১১:৪২ এম
দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের সৌরবিদ্যুৎ সম্প্রসারণের পরিকল্পনা নীতি ও প্রতিশ্রুতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। তবে চলতি বাজেটে এই খাতের জন্য নেওয়া কয়েকটি বড় সিদ্ধান্ত সেই চিত্র বদলে দেওয়ার সম্ভাবনা তৈরি করেছে।
এই বাজেটে সরকার সৌর প্যানেল, ইনভার্টার, লিথিয়াম ব্যাটারি, ডিসি কেবল এবং মাউন্টিং স্ট্রাকচার-সহ সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনের গুরুত্বপূর্ণ উপকরণের ওপর আরোপিত সব ধরনের আমদানি শুল্ক প্রত্যাহার করেছে। এর ফলে এসব যন্ত্রপাতির ওপর কার্যকর শুল্কের বোঝা প্রায় ২০ শতাংশ থেকে শূন্যে নেমে গেছে।
এছাড়া অন্যান্য সৌর উপকরণের ওপর থাকা কাস্টমস ও নিয়ন্ত্রক শুল্কও শূন্য করা হয়েছে। ব্যাটারি আমদানির ক্ষেত্রে ৬১ দশমিক ৮ শতাংশ পর্যন্ত যে শুল্ক ছিল, সেটিও তুলে নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে বাণিজ্যিক সৌরবিদ্যুৎ বিনিয়োগে ২০৩৫ সাল পর্যন্ত পূর্ণ আয়কর ছাড় দেওয়া হয়েছে। যারা বাড়ি, প্রতিষ্ঠান বা শিল্পকারখানায় সৌরবিদ্যুৎ স্থাপন করবেন, তারা বিদ্যুৎ বিলে ৫ শতাংশ পর্যন্ত ছাড় পাওয়ার সুযোগ পাবেন।
আরও পড়ুন: যাত্রাবাড়ীতে ছিনতাই সন্দেহে গণপিটুনিতে আহত যুবক নিশাত মিয়ার মৃত্যু
বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব পদক্ষেপ বাংলাদেশে ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুতের বড় ধরনের সম্প্রসারণ ঘটাতে পারে।
শুল্ক কমানোর ফলে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনের ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসবে। আগে যেখানে ১ মেগাওয়াট ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনে খরচ হতো প্রায় ৩ কোটি ৫০ লাখ থেকে ৪ কোটি টাকা, এখন তা নেমে আসবে আনুমানিক ২ কোটি ৭৫ লাখ থেকে ৩ কোটি টাকায়। অর্থাৎ ব্যয় কমতে পারে প্রায় ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ।
এক কিলোওয়াট-ঘণ্টা ক্ষমতার যে ব্যাটারির দাম আগে প্রায় ৩০০ মার্কিন ডলার ছিল, শুল্ক প্রত্যাহারের পর সেটি প্রায় ১৬০ ডলারে পাওয়া সম্ভব হতে পারে। একইভাবে ১ মেগাওয়াট সৌর প্রকল্পে বিদেশি মুদ্রায় ব্যয় কমবে প্রায় ৪০ হাজার ডলার, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৫০ লাখ টাকার সমান।
দেশের অন্যতম বড় সৌর প্যানেল উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান ওমেরা সোলারের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মাসুদুর রহিম বলেন, "অতীতে আমরা শুধু স্বপ্ন দেখেছি এবং আলোচনা করেছি। এখন সরকার বাস্তব পদক্ষেপ নিয়েছে।"
আরও পড়ুন: গণভোটের রায় না মানলে তারেক রহমানের ক্ষমতায় থাকার অধিকার নেই: জুনায়েদ
খাতসংশ্লিষ্টরা ধারণা করছেন, আগামী দুই বছরের মধ্যে বাংলাদেশে নতুন করে প্রায় ২ হাজার মেগাওয়াট ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা যুক্ত হতে পারে। এর ফলে পাকিস্তান-ভিয়েতনাম ধাঁচের একটি অর্থনৈতিক উত্থানের সম্ভাবনা রয়েছে, যা এক দশকের মধ্যে বাংলাদেশের জ্বালানি মিশ্রণকে আমূল পরিবর্তন করে দেবে।
পাকিস্তান ও ভিয়েতনামের অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের জন্য পাকিস্তান ও ভিয়েতনামের সৌরবিদ্যুৎ সম্প্রসারণ একটি বড় উদাহরণ হতে পারে। পাকিস্তানে গত কয়েক বছরে সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার ব্যাপকভাবে বেড়েছে। দেশটিতে বর্তমানে আনুমানিক ৩৪ হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ সক্ষমতা রয়েছে, যার মধ্যে প্রায় ২৫ হাজার মেগাওয়াট বিকেন্দ্রীভূত ও গ্রিড-সংযুক্ত স্থাপনা।
২০২২ সালে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের পর জ্বালানি তেলের দাম বেড়ে গেলে পাকিস্তান আমদানিনির্ভর জ্বালানি ব্যবস্থার চাপে পড়ে। এরপর সরকার সৌরবিদ্যুৎ সরঞ্জামের আমদানি শুল্ক কমিয়ে দেয়। এর ফল হিসেবে দেশটির জ্বালানি মিশ্রণে সৌরবিদ্যুতের অংশ ২০২০ সালের ২ দশমিক ৯ শতাংশ থেকে ২০২৫ সালে ৩২ দশমিক ৩ শতাংশে উঠে এসেছে।
বর্তমানে পাকিস্তানের প্রতি চারটি পরিবারের একটি কোনও না কোনওভাবে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহার করছে। এর ফলে দেশটি জ্বালানি আমদানিতে শত শত কোটি মার্কিন ডলার সাশ্রয় করতে পারছে।
আরও পড়ুন: বিয়ের ১৫ দিনের মাথায় সড়কে প্রাণ গেল ইতালি প্রবাসী তানভীরের
ভিয়েতনামের ক্ষেত্রেও বিষয়টি ছিল সমানভাবে চমকপ্রদ। ২০১৮ সালেও দেশটির সৌরবিদ্যুৎ খাত প্রায় শূন্যের কাছাকাছি ছিল। বিদ্যুতের ক্রমাগত দাম বৃদ্ধি এবং আকর্ষণীয় নীতিগত সুবিধা দেশটির সৌর খাতকে দ্রুত এগিয়ে দিয়েছে। এর ফলে ২০২৫ সালের শেষ নাগাদ সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন ১৯ হাজার মেগাওয়াট ছাড়িয়েছে, যা দেশটিকে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বৃহত্তম সৌর উৎপাদকে পরিণত করেছে।
বাংলাদেশের জন্য এখনই উপযুক্ত সময় বাংলাদেশেও বর্তমানে সৌরবিদ্যুতের অর্থনৈতিক সুবিধা সুস্পষ্টভাবে লক্ষ্য করা যাচ্ছে। যেখানে শিল্প খাতে গ্রিড বিদ্যুতের দাম অফ-পিক সময়ে প্রতি ইউনিট ১১ টাকা ৫৬ পয়সা এবং পিক সময়ে প্রায় ১৬ টাকা পর্যন্ত পড়ে, সেখানে শুল্ক ছাড়ের ফলে, ছাদভিত্তিক সৌর প্রকল্প ২০ বছর মেয়াদে প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদন খরচ প্রায় ৩ টাকার মধ্যে রাখা সম্ভব হতে পারে। যা বিদ্যুতের গ্রিড মূল্যের প্রায় এক-চতুর্থাংশ। সুতরাং এর অর্থনৈতিক দিকটি এখন আর প্রান্তিক নয়। বরং তা অত্যন্ত আকর্ষণীয় ও লাভজনক।
ইনস্টিটিউট ফর এনার্জি ইকোনমিকস অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল অ্যানালাইসিস (আইইইএফএ)-এর প্রধান জ্বালানি বিশ্লেষক শফিকুল আলম বলেন, "যেসব শিল্পপ্রতিষ্ঠানের ছাদ বা অব্যবহৃত জায়গা রয়েছে, তারা দ্রুত সৌরবিদ্যুতে যেতে আগ্রহী হবে। আর্থিক সক্ষমতা থাকা গ্রামীণ গ্রাহকরাও এতে যুক্ত হতে পারেন।"
সৌরবিদ্যুতের সম্প্রসারণ শুধু বিদ্যুৎ খাত নয়, দেশের অর্থনীতিতেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
আরও পড়ুন: হাসিনার পতনের আগে ইউনূসকে দায়িত্ব নেওয়ার আহ্বান করেন শফিকুল আলম
ওমেরা সোলারের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মাসুদুর রহিমের হিসাব অনুযায়ী, পাঁচ বছরের মধ্যে শিল্পকারখানায় ৪ হাজার মেগাওয়াট ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ স্থাপন করা সম্ভব হলে গ্রিড বিদ্যুতের ওপর চাপ কমবে এবং সরকার বছরে প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকা পর্যন্ত বিদ্যুৎ ভর্তুকি কমাতে পারবে।
বর্তমানে সরকার প্রতি ইউনিট বিদ্যুতে প্রায় ৪ থেকে ৬ টাকা পর্যন্ত ভর্তুকি দিচ্ছে।
এছাড়া প্রতি ৫০০ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনের মাধ্যমে প্রায় ২ কোটি ডলার পর্যন্ত আমদানি ব্যয় সাশ্রয় হতে পারে। ১ হাজার মেগাওয়াট হলে এই সাশ্রয় দ্বিগুণ হবে।
সরকার আগামী পাঁচ বছরে ১০ হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্য নিয়েছে। এর মধ্যে শিল্পকারখানার ছাদ থেকেই ৪ হাজার মেগাওয়াট উৎপাদন সম্ভব বলে মনে করছেন খাতসংশ্লিষ্টরা।
আরও পড়ুন: ভোটার এলাকা পরিবর্তনের আবেদন সময়সীমা ১ নভেম্বর পর্যন্ত বাড়াল ইসি
বড় চ্যালেঞ্জ মান নিয়ন্ত্রণ তবে এই সম্ভাবনার পাশাপাশি একটি বড় ঝুঁকিও রয়েছে, সেটি হচ্ছে নিম্নমানের যন্ত্রপাতি।
আমদানি শুল্ক শূন্য করার ফলে বাজারে সস্তা কিন্তু নিম্নমানের সৌর প্যানেল, ব্যাটারি ও ইনভার্টারের প্রবেশ বাড়তে পারে। এসব পণ্য দ্রুত নষ্ট হলে গ্রাহকদের মধ্যে সৌরবিদ্যুৎ নিয়ে নেতিবাচক ধারণা তৈরি হতে পারে।
শফিকুল আলম বলেন, "টেকসই ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (স্রেডা) ও বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস এন্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশনকে (বিএসটিআই) নিশ্চিত করতে হবে যেন মানহীন পণ্য বাজারে প্রবেশ করতে না পারে। তা না হলে গ্রাহক ক্ষতিগ্রস্ত হবেন এবং সৌরবিদ্যুতের প্রতি আস্থা কমে যেতে পারে।"
যদি নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো আমদানি পর্যায়ে পণ্যের মান নিশ্চিত করতে না পারে, তবে সৌরশক্তিকে সবার জন্য সহজলভ্য করার উদ্দেশ্যে নেওয়া শুল্ক মওকুফের ফলে বাজার সস্তা ও অবিশ্বস্ত সরঞ্জামে ছেয়ে যেতে পারে এবং বাংলাদেশের সৌরশক্তির এই যুগান্তকারী মুহূর্তটি একটি ব্যর্থতার উদাহরণ বা উপাখ্যানে পরিণত হতে পারে।
আরও পড়ুন: রাজউকের ১২৬৯ ভবনের মালিককে চূড়ান্ত নোটিশ, নির্দেশনা না মানলে আইনানুগ ব্যবস্থা
পরিশেষে বলা যায়, সরকার কর্তৃক গৃহীত নীতিটি সঠিক। এর অর্থনৈতিক দিকটিও সঠিক। জ্বালানি সরবরাহের অনিশ্চয়তা এবং ক্রমবর্ধমান গ্রিড খরচের প্রেক্ষিতে, এখনকার চেয়ে ভালো উপযুক্ত সময় আর হতে পারে না। বাংলাদেশ এই মুহূর্তটি কাজে লাগাবে নাকি নষ্ট করবে, তা শুল্ক হ্রাসের ওপর নির্ভর করবে না, বরং সেই কর্তৃত্বের ওপর নির্ভর করবে, যারা নিশ্চিত করবে যে চট্টগ্রাম বন্দরে যা এসে পৌঁছায় তা কারখানার ছাদে স্থাপনের যোগ্য কি না। সৌজন্যে: টিবিএস
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন