক্রম স্থগিত
বিমান চলাচল-সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানিয়েছে, হামলায় বিমানবন্দরের রাডার ও যোগাযোগব্যবস্থার সরঞ্জাম ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পাশাপাশি রানওয়েগুলোও পরীক্ষা করে দেখতে হবে।
শনিবারের হামলার পর বিমানবন্দরে চরম বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির বর্ণনা দিয়েছেন প্রত্যক্ষদর্শীরা। রিয়াদের ৩২ বছর বয়সী এক বাসিন্দা এএফপিকে বলেন, ‘টার্মিনাল ৩-এ থাকা লোকজন আমাদের দিকে দৌড়ে আসতে শুরু করেন। কারও হাত বা বাহু বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছিল। আহতদের রক্তাক্ত অবস্থায় কোলে করে নিয়ে মানুষ দৌড়াচ্ছিলেন।’
চিকিৎসা সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র এ তথ্য জানিয়েছে, হামলার পর আহতদের চিকিৎসায় জরুরি ভিত্তিতে বিপুলসংখ্যক চিকিৎসককে কাজে যোগ দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়।
সৌদি আরবে অবস্থানরত নিজেদের নাগরিকদের রিয়াদ বিমানবন্দর এড়িয়ে চলার পরামর্শ দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, জার্মানি ও স্পেনের দূতাবাস।
সোমবার অস্ট্রেলিয়াও হুতিদের হামলার নিন্দা জানিয়ে একে ‘অগ্রহণযোগ্য’ বলে আখ্যা দিয়েছে। এর আগে অস্ট্রেলিয়া সৌদি আরবে অবস্থানরত দেশটির নাগরিকদের ঘরের ভেতরে থাকতে ও নিরাপদ আশ্রয়ে অবস্থান করার পরামর্শ দিয়েছিল।
ইয়েমেনে সংঘাত আরও তীব্র
সৌদি আরবে বড় ধরনের সম্মেলন ও বিনোদন আয়োজনের মৌসুম শুরুর ঠিক আগে শনিবারের বিমানবন্দর হামলার ঘটনা ঘটেছে। ২০১৫ সালে আত্মঘাতী বোমা হামলার পর এটিকে দেশটিতে সবচেয়ে প্রাণঘাতী হামলা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
গ্রীষ্মের প্রচণ্ড গরম কমে আসার সঙ্গে সঙ্গে অক্টোবর মাসে সাধারণত ওমরাহ পালনের জন্য ভ্রমণের মৌসুম শুরু হয়। এ সময় বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে লাখ লাখ মুসলমান পবিত্র মক্কায় যান।
২০১৫ সাল থেকে সৌদি আরবের নেতৃত্বাধীন একটি আন্তর্জাতিক জোট ইয়েমেনের সরকারকে সামরিক সহায়তা দিয়ে আসছে। ইয়েমেনের আকাশসীমা ও হুতিদের নিয়ন্ত্রণাধীন রাজধানী সানার বিমানবন্দরের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টাও এই কার্যক্রমের অংশ।
অটোয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের নিরাপত্তা বিশ্লেষক জুনোর মতে, হুতিরা এখন সৌদি আরবের বিরুদ্ধে এমন কৌশল প্রয়োগ করতে চাইছে, যা সৌদি আরব এত দিন তাদের বিরুদ্ধে প্রয়োগ করে এসেছে।
এদিকে, ইয়েমেনের অভ্যন্তরে সৌদি-সমর্থিত সরকারি বাহিনী গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ বাব আল-মান্দাব প্রণালীর আশপাশে হুতিদের বিরুদ্ধে পাল্টা অভিযানে অগ্রসর হচ্ছে বলে শনিবার সামরিক সূত্র জানিয়েছে। তবে হুতিরা দাবি করেছে, তারা সরকারি বাহিনীর ওই অগ্রযাত্রা প্রতিহত করেছে।
মাঠপর্যায়ে দ্রুত পরিস্থিতি পরিবর্তন ও সাংবাদিকদের প্রবেশে নানা বাধা থাকায় সংঘাতে জড়িত দুই পক্ষের দাবিই স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন