০৩:৩৯ পি.এম
ভূমিকম্পের ঝুঁকি কমাতে রাজধানীর ভবনগুলোর ত্রুটি নিয়ে ধাপে ধাপে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছেন রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) চেয়ারম্যান ইঞ্জিনিয়ার রিয়াজুল ইসলাম।
তিনি আরও বলেন, ভূমিকম্পে ভবন ধসে পড়ার মূল কারণ শুধুমাত্র ভবনের উচ্চতা নয়, বরং ত্রুটিপূর্ণ নকশা, মাটির অবস্থা ও নির্মাণে অনিয়ম। তাই ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে অনুমোদিত নকশা, মাটি পরীক্ষা এবং প্রকৌশলগত মান নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি।
শনিবার সকালে রাজধানীর জাতীয় প্রেস ক্লাবের তোফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া মিলনায়তনে অ্যাসোসিয়েশন ইউটিলিটি রিপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (ডুরা) আয়োজিত ‘ভূমিকম্প ঝুঁকিতে দেশ: আমাদের করণীয়’ শীর্ষক আলোচনা সভায় তিনি এ বক্তব্য রাখেন।
আরও পড়ুন: পুলিশের ১১ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে বদলি করা হয়েছে
অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বাংলাদেশ প্রকৌশলী বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক মেহেদী হাসান আনসারী।
রাজউক চেয়ারম্যান ইঞ্জিনিয়ার রিয়াজুল ইসলাম বলেন, রাজধানীতে অনেক সংখ্যক ভবন রয়েছে এবং এসব ভবনের ঝুঁকি একসঙ্গে নিরূপণ করা সম্ভব নয়। এজন্য ধাপে ধাপে র্যাপিড ভিজ্যুয়াল অ্যাসেসমেন্ট, প্রিলিমিনারি ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যাসেসমেন্ট এবং ডিটেইল ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যাসেসমেন্ট করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
তিনি জানান, ভূমিকম্প মোকাবিলায় রাজউকের সক্ষমতা বাড়াতে একটি গবেষণা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এই প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ভূমিকম্পের আগে ঝুঁকি নিরূপণ ও সচেতনতা তৈরির পাশাপাশি ভবিষ্যতে প্রয়োজনীয় গবেষণাও করার কাজ হবে।
ইঞ্জিনিয়ার রিয়াজুল ইসলাম উল্লেখ করেন, ভূমিকম্পের ঝুঁকি কমাতে শুধু রাজউককে দায়ী করলে হবে না। সিটি কর্পোরেশন, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, ফায়ার সার্ভিসসহ সংশ্লিষ্ট সকল সংস্থাকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। একটি কার্যকর সিটি গভর্নমেন্ট ব্যবস্থা থাকলে নগর ব্যবস্থাপনার বিভিন্ন কাজ আরও সহজ ও সমন্বিতভাবে করা সম্ভব বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
আরও পড়ুন: দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিতে মানুষ হিমশিম খাচ্ছে: মিয়া গোলাম পরওয়ার
ভবন নির্মাণে অনিয়ম প্রসঙ্গে রাজউক চেয়ারম্যান বলেন, অনুমোদিত ছয়তলা ভবনকে নিয়মবহির্ভূতভাবে ১০তলা করা কিংবা নকশা পরিবর্তন করে নির্মাণের সুযোগ দেওয়া হবে না। এ ধরনের ভবনের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় কারিগরি ও আইনি যাচাই ছাড়া অনুমোদন দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই।
তিনি আরও বলেন, ভবনের নকশা প্রণয়নকারী স্থপতি ও প্রকৌশলীদেরও তাদের দায়িত্ব নিতে হবে। নকশায় স্বাক্ষর করার পাশাপাশি নির্মাণকাজের বাস্তবায়ন ও তদারকিতেও তাদের দায়িত্বশীল ভূমিকা রাখতে হবে। অনিয়ম হলে তাদেরও আইনানুগ প্রদানের ব্যবস্থা করা হচ্ছে।
রাজউক চেয়ারম্যান জনগণের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, আপনারা নিয়মের মধ্যে আসুন। অনুমোদিত নকশা অনুযায়ী ভবন নির্মাণ করুন এবং অকুপেন্সি সার্টিফিকেট নিন।
গণমাধ্যমকে অনিয়মের তথ্য তুলে ধরার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, সংবাদমাধ্যম থেকে পাওয়া অভিযোগ রাজউক যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার চেষ্টা করছে।
আরও পড়ুন: ‘গণঅভ্যুত্থানের পরতে পরতে হাসনাত ও সারজিসের গাদ্দারি খুঁজে পাওয়া যাবে’
তিনি বলেন, রাজউকের দুর্বল উপস্থিতিকে শক্তিশালী উপস্থিতিতে পরিণত করাই তার লক্ষ্য। এজন্য ভবন নির্মাণে অনিয়ম, ঝুঁকিপূর্ণ স্থাপনা ও নগর ব্যবস্থাপনার বিভিন্ন সমস্যা চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। এই কাজ একদিনে সম্ভব নয়। শুরু করেছি, কতটুকু করতে পারবো জানি না; তবে আমরা চেষ্টা করছি।
ভূমিকম্পের মতো বড় দুর্যোগ মোকাবিলায় সরকার, সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান, ভবন মালিক, প্রকৌশলী এবং সাধারণ মানুষ সবাইকে নিজেদের জায়গা থেকে দায়িত্বশীল হওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
রিহ্যাবের ভাইস প্রেসিডেন্ট-১ আব্দুর রাজ্জাক বলেন, ভবন নির্মাণের ঝুঁকি সম্পর্কে জনগণের মধ্যে জনসচেতনতা বাড়াতে গণমাধ্যমকে নিয়মিত ভূমিকা রাখতে হবে। প্রকৌশলী ও তদারকি সংস্থাগুলোকে ব্যক্তিস্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে সততা ও দায়িত্বশীলতার সঙ্গে কাজ করতে হবে।
তিনি বলেন, দেশের স্বার্থ ও জনগণের নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে রাজউকসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে ডেভেলপারদের সহযোগিতা করতে হবে। অভিজ্ঞ প্রকৌশলীদের মাধ্যমে ভবনের নকশা ও নির্মাণ নিশ্চিত করা গেলে টেকসই ও নিরাপদ ভবন নির্মাণ সম্ভব।
আরও পড়ুন: আগামী বছর দেশে বিদ্যুৎ রাখার জায়গা থাকবে না : চিফ হুইপ
ইনস্টিটিউট ফর প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (আইপিডি) নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক ড. আদিল মোহাম্মদ খান বলেন, ভূমিকম্পের ঝুঁকি শুধু ভবনের নকশা বা নির্মাণমানের ওপর নির্ভর করে না; ভবনটি কোথায় এবং কী ধরনের মাটির ওপর নির্মাণ করা হচ্ছে, সেটিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দুর্বল ও জলাভূমি এলাকায় অপরিকল্পিত আবাসন প্রকল্প ভূমিকম্পের ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দেয়। দুর্বল মাটির ওপর ভবন নির্মাণ বন্ধে রাষ্ট্রীয় সংস্থাগুলোকে কঠোরভাবে আইন প্রয়োগ করতে হবে। রাজউকসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে ভবনের নকশা ও নির্মাণ তদারকির পাশাপাশি নিয়ম ভঙ্গকারীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে।
ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির (ডিআরইউ) সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হাসান সোহেল বলেন, ঢাকায় অনুমোদিত ভবনের অতিরিক্ত তলা নির্মাণের বিষয়টি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। রাজউকের অসাধু কর্মকর্তাদের যোগসাজশে কোথাও কোথাও ছয়তলা অনুমোদন নিয়ে ১০ তলা ভবন নির্মাণের অভিযোগ রয়েছে। এসব ভবন চিহ্নিত করে দ্রুত পরিদর্শনের জন্য রাজউক চেয়ারম্যানের উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।
তিনি বলেন, ঢাকার প্রায় ছয় লাখ ভবনের মধ্যে ঝুঁকিপূর্ণ ভবনগুলো চিহ্নিত করা জরুরি। শুধু ভূমিকম্পের সময় সচেতনতা নয়, সারা বছর গণমাধ্যমকে এ বিষয়ে জনসচেতনতামূলক সংবাদ প্রচার করতে হবে।
মাইনুল হাসান সোহেল আরও বলেন, আগাম প্রস্তুতি ও ঝুঁকিপূর্ণ ভবন চিহ্নিত করা গেলে বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি এড়ানো সম্ভব। এজন্য রাজউক, গণমাধ্যম ও নাগরিকদের নিজ নিজ জায়গা থেকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালনের আহ্বান জানান তিনি।
আরও পড়ুন: শেরেবাংলা নগরে সচিবালয় সরছে, মন্ত্রিসভায় সিদ্ধান্ত
ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের উপ-পরিচালক সালেহ উদ্দিন বলেন, ভূমিকম্প মোকাবিলায় কোনো একক সংস্থার পক্ষে কাজ করা সম্ভব নয়; সমন্বিতভাবে সব স্টেকহোল্ডারকে প্রস্তুতি নিতে হবে। এজন্য সচেতনতা বাড়ানোর পাশাপাশি নিয়মিত মহড়া ও প্রশিক্ষণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
তিনি জানান, ভূমিকম্পের পর উদ্ধার কার্যক্রম দ্রুত পরিচালনায় ফায়ার সার্ভিসের কিছু প্রস্তুতি রয়েছে। ঢাকার আশপাশের ৪১ ফায়ার স্টেশনকে এয়ারমার্ক করা হয়েছে এবং বিশেষ রেসপন্স টিমও প্রস্তুত রাখা হয়েছে। তবে এসব প্রস্তুতি যথেষ্ট নয় উল্লেখ করে তিনি সরকারি-বেসরকারি সব সংস্থাকে একসঙ্গে কাজ করার আহ্বান জানান।
সালেহ উদ্দিন আরও বলেন, ভূমিকম্পে মানুষ সরাসরি মারা যায় না, বরং ভবন ও স্থাপনা ধসে পড়েই প্রাণহানি ঘটে। তাই ভবন নির্মাণে বাংলাদেশ ন্যাশনাল বিল্ডিং কোড ও সংশ্লিষ্ট আইন মেনে চলার পাশাপাশি ফায়ার সেফটি নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি পরিবার, কমিউনিটি ও জাতীয় পর্যায়ে আগাম প্রস্তুতি নেওয়ার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
ডুরার সভাপতি শাহজাহান মোল্লা বলেন, ঢাকাসহ সারা দেশে ভূমিকম্পের ঝুঁকি নিয়ে সচেতনতা বাড়াতে গণমাধ্যমকে আরও সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে হবে। সাম্প্রতিক ভূমিকম্পের পর রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় ঝুঁকি নিয়ে নতুন করে ভাবার প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে।
আরও পড়ুন: সাংবাদিক সহিদুলকে প্রাণনাশের হুমকি, আদালতে মামলা
তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থা নিয়মিত ভূমিকম্পের ঝুঁকি ও প্রস্তুতি নিয়ে নানা তথ্য তুলে ধরছে। এসব তথ্যের আলোকে বর্তমান পরিস্থিতিতে আমাদের কী করণীয় এবং কীভাবে ঝুঁকি কমানো যায়, সে বিষয়ে জনসচেতনতা তৈরির প্রয়োজন রয়েছে।
শাহজাহান মোল্লা বলেন, গণমাধ্যমের মাধ্যমে সঠিক তথ্য তুলে ধরে সরকার ও রাজউকের নীতিনির্ধারণী কার্যক্রমে সহযোগিতা করা সম্ভব। এ লক্ষ্যেই ভূমিকম্পের ঝুঁকি ও করণীয় নিয়ে এ ধরনের আলোচনা আয়োজন করা হয়েছে।
তিনি অনুষ্ঠানে উপস্থিত অতিথি ও সাংবাদিকদের ধন্যবাদ জানিয়ে ভূমিকম্পের ঝুঁকি মোকাবিলায় সম্মিলিতভাবে কাজ করার আহ্বান জানান।
অনুষ্ঠানে সঞ্চালনায় ছিলেন ডুরার সাধারণ সম্পাদক জহিরুল ইসলাম। অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন ডুরার প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক মিরাজ মাহবুব ইফতি এবং সিনিয়র সাংবাদিক রিপন তালুকদার প্রমুখ।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন