০৭:৩০ পি.এম
মালয়েশিয়ার মানবসম্পদ মন্ত্রণালয় বিদেশি কর্মী নিয়োগের প্রক্রিয়া সম্পর্কে নতুন নির্দেশনা প্রকাশ করেছে। বিদেশি কর্মী নিয়োগের জন্য যেসব প্রতিষ্ঠান কাজ করবে, তাদের এই নির্দেশনাগুলো অনুসরণ করতে হবে বলে জানানো হয়েছে।
দেশটির সরকার পূর্বে অনুমোদিত কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে বিদেশি কর্মী নিয়োগের জন্য বাংলাদেশের ২৫টি রিক্রুটিং এজেন্সি এবং স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য ৪০টির বেশি মেডিক্যাল সেন্টারের তালিকা প্রকাশ করেছিল।
আরও পড়ুন: যাত্রাবাড়ীতে ছিনতাই সন্দেহে গণপিটুনিতে আহত যুবক নিশাত মিয়ার মৃত্যু
তবে এই এজেন্সিগুলোর নাম প্রকাশের পর জনশক্তি রপ্তানি সংশ্লিষ্ট এজেন্সিগুলোর মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। বিভিন্ন রাজনৈতিক দলও এটিকে ‘সিন্ডিকেট’ হিসেবে উল্লেখ করে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে।
জনশক্তি রপ্তানিকারকদের সংগঠন বায়রার সাবেক যুগ্ম মহাসচিব মোহাম্মদ ফখরুল ইসলাম বিবিসি বাংলাকে জানান, তালিকাভুক্ত এজেন্সিগুলোর মধ্যে ২-৩টি ছাড়া বাকি সবই মূলত ডামি এজেন্সি, যেগুলোর পেছনে প্রভাবশালীরা সক্রিয় রয়েছে।
এমন পরিস্থিতিতে, বাংলাদেশ সরকারের প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয় মালয়েশিয়া সরকারকে এ বিষয়ে জানতে চেয়ে একটি চিঠি পাঠিয়েছে। মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী বলেন, শ্রমবাজার নিয়ে দুই দেশের সরকার কাজ করছে এবং এখানে যা হবে তা স্বচ্ছতার সঙ্গে হবে।
আরও পড়ুন: গণভোটের রায় না মানলে তারেক রহমানের ক্ষমতায় থাকার অধিকার নেই: জুনায়েদ
তিনি আরও বলেন, ‘আশা করছি, দ্রুতই শ্রমবাজার খোলার বিষয়ে সে দেশের সরকারের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আমরা পেয়ে যাব। কোনো গোপনীয়তা বা সিন্ডিকেট থাকবে না, নিয়ম মেনে সবাই কাজের সুযোগ পাবে।’
’
জুলাইয়ের শেষ দিকে মালয়েশিয়ায় বৈঠকের পর প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মাহদী আমিন বলেছিলেন, ‘আগস্ট মাসের শেষ সপ্তাহ থেকেই মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশি শ্রমিকদের যাওয়া শুরু হবে।’ পরে চলতি মাসের শুরুতে প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান সচিবালয়ে এক প্রেস ব্রিফিংয়ে একই কথা বলেছিলেন।
আরও পড়ুন: বিয়ের ১৫ দিনের মাথায় সড়কে প্রাণ গেল ইতালি প্রবাসী তানভীরের
তবে, এখনও পর্যন্ত ঠিক কবে শ্রমবাজার উন্মুক্ত হওয়ার ঘোষণা মালয়েশিয়া দেবে, তা প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয় বা কুয়ালালামপুরে বাংলাদেশ হাইকমিশন জানতে পারেনি।
নিয়োগ প্রক্রিয়ায় যা বলেছে মালয়েশিয়া
মালয়েশিয়া কর্মী নিয়োগের বিষয়ে বাংলাদেশের সঙ্গে ২০২১ সালে একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছিল, যার মেয়াদ আগামী ডিসেম্বরে শেষ হবে। যদিও নানা দুর্নীতি, অনিয়ম ও সিন্ডিকেটের অভিযোগের কারণে ২০২৪ সালের জুনে বাংলাদেশ থেকে কর্মী নিয়োগ বন্ধ হয়ে যায়।
আরও পড়ুন: হাসিনার পতনের আগে ইউনূসকে দায়িত্ব নেওয়ার আহ্বান করেন শফিকুল আলম
ঢাকায় মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ওই সমঝোতা স্মারক কার্যকর থাকায় সেটি অনুসরণ করেই বাংলাদেশ থেকে কর্মী পাঠাতে হবে। তবে ডিসেম্বরের পর নতুন সমঝোতা স্মারক বা চুক্তির বিষয়ে পদক্ষেপ নেবে সরকার।
জনশক্তি রপ্তানিকারকরা বলছেন, যারা সিন্ডিকেট করেছে এবং যাদের দুর্নীতির কারণে মালয়েশিয়া শ্রমবাজার বন্ধ হয়েছে, তাদের একটি প্রভাবশালী গোষ্ঠী শুরু থেকেই মালয়েশিয়া শ্রমবাজার নিয়ন্ত্রণ করতে চাইছে।
বায়রার সাবেক যুগ্ম মহাসচিব মোহাম্মদ ফখরুল ইসলাম বলেন, ‘যাদের তালিকাভুক্ত করা হয়েছে, তাদের আমরা নিজেরাই তো চিনি না। মালয়েশিয়া সরকার তাদের কিভাবে চিনল? আসলে আগের সিন্ডিকেটের একটি অংশের সঙ্গে নতুন কিছু প্রভাবশালীরা এগুলোর পেছনে আছে এবং এই ক্ষেত্রে বড় দুর্নীতিও কাজ করেছে।’
এদিকে, প্রবাসী কল্যাণমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী সিন্ডিকেট বা এ ধরনের কোনো তৎপরতার অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছেন।
আরও পড়ুন: ভোটার এলাকা পরিবর্তনের আবেদন সময়সীমা ১ নভেম্বর পর্যন্ত বাড়াল ইসি
এজেন্সি ও মেডিক্যাল সেন্টার নিয়ে নানা প্রশ্নের মধ্যে রবিবার মালয়েশিয়ার মানবসম্পদ মন্ত্রণালয় বিদেশি কর্মী নিয়োগের প্রক্রিয়া ও নিয়মকানুন নির্দেশনা জারি করেছে, যা বাংলাদেশ সরকার দ্রুতই ‘শ্রমবাজার খোলার’ ইঙ্গিত হিসেবে মনে করছে।
ওই নির্দেশনা জারি করে যে বিবৃতি দেওয়া হয়েছে, তাতে বলা হয়েছে, বিদেশি কর্মী নিয়োগের পুরো প্রক্রিয়া স্বচ্ছ, সুশৃঙ্খল ও নির্ধারিত নিয়ম অনুযায়ী সম্পন্ন করতে হবে।
মালয়েশিয়া সরকার এই নির্দেশনা অনুযায়ী, একজন বিদেশি কর্মী নিয়োগের জন্য মালয়েশিয়ায় গিয়ে কাজ শুরু করার জন্য আটটি ধাপ অতিক্রম করতে হবে।
প্রথম ধাপে নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানকে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে কর্মী চেয়ে আবেদন করতে হবে বা অনুমোদন নিতে হবে। একই সঙ্গে নির্দিষ্ট প্লাটফর্মে সংশ্লিষ্ট শূন্য পদে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করতে হবে।
আরও পড়ুন: রাজউকের ১২৬৯ ভবনের মালিককে চূড়ান্ত নোটিশ, নির্দেশনা না মানলে আইনানুগ ব্যবস্থা
এরপরের ধাপে আগ্রহী নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানকে মানবসম্পদ মন্ত্রণালয়ের ওয়ান-স্টপ সেন্টারে বিদেশি কর্মীর কোটা চেয়ে আবেদন করতে হবে।
অনলাইনে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র যাচাইয়ের পর সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে সরাসরি সাক্ষাৎকার নেওয়া হবে এবং কোটা অনুমোদনের সিদ্ধান্ত জানানো হবে।
তৃতীয় ধাপে লেভি বা নিয়োগসংক্রান্ত সরকারি ফি পরিশোধ করতে হবে, যা মালয়েশিয়ার অভিবাসন বিভাগ এবং মাইআইএমএমএস ব্যবস্থার মাধ্যমে সম্পন্ন করতে হবে।
এরপর নিয়োগদাতা শর্তসাপেক্ষ অনুমোদনপত্র সংগ্রহ করবেন। এই প্রক্রিয়াটিও মানবসম্পদ মন্ত্রণালয়ের ওয়ান-স্টপ সেন্টার এবং সরকার নির্ধারিত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সম্পন্ন হবে।
এটি হয়ে যাওয়ার পর বিদেশি কর্মীর নিজ দেশের মালয়েশিয়ান দূতাবাস বা সংশ্লিষ্ট কূটনৈতিক মিশনের মাধ্যমে নির্ধারিত আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করতে হবে।
এগুলো সম্পন্ন হওয়ার পর ষষ্ঠ ধাপে কর্মী উৎস দেশ থেকে নিয়োগ ও মালয়েশিয়ায় পাঠানোর ব্যবস্থা করতে হবে এবং এটি করতে হবে রিক্রুটমেন্ট এজেন্সি (আরএ) বা নিয়োগকারী সংস্থার মাধ্যমে।
সপ্তম ধাপে বিদেশি কর্মীর জন্য ভিসা উইথ রেফারেন্স (ভিডিয়োর) সংগ্রহ করতে হবে এবং শেষ বা অষ্টম ধাপে বিদেশি কর্মীর মালয়েশিয়ায় প্রবেশ সম্পন্ন হবে। এই ধাপ শেষ হওয়ার মধ্য দিয়ে নিয়োগের নির্ধারিত প্রক্রিয়া সম্পন্ন হবে।
ওই নির্দেশনায় মালয়েশিয়া সরকার বিদেশি কর্মী নিয়োগসংক্রান্ত বিস্তারিত তথ্য ও অনুমোদিত রিক্রুটমেন্ট এজেন্সির তালিকা জানতে নিয়োগদাতাদের মালয়েশিয়া সরকারের বিদেশি কর্মী ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত প্লাটফর্ম ফরেন ওয়ার্কার্স সেন্ট্রালাইজড ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম বা এফডব্লিউসিএমএস পোর্টাল ব্যবহারের পরামর্শ দিয়েছে।
প্রসঙ্গত, বাংলাদেশে গত ফেব্রুয়ারিতে বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রথম বিদেশ সফরে মালয়েশিয়ায় শ্রমবাজার খুলে দেওয়ার প্রসঙ্গ সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পেয়েছিল।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন